বৃহস্পতিবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ০১:৫৪ অপরাহ্ন

এক সময় ফেল করা পাবনার সেই ছাত্রটি এখন বিসিএস ক্যাডার!

ভাঙ্গুড়া প্রতিনিধি : এক সময়ের পড়ালেখায় দুর্বল, পরীক্ষায় একাধিক বিষয়ে ফেল করা। পিছনের বেঞ্চে বসা দরিদ্র পরিবারে সেই ছাত্রটি বর্তমানে বিসিএস ক্যাডার। এখন তাকে নিয়ে এলাকাবাসী করেন গর্ব।

তিনি হলেন বিদ্যুৎ কুমার রায়। বাবা হরেন্দ্রনাথ রায় পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার উত্তর মেন্দার বাসিন্দা।

১৯৭৫ সালে এ উপজেলার উত্তর মেন্দা এলাকায় হৃত দরিদ্র সূত্রধর পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন তিনি। বাবা পেশায় ছিলেন একজন সাইকেল মেকার। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়।

অর্থের অভাবে তার বাবা হরেন্দ্রনাথ ছেলেকে পড়া লেখার খরচ, বই-খাতা-কলম ও পোশাক জোগাড় করে দিতে পারেতন না। কিন্তু কঠোর পরিশ্রম সাধনায় শত বাধাকে অতিক্রম করে তিনি আজ বিসিএস ক্যাডার হয়েছেন। বর্তমানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কলেজ এডুকেশন ডেভলপমেন্টের টিচার ট্রেনিংয়ে প্রোগ্রাম অফিসার হিসেবে কর্মরত তিনি। তার লেখা রসায়ন বই ৯ম-১০ম শ্রেণির পাঠ্যসূচিতে স্থান পেয়েছে।

তিনি শরৎনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ১৯৮৫ সালে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন। ১৯৯০ সালের এসএসসি পরীক্ষায় গণিতে লেটার নিয়ে ভাঙ্গুড়া ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২য় বিভাগে পাস করেন এবং ১৯৯২ সালে হাজী জামাল উদ্দীন ডিগ্রী কলেজ থেকে দ্বিতীয় বিভাগে এইচএসসি পাস করেন।

পরর্বতীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রাসায়ন বিভাগে ভর্তি হয়ে রেকর্ড পরিমাণ নম্বর নিয়ে ১৯৯৬ সালে বিএসসি (সম্মান) প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় হন। ১৯৯৭ সালে এমএসসিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। এ জন্য তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গোল্ড মেডেল ও বিশ্ববিদ্যালয় পুরস্কারে ভূষিত হন।

বিসিএস ক্যাডার বিদ্যুৎ কুমার রায় (সহযোগী অধ্যাপক রসায়ন) তার অতীত জীবনের স্মৃতিচারণ করে জানান, প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে মাধ্যমিকের অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় সব শ্রেণিতেই অংক ও ইংরেজি বিষয়ে তিনি ফেল করেছিলেন। মানুষ পাশ করে উপরের ক্লাসে উঠত আর তিনি ফেল করেই উপরের শ্রেণিতে উঠতেন। আর তিনি ফেল করেলেও তার মা শিক্ষকদের কাছে গিয়ে অনুরোধ করে তাকে উপরের শ্রেণিতে তুলে দিতো। স্কুলে পড়া লেখা কিছুই পারতেন না।

এ কারণে বসতে হতো তাকে পেছনের বেঞ্চে। কোনো রকমে পুরাতন পোশাক আর পুরাতন স্যান্ডেল পড়ে স্কুলে যেতেন। সহপাঠীরা প্রায়ই তাকে মারধর করত। কিন্তু কাউকেই তিনি কিছুই বলতেন না। কারণ সে সময় তিনি মনে করতেন যে, গরিবদের সঙ্গে অন্যরা এমনই আচারণ করে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় ফজলু স্যার তাকে একদিন দ্রুত হাতের লেখা লিখতে পারলে চকলেট দিবে বললে তিনি দ্রুত হাতের লেখা লিখতে আয়ত্ত করে ফেলেন।

এর পর থেকে তার সঙ্গে দ্রুত লিখতে পারা অনেকেই পারতেন না। এভাবে এসএসসিতে টেস্ট পরীক্ষায় ইংরেজি ও অংকে ফেল করে নারান ও ধীরন স্যারের কাছে পড়ে তিনি ১৯৯০ সালে এসএসসি পাস করেন। এরপর ১৯৯০- ১৯৯১ শিক্ষাবর্ষে হাজী জামাল উদ্দীন ডিগ্রী কলেজে ভর্তি হন। সেখানে বই কিনতে পারেননি। ক্লাসে পড়া ধরলে শিক্ষককে বলতেন বই কিনতে পারিনি তাই পড়া হয়নি। তাই কলেজের শিক্ষকরা বিভিন্ন সময়ে তাকে বই দিয়ে সহায়তা করত।

এভাবেই এইচএসসি পরীক্ষায় পাস করে। আশা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে কিন্তু মানুষ বলতো তোমার বাবা সাইকেলের মেকার তাই সাইকেল সেরেই খাওগা। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার খরচ জোগাতে পারবে না। ওই আশা ছেড়ে দাও। তাই সবার কথা শুনে জামাল উদ্দীন ডিগ্রী কলেজে বিএসএসে ভর্তি হন।

সেখানে ফ্রি পড়ার আবেদন করলে হাফ ফ্রি পড়ার আবেদন মঞ্জুর হয়। কিন্তু তার চেয়ে বড় লোকের ঘরে সন্তানরা পায় ফুল ফ্রি আর তিনি পান হাফ ফ্রি। মনে এ কষ্ট নিয়ে তিনি মনস্থির করেন যে, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া লেখা করবেন। তাই তিনি এক বছর বাদ দিয়ে পরের বছর ভর্তি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করেন। এরপর থেকে দিনরাত কঠোর পরিশ্রম ও শ্রমের বিনিময়ে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের পড়ার সুযোগ লাভ করেন।

সেখানে ছাত্র জীবনে প্রচুর পড়াশোনার মধ্য দিয়ে সময় কাটিয়েছেন। এমনটি পড়া লেখা ছাড়া অন্য কোনো জগৎ তিনি জানতেন না। সে কারণেই তিনি ১৯৯৬ সালের বিএসসি (সম্মান) প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় ও ১৯৯৭ সালের এমএসসি পরীক্ষায় রেকর্ড পরিমাণ নম্বর প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান লাভ করে। সে কারণে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গোল্ড মেডেল ও বিশ্ববিদ্যালয় পুরস্কারে ভূষিত হন।

তিনি আরো জানান, ছাত্রজীবনে তিনি বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে গেলে গরিব বলে তাকে কেউ খেলা নিতো না । কারণ তারা বলতো তিনি খেলার কোনো সামগ্রী কিনতে পারবে না। তবে কখনো কখনো তাকে ফুটবল খেলায় গোলকিপার রাখতো। সেখানেও তিনি দেখিয়েছেন দক্ষতা।

এরপর তার অদম্য চেষ্টা ও ইচ্ছার কারণে ২২তম বিসিএস পরীক্ষায় সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে উত্তীর্ণ হন। বর্তমানে তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কলেজ অ্যাডুকেশন ডেভলপমেন্টের টিচার ট্রেনিং এ প্রোগ্রাম অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন। তবে শনিবার সরকারি ছুটির দিন হলে জন্মভূমি ভাঙ্গুড়ায় ও পাশের উপজেলার এসে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছুটে যান এবং বিনামূল্যে শিক্ষার্থীদের ক্লাস নেয়াসহ শিক্ষক শিক্ষার্থীদের বিষয়ে বিভিন্ন পরামর্শ দেন।

প্রতিটি শিশুর মধ্যেই অদম্য মেধা রয়েছে শিক্ষকরাই পারেন সেটিকে ফুটিয়ে তুলতে এবং বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা আগামী দিনে পৃথিবী শাসন করবে এমন আশা ব্যক্ত করে তিনি জানান, তার মতো বাংলার প্রতিটি ঘরে একজন করে বিসিএস ক্যাডার তৈরি হোক।


© All rights reserved 2020 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!