এডওয়ার্ড কলেজের অধ্যক্ষ’র বিরুদ্ধে কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার : দেশের ঐতিহ্যবাহি বিদ্যাপিঠ পাবনা সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. হুমায়ুন কবির মজুমদারের বিরুদ্ধে কোটি টাকা দূর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।

ভূয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে গত এক বছরে তিনি এই পরিমান অর্থ আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

অধ্যক্ষের এমন কর্মকান্ডে শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।

লিখিত অভিযোগে জানা গেছে, কলেজের ছাত্র সংসদের কার্যক্রম চালু না থাকলেও
ছাত্র সংসদের তহবিল হতে সরকারি পরিপত্রকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ভূয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে অধ্যক্ষ ৭ লক্ষ টাকা আত্মসাত করেছেন।

তিনি গত এক বছরে কোন রুপ টেন্ডার ছাড়াই পিওন, কর্মচারী ও অফিস সহকারি এবং অধ্যক্ষ’র কতিপয় আস্থাভাজন শিক্ষকের মাধ্যমে উন্নয়ন তহবিল হতে ২৮ লক্ষ ২১ হাজার ৫৭৬ টাকা উত্তোলন করেছেন।

এই অর্থের অধিকাংশ অর্থই তিনি অফিস সহকারি ও পিওনদের নামে উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেছেন।

কিন্তু সরকারি পরিপত্র অনুযায়ী কোন পিওন ও অফিস সহকারির নামে চেক ইস্যু করা সম্পূর্ণ অবৈধ।

সরকারি পরিপত্রে বিবিধ খাত নামে আলাদা কোন খাত না থাকলেও দরিদ্র ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে বিবিধ খাতের নাম করে ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরেই ২৮ লাখ ৭৬ হাজার টাকা উত্তোলন করেছেন।

আদায়কৃত টাকা ভূয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে।

এক বছরে পরিবহন খাতে ৬৮ লক্ষ টাকায় গাড়ির টায়ার, যন্ত্রপাতি ক্রয় ও
মেরামত দেখানো হলেও সিংহভাগ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে নানা ভুয়া বিল
ভাউচারে।

২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরেই সরকার এডওয়ার্ড কলেজের নামে ১৯ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ক্রয়ের জন্য বরাদ্দ দেয়।

কিন্তু টেন্ডার ছাড়াই ২/৩ লাখ টাকার যন্ত্রপাতি ক্রয় করা হয়। আর বাকি টাকা ভূয়া বিল ভাউচার দেখিয়ে উত্তোলন দেখানো হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নিয়মানুযায়ী ২ লাখ টাকার অতিরিক্ত মালামাল ক্রয়ের জন্য পত্রিকায় টেন্ডার প্রকাশ করতে হবে।

অথচ অধ্যক্ষ সরকারী নিয়মকে উপেক্ষা করে নামেমাত্র মালামাল করে দূর্নীতির আশ্রয় নিয়েছেন।

অধ্যক্ষ হুমায়ুন কবির মজুমদার ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে পাবনা সরকারী
এডওয়ার্ড কলেজে যোগদান করেন।

যোগদানের পরপরই শুরু হয় তার দূর্নীতির মহোৎসব।

শুরুতেই কলেজের বিভিন্ন বিভাগে মাস্টার্স ভর্তি ফরম বিক্রয়ে অতিরিক্ত ৬ লাখ টাকা আদায় করেন এবং মাস্টার্স ফরম পূরণের সময় আরো ২০ লাখ টাকা অতিরিক্ত আদায় করেন।

এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ হলে তিনি এই অতিরিক্ত টাকা ফেরত দেবে বলে শিক্ষার্থীদের কাছে প্রতিশ্রুতি দেন।

কিন্তু অদ্যবধি অধ্যক্ষ হুমায়ুন কবির তা ফেরৎ না দিয়ে আত্মসাৎ করেছেন।

কলেজের ছাত্র-অভিভাবক দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির পক্ষ থেকে এক লিখিত
অভিযোগে আরো জানা যায়, অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. হুমায়ুন কবির মজুমদার ১৪তম
বিসিএস’র জুনিয়র কর্মকর্তা হলেও বিগত বিএনপি-জামাত জোট সরকারের
আমলে রাষ্ট্রপতির ১০% কোটায় তারেক জিয়া ও সাবেক শিক্ষাপ্রতিমন্ত্রী
এহসানুল হক মিলনের (চাঁদপুর) সুপারিশে পদোন্নতি পেয়েছিলেন।

তিনি চাঁদপুর জেলার বাসিন্দার কারণেই এই মন্ত্রীপ্রীতি পেয়েছিলেন বলে সুত্রের দাবী।

সাংবাদিকদের কাছে লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, শুধু অর্থ আত্মসাৎ-ই নয় অধ্যক্ষ প্রতিদিনই গভীর রাত পর্যন্ত কলেজ কার্যালয়ে তাসের মাধ্যমে জুয়া খেলেন এবং বহিরাগতদের নিয়ে মজমা বসান।

অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. হুমায়ুন কবির মজুমদার নিজের দূর্নীতি ঢাকতে এবং নিজের মিথ্যা বাহাদুরি প্রকাশ করতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিজেকে বিভিন্ন মন্ত্রীর আত্মীয় এমনকি নিজেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টার পরিচয় দেন।

যার কোন ভিত্তি নেই।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কলেজের কয়েকজন শিক্ষক বলেন, অধ্যক্ষ’র স্বেচ্ছাচারিতা, স্বজনপ্রীতি, নানা কৌশলে অর্থ আত্মসাৎ ও ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নানা অন্যায় কর্মকান্ডে সাধারণ শিক্ষকেরা অতিষ্ঠ।

শিক্ষকেরা কোন ধরণের প্রতিবাদ করলেই অধ্যক্ষ তার উপর নানা হয়রানিসহ অন্যত্র বদলির নোংড়ামি শুরু করেন।

এসব বিষয়ে কথা বলতেই সরকারী এডওয়ার্ড কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি
তাজুল ইসলাম বলেন, কলেজে ছাত্র সংসদ নেই।

প্রিন্সিপালের টাকা উত্তোলনের বিষয়টি আমার জানা নেই। এসব বিষয়ে কথা বলাও আমার নিষেধ আছে।

একজন কলেজ অধ্যক্ষ এর এহেন দূর্নীতির বিষয়ে পাবনার বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ নাম
প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অর্থ উপার্জন করতে হলে শিক্ষা পেশায় কেন তিনি
অন্য পেশায় কাজ করতেন।

শিক্ষক হিসেবে ছাত্রছাত্রীদের টাকা আত্মসাৎ বিকৃত মানসিকতার প্রকাশ পায়। এটা লজ্জাস্কর বটে।

পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মনিরউদ্দিন মান্না জানান,
এডওয়ার্ড কলেজের শিক্ষার পরিবেশ, ছাত্র শিক্ষকের সম্পর্ক ও শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন
দাবীর বিষয়ে পাবনা সদর আসনের সংসদ সদস্য গোলাম ফারুক প্রিন্স একটি
তদারকি কমিটি গঠন করে দিয়েছেন।

সে বিষয়গুলো নিয়েই মূলত কাজ করছি।

তিনি বলেন, প্রিন্সিপালের দূর্নীতির বিষয়টি ওপেন সিক্রেট। দূর্নীতির দালিলিক  প্রমানাদিও হাতে হাতে।

তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষার স্বার্থে দূর্নীতি বা অনিয়ম হলে অবশ্যই তার উপযুক্ত তদন্ত প্রয়োজন।

কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, দুদক সারাদেশে কাজ করছে। অথচ পাবনার শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপিঠ দূর্নীতির অভয়ারন্যে পরিণত হয়েছে।  তা তাদেরচোখে পড়ছে না।

সরেজমিনে তদন্ত করে দূর্নীতিবাজ শিক্ষকসহ জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবী জানান এই অভিভাবক।

সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. হুমায়ুন কবির মজুমদারের সাথে মুঠোফোনে
একাধিক বার যোগাযোগ করা হলেও তিনি মোবাইল ফোন রিসিভ করেননি।

ক্ষমতাধর অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. হুমায়ুন কবির মজুমদারের সীমাহীন দুর্নীতির হাত
থেকে উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহি বিদ্যাপীঠ সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের অতীত সুনাম রক্ষায়, শক্তিশালী তদন্ত কমিটি করে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দুর্নীতি খতিয়ে দেখে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থার জোর দাবী জানিয়েছে শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ অভিজ্ঞজনেরা।