সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২০, ০৭:২০ অপরাহ্ন

আতঙ্কিত হবেন না
করোনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান অমর সৃষ্টি

image_pdfimage_print

।। মুরশাদ সুবহানী।।

পূর্ব প্রকাশের পর পর্ব (৩) :

এই প্রবন্ধের মুখ্য উদ্দেশ্য রবীন্দ্র-সঙ্গীতের সুর নিয়ে নিঁখুত কোনো আলোচনা নয়। এই কাজ আমার
নয়। এটি সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ পন্ডিতজনের কাজ। আমরা তাঁর গানের সুরের ব্যঞ্জনা নিয়ে সম্যক
আলোচনা করতে চাই।

শব্দ-সুর এক হয়ে আমাদের মনের গভীরে প্রোথিত হয়। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘ সুর
অনির্বচনীয়ের প্রধান বাহন। কিন্তু মানুষ যে ব্যবহার্য় সামগ্রীর সঙ্গেই অনির্বচনীয়কে প্রকাশ করতে
চেয়েছে তা নয়। তার চেয়ে অনেক বেশী ব্যাকুল হতে চেয়েছে আপন সুখ দুখ ভালোবাসার
সহযোগে। অর্থাৎ যে সব শব্দ তার হৃদয়াবেগের সংবাদ দেয়, শিল্প-কলার দ্বারা তার মধ্যে সে
অসীমের ব্যঞ্জনা আনতে চায়। আদিকাল থেকেই মানুষ তাই শব্দের সঙ্গে সুরকে মিলিয়ে গান
গেয়েছে।’

কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মানুষের এই শব্দ সুরের ব্যঞ্জনায় গানের বিষয়টি গভীরভাবে উপলব্দি করতে
পেরেছিলেন বলেই তাঁর গান আমাদের গভীরভাবে টানছে যুগের পর যুগ ।রবীন্দ্র-সঙ্গীত আমাদেরকে
মুগ্ধ করে চলেছে। তাঁর গানের বাণীতে সুখ-দুখ, বিরহ, বিচ্ছেদ, বাউল তত্ব যা আধ্যাত্বিকতা নামে
পরিচিত, ধর্মীয় দিক সব কিছুই আছে ।

বাক্য যা পারে না, গানের অমোঘ শক্তি তা পারে। যে কোনো গানেরই বাণী ও সুর যদি ভাল হয়
আর গায়কী কন্ঠ যদি হয় সুমধুর তাহলে সেই গান শুনতে সবার ভালো লাগে; মনের মধ্যে গেঁথে
যায়।

কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ধ্রুপদী ভারতীয় সঙ্গীত, বাংলা লোক সঙ্গীত, বাউল সঙ্গীতের
সহযোগিতায় সঙ্গীত, ইউরোপীয় সঙ্গীতের ধারায় নিজ প্রতিভায় সুর শৈলী সৃষ্টি করেন। তাঁর গানের
বাণীতে যে সুর করেন; সেই সুর ঝংকার তোলে মানুষের মনে। তিনি অনেক কবিতাকে সুর দিয়ে
গানে রূপান্তরিত করেছেন।

রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ সুকুমার সেন রবীন্দ্র-সঙ্গীত রচনার চারটি পর্ব নির্দেশ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘
প্রথম পর্বে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্ট গীতের অনুকরণে গান রচনা করেছিলেন।দ্বিতীয় পযায়ে

১৮৮৪-১৯০০ পল্লীগীতি ও কীর্তনের অনুকরণে রবীন্দ্রনাথ গান রচনা করেন। এই পযায়ে তিনি
নিজস্ব সুরারোপ করেন।১৯০০ সালে শান্তি নিকেতনে বসবাসকালে তাঁর তৃতীয় পর্বের গান রচনা
শুরু হয়। এই সময় বাউল গানের সুর ও প্রভাব তাঁর নিজের গানে অঙ্গীভূত করেন।প্রথম
বিশ্বযুদ্ধের পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান রচনার চতুর্থ পর্বের সূচনা হয়।এই সময়ে তাঁর গানে নতুন
নতুন ঠাটের প্রয়োগ এবং বিচিত্র ও দুরুহ সুর সৃষ্টি করেন।’

আমরা আগেই বলেছি, কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের তাল-লয় আমাদের এই প্রবন্ধের মুখ্য
আলোচরা নয়। আমরা তাঁর গানের বাণী নিয়েই আলোকপাত করতে চাইছি। আর গানে সুর তো
থাকেই সবাই জানেন, সুর ছাড়া তো গান হয় না। আমরা রবীন্দ্র-সঙ্গীতের একটি গান দিয়ে এই
লেখা শুরু করেছিলাম।

‘তোমায় নতুন করে পাব বলে হারাই ক্ষণে ক্ষণ
ও মোর ভালোবাসার ধন।’
…………………………….।’
এই গানটি গীতবিতানে সংকলিত হয়েছে(পৃ: ৪৫)।

এই গানটি পূজা পর্বের গান।
খুব সাদামাটাভাবে যদি গানটি শোনা হয়,তাহলে মনে হবে, কোনো রমণীকে নতুন করে পাবার জন্য
বারবার হারানোর কথা বলেছেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আসলে কি তাই ? এই গানের শব্দ-
বাণীকে নিয়ে যদি আমরা আলোচনা করি, তাহলে এইভাবে বলতে পারি , এই গানটির কোন
জায়গায় ভগবান শ্রী কৃষ্ণ এবং রাধার নাম উল্লেখিত হয়নি।এই গানে আসলে রাধা শ্রী কৃষ্ণের
উদ্দেশ্যে তাঁর আবেদন-নিবেদনের কথা বলেছেন এই ভাবে শ্রী কৃষ্ণকে নতুন করে পাওয়ার জন্য
তাঁকে বারবার হারিয়ে ফেলছেন। শ্রী কৃষ্ণ দেখা দেবেন বলে দর্শনের আড়ালে যাচ্ছেন।
একজন কবি গীতিকার-সাহিতিক্যের মনের ভাবনা বিশ্লেষণ করা খুব সহজ কাজ নয়। তারপর কবি
গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ক্ষেত্রে এই কাজটি তো আরো দুরূহ।

কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কখনও একটি কবিতাকে গানে রূপান্তরিত করে সুর দিয়ে সেটাকে গান
করে তুলেছেন। দেখা গেল পূজার জন্য যে গান রচনা করলেন, সেটির বাণী –শব্দ প্রেমের বাণীতে
পরিনত হয়েছে।

একটি লেখাকে তিনি নানাভাবে শিল্পী-কবি মনের ভাব দিয়ে বিবর্তন করে তুলেছেন।
তাঁর প্রেমের একটি গান- ‘ তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটর নিমন্ত্রণে,
তখন ছিলেম বহু দূরে কিসের অন্বেষণে।।
………………………………………………
চাইল রবি শেষ চাওয়া তার কনকচাঁপার বনে।

………………………………………………….
এল আমার ক্লান্ত হাতে ফুল-ঝরানো শীতের রাতে
………………………………………………………
তখন ছুটি ফুরিয়ে গেছে কখন অন্যমনে।
(রচনাকাল ২২ কার্তিক,১৩৩৪ বঙ্গাব্দ)
তাঁর এই গানে দেখা যায়, ‘প্রেমের তৃষ্ণার অপ্রাপ্তি আছে। তবে কোন ক্ষোভ নেই।’
কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অপর একটি প্রেমের গান ‘ তুমি কোন কাননের ফুল, কোন গগনের
তারা।
তোমায় কোথায় দেখেছি যেন কোন স্বপনের পারা।
………………………………………………….।’(রচনাকাল ১২৯৩ বঙ্গাব্দ)

এই গানের সুর ও বাণী আমাদের গভীরে টানে, হৃদয়ে দোলা দিয়ে যায় ।
কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি, কালো তারে বলে গাঁয়ের লোক।
মেঘলা দিনে দেখেছিলেম মাঠে কালো মেয়ের কালো হরিণ চোখ।
কালো ? তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ চোখ।’
…………………….।’ (রচনাকাল; ৪ আষাঢ়,১৩০৭ বঙ্গাব্দ)
কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এটি কবিতা। পরে বাণী-শব্দকে সুরারোপ করে গানে রূপান্তর করেন। এ
প্রসঙ্গে শান্তিদেব ঘোষ লিখেছেন,‘ ১৯৩১ সালে বর্ষামঙ্গল উপলক্ষ্যে ‘ ক্ষণিকার’র ‘ ‘কৃষ্ণকলি’
কবিতাটিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সুর দিলেন কীর্তন ও নানা রাগিণী মিশিয়ে। তাঁকে (শান্তিদেব
ঘোষ) দিয়ে এই গানটি গাইয়ে পরীক্ষা করলেন। গানের বাঁধা ছন্দকে ভেঙ্গে আবৃত্তির ধরণটি ঠিক
রেখে গানটি গাইলেন তিনি।
আসলে আবেগের ভাষাই সঙ্গীতের মূল। আমরা আর আলোচনা বাড়াতে চাই না। কবি গুরুর এই
গানটি দিয়ে শেস করতে চাই আমাদের আলোচনা।

‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিন্হ এই বাটে,
আমি বাইব না মোর খেয়াতরী এই ঘাটে।
………………………………………………
বন্ধ হবে আনা গোনা এই হাটে,
তখন আমায় নাইবা মনে রাখলে,
তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাইবা আমায় ডাকলে।
…………………………………………………
তখন কে বলে গো সেই প্রভাতে নেই আমি।’
এই গানটির বাণী ও সুরে বাউলের ধাঁচ রয়েছে। এই গানটি বাউলের সুরের ধাঁচে করা হলেও
গানের নিবিড় অর্থ ভিন্ন বলেই আমাদের মনে হয়েছে। এই গনাটিতে কবি গুরুর চলে যাবেন
আমাদের ছেড়ে, যেখান থেকে কেউ আর ফিরে আসেন না। তারপরও এই বাটে, ঘাটে, হাটে তাঁর
যে পদচিন্হ সেটি থেকে যাবে। যদি তারার পানে চেয়ে তাঁকে নাও ডাকা হয়, আমরা তাঁকে ভুলে
যাবো না।
কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের বাংলা সাহিত্যের অংলকার-অহংকার। তাঁর গান অমর সৃষ্টি
এবং তিনি এক স্বর্ণযুগের স্রষ্টা। (সমাপ্ত)

( লেখক : কবি, সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক ও অ্যাডভোকেট জজকোর্ট, পাবনা)।

Best WordPress themes


© All rights reserved 2020 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!