শুক্রবার, ২২ জানুয়ারী ২০২১, ০৬:০৫ পূর্বাহ্ন

আতঙ্কিত হবেন না
করোনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান অমর সৃষ্টি

image_pdfimage_print

।। মুরশাদ সুবহানী ।।

‘‘তোমায় নতুন করে পাব বলে হারাই ক্ষণে ক্ষণ
ও মোর ভালোবাসার ধন।
দেখা দেবে বলে তুমি হও যে অদর্শন,
ও মোর ভালোবাসার ধন।
ওগো তুমি আমার নও আড়ালের, তুমি আমার চিরকালের-
ক্ষণকালের লীলার স্রোতে হও যে নিমগন,
ও মোর ভালোবাসার ধন।।
আমি তোমায় যখন খুঁজে ফিরি ভয়ে কাঁপে মন-
প্রেমে আমার ঢেউ লাগে তখন।
তোমার শেষ নাহি, তাই শূন্য সেজে শেষ করে দাও আপনাকে যে,
ওই হাসিরে দেয় ধুয়ে মোর বিরহের রোদন,
ও মোর ভালোবাসার ধন।” (কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

বাংলা সাহিত্যের বিশাল আঙ্গিনায় রয়েছেন কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাংলা সাহিত্যে আধুনিক
ধারার সূচনা করেছিলেন , কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। যার সমাপ্ত করেছেন কবি রবীন্দ্রনাথ
ঠাকুর।সাহিত্যের সব ক্ষেত্রেই তাঁর হাতে সার্থক রূপায়ন হয়েছে। বাংলা সাহিত্যকে নতুন অলংকারে
ঐতিহ্যমন্ডিত করে তিনি নতুনের এক সার্থক মাত্রা যোগ করে সৌন্দয-সৌকয করে তুলেছেন। তাঁর
হাতে উন্মোচিত হয়েছে মানব জীবনের নানা দিক নানা আঙ্গিকে।

সাহিত্যের সাথে যারা কমবেশী জড়িত তাদের অনেকেই এই বিষয়টি জানেন যে, বিশ শতকের
সাহিত্যে প্রধান দিক ছিল মানুষের নি:সঙ্গতা, বিচ্ছিন্নতা। প্রেম-ভালোবাসার মধ্যে দোতনা। কবি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই দিকটি গভীরভাবে দেখেছেন। একজন মনোজগতের মানুষ হিসেবে । এ নিয়ে
বঙ্গীয় সাহিত্য দর্পণে আমি আলোকপাত করেছি। ওই লেখার পুনরাবৃত্তি আর করতে চাই না।

আজকের আলোচনা হবে তাঁর সঙ্গীত সৃষ্টি নিয়ে । কি আছে তাঁর সঙ্গীতে, যা আমাদের মনকে
এখনো টানে। আমরা আপ্লুত হই। ভাব জগতে ডুবে যাই ।

‘ কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে একবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ‘ আপনার বড় গুণ কি” তিনি উত্তর
দিলেন, ‘ অসামঞ্জস্যতা’ ।

আপনার বড় দোষ কি? তিনি একই উত্তর দিলেন।, আসলেও তো তাই । একই সময়ে একই সাথে তিনি গল্প, উপন্যাস, গান রচনা করছেন, কোনোটির সাথে কোনোটির মিল নেই। এখানেই রবীন্দ্রনাথকে আমরা খুঁজে পাই । এই রকম প্রতিভা এই বিশ্ব জগতে প্রায় বিরল।

এক গল্পের সাথে আর এক গল্পের মিল নেই, এক উপন্যাসের সাথে আর এক উপন্যাসের
কোনো মিল নেই। এক গানের সাথে আর এক গানের মিল নেই। এক নাটক-নাটিকার সাথে
অপরটির মিল নেই । এ এক বিস্ময় জাগানো প্রতিভা ।

কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত গানের সংখ্যা ১৯১৫টি দ্বিমতে ২,২৩০টি । এই গান গুলোকে
আলোচকরা কয়েক পর্যায়ে ভাগ করেছেন। পূজা, প্রেম, প্রকৃতি, স্বদেশ বিবিধ। আমরা বলতে চাই
কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সঙ্গীতের প্রায় সব পর্যায়কে স্পর্শ করেছেন।

রাগ সঙ্গীত, শ্যামা সঙ্গীত, ভক্তিমূলক গান, বাউল গান, মানব-মানবীর বিশুদ্ধ প্রেম আবার ভগবান-ঈশ্বরের প্রতি গভীর ভালো বাসায় সনাতন হিন্দু শাস্ত্রের বাইরে এসে এক অপূর্ব প্রেম-ভালোবার গান। সব ক্ষেত্রকে তিনি
ছুঁয়ে গেছেন ,তাঁর সারা জীবনে রচিত গানের মধ্যে।

কোনো কোনো গান শুনলে মনে হবে তিনি মনে হয় কোনো মানবীকে ভালোবেসে তার উদ্দেশ্যে গানটি লিখেছেন। কিন্তু আমরা যদি গভীরভাবে সেই গানকে উপলব্ধি করি তাহলে বুঝা যাবে, আসলে তা নয়, তিনি ভগবানের প্রতি ভক্তি শ্রদ্ধা নিবেদন করে গানটি রচনা করেছেন। তাঁর সব গান নিয়ে আলোচনা করা সম্ভব নয়।

তারপরও আমরা চেষ্টা করবো। তার আগে বলে নেই, তিনি কয়েটি দেশের জাতীয় সঙ্গীতের রচিয়তা অথবা তাঁর গানকে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে; ‘জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে….।’ ভারতের জাতীয় সঙ্গীত।১৯৫০ সালে স্বাধীন ভারতের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে স্বীকৃতি পায়।‘

আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।’ কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই গানটি ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে রচনা করেছিলেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে গানটির প্রথম ১০ লাইন জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। শ্রীলংকার জাতীয় সঙ্গীতের রচিয়তাও কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

১৯৩৮ সালে তাঁর প্রিয় আনন্দ সামারাকুন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে এবটি গান লিখে দেওয়ার অনুরোধ করলে তিনি ‘নমো নমো শ্রীলঙ্কা মাতা….।’ গানটি লিখে সুর করে আনন্দকে দেন। অনেকের ধারণা এটি আনন্দ সামারাকুনের রচনা । আসলে তা নয়। গানটি লিখে সুর করে দিয়েছেন কবি গুরু।

কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই গানটি ১৯৫১ সালের ২২ নভেম্বর শ্রীলঙ্কার জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
কবিগুরু নিজেই বলেছেন, আমার সব রচনা হারিয়ে যাবে, লোকে ভুলে যাবে একদিন, কিন্তু আমার
গান থাকবে চিরকাল।’ কি আছে এমন তাঁর গানের মধ্যে যা আমাদের মনে গভীরভাবে রেখাপাত
করে।

গানের কথা? তা তো বটেই | কিন্তু কথা দিয়ে তো কবিতাও লিখেছেন তিনি অজস্র | সুর? তা
সুর-বৈচিত্র্যের দিক দিয়ে নজরুলই বা কম কিসে ? তাল ? স্বসৃষ্ট কিছু তাল আছে বটে, ঝম্পক,
নবতাল, একাদশী, নব-পঞ্চতাল ইত্যাদি, কিন্তু… তারা মূলত: ফাঁক বিহীন ও মুখ্যত: কর্নাটকী
সঙ্গীত থেকে নেওয়া ।’’

রবীন্দ্রনাথের গানে রয়েছে জীবনের নানা উপাদান। যা চিরস্থায়ী রূপ লাভ করেছে বাঙালীদের মনে। শুধু বাঙালা-ভাষা- ভাষী নয়, তাঁর গানের অনুবাদ ইংরেজীতে হয়েছে। বিশ্বব্যাপী সঙ্গীত পিপাসু মানুষের মনে রেখাপাত করে চলেছে।

কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘‘ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীর লেখা রবীন্দ্র-সঙ্গীতের ত্রিবেনী- সঙ্গম. তাতে ছিল রবীন্দ্র-কৃত ভাঙ্গা গানের তালিকা |

ভাঙ্গা অর্থে অন্য ভাষা বা জাতের সঙ্গীত থেকে সুরটুকু গ্রহণ করে তাতে নিজের কথা বসানো | অবাক হয়েছিলাম কি অনায়াস দক্ষতায় ইংরেজি ও আইরিশ গানগুলিকে ভেঙ্গে বাল্মীকি-প্রতিভা ও কালমৃগয়ার মত পৌরানিক গীতিনাট্যে ব্যবহার করেছেন অথচ তা বাংলাভাষায় বেখাপ্পা তো লাগেইনি, উল্টো মনে হয়েছে যেন এর থেকে সার্থক প্রয়োগ এদের জন্যে আর সম্ভব ছিল না |

বাসন্তী হে ভুবনমোহিনী শূন্য হাতে ফিরি হে কোনকালে হয়ত তামিল বা হিন্দি গান ছিল, কিন্তু সুরের কাঠামোটা অপরিবর্তিত রেখেও যে বদলটা ঘটানো হয়েছে, তার চেয়ে বড় বিস্ময় বুঝি আর হয়না ।’’

কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে দেশসমূহ ভ্রমণ করেছেন, সেখানকার সাহিত্য থেকে তুলে এনেছেন রত্নরাজি । যা দিয়েছেন বাংলা সাহিত্যে। বিদেশী ভাষার বেশ কিছু সংখ্যক গান সুরে বাংলায় নিয়ে এসেছেন, কিন্তু নিজস্ব স্বকীয়তা হারাননি। এই কারণেই রবীন্দ্রনাথের গান আমাদের মনে গভীরভাবে রেখাপাত করছে। রবীন্দ্রনাথের ঠাকুরের কট্টর সমালোচক ডি.এল রায়ের পুত্র দিলীপ কুমার কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানে Variation করার অনুমতি পাননি।

কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিজের বক্তব্য ষ্পষ্ট – “ হিন্দুস্থানী সঙ্গীতকার, তাঁদের সুরের মধ্যকার
ফাঁক গায়ক ভরিয়ে দেবে এটা যে চেয়েছিলেন। তাই কোনো দরবারী কানাড়ার খেয়াল সাদামাটা
ভাবে গেয়ে গেলে সেটা নেড়া-নেড়া না শুনিয়ে পারে না।….

…..আমার গানেতো আমি সেরকম ফাঁক রাখিনি যে সেটা অপরের ভরিয়ে দেওয়াতে আমি কৃতজ্ঞ
হয়ে উঠব।’

আসলেও তাঁর গানে সুরের কোন ফাঁক নেই । যেটা অন্য কেউ ভ্যারিয়েশন করে ঠিক করবে।
ইদানিং লক্ষ্য করা যায়, ব্যান্ড সঙ্গীতে ফিউশন নামে একটি বিষয় যোগ হয়েছে। কোনো কোনো
ব্যান্ড দল কবি গুরুর গান ফিউশন করায় সঠিক সুর ও তালে থাকছে না।

এটা বন্ধ হওয়া দরকার। রবীন্দ্র সঙ্গীতকে তাঁর স্বরলিপি অনুসারে শুদ্ধভাবেই গাইতে হবে। কবি গুরু বেঁচে থাকলে আমরা বিশ্বাস করি তিনি কোন ক্রমেই ফিউশন করার অনুমতি দিতে না। এ ব্যাপারে আমরা
রবীন্দ্রনাথের গানের যাঁরা শুদ্ধ চর্চা করেন, তাদের এগিয়ে আসার অনুরোধ করছি।

0
1
fb-share-icon1

Best WordPress themes


© All rights reserved 2020 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!