সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২০, ০৫:২৯ অপরাহ্ন

আতঙ্কিত হবেন না
করোনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

করোনার কালকেটা কেমন হবে?

করোনা স্থবির করে দিয়েছে গোটা বিশ্বকে। বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে সব ধরনের সামাজিক যোগাযোগ। কোভিড-১৯ আতঙ্কে কাঁপছে বাংলাদেশও। যদিও বাংলাদেশে সংক্রমণ এখনো কম, তবু বিপুল ঘনবসতির এই দেশে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ। পাঁচজন এরই মধ্যে মারা গেছেন। এর শেষ কোথায় এটা এখন বোধহয় কেউ বলতে পারবেন না। আমিও পারবো না। তবে এটুকু বলতে পারি শেষটা অবশ্যই হবে।

এটা এমন কোনো জিনিস না যে এটা দিয়ে মানবসভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে। কতগুলো বৈজ্ঞানিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে এ কথা বলা যায়। ভ্যাকসিন তৈরির কাজ চলছে। ছয় মাসে না হোক ভ্যাকসিন চলে আসবেই। দ্বিতীয় বিষয় হলো এই ভাইরাসে মানুষ কেন অসুস্থ হচ্ছে বা মারা যাচ্ছে? কারণ এটি আমাদের জন্য নতুন একটি ভাইরাস। এর বিরুদ্ধে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ছিল না। যখন আস্তে আস্তে অনেক মানুষ আক্রান্ত হয়ে যাবে তখন আশেপাশের আরও অনেক মানুষের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হবে।

এই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সারাজীবন স্থায়ী হবে, নাকি কয়েক মাস বা কয়েক সপ্তাহ- সেটা আমরা জানি না। কারণ ভাইরাসটাই নতুন। কিন্তু রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অবশ্যই তৈরি হবে। যখন সংক্রমিত হওয়ার কারণে ১০ জন মানুষের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হবে তখন আশেপাশের আরও পাঁচ-সাত জনের মধ্যেও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ডেভেলপ করবে। এটাকে হার্ড ইমিউনিটি বলে।

একটা সময় আসবে যখন এই ভাইরাসটা আমাদের আশেপাশেই থাকবে কিন্তু হার্ড ইমিউনিটির কারণে বা ভ্যাকসিনের কারণে এটি নতুন করে আর আমদের সংক্রমিত করতে পারবে না। ফলে একটা পর্যায়ে এটি থামাতে বাধ্য হবে। সেটা কবে হবে তা অবশ্য আমরা হলফ করে বলতে পারি না। তবে যত তাড়াতাড়ি থামবে ততই মঙ্গল।

তবে মানুষকে আশ্বস্ত করার জায়গাটা হলো এই যে, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত সবাই কিন্তু মৃত্যুবরণ করবে না। শতকরা ৮০-৮৫ জনের কোনো উপসর্গই থাকবে না। ১০-১৫ শতাংশ মানুষের উপসর্গ দেখা দেবে আর তাদের মধ্যে অল্প কিছু মৃত্যুবরণ করবে। এটাই বাস্তবতা। রোগটি খুব বেশি ছোঁয়াচে হলেও একটু সচেতনতা আর সতর্কতা এর মৃত্যুহার কমিয়ে আনতে পারে।

অনেকের মনে প্রশ্ন করোনা নিয়ে আমাদের সরকারের প্রস্তুতিটা কেমন? এটি আসলেই যে কেমন, তা কিন্তু শুধু তখনই জানা যাবে যদি স্রষ্টা না করুন করোনার ধাক্কাটা জোরে-সোরে আমাদের ওপর এসে পড়ে। প্রত্যেক দায়িত্বশীল গণতান্ত্রিক সরকারই তার নাগরিকদের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। বাংলাদেশ সরকারও এর বাইরে না। মনে রাখতে হবে এক ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় বরাদ্দ দেয়ার পরও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হতে যাচ্ছে করোনার পরবর্তী এপিসেন্টার আর সম্ভাব্য সব প্রস্তুতি নেয়ার পরও ইতালি আর স্পেনে মৃতের সংখ্যা পেছনে ফেলেছে চীনকে।

অন্যদিকে ভুটানে আক্রান্ত একজন আর নেপাল মারা যায়নি কেউই। অনেক শক্তিশালী আর উন্নত দেশ যা করতে পারেনি তাই করে দেখিয়েছে অনেক ছোট দেশও। কাজেই শুধু সরকারের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে বসে থাকলে হবে না, নিজেদের কাজটাও ঠিকঠাক মতো করতে হবে। আর গত কদিনে এই জায়গাটাতেই বোধহয় আমরা খুব বেশি দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে পারিনি।

চীন থেকে যেসব দেশি-বিদেশি নাগরিককে দেশ ত্যাগের অনুমতি দেয়া হয়েছিল, তাদের সবাইকে চীনে কোয়ারেন্টাইন করে বিমানে উঠতে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তেমনটা করেনি ইতালি। পাশাপাশি উহান থেকে প্লেন বোঝাই করে যে বাংলাদেশিদের উড়িয়ে আনা হয়েছিল, তাদের আমরা প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে রাখতে পেরেছিলাম। এমনকি যেসব বাংলাদেশি ছাত্র ভারত হয়ে উহান থেকে দেশে এসেছিলেন তাদেরও ভারত সরকার কোয়ারেন্টাইন শেষেই দেশে পাঠিয়েছিল।

পাশাপাশি উহানের যে বাংলাদেশিদের বসবাস তারা মূলত ছাত্র ও শিক্ষক। তাদের মধ্যে আন্তঃযোগাযোগ খুব বেশি না। অন্যদিকে ইতালির ব্যাপারটা সম্পূর্ণই ভিন্ন। সেখানে বসবাস ছয় লক্ষাধিক বাংলাদেশির। কী নেই তাদের সেখানে? রেস্টুরেন্ট আর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানতো বটেই, আছে এই জেলা আর ওই উপজেলা সমিতি আর সংঘও। তাছাড়া এসব বাংলাদেশিদের ওখানকার স্থানীয়দের সাথে মেলামেশাটাও উহানের বাংলাদেশিদের তুলনায় অনেক বেশি।

সঙ্গত কারণেই করোনার এপিসেন্টারটা চীন থেকে ইউরোপে স্থানান্তরিত হওয়ার পর যখন দলে-দলে প্রবাসী ইতালি থেকে দেশে আসতে শুরু করলেন, তখন আমরা হয়তো এত বিপুল সংখ্যক মানুষকে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে রাখার ব্যবস্থা করতে না পেরে হোম কোয়ারেন্টাইনে পাঠিয়েছিলাম। আমরা হয়তো বুঝে উঠতে পারিনি চীন আর ইতালিফেরত প্রবাসীদের মধ্যকার এই পার্থক্যগুলো। তাছাড়া হোম কোয়ারেন্টাইনতো এ ধরনের প্যান্ডেমিকে ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সমিশন ঠেকানোর একটা প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতিও বটে।

কিন্তু আমাদের প্রবাসী ভাই-বন্ধুদের নাগরিক দায়-দায়িত্বটা কোথায় হারিয়ে গেল? একটি উন্নত দেশ থেকে আসার পরও হোম কোয়ারেন্টাইনের সংজ্ঞা না মেনে তারা ঘুরছেন-ফিরছেন, সামাজিকতা করছেন, এমনকি বিয়ে-শাদীও করছেন কেউ-কেউ! দেশে ফিরে কেন দেশটাকে এমন অনিরাপদ বানালেন তারা?

আর শুধু প্রবাসীদেরই বা দুষবেন কেন। সামাজিক বিচ্ছিন্নতা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে সরকারের ঘোষিত ১০ দিনের ছুটিকে ঈদের ছুটি বানিয়ে যারা হাজারে-হাজারে, কাতারে-কাতারে দেশের বাড়িতে ছুটলেন, বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতুতে তৈরি করলেন ১৫ কিলোমিটার ট্রাফিক জ্যাম, তারা কি একবারও ভেবে দেখেছেন আর সবকিছু বাদ দেন, যে পরম নিকটজনদের সাথে ছুটি কাটানোর উদ্দেশ্যে আপনাদের এই ঢাকা ত্যাগ, আপনাদের কারণে কত বেশি অনিরাপদ হয়ে পড়লেন তারা।

আজ এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে যদি আমাকে প্রশ্ন করেন আমদের এখন করণীয়টা তাহলে কী, আমার উত্তরটা হবে ছোট – আমাদের এই সংকটকে অবশ্যই সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে নিতে হবে, কিন্তু কোনোভাবেই আতঙ্কিত হওয়া যাবে না কারণ আতঙ্কিত ব্যক্তি কখনোই ঠান্ডা মাথায় সঠিক সিদ্ধান্তটি নিতে পারে না। আমরা যদি সরকারের ওপর আস্থা রেখে সরকার বাতলে দেয়া নিয়ম-কানুনগুলো ঠিকঠাক মতো মেনে চলি তাহলে করোনা আমাদের কাবু করতে পারবে না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশ্যে তার ভাষণে এই কথাগুলোর ওপর জোর দিয়েছেন। আমার উত্তরটাও আমি তার কাছ থেকেই ধার করে দিলাম।

লেখক : অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, লিভার বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়
এবং সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ।

error20
fb-share-icon0
Tweet 10
fb-share-icon20


© All rights reserved 2020 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial
error: Content is protected !!