শনিবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২১, ১২:৪৩ পূর্বাহ্ন

আতঙ্কিত হবেন না
করোনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

করোনায় শিশুদের সুরক্ষা

image_pdfimage_print

ডা. সুদেশ রক্ষিত।। আমরা করোনা অতিমারির এক বিপজ্জনক সময় পার করছি। সরকারের তথ্য ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ গণমাধ্যমের প্রচার-প্রচারণায় মাস্কের ব্যবহার লক্ষণীয়ভাবে বেড়েছে। অন্যদিকে করোনা ভাইরাসের আরও বিধ্বংসী প্রজাতির উদ্ভব হচ্ছে। তার মধ্যে বি ১১৭ অন্যতম।

লন্ডনের ইমপেরিয়াল কলেজের প্রফেসর ওয়েন্ডে বার্ক্লের মতে, বি ১১৭-এর পরিবর্তিত স্পাইক প্রোটিন আরও সুচারুরূপে শ্বাসনালীর এপিথেলিয়ালমকে ভেদ করতে সক্ষম, এমনকি এত দিন যে শিশুকিশোররা তুলনামূলকভাবে কোভিড প্রতিরোধী ছিল, তারাও এখন বয়োজ্যেষ্ঠদের মতো সমভাবে এ ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। নতুন এ প্রজাতির সংক্রমণ-ক্ষমতা আগের প্রজাতির চেয়ে ৭০ শতাংশ বেশি হওয়ায় যেমন আশঙ্কার সৃষ্টি করেছে তেমনি স্বস্তিদায়ক যে, মৃত্যুহারের ওপর এর কোনও প্রভাব পড়বে না বলে এ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা গেছে। প্রায়ই আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের আক্রান্ত হওয়া, কোনও কোনও ক্ষেত্রে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রয়াণ মনকে ভীষণভাবে ব্যথাতুর ও বিষাক্ত করে তুলছে। ইতিমধ্যে বিশ্বজুড়ে অকল্পনীয় প্রায় সাড়ে ১৮ লাখ অমূল্য জীবনের অবসান এবং এর দ্রুতগতিতে উল্লম্ফন, মানবতার এ এক চরম বিপর্যয়, এ ভার সইবার নয়।

অথচ এখনো আমাদের দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সুরক্ষার কৌশল মেনে চলতে একদিকে যেমন অনীহা, অন্যদিকে অতিকথন খুবই হতাশাজনক। মানুষ ততক্ষণ পর্যন্ত বড় বড় কথা বলে যতক্ষণ পর্যন্ত না নিজের ওপর বিপর্যয় নেমে আসে। এ বন্ধ্যত্ব থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসতে হবে। করোনা রোগীর চিকিত্সা দিতে গিয়ে এত এত চিকিৎসকের প্রাণহানি, আমাদের আর কত প্রাণ দিতে হবে। সম্মুখসারির কোভিড যোদ্ধাদের অতি দ্রুততার সঙ্গে ভ্যাকসিন প্রয়োগ করেই তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। তবেই মানবতার সেবা করতে গিয়ে নিজেদের আর বিপন্ন হতে হবে না। এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনও ওষুধ বা সম্পূর্ণ নিরাপদ ও শিশুদের উপযোগী টিকা আবিষ্কৃত না হওয়ায় ব্যক্তিগত ও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার নিয়মাবলী কঠোরভাবে অনুসরণ করেই করোনাযুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হবে। আর যারা কোভিড-পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদি জটিলতায় ভুগছেন কিংবা মহামারিতে মৃত্যুবরণ করেছেন, তাদের অসহায় পরিবার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরকারি ক্ষতিপূরণ পাওয়ার দাবি রাখে।

শিশুদের পক্ষে যেহেতু হাঁচি-কাশি শিষ্টাচার মেনে চলা কঠিন, তাই প্রতিনিয়ত সাবান-পানি দিয়ে শিশুর হাত ধুয়ে দিতে হবে। এতে করোনাসহ অন্যান্য সংক্রামক ব্যধি থেকে শিশু যেমন নিরাপদ থাকবে তেমনিভাবে পরিবারের অন্য সদস্যদেরও সংক্রমণ ঝুঁকি কমে যাবে। সঠিক নিয়মে হাত ধোয়া পারিবারিক অভ্যাসে পরিণত করতে হবে, যা অনুকরণ করে শিশুরাও হাত ধোয়া শিখে নেবে। দাহ্য পদার্থ সেনিটাইজার ব্যবহারে শিশুদের ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। পাঁচ মিলি পরিমাণ ৬০ শতাংশ অ্যালকোহলযুক্ত সেনিটাইজার দিয়ে হাত ভিজিয়ে হাতের তালু ও বাইরের দিক ভালোভাবে ঘষতে হবে, যতক্ষণ পর্যন্ত না সেনিটাইজার শুকিয়ে যায়। সাধারণত পরিবারের বয়স্কদের থেকেই শিশুরা করোনা আক্রান্ত হয়। তাই কোনও ব্যক্তির করোনা লক্ষণ দেখা দিলে ঐ ব্যক্তিসহ পরিবারের দুই বছরের ওপর শিশুদেরকেও ঘরে মাস্ক পরে থাকতে হবে, যেন তারা সংক্রমিত না হয়।

বয়স্কদের পৃথক কক্ষে থাকাই নিরাপদ, অনুরূপভাবে যারা বাইরে বের হন তাদেরও ঘরে এসে শিশুদের কোলে নেওয়ার আগে পোশাক পালটিয়ে সাবান-পানি দিয়ে হাত ধুতে হবে ও মাস্ক পরে নিতে হবে। যত বেশি লোক ও যত বেশি সময় ধরে শিশু অন্যদের সঙ্গে মিশবে তত বেশি সংক্রমণের ঝুঁকি থাকবে। শিশুকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য ঘরে রাখাই নিরাপদ। তবে মানসিক বৃদ্ধির দিকটিও বিবেচনায় নিয়ে মন প্রফুল্ল রাখতে বেশি বেশি খেলনা দিতে হবে। খোলা জায়গায় গেলে ছয় ফুট দূরত্বে থেকে খেলাধুলা করলে ঝুঁকি কমবে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে শিশুদের প্রোটিন ও ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার যেমন ছোট মাছ, মাংস, দুধ, ডিমসহ টাটকা শাকসবজি, ফলমূল খেতে দিতে হবে। শীতের এ সময়ে শিশুদের অতিরিক্ত কাপড় দিয়ে জড়িয়ে রাখার কারণে ভিটামিন-ডি ঘাটতি দেখা দিতে পারে, প্রতি দিন ভিটামিন ডি ৪০০ ই ইউ সাপ্লিমেন্ট ঘাটতি দূর করে।

ফ্লু টিকা (ছয় মাস বয়স থেকে) নিলে করোনা ব্যতীত অন্যান্য ভাইরাসজনিত শ্বাসনালীর প্রদাহ ও গাট ফ্লু থেকে শিশু সুরক্ষিত থাকবে। কঠিন সত্য হলো করোনার টিকা আবিষ্কার হলেও ১৬ বছরের কম বয়সি শিশুদের ওপর বর্তমানে বাজারজাতকৃত কোনও টিকারই ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল না হওয়ায় আপাতত শারীরিক ও সামাজিক দূরত্ব কঠোরভাবে মেনে চলার ওপরই কোমলমতি শিশুদের সুস্থতা নির্ভর করছে। শিশুদের করোনা সাধারণত তীব্র হয় না, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উপসর্গ বিহীন বা মৃদু উপসর্গ থাকে। বুকের দুধে করোনার উপস্থিতি সম্পর্কে এখন পর্যন্ত জোরালো কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে করোনা আক্রান্ত মায়েদের হাঁচি, কাশি ও নিবিড় স্পর্শের মাধ্যমে শিশু সংক্রমিত হতে পারে। তাই বুকের দুধ দেওয়ার আগে মায়েরা আলাদা কাপড় দিয়ে জড়িয়ে নেবেন, সাবান-পানি দিয়ে হাত ধুয়ে মাস্ক পরে নির্দ্বিধায় শিশুদের বুকের দুধ পান করাতে পারেন। এতে সামান্য ঝুঁকি থাকলেও বুকের দুধ না পেলে শিশুদের যে ক্ষতি হবে, তার তুলনায় অনেক কম। বিকল্পভাবে বুকের দুধ চিপে বের করে সুস্থ কোনও সেবাদানকারীর মাধ্যমেও শিশুকে দুধ পান করানো যেতে পারে।

সরকার জনগণের জানমাল রক্ষার্থে যথাসাধ্য চেষ্টা করছে ও ইতিমধ্যে করোনা মহামারি নিয়ন্ত্রণে আশানুরূপ সাফল্যও দেখিয়েছে। এ মানবিক বিপর্যয় আমরা কাটিয়ে উঠবই। মানবতার জয় অবশ্যম্ভাবী।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, শিশু বিভাগ, যশোর মেডিক্যাল কলেজ।

0
1
fb-share-icon1

Best WordPress themes


© All rights reserved 2020 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!