করোনা কালের জীবন ধারা

।। এবাদত আলী।।
(পূর্ব প্রকাশের পর) (২৪)
এমনি ঘটনার অবতারণা হয়েছে হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে ঈদের নামাজ আদায়। ঘটনাটি ঘটেছে খুলনার কয়রা উপজেলার ২ নম্বর কয়রা গ্রামে। জামায়াত নেতাদের রাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে ঈদের নামাজ আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ।

এ সম্পর্কে দৈনিক প্রথম আলো ২৫ মে-২০২০ সংখ্যায় লিখেছে,“ঘূর্ণিঝড় আমফানের ফলে ভেঙে গেছে নদীর বাঁধ। তলিয়ে গেছে এলাকা। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। এই পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করেছেন খুলনার কয়রা উপজেলার ২ নম্বর কয়রা গ্রামের লোকজন। এলাকার লোকজন জানান, আম্ফানের ফলে এ উপজেলার ৮০ ভাগ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। ঝড়ের তান্ডবে ১২১ কিলোমিটার বেড়ি বাঁধের ২১ টি স্থানে ৪০ কিলোমিটারের বেশি অংশ ভেঙে গেছে। আজ সকালে ক্ষতিগ্রস্থ বাঁধ নির্মাণে স্বেচ্ছ্রাশ্রমে অংশ নেন কয়েক হাজার মানুষ। কাজের ফাঁকে বেলা ১১টার দিকে ২ নম্বর কয়রা গ্রামের লোকজন পানিতে দাঁড়িয়ে ঈদের নামাজ আদায় করেন।

ঈদের নামাজে ইমামতি করেন উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আ খ ম তমিজ উদ্দিন। এতে অন্যদের মধ্যে অংশ নেন উপজেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান এসএম শফিকুল ইসলাম। তিনি নামাজের আগে এলাকাবাসির উদ্দেশ্যে বক্তব্য দেন। এসময় তিনি ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্থ কয়রা বাসির দুর্বিসহ অবস্থা তুলে ধরেন এবং মজবুত বাঁধ নির্মাণে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন। তিনি স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ নির্মাণে অংশ নেওয়ার জন্য এলাকাবাসিকে ধন্যবাদ জানান। এসএম শফিকুল ইসলাম বলেন, এবার আমরা অন্যরকম ঈদ পালন করছি। স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ নির্মাণের সময় জোয়ারের পানি যখন হাঁটু পর্যন্ত পৌঁছায় তখন ঈদের নামাজ শুরু হয়। প্রায় ৬ হাজার মানুষ নামাজে অংশগ্রহণ করেন। আমি ব্যক্তিগত উদ্যোগে সবার জন্য ঈদের সেমাইএর ব্যবস্থা করেছি। এছাড়া দুপুরে উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে খিচুড়ির ব্যবস্থা করা হয়েছে।

বিশ^ব্যাপি করোনাভাইরাসের প্রদুর্ভাবের কারণে বিশ্বের প্রায় সকল দেশের মুসলমানেরা ঈদগাহে উন্মুক্ত স্থানে নামাজ আদায় না করে মসজিদে কিংবা বাসা-বাড়িতে ঈদের নামাজ আদায় করেছে। বাংলাদেশ সরকারের নির্দেশ ও ছিলো তাই। এর পেছনে মুল উদ্দেশ্য ছিলো সামাজিক দুরত্ব নিশ্চিত করা। সমগ্র দেশের মুসলমানরা সরকারের এই আদেশ মান্য করলেও কয়রা গ্রামের মানুষ তা মানেনি। তারা বাঁধ নির্মাণকালে পানিতে দাঁড়িয়ে সামাজিক দুরত্ব না মেনে গায়ের সঙ্গে গা লাগিয়ে কাতারবন্দি হয়ে নামাজ আদায় করেছেন। হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে ঈদের নামাজ আদায়ের ভিডিওটি প্রথমে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে তা প্রচার হয় সংবাদ মাধ্যমে। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহি প্রার্থি হিসেবে বিজয়ী উপজেলা চেয়ারম্যানের এতে মদদ ছিলো বলে অভিযোগ করেছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলামের অনুরোধে সোমবার (২৫ মে) স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ নির্মাণের জন্য হাজির হয়েছিলেন স্থানীয়রা। হঠাৎই ঘোষণা হয় পানির মধ্যেই ঈদ জামায়াতের। ইমামতির জন্য দাঁড়িয়ে যান উপজেলা জামায়াতের সাবেক আমির তমিজ উদ্দিন।

প্রশাসন বলছে, স্থানীয় লোকজন ঈদের দিন স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে বাঁধ মেরামতের কাজ করবেন- এমন পরিকল্পনার কথা জানানোর পর সরকারি খরচেই দুপুরের খাবেরর ব্যবস্থা করা হয়। উপজেলা নির্বার্হী কর্মকর্তা শিমুল কুমার বলেন, ‘‘আমাদের বলা হয়েছিলো বাঁধ নির্মাণ হবে। তাই আমি নিজে সেখানে পরিদর্শনে যাই। তবে পানির মধ্যে নামাজ পড়ার বিষয়টি জানা ছিলোনা। স্থানীয়ভাবে করা হয়েছে।’’

স্থানীয় আওয়ামী লীগ বলছে , বাঁধ নির্মাণের আড়ালে রাজনৈতিক সক্রিয়তা দেখিয়েছে জামায়াত-শিবির। আর তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মদদ দিয়েছেন খোদ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান। কয়রা উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মোহসিন রেজা বলেন,‘ আমাদের বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন শফিকুল ইসলাম। তিনি মদদ দিয়েছেন। মুলত তার কারণে জামায়াত-শিবির এই সুযোগ পেয়েছে। কারণ বাঁধের আড়ালে তাদের লক্ষ ছিলো সবাই একত্রিত হবে। গত ২৭ মে প্রকাশিত দৈনিক পঞ্চগড় নিউজ ডেস্ক আরো উল্লেখ করেছে, এ অভিযোগের বিষয় জানতে উপজেলা চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।”

কথায় বলে, ইল্লত না যায় ধুলে, আর খাছলত না যায় ম’লে (মরলে)। জামায়াত শিবির অধ্যুষিত একটি মসজিদে ঈদের দিন কমিটি কর্তৃক মুসুল্লিদেরকে নামাজ আদায় এবং মসজিদ সংলগ্ন গোরস্থানে কবর জিয়াতও করতে দেওয়া হয়নি। উদ্দেশ্যমূলকভাবে মসজিদ ও গোরস্থানের প্রবেশ পথ কাঁটা দ্বারা মজবুত করে ঘিরে রাখা হয়।

কারণ হিসেবে জানা যায় পাবনা সদর উপজেলার মালিগাছা ইউনিয়নের মালিগাছা-মজিদপুর জামে মসজিদ সংলগ্ন গোরস্থানে এক করোনাভাইরাসে মৃত্যুবরণকারিকে এদিন ভোর বেলা দাফন করার পর তারা এই বিভ্রান্তি রটনা করে। মালিগাছা গ্রামের কাজী আলতাফ হোসেন ফিরোজ যিনি ঢাকাস্থ এল জি ই ডির প্রধান কার্যালয়ে হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি ঈদের আগের দিন সন্ধ্যা ৬টা ৩৫ মিনিটে করোনাভাইরাস জনিত রোগে মিরপুর বেসরকারি রিজেন্স হাসপাতালে মারা যান।

তার মরদেহ পরদিন ২৫ মে-২০২০, ভোরবেলা আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের তত্বাবধানে সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করে পুলিশের উপস্থিতিতে মৃত্যুর প্রায় সাড়ে ১১ ঘন্টা পর মালিগাছা-মজিদপুর গোরস্থানে দাফন করার পরপরই উদ্দেশ্যমূলকভাবে মসজিদের মাইকে ঈদের নামাজ আদায় ও কবর জেয়ারত বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়।

রোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, কোন ব্যক্তি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার সাথে সাথে জীবাণুও মরে যায়। তাই অন্য ব্যক্তির শরীরে সংক্রমণের সুযোগ কম। তিনি মনে করেন এই ভাইরাস ৬ ঘন্টা পর্যন্ত জীবিত থাকতে পারে। মালিগাছা গ্রামের বাসিন্দা পাবনার ঈশ^রদী সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. আব্দুল বাতেন বলেন, ‘‘কোভিট-১৯ এর নির্দেশনাবলীতে করোনা আক্রান্ত রোগীকে কবরস্থ করা যাবেনা এমন কোন বিধি নেই। আর সরকারি বিধি মেনেই বিশেষ টিম এই দাফন সম্পন্ন করেছেন। সেখানে করোনা সংক্রমণের কোন প্রশ্নই আসেনা। অথচ অতি উৎসাহি হয়ে একটি মহল ঈদের নামাজ ও কবর জিয়ারত বন্ধ করে দিয়েছে, যা কোনভাবেই মেনে নেওয়া যায়না।’’

‘লাল সবুজের কন্ঠ’ এর প্রতিবেদকের ভাষ্য মতে মালিগাছা-মজিদপুর গোরস্থান কমিটির সাধারণ সম্পাদকের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পাবনা জেলা প্রশাসক কবীর মাহমুদ বলেন, মৃত ব্যক্তির শরীরে করোনাভাইরাস অবস্থান করেনা। তারপরও প্রায় সাড়ে ১১ ঘন্টা পর বিশেষ ব্যবস্থাপনায় মৃত ব্যক্তিকে দাফন করা হয়েছে।

সেহেতু করোনা সংক্রমণের সেধরণের কোন সুযোগ নেই। মসজিদে ঈদের নামাজ ও কবরস্থান জিয়ারত বন্ধের ব্যাপারে তিনি বলেন, লকডাউন কেবলমাত্র প্রশাসন করে থাকে। স্থানীয় জনগণ বা মসজিদ কমিটির এখতিয়ার নেই। এধরণের ঘটনা ঘটলে তদন্ত করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। (চলবে) (লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)।