শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০, ০৬:২৯ অপরাহ্ন

আতঙ্কিত হবেন না
করোনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

করোনা কালের জীবন ধারা

image_pdfimage_print


।। এবাদত আলী।।
(পূর্ব প্রকাশের পর ) (৭২)
কথিত আছে, প্রায় ২০০শ বছর আগে পাবনা জেলার সুজানগর থানাধীন দুলাই এর আজীম চৌধুরী ছিলেন প্রভাবশালী একজন জমিদার। ১২০ বিঘা জমির উপর তার বসতবাড়ি, কাচারি ঘর, জামে মসজিদ, এতিম খানা, হাতিশালা, পুকুর ইত্যাদি ছিলো। তিনি ছিলেন দানশীল ও সৌখিন জমিদার।

একই থানার তাঁতিবন্দে সেই সময় ছিলেন আরেক প্রজাবৎসল জমিদার বিজয় গোবিন্দ চৌধুরী। এই দুই জমিদারের মধ্যে ছিলো ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব। একবার জমিদার আজিম চৌধুরীকে বিজয় গোবিন্দ চৌধুরী নেমন্তন্ন করেন। প্রতিউত্তরে আজিম চৌধুরী রসিকতা করে বিজয় বাবুকে বলেন, আমার খাবার -দাবার একটু ভিন্ন ধরণের। আপনি আমার জন্য একটু খিচুড়ি রান্নার ব্যবস্থা করবেন। জমিদার বিজয় বাবু বলেন, আমি আপনাকে নেমন্তন্ন করলাম ভালো মত একটু খাবার-দাবারের ব্যবস্থা করবো, আর আপনি সামান্য খিচুড়ি খেতে চেয়ে আমাকে কি উপহাস করছেন? দুলাইয়ের জমিদার বলেন, না না উপহাস নয়। আপনি আমাকে খিচুড়ি খাওয়াতে চাইলে তা পাক করবে আমার বাবুর্চি। তা বেশ তো তাই হবে। জনশ্রুতি আছে জমিদার আজিম চৌধুরীর বাবুর্চি মসলার যে ফিরিস্তি দিয়েছিলেন, তা সমগ্র ভারত উপমহাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে সংগ্রহ করতে প্রায় দেড় মাস সময় লেগে যায়।

এরপর ধার্যকৃত দিনে খিচুড়ি পাক শুরু হয়। এদিকে খিচুড়ি পাকের সুগন্ধি সারা তাঁতিবন্দ গ্রামে ছড়িয়ে পড়লে গ্রামের আবাল-বৃদ্ধ বণিতা সকলেই জমিদার বাড়ির উঁচু দেওয়ালের বাইরে অবস্থান করে ঘৃাণ নিতে থাকে। খবর পেয়ে পার্শবর্তী গ্রামের লোকজনও নাকি তথায় জড়ো হয়েছিলো।

পাক শেষে দুই বন্ধু ঘটা করে খিচুড়ি খেতে বসেন। খাবার এক পর্যায়ে নাকি বিজয় গোন্দি চৌধুরী বন্ধু জমিদার আজিম চৌধুরীর উদ্দেশ্যে বলেন, বন্ধু আপনি আর কোন দিন আমার কাছে খিচুড়ি খেতে চাইবেন না। কারণ এরপর আপনার জন্য আবার খিচুড়ি পাক করতে গেলে আমার জমিদারিই লাটে উঠে যাবে।

এতো গেল সেকালের কথা। বর্তমানে করোনা কালে দেশের সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। সেই কবে চলতি বছর অর্থাৎ ২০২০ সালের মার্চ মাসে যখন বৈশ্বিক করোনাভাইরাস পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশে হানা দেয় তখন সর্বপ্রথম দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের জীবন রক্ষায় তা বন্ধ ঘোষণা করা হয়, যা এখনো বলবৎ রয়েছে। এরই মাঝে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা দেশের ৫০৯ টি উপজেলা ও থানায় ৬৫ হাজার ৬২০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১ কোটি ৪৭ লাখ কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জন্য ‘প্রাইমারি স্কুল ফিডিং কর্মসুচি চালু করতে যাচ্ছেন। এই প্রকল্পের আওতায় শিক্ষার্থীরা সপ্তাহে তিন দিন খিচুড়ি ও তিন দিন বিস্কুট পাবে।

কিন্তু মজার ব্যাপার হলো এই খিচুড়ি রান্নার জন্য তো যুতসই বাবুর্চি দরকার। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জন্য তো আর যেন তেন প্রকারের রান্না করা খিচুড়ি মুখে তুলে দেওয়া যায়না। তাও আবার করোনাভাইরাসের এতোবড় ঝুঁকির সময়। তাই ১ হাজার সরকারি কর্মকর্তাকে খিচুড়ি রান্না শিখতে বা অভিজ্ঞতা অর্জন করতে বিদেশে পাঠানোর প্রস্তাব করেছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই)। স্কুল ফিডিং কর্মসুচির আওতায় প্রশিক্ষণের জন্য তাদেরকে বিদেশ পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দৈনিক কালের কন্ঠ গত ১৫ সেপ্টেম্বর-২০২০, লিখেছে, পরিকল্পনা কমিশন থেকে অনুমোদন পাওয়ার চেষ্টা করছে অধিদপ্তর।

বিভিন্ন প্রকল্পের অভিজ্ঞতা অর্জনে বিদেশে যাওয়া সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য নতুন কিছু নয়। তবে সরকারি অন্তত ১ হাজার কর্মকর্তাকে খিচুড়ি রান্না শিখতে বিদেশ পাঠানোর উদ্যোগ ফের আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জনগণের টাকা খরচ করে এধরণের সফরের যৌক্তিকতা নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। ডিপিই ও পরিকল্পনা কমিশন সুত্রে জানানো হয়েছে, সফরে গিয়ে কর্মকর্তারা এধরণের প্রকল্পের জন্য বাজার থেকে কিভাবে দ্রব্যাদি ক্রয় করা হয়, খিচুড়ি রান্নার নিয়ম এবং তা বিতরণের উপায় সম্পর্কে ধারণা নেবেন। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, ডিপিই, পরিকল্পনা কমিশন এবং বাস্তবায়ন, পরীবিক্ষণ ও মূল্যাায়ন বিভাগের কর্মকর্তারা পাঁচ বছরের এই সফরের সুযোগ পাবেন। ওই প্রকল্পের পরিচালক এবং ডিপিই কর্মকর্তা রুহুল আমিন খান বলেন, পাঁচ বছরে ১ হাজার কর্মকর্তাকে বিদেশে পাঠানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মাধ্যমে কীভাবে খিচুড়ি রান্না করতে হয় এবং তা শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হয় সে বিষয়ে তারা ধারণা নিতে পারবেন। এজন্য বিদেশী প্রশিক্ষণ প্রয়োজন বলে তিনি জানান। ্জানা গেছে ডিপিই প্রাথমিকভাবে বিদেশ যাত্রার জন্য ৫ কোটি টাকা চেয়েছে। এছাড়া দেশেই প্রশিক্ষণের জন্য আরো ১০ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত এই রান্না করা খাবার বিতরণ কর্মসুচির জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১৯ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা।

তবে পরিকল্পনা কমিশন এই প্রকল্প থেকে বিদেশ যাত্রা বাতিল করার কথা বলেছে। এছাড়া দেশেও এধরণের প্রশিক্ষণের বিষয়ে যৌক্তিকতা কি জানতে চেয়েছে। কমিশন জানিয়েছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এধরণের খাবার বিতরণ নতুন নয়। ডিপিই দীর্ঘদিন ধরে কর্মসুচি বাস্তবায়ন করছে। তবে এ বিষয়ে রুহুল আমি খান বলেন, গত বছরে ভারতের কয়েকটি স্কুল তারা পরিদর্শন করেন এবং সেখানে কিভাবে খাবার রান্না হয় সে বিষয়টি প্রত্যক্ষ করেছেন। আরো কর্মকর্তাকে এধরণের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ দিতে চান বলে তিনি জানিয়েছেন।’’

খিচুড়ি রান্না নয়, মিড-ডে মিল প্রশিক্ষণ নিতে বিদেশ ভ্রমণে পাঠানোর প্রস্তাব করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রনালয়ের সিনিয়র সচিব আকরাম-আল-হোসেন। গত ১৫ সেপ্টেম্বর তিনি একথা বলেন। প্রসঙ্গত ডিম খিচুড়ি, সবজিসহ অন্যান্য খাবার রান্না ও প্রসেসিং শিখতে প্রাথমিকভাবে বিদেশ যাত্রার জন্য চাওয়া হয়েছে ৫ কোটি টাকা। এ বিষয়ে দেশে প্রশিক্ষণের জন্য আরো ১০ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে।

সামান্য খিচুড়ি রান্না শেখার জন্য পাবলিকের টাকা উজাড় করে যদি বিদেশ যেতে হয় তাহলে তার সাথে সাথে থালা-বাসন, ঘটি-বাটি ধোয়ার প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন জনৈক রশিকজন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আরো বলা হয়েছে বিদেশে যদি তাদের পাঠানো সম্ভব না হয় তাহলে যেন ফুটপাতে বিক্রি হওয়া ‘বিনা তেলে রান্না পদ্ধতি’ বইটি অন্তত তাদের মুখস্ত করানো হয়।’ এমনি আরো কত কি।

খিচুড়ি বাঙালিদের একটি প্রিয় খাদ্য। বৃষ্টির দিনে বাঙালি খিচুড়ি খেতে খুবই পছন্দ করে। খিচুড়ির সঙ্গে যদি ভুনা মাংস কিংবা ইলিশ ভাজা হয় তবে তা ভোজন রসিক বাঙালির কাছে নির্ঘাত অমৃত সমান। আদি কাল হতেই বাঙালিদের খাদ্য তালিকায় রয়েছে মুগ ডালের খিচুড়ি, সবজি খিচুড়ি, মসুর ডালের খিচুড়ি, গমের খিচুড়ি, সাবুর খিচুড়ি, মাংসের খিচুড়ি, ডিমের খিচুড়ি, মাছের খিচুড়ি ও ভুনা খিচুড়ি।

পাবনার সেই ভোজন রশিক জমিদার আজিম চৌধুীর খিচুড়ি রান্নার বাবুর্চি আজ যদি বেঁচে থাকতো তাহলে আর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিপুল অঙ্কের টাকা খরচ করে প্রশিক্ষণের জন্য দেশের বাইরে যেতে হতোনা। পাবনার দুলাই এর জমিদার আজিম চৌধুরীর দহলিজে গেলেই বনেদি খিচুড়ি রান্না শেখার কায়দা-কৌশল রপ্ত করা যেতো। তাহলে খিচুড়ি রান্নার প্রশিক্ষণ নিয়ে এমন জগা-খিচুড়ির সৃষ্টি হতোনা। ’’ (চলবে) (লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)।

Best WordPress themes


© All rights reserved 2020 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!