শনিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২০, ০২:২৮ পূর্বাহ্ন

আতঙ্কিত হবেন না
করোনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

করোনা কালের জীবন ধারা

image_pdfimage_print


।। এবাদত আলী।।
(পূর্ব প্রকাশের পর ) (৭৮)
তাক দ্রিম দ্রিম তাক, ঢোলের বাড়ি। কিংবা ‘আয়রে ছুটে আয়, পুজোর গন্ধ এসেছে, ঢ্যাং কুরাকুর ঢ্যাং কুরাকুর বাদ্যি বেজেছে।’ সঙ্গে জয় ঢাক, খোল-করতাল, কাঁশি এবং ফ্লুয়েট বাঁশিসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রে পুজামন্ডপে বিশেষ আবহ সৃষ্টি হয়ে থাকে। সনাতন ধর্মাবলম্বী হিন্দু সমপ্রদায়ের সব চেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গা পূজার সময় প্রতিটি মন্ডপেই কম বেশি এসব বাদ্যযন্ত্র নানান সুর তোলে। ধুপ-ধোঁয়ার সুবাসে মন্দিরের পুরোহিত নিবিষ্ট মনে মন্ত্র পড়েন এবং মালা জপ করেন। নানা বয়সের সকল শ্রেণির দর্শনার্থী পুজামন্ডপে ভীড় করে থাকে।

কিন্তু বর্তমানে অতিমারি করোনাভাইরাসের প্রদুর্ভাবের কারণে আমাদের দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের বৃহৎ এই ধর্মীয় উৎসব নীরবেই পালন করতে হবে বলে সরকার তরফ হতে ২৬ দফা নিদের্শনা জারি করা হয়েছে। সত্যি কথা বলতে কি মহামারি করোনাভাইরাস পুজা-পার্বনের ওপর ও তার কর্তৃত্ব খাটিয়ে চলেছে।

দুর্গা পুজার অতীত ইতিহাস হতে জানা যায়, দুর্গা পুজা শুরু হয়েছিলো মোঘল শাসন আমল থেকেই। তখন কেবলমাত্র ধনী পরিবারগুলোই দুর্গা দেবীর পুজা-অর্চনা করতো। ইতিহাস বলছে দেবীর পুজা সম্ভবত ১৫০০ শতকের শেষ দিকে প্রথম শুরু হয়। সম্ভবত দিনাজপুর-মালদার জমিদার সপ্নাদেশের পর পারিবারিক দুর্গা পুজা শুরু করেছিলেন। অন্য সুত্রানুসারে তাহেরপুরের রাজা কংশ নারায়ন বা নদীয়ার ভবানন্দ মজুমদার বাংলায় প্রথম শারদীয়া বা শরৎ দুর্গা পুজা সংঘটিত করেন। এরপর রাজশাহীর রাজা এবং বিভিন্ন গ্রামের হিন্দু রাজারা প্রতি বছর এই পুজা-অর্চনা করে থাকেন।

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১৮ কোটি জনসংখ্যানুপাতে মুসলমানদের সংখ্যা শতকরা ৯০ দশমিক ৪ ভাগ। হিন্দু ৮ দশমিক ৫ ভাগ। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা শুন্য দশমিক ৬ ভাগ। খ্রিষ্টানদের সংখ্যা শুন্য দশমিক ৪ ভাগ এবং আদিবাসীদের সংখ্যা শুন্য দশমিক ১০ ভাগ। বাংলাদেশ ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হওয়ায় এখানে অবাধে যে যার ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করতে পারে। কিন্তু এবারে মহামারির কারণে শারদীয় দুর্গা পুজা সল্প পরিসরে পালন করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশের মাটিতে সকল ধর্মের মানুষ অবাধে তাদের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন করে চলেছেন। কিন্তু সাবেক পুর্ব-পাকিস্তান আমলে তৎকালিন পাকিস্তান সরকার হিন্দু সম্প্রদায়ের সঙ্গে বিমাতা সুলভ আচরণ করতো। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর অনেক হিন্দু তাদের সহায়-সম্পত্তি, ঘর-বাড়ি ফেলে ভারতের চলে যেতে বাধ্য হয়। তাদের ফেলে যাওয় সম্পত্তি পাকিস্তান সরকার শত্রু সম্পত্তি হিসেবে গন্য করে সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেয়। ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাংলাদেশে বসবাসরত হিন্দুদের প্রতি পাকিস্তানিদের বেশি আক্রমণ পরিলক্ষিত হয়। এদেশীয় এক শ্রেণির ধর্মান্ধ ব্যক্তি হিন্দুদের প্রতি ঈর্শাপরায়ন ছিলো যা তারা এই যুদ্ধের সময় কাজে লাগায়। তারা পাকিস্তানি সৈন্যদেরকে পথ-ঘাট দেখিয়ে বাড়িতে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে লুট-তরাজ করতো, অগ্নিসংযোগ করতো। তারা ধর্ষণ কাজে সহায়তা করে মা-বোনদেরকে পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে তুলে দিতো। তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষিপ্ত ছিলো হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর। সেসময় বন্ধুপ্রতিম দেশ ভারত বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি শরনার্থীকে আশ্রয় দেয়। মুক্তিযুদ্ধে প্রশিক্ষনের জন্য বাংলাদেশের যুবকদেরকে গেরিলা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে। শুধু তাই নয় ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধি ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানসহ নিজ দেশের সৈন্যদেরকে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করেন।

পাকিস্তানি সৈন্যদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনীর সহায়তায় পাকিস্তানি সৈন্যরা হিন্দুদেরকে বলতো ‘মালাউন’। সেসময় যেকোন মানুষকে তাদের নাগালের মধ্যে পেলেই বলতো তোম মুসলমান হো ইয়া মালাউন? উত্তর দিতে দেরি হলেই বলতো তোম কাপরা উতাউ (উঠাও)। তারা পরনের কাপড় তুলতে লোকজনকে বাধ্য করতো। তারা মুসলমানদেরকে বলতো তোম মুসলমান আওর হামভি মুসলমান হায়, ছব মুসলমান ভাই ভাই হায়। উ হিন্দু হায় উ মালাউন হায় উ ভি কাফের হায়। উছকো ছাত কভি দুস্তি নেহি হোতা হায়। কিন্তু পাকিস্তানি সৈন্যরা এতই বর্বর যে কি হিন্দু, কি মুসলমান, তারা কাউকেই ছাড়তোনা।

মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর সর্বকালের সর্ব শ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার হতে মুক্তিলাভের পর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলার মাটিতে প্রত্যাবর্তন করেন। তিনি সরকার প্রধান হিসেবে দেশ সেবায় ব্রতি হন। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত- যুদ্ধের পর ‘ডিফেন্স অব পাকিস্তান রুলস, ১৯৬৫’ শত্রু সম্পত্তি নাম পরিবর্তন পুর্বক সংশোধন করে বঙ্গবন্ধু সরকার ১৯৭৪ সালে হিন্দু সম্প্রদায়ের সম্পত্তির নাম শত্রু সম্পত্তির পরিবর্তে ‘‘অর্পিত সম্পত্তি’’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সরকার ২০১১ সালের ১১ ডিসেম্বর তারিখে ‘অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ (সংশোধন) আইন, ২০১১ বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে পাশ করে। এরপর নানা জটিলতা দেখা দেওয়ায় ২০১৩ সালে ‘অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন (২য় সংশোধন ) উপস্থাপন ও পাশ করা হয়।

এতক্ষণ এ আলোচনার মূল উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশ সরকার হিন্দু সম্প্রদায়ের স্বার্থ শংশ্লিষ্ট বিষয়ে অধিক আন্তরিক। কিন্তু চলতি শারদীয় দুর্গা উৎসবে হিন্দুদের পুজা-অর্চনার ওপর বেশ কিছু বিধি নিষেধ আরোপ করেছে। আর এটা করা হয়েছে শুধুমাত্র করোনাভাইরাসের কারণে। মহামারি করোনার কারণে এবছর সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গা পুজা ২৬ দফা নিদের্শনা মেনে উদযাপন করার নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।

নিদের্শনায় বলা হয়েছে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে ২২-২৬ অক্টোবর-২০২০ শারদীয় দুর্গাপুজা অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া এবছর প্রতিমা বিসর্জনে শোভাযাত্রা করা যাবেনা। বৈশ্বিক করোনা পরিস্থিতরি কারণে বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য সুরক্ষা মেনে দুর্গাপুজা যাতে সুষ্ঠ’ভাবে অনুষ্ঠিত হয়, সে বিষয়ে বাংলাদেশ পুজা উদযাপন পরিষদের পক্ষ থেকে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত আকারে করতে হবে। মন্দির বা পুজা মন্ডপে আগত দর্শনার্থীদের জীবাণুমুক্ত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গহণ করতে হবে। দর্শনার্থী, ভক্ত ও পরোহিত –সবাইকে বাধ্যতামূলকভাবে মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত এবং সকল দর্শনার্থীকে কমপক্ষে তিন ফুট শারীরিক দুরত্ব বজায় রাখতে বলা হয়েছে। (চলবে) (লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)।

0
1
fb-share-icon1

Best WordPress themes


© All rights reserved 2020 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!