মঙ্গলবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৪:৫১ পূর্বাহ্ন

কাজী নজরুল ইসলামের সান্নিধ্যে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

।। সোমঋতা মল্লিক।।

গ্রামের নাম লাভপুর, শনিবার, রাত্রি ৯টা…

স্টেশনে নামলেন কাজী নজরুল ইসলাম এবং নলিনীকান্ত সরকার। সাক্ষাৎ হল তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কিন্তু সেই দিনটি আর পাঁচটি দিনের মতো স্বাভাবিক ছিল না। পুত্রশোকে বিহ্বল তারাশঙ্করের মনের অবস্থা কেমন ছিল তা তাঁর স্মৃতিচারণা থেকে জানা যায়—“আমার মন সেদিন একটি বিশেষ কারণে খুব স্বাভাবিক ছিল না। ১৯৩৯ সালের অক্টোবর-ঠিক পূজোর পরেই। সেদিন বেলা বারোটা-একটার সময় আমার একটি শিশু-সন্তান মারা গেল। কয়েক মাসের সন্তান। বেলা দুটো নাগাদ তার সৎকারের ব্যবস্থা করে শবটিকে শ্মশানে পাঠানো হল। বেলা তখন চারটে, একটি টেলিগ্রাম পেলাম, ‘আমি এবং নজরুল আজ তোমার ওখানে পৌঁচুচ্ছি।—নলিনী’

বলা প্রয়োজন, আমার সঙ্গে কাজী সাহেবের পরিচয় ছিল নামমাত্র। বোধকরি ১৯৩৩/৩৪ সালে তাঁর সঙ্গে আমদপুর রেলস্টেশনে দেখা হয়েছিল। তিনি আমাদের ও-অঞ্চলের একটি বর্ধিষ্ণু এবং উঁচু সরকারী চাকুরে মিঁয়া সাহেবের সঙ্গে তাঁদের বাড়ি যাচ্ছিলেন। কয়েকটি মাত্র কথা হয়েছিল। ঐ সময় আমি আমার পরিচয় গড়ে তুলতে পারিনি। নলিনীদার সঙ্গে পরে পরিচয় হয়েছে ‘শনিবারের চিঠির’ আপিসে। সেইহেতু টেলিগ্রাম তিনিই করেছিলেন।”

কাজী নজরুল ইসলামের সহধর্মিনী অসুস্থ হলে, নজরুল তাঁর চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখেন নি। যেকোনো উপায়ে তাঁকে সুস্থ করতে চেয়েছিলেন। সেই উদ্দ্যেশ্যেই তাঁর লাভপুরে আগমন। তারাশঙ্কর লিখছেন, “কাজী সাহেবের স্ত্রী বাতে পঙ্গু ছিলেন। বহু স্থানে বহু চিকিৎসা করিয়ে কিছু হয়নি। তখন দৈব ওষুধের সন্ধানে ‘বেলের’ কথা মনে পড়ে। বেলে গ্রামে ধর্মঠাকুর আছেন। বেলের ধর্মঠাকুরের স্থানের মাটি এবং একধরনের জলজ উদ্ভিদ ও তেলের খ্যাতি বাতের ওষুধ হিসেবে বহুকাল থেকে বাংলা দেশে ছড়িয়ে আছে। কাজী সাহেব বর্ধমানের লোক, তাঁর নিশ্চয়ই অজানা ছিল না।

যাক, টেলিগ্রামখানি পেয়ে আমি বিব্রত হলাম। কারণ মেয়েরা এই সময় এই আসা কেমন ভাবে নেবেন ঠিক বুঝলামনা। তবুও এসে কথাটা বললাম এবং ওঁদের জন্য যথাসাধ্য ব্যবস্থাদি করলাম। ওঁরা এলেন। নেমেই আমাকে আমার ছেলে কেমন আছে প্রশ্ন করলেন। ছেলেটির অসুখের সংবাদ নলিনীদা জানতেন। কথাটা শুনে কাজী সাহেব বললেন, ‘আমাদের ডাক-বাংলোয় একটু ব্যবস্থা করে দাও কিংবা স্টেশনের ওয়েটিংরুমে।’ আমার আগ্রহে ও অনুরোধে শেষ পর্যন্ত আমার ওখানেই এলেন। রাত্রে থাকলেন। সকালে ট্যাক্সি করে বেলে গিয়ে দুপুরে ফিরে এসে আহারাদির পর বললেন, ‘রাত্রে আসর পাতো, গান গাইব।’

গানের আসর বসেছিল সেইদিন সন্ধ্যায়। কিন্তু তার আগে ফুল্লরা মহাপীঠে দেবীর মন্দিরের সামনে নাটমন্দিরে পদ্মাসন হয়ে বসে কাজী সাহেব প্রাণায়াম যোগে জপ শুরু করেন। তারাশঙ্কর সেদিন উপলব্ধি করেছিলেন, যে কাজী নজরুল ইসলাম কত বড় যোগী ছিলেন। “মনে হল মানুষটা নিস্পন্দ বা সমাধিস্থ হয়ে গেছেন। কুম্ভকে এতোক্ষন অবস্থান খুব বড় যোগী ভিন্ন সম্ভবপর নয়। সমস্ত শরীরে ঘামের বন্যা বয়ে গেল। যখন জপ সেরে উঠলেন তখন চোখদুটি জবা ফুলের মতো লাল এবং তখনও ঠিক জাগ্রত চেতনায় যেন ফেরেননি। সেই অবস্থাতেই একখানি গান রচনা করে সুর দিয়ে দেবতাকে এবং সমবেত লোকদের শুনিয়ে বাড়ি ফিরলেন।”

সৃষ্টি হল কালজয়ী গান। গানের আসর চলেছিল রাত্রি ২টা পর্যন্ত। একের পর এক গান গেয়ে গেলেন নজরুল।

“সন্ধ্যা থেকে গানের আসর বসল। রাত্রি দুটো পর্যন্ত একনাগাড়ে গেয়ে গেলেন। মধ্যে একবার আধঘন্টার জন্য নলিনীদা দুই বা তিনখানি হাসির গান গেয়েছিলেন। লোকে লোকারন্যের সৃষ্টি করেছিল। স্থানীয় মুসলমানেরা এসেছিলেন দলে দলে, তাঁরা ইসলামী সঙ্গীত শুনতে চেয়েছিলেন। রাত্রির মধ্যখানে গেয়েছিলেন শ্যামাসঙ্গীত। সে সময়ে আশ্চর্য ভাবমন্ডলের সৃষ্টি করেছিলেন এবং তাঁর মধ্যে কবি ও ভক্ত অর্থাৎ ভারতবর্ষের বিশেষ করে বাংলাদেশের সাধক বা মহাজনকে প্রত্যক্ষ করেছিলাম।”

আমার হৃদয়ের সন্তান বিয়োগ বেদনার নিঃশেষ উপশম হয়েছিল এমন কথা বলবনা, তবে তার উপর যে তিনি আনন্দ শ্বেত-চন্দনের একটি স্নিগ্ধ-শীতল প্রলেপ বুলিয়ে দিয়ে এসেছিলেন, এ শতবার উচ্চকন্ঠে ঘোষনা করে বলব।

একদিকে সন্তান-বিয়োগের শোক, অন্যদিকে কাজী নজরুল ইসলামের সাহচর্য লাভ-এই দুইয়ের কারণে এই দিনটি তারাশঙ্করের জীবনে স্মরণীয়। তিনি যথার্থই তাঁর উপলব্ধি ব্যক্ত করেছেন—

“আমার হৃদয়ের সন্তান বিয়োগ বেদনার নিঃশেষ উপশম হয়েছিল এমন কথা বলবনা, তবে তার উপর যে তিনি আনন্দ শ্বেত-চন্দনের একটি স্নিগ্ধ-শীতল প্রলেপ বুলিয়ে দিয়ে এসেছিলেন, এ শতবার উচ্চকন্ঠে ঘোষনা করে বলব।”

তথ্য ঋণঃ নজরুল স্মৃতি, বিশ্বনাথ দে সম্পাদিত

গ্রন্থণা: সোমঋতা মল্লিক, নজরুল সঙ্গীতশিল্পী এবং সভাপতি, ছায়ানট (কলকাতা)

0
1
fb-share-icon1


© All rights reserved 2021 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
x
error: Content is protected !!