বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২০, ০৭:২৮ পূর্বাহ্ন

আতঙ্কিত হবেন না
করোনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

কে ছড়ালো করোনাভাইরাস? কি বলছেন বিজ্ঞানীরা?

বার্তাকক্ষ : কে ছড়ালো করোনাভাইরাস- যুক্তরাষ্ট্র, চীন না ব্রিটেন? আসলেই কি এটি জীবজন্তুর দেহ থেকে মানুষের শরীরে ঢুকেছে নাকি জীবাণু অস্ত্রের ল্যাবরেটরি থেকে উদ্দেশ্যমূলক-ভাবে এটি ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে?

সংক্রমণ যত ছড়িয়ে পড়ছে, তার সাথে পাল্লা দিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব।

শুধু যে সোশ্যাল মিডিয়াই এসব ষড়যন্ত্র তত্ত্বে ছয়লাব তাই-ই নয়, কিছু দেশের মূলধারার কিছু কিছু মিডিয়াও এসব তত্ত্ব প্রচার করছে।

ষড়যন্ত্র এসব তত্ত্বগুলো আসছে প্রধানত যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন এবং ইরান থেকে। এসব দেশের সরকারগুলো সরাসরি এসবের পেছনে না থাকলেও, সরকারের সাথে সম্পর্কিত কিছু ব্যক্তির কথায় এবং মিডিয়ায় এগুলো স্থান পাচ্ছে।

কে কাকে সন্দেহ করছে?
চীন এবং ইরানের ভেতর থেকে সন্দেহের তীর যুক্তরাষ্ট্রের দিকে।

চীনের ভেতর সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষজন হরদমসে লিখছে এবং শেয়ার করছে যে চীনকে শায়েস্তা করতে যুক্তরাষ্ট্র জীবাণু অস্ত্র হিসাবে চীনে এই ভাইরাস ছড়িয়ে দিয়ে গেছে।

শুধু সোশ্যাল মিডিয়া নয়, একজন চীনা কূটনীতিক তার টুইটার অ্যাকাউন্টে এক পোস্টে সরাসরি ইঙ্গিত করেছেন, উহানে গত বছর অক্টোবর মাসে একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে আসা মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি দল এই ভাইরাস ছড়িয়ে গেছে।

চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্রও ঝাও লিজিয়িান টুইটারে মার্চের ১১ তারিখে মার্কিন একটি কংগ্রেস কমিটির সামনে সেদেশের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলের (সিডিসি) প্রধান রবার্ট রেডফিল্ডের একটি শুনানির ভিডিও ক্লিপ পোষ্ট করেছেন। ঐ ফুটেজে রেডফিল্ড যুক্তরাষ্ট্রে কিছু ইনফ্লুয়েঞ্জা-জনিত মৃত্যুর ঘটনা সম্পর্কে বলছেন, পরীক্ষায় দেখা গেছে কোভিড-নাইন্টিনের কারণেই ঐ মৃত্যু।

যদিও রেডফিল্ড বলেননি কখন ঐসব মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু চীনা ঐ কূটনীতিক টুইটারে ঐ ভিডিও ক্লিপ পোস্ট করে সাথে লিখেছেন, “সিডিসি ধরা পড়ে গেছে। কখন প্রথম রোগীটি যুক্তরাষ্ট্রে মারা গিয়েছিল? কত মানুষ সংক্রমিত হয়েছিল? কোন কোন হাসপাতালে? হতে পারে যেসব মার্কিন সেনা উহানে ঐ ভাইরাস এনেছিল তারাই… স্বচ্ছ হোন। মানুষকে সত্য জানান। যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ব্যাখ্যা চাই।”

ঝাওয়ের ঐ টুইট চীনা রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত টিভি সিসিটিভিতে প্রচার হয়। গ্লোবাল টাইমসেও তা ছাপা হয়।

এছাড়াও, চীনের ভেতর থেকে একাধিক বিজ্ঞানী বলেই চলেছেন করোনাভাইরাসের মহামারি চীনে শুরু হলেও, এই ভাইরাসের উৎপত্তি চীনে হয়নি।

ইরানের অঙ্গুলি আমেরিকার দিকে
চীনের পাশাপাশি ইরানের ভেতরেও ব্যাপক মানুষের বিশ্বাস এই জীবাণু যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি।

এমনকি ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডের কম্যান্ডার মেজর জেনারেল হুসেইন সালামি সরাসারি বলেছেন, করোনাভাইরাস যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি একটি জীবাণু অস্ত্র।

গত পাঁচই মার্চ জে. সালামি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে চীনে এবং পরে ইরানের বিরুদ্ধে “জীবাণু-অস্ত্রের সন্ত্রাসী হামলা” চালিয়েছে।

পরদিনই ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির একজন প্রভাবশালী সদস্য হেশমাতোল্লাহ ফাতালহাতপিশে মন্তব্য করেন, “ট্রাম্প এবং পম্পেও করোনা নিয়ে মিথ্যা কথা বলছেন…এটা কোনো সাধারণ রোগ নয়, এটা ইরান এবং চীনের বিরুদ্ধে জীবাণু অস্ত্রের হামলা।”

রাশিয়ার ভূমিকা
রাশিয়ার ভেতর থেকে সোশ্যাল মিডিয়া ছাড়াও রাশিয়ার সরকারের সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন মিডিয়ায় চীন এবং ইরানের এসব অভিযোগ-তত্ত্ব জোরেসোরে প্রচার করা হচ্ছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ফাঁস হয়ে যাওয়া একটি গোপন রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইইউ’এর একটি মনিটরিং দল মার্চের ১৬ তারিখ পর্যন্ত দুমাসের এক অনুসন্ধানে ৮০টি প্রমাণ পেয়েছে যে ক্রেমলিনের সাথে ঘনিষ্ঠ মিডিয়ায় করোনাভাইরাস নিয়ে নানা ধরণের অপ্রচার চালানো হচ্ছে।

রুশ বিভিন্ন মিডিয়ায় এই ভাইরাস ছড়ানোর জন্য ব্রিটেনকেও দায়ী করা হচ্ছে।

সরকার সমর্থিত স্পুটনিক রেডিওতে একটি অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়েছে যেখানে বলা হয়েছে, ব্রেক্সিটের পর বাজার খুলে দেওয়ার জন্য চীনকে বাধ্য করতে ব্রিটেন এই কাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারে।

রুশ একটি জনপ্রিয় টিভি টকশোতে (দি বিগ গেম) ইগর নিকুলিন নামে রুশ একজন মাইক্রোবায়োলজিস্ট বলেন, ব্রিটেন এই করোনা ‘অস্ত্র’ তৈরি করেছ।

তিনি বলেন, “(ব্রিটেনের) পোর্টান ডাউনে একটি গবেষণাগারে বহুদিন ধরেই নানা জীবাণু এবং রাসায়নিক অস্ত্র তৈরির কাজ চলছে।”

তবে রুশ সরকার দাবি করেছে, এসব বক্তব্যের সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই।

আমেরিকার তীর চীনের দিকে
আমেরিকার ভেতরেও করোনাভাইরাস নিয়ে নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়েছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্বয়ং ঘুরে ফিরে বলেই চলেছেন, করোনা ভাইরাস চীনের কাজ, তারাই দায়ী।

মি ট্রাম্পের সমর্থক হিসাবে পরিচিত অনেক ব্যক্তিই খোলাখুলি বলছেন, করোনাভাইরাস চীনের তৈরি একটি জীবাণু অস্ত্র।

ক্যালিফোর্নিয়া থেকে কংগ্রেসে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন এমন এক রিপাবলিকান রাজনীতিক জোয়ান রাইট টুইট করেছেন, “উহান ল্যাবরেটরিতে এই করোনাভাইরাস তৈরি করা হয়েছে, এবং ঐ গবেষণায় চীনাদের সহায়তা করেছেন বিল গেটস।”

সমালোচনার মুখে পরে তিনি ঐ টুইট ডিলিট করে দেন।

তবে আমেরিকার কট্টর ডানপন্থী বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া সাইটে করোনাভাইরাস নিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের কোনো শেষ নেই।

যা বলছেন বিজ্ঞানীরা
পরিস্থিতি দেখে উদ্বিগ্ন একদল বিজ্ঞানী মেডিকেল জার্নাল ল্যানসেটে একটি বিবৃতি দিয়েছেন যেখানে তারা বলেছেন, “জীবজন্তুর শরীর থেকেই এই করোনাভাইরাস ছড়িয়েছে। ষড়যন্ত্র তত্ত্ব শুধুই ভয়,গুজব এবং ঘৃণা ছড়াবে যাতে এই সংকট মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ব্যাহত হবে।”

এছাড়া ইতোমধ্যেই পৃথিবীর অনেক বৈজ্ঞানিক গবেষণাগারে পরীক্ষা-নিরিক্ষার পর বিজ্ঞানী ও গবেষকরা অনেক গবেষণাপত্রে প্রমাণ দিয়েছেন যে এই ভাইরাস মানুষের তৈরি কোনো জীবাণু বা জৈব অস্ত্র না।

বিজ্ঞানীরা এরমধ্যেই এই SARS-CoV-2 বা করোনা ভাইরাসের দুই প্রকার জেনেটিক বৈশিষ্ট্য- আলফা ও বিটাকরোনাভাইরাসের জিনেটিক তথ্যের তুলনামূলক কাঠামোগত বিশ্লেষণ এবং জৈব-রাসায়নিক পরীক্ষার মাধ্যমে দেখাইছেন, এই ভাইরাস মানুষের তৈরি করা কোনো কৃত্রিম জীবাণু না।

১৭ই মার্চ নেচারমেডিসিনে প্রকাশিত ‘দা প্রক্সিমাল অরিজিন অভ SARS-CoV-2’ নামক আর্টিকেলে গবেষকরা দেখান, এই ভাইরাসের জিনের প্রোটিনে যে ছয় ধরণের অ্যামইনো অ্যাসিড সম্বলিত ‘রিসেপটর বাইন্ডিং ডোমেইন’ বা RBD পাওয়া যায়, তা এই ভাইরাসের বাহক- এইক্ষেত্রে মানুষের ACE2 রিসেপ্টরের সাথে যুক্ত হইলে মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হইতে পারেন। এই ACE2 রিসেপ্টরের সাথে SARS-CoV-2-র স্পাইক প্রোটিনের যুক্ত হওয়ার প্রবণতা ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’এর কারণে হয় বলে গবেষকরা ধারণা করেন।

এছাড়াও ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের মতই এই করোনা ভাইরাসের প্রোটিন স্পাইকের সাবইউনিটে পাওয়া পলিবেসিক ফিউরিন ক্লিভেজ সাইট প্রাকৃতিকভাবে ভাইরাসরে তার বাহক খুঁজতে সাহায্য করে। গবেষকরা ধারণা করেন, এই ভাইরাস প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে মানুষরে আক্রমণ করার আগে অন্য প্রাণীকে প্রাথমিক আধার হিসাবে ব্যবহার করে এবং পরবর্তীতে ঐ প্রাণীর মাধ্যমে এই ‘জুনোসিস’ বা প্রাণিবাহিত রোগ মানুষের মধ্যে ছড়ায়। মানুষের চাইতে যেসব প্রাণীর জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি এবং যেসব প্রাণীর মানুষের মত ACE2 রিসেপ্টর আছে, সেসব প্রাণীকেই এই ভাইরাস প্রাথমিক আধার হিসাবে ব্যবহার করে।

দ্বিতীয় সম্ভাবনা হলো, এই ভাইরাসের পূর্বসূরী ভাইরাস কোনো প্রকার লক্ষণ প্রকাশ না করে অনেক আগে থেকেই মানুষের শরীরে বাস করছিলো, পরবর্তীতে প্রাণীবাহিত নতুন ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার ফলে প্রাথমিক ভাইরাস সক্রিয় হয়ে ওঠে। করোনা গোত্রীয় আরেকটা ভাইরাস MERS-CoV এই পদ্ধতিতে মরু অঞ্চলের এক প্রকার উট থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রামিত হয়েছিলো।

অনেকের মতে আবার, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে প্রায় কয়েক লক্ষ বছর আগে বরফ-যুগে মাটির নিচে চাপা পড়া ‘পারমাফ্রস্ট’ হয়ে থাকা ব্যাকটেরিয়া এবং ভাইরাসেরা পৃথিবীতে ফেরৎ আসা শুরু করেছে।

২০১৬ সালে প্রায় ৭০ বছর আগের এই ধরণের পারমাফ্রস্টেড এ্যানথ্রাক্স জীবাণু তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বরফ গলে বাইরে বের হয়ে আসে। এবং তাতে আক্রান্ত হয়ে সাইবেরিয়ান তুন্দ্রা অঞ্চলে বেশ কিছু রেইনডিয়ার এবং মানুষ মারা যান। শুধু এ্যানথ্রাক্স না, বিশ্বের তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে বরফের নিচে চাপা পড়ে থাকা ১৯১৮ সালের ভয়ানক স্প্যানিশ ফ্লু ভাইরাস, স্মল পক্স এবং মধ্যযুগের বিউবনিক প্লেগের ভাইরাসেরও পৃথিবীতে আবার ফেরৎ আসার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে বলে দাবি করেন অনেক বিজ্ঞানী।

সুত্রঃ বিবিসি বাংলা, দ্য গার্ডিয়ান


About Us

COLORMAG
We love WordPress and we are here to provide you with professional looking WordPress themes so that you can take your website one step ahead. We focus on simplicity, elegant design and clean code.

© All rights reserved 2020 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial