কে হচ্ছেন হেফাজতের নতুন আমির

আল্লামা শাহ আহমদ শফীর মৃত্যুর পরপরই হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির কে হচ্ছেন তা নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি শুরু হয়ে গেছে জল্পনা-কল্পনা।

আলোচনায় সবার উপরে আছেন সংগঠনের এক নম্বর সহ-সভাপতি আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী। তিনি বয়সেও সবার বড়। তাকেই হেফাজতে ইসলামের ভারপ্রাপ্ত আমির হিসেবে আপাতত নেতৃত্বে দেখা যেতে পারে বলে মনে করছেন কেউ কেউ। যদি তিনি দায়িত্ব নিতে অপারগ হন, তাহলে সহ-সভাপতিদের মধ্য থেকে যে কাউকেই ভারপ্রাপ্ত আমিরের দায়িত্বে দেখা যেতে পারে।

এক্ষেত্রে ভারপ্রাপ্ত আমির হিসেবে হেফাজতের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি মাওলানা তাজুল ইসলাম, সাবেক মন্ত্রী মুফতি মোহাম্মদ ওয়াক্কাসের নাম আলোচনায় রয়েছে।

জানা গেছে, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফীর আদর্শ বাস্তবায়ন ও অনুসরণ করবে হেফাজতে ইসলাম। আর কাউন্সিলের মাধ্যমে হেফাজতের পরবর্তী আমির এবং শুরা কমিটির মাধ্যমে আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারীর মাদ্রাসার পরবর্তী মহাপরিচালক নির্বাচিত হবেন।

হেফাজতে ইসলামের আমির কে হবেন এমন প্রশ্নের জবাবে সংগঠনটির মহাসচিব মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরী শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এটা তো আমি বলতে পারবো না, এটা আল্লাহ তায়ালা জানেন। তবে আমরা চেষ্টা করবো উনার আদর্শ বাস্তবায়ন করার। সেটা হাটহাজারী মাদ্রাসা ও হেফাজতে ইসলামের ব্যাপারেও। উনি হেফাজতের আমির ছিলেন। এখন কাউন্সিল হবে, কাউন্সিলে নির্ধারণ করা হবে কে হেফাজতে ইসলামের আমির হবেন। এককভাবে কেউ ঠিক করতে পারবে না।’

‘আর মাদ্রাসা পরিচালনার দায়িত্ব তিনি জীবিত থাকাকালীন লিখে গেছেন, মাদ্রাসার শূরা কমিটি মাদ্রাসা পরিচালনা করবে। মাদ্রাসার শুরা কমিটি নির্ধারণ করবে মাদ্রাসার মহাপরিচালক কে হবেন।’ বলছিলেন বাবুনগরী।

তবে, সংশ্লিষ্টদের ধারণা- হেফাজত নেতাদের কোন্দল-গ্রুপিংয়ের কারণে ভারপ্রাপ্ত আমির হিসেবে কাউকে দায়িত্ব না দিয়ে জরুরি কাউন্সিলও করতে পারে সংগঠনটি। এক্ষেত্রে কাউন্সিলে সংগঠনের বর্তমান মহাসচিব মাওলানা জুনাইদ বাবুনগরী হেফাজতের নতুন আমির নির্বাচিত হতে পারেন বলে মনে করছেন অনেকেই।

এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে হেফাজতের যুগ্ম-মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সকালে হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে বলেন, ‘আমিরের মৃত‌্যুর পর এই বিষয়ে কথা বলার মতো মানসিক অবস্থাও আমাদের কারও নেই। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সবার অভিমতের ভিত্তিতে বিষয়টি ফয়সালা করা হবে।’

জানা গেছে, আল্লামা শফীর মৃত্যুর আগে হাটহাজারী মাদ্রাসার কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রকশ্যে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে হেফাজতে ইসলাম।সংগঠনটির দুই গ্রুপই নিজেদের শীর্ষ নেতাদের হেফাজতের ভারপ্রাপ্ত নেতৃত্বে আশা করছেন। তাদের মধ্যে একগ্রুপ আল্লামা শফীর ছেলে আনাস মাদানির নেতৃত্বে রয়েছেন। এই গ্রুপে রয়েছেন হেফাজতের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ, মাওলানা মহিউদ্দিন রুহি প্রমুখ। অন‌্য গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন হেফাজতের বর্তমান মহাসচিব মাওলানা জুনাইদ বাবুনগরী। মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমী, সাবেক মন্ত্রী মুফতি মোহাম্মদ ওয়াক্কাস, যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক, মাওলানা মামুনুল হকসহ কওমি ঘরানার অধিকাংশ আলেম ওলামা ও হেফাজতের অধিকাংশ নেতাকর্মী রয়েছেন।

সংগঠনটির দুই গ্রুপই চাইছেন তাদের শীর্ষ নেতারাই হেফাজতের নেতৃত্বে আসুক। তবে, নিয়ম অনুযায়ী হেফাজতের এক নম্বর সহ-সভাপতি ভারপ্রাপ্ত আমির হওয়ার কথা। তবে সহ-সভাপতিদের মধ্য থেকে ভারপ্রাপ্ত্ আমির নির্বাচনে মতানৈক্য দেখা গেলে জরুরি ভিত্তিতে হেফাজতের কাউন্সিল ডাকা হতে পারে। কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন আমির নির্বাচন করা হতে পারে। এক্ষেত্রে সংগঠনটির বর্তমান মহাসচিব মাওলানা জুনাইদ বাবুনগরীকেও হেফাজতের আমির হিসেবে দেখা যেতে পারে। বর্তমানে বিবদমান হেফাজত নেতারা আপাতত তাদের আমিরকে হারিয়ে শোকে মুহ্যমান। আল্লামা শফীর জানাজা, দাফন ও কাফন নিয়ে ব্যস্ত রয়েছেন তারা।

এদিকে আজ দুপুর সোয়া ২টার দিকে প্রিয় প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে আল্লামা শাহ আহমদ শফীর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। চট্টগ্রামসহ দেশের দূর-দূরান্ত থেকে লাখ লাখ মানুষ এই জানাজায় অংশ নিয়ে তাঁদের বড় হুজুরের জন্য মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া করেন। পরে মাদ্রাসা প্রাঙ্গণেই তাঁকে দাফন করা হয়।

আল্লামা শাহ আহমদ শফীর জানাজায় ইমামতি করেন তাঁর বড় ছেলে মাওলানা ইউসুফ মাদানী। মাদ্রাসা প্রাঙ্গণ পরিপূর্ণ হয়ে আশপাশে এক কিলোমিটার দূর পর্যন্ত রাস্তায় দাঁড়িয়ে মানুষ জানাজায় অংশ নেন।

আহমদ শফী বেশ কিছুদিন ধরেই বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন অসুস্থতা ছাড়াও ডায়াবেটিস ও হাইপারটেনশনে ভুগছিলেন। এর মধ্যেই গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১টার দিকে হেফাজতে ইসলামের আমিরকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তিনি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন ছিলেন। শুক্রবার বিকেলে শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় আহমদ শফীকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় আনা হয়। তাঁকে পুরান ঢাকার গেণ্ডারিয়ার ধূপখোলা মাঠের পাশে অবস্থিত আজগর আলী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। ভর্তির কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়।