সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২০, ০৯:২৬ অপরাহ্ন

আতঙ্কিত হবেন না
করোনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

কোরবানি ঈদের খাবার ও সচেতনতা


অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ


ঈদুল আযহা সমাগত যার অপর নাম কোরবানির ঈদ। ঈদ হলো আনন্দের দিন, যার অন্যতম অনুষঙ্গ হলো খাবার। আর কোরবানির ঈদের অন্যান্য খাবারের সাথে মূল আয়োজন হলো বিভিন্ন রকমের গোসত খাওয়া, যেমন গরু, খাসি, মহিষ, এমনকি উটের গোসতও। ঈদ উৎসবে সবারই মনে প্রবল ইচ্ছা থাকে বেশি বেশি করে কোরবানির গোসত খাওয়া। গোস্ততো অবশ্যই খাবেন, কিন্তু খাবারের বিষয়ে চাই পরিমিত জ্ঞান ও সংযম পালন এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা। মনে রাখতে হবে, দুই একদিন বেশি গোসত খেতে যদিও বাধা নেই, তবুও খাবেন রয়ে সয়ে। সমস্যা হলো যারা অনেক দিন যাবৎ বিভিন্ন রোগে ভোগেন যেমন- যাদের পেটের সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা হৃদরোগ, কিডনি বা লিভারের রোগ আছে কিংবা এসব রোগের প্রাথমিক লক্ষণ আছে। ঈদকে উপলক্ষ করে সবার বাসায় নানা ধরণের মুখরোচক খাবারের আয়োজন করা হয়। নিজের বাসায় তো বটেই, আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধবের বাসায় ঘুরে ঘুরে প্রায় সারা দিনই টুটিটাকি এটা-সেটা ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় খাওয়া হয়েই থাকে। আমাদের একটু নজর দেওয়া দরকার আমরা কী খাচ্ছি, কতটুকু খাচ্ছি, শরীরে বিভিন্ন খাবারের কি প্রতিক্রিয়া হতে পারে তার ওপর।

খাবারের পরিমাণ:

মূল সমস্যাটা নিঃসন্দেহে খাবারের পরিমাণে। অনেকেই একসঙ্গে প্রচুর পরিমাণ চর্বিযুক্ত খাবার খেয়ে হজম করতে পারেন না। কোরবানির গোসত পরিমাণে একটু বেশিই খাওয়া হয়। অধিক পরিমাণে গোসত খাওয়ার ফলে হজমে সমস্যা, পেট ফাঁপে, জ্বালাপোড়া করে, ব্যথা করে। গ্যাস্ট্রিকে আক্রান্ত রোগীদের সমস্যাটা আরও বেশি হয়। পর্যাপ্ত পানি বা তরল খাদ্য গ্রহণ না করার দরুন অনেকে কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগেন। যদিও সাধারণভাবে কোনো নির্দিষ্ট খাবার খেতে মানা নেই, কিন্তু পরিমাণ বজায় রাখা খুবই জরুরি। কিছু কিছু খাবার সকাল আর দুপুরে পরিহার করা উত্তম। যেমন-তৈলাক্ত খাবার, পোলাও, বিরিয়ানি, আমিষ জাতীয় খাবার, যেমন- মুরগি, খাসি বা গরুর মাংস, কাবার, রেজালা ইত্যাদি। অন্য খাবারও যথাসম্ভব কম খেয়ে পেটটা একটু খালি রাখুন। কারণ দিন গড়িয়ে গেলে কোরবানির গোসত প্রচুর পরিমাণে খাওয়ার সম্ভাবনা থাকবেই। ঈদের দিনে অনেকেই সরবত, কোমল পানীয়, ড্রিংকস এবং ফ্রুট জুস খাওয়া পছন্দ করেন। তবে মনে রাখা উচিত, বাজারে দেশি-বিদেশি যেসব ফ্রুট জুস পাওয়া যায়, সেগুলোর বেশির ভাগই আসল ফলের রস নয়। লেবুর শরবত, বাসায় বানানো ফলের রস, ডাবের পানি, বোরহানি ইত্যাদি খাওয়া যেতে পারে।

সকালের খাবার হতে হবে হালকা:

ঈদের নামাজ পড়তে যাওয়ার আগে অল্প করে সেমাই বা পায়েস খেতে পারেন। সঙ্গে কিশমিশ, বাদাম এমনকি খেজুর বা খুরমা, ফলের জুস, ডাবের পানি খেতে পারেন। খাবার আধ ঘণ্টা পরে দেড় থেকে দুই গ্লাস পানি খেয়ে নামাজ পড়তে যান।

খাবার খেতে হবে বুঝশুনে:

যাদের বয়স কম এবং শারীরিক কোনো সমস্যা নেই, তারা নিজের পছন্দমতো সবই খেতে পারেন এবং তাদের হজমেও কোনো সমস্যা হয় না, শুধু অতিরিক্ত না হলেই হলো। বিশেষ করে চর্বি জাতীয় খাবার। বেশি গোসত খেলে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা বেড়ে যায়। যাদের এনাল ফিশার ও পাইলস জাতীয় রোগ আছে, তাদের পায়ুপথে জ্বালাপোড়া, ব্যথা ইত্যাদি বাড়তে পারে, এমনকি পায়ুপথে রক্তক্ষরণও হতে পারে। তাই প্রচুর পরিমাণে পানি, সরবত, ফলের রস, ইসবগুলের ভূষি ও অন্যান্য তরল খাবার বেশি করে খাবেন। পেটে গ্যাস হলে ডমপেরিডন, এন্টাসিড, রেনিটিডিন, ওমিপ্রাজল, প্যান্টোপ্রাজল জাতীয় ওষুধ খেতে পারেন। যাদের আইবিএস আছে, তারা দুধ ও দুগ্ধজাতীয় খাবার এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করুন। দাওয়াতে গেলে পরিমিত খাবেন, অতিভোজন পরিহার করার চেষ্টা করুন। খাবারের ফাঁকে ফাঁকে পানি খাবেন না, এতে হজম রসগুলো পাতলা হয়ে যায়। ফলে হজমে অসুবিধা হয়। তাই খাওয়ার অন্তত এক ঘণ্টা পর পানি পান করুন। খাবারের মাঝে বোরহানি খেতে পারেন। খাওয়ার পর কিছুক্ষণ হাঁটাচলা করুন। রাতের খাবার খেয়েই ঘুমিয়ে পড়বেন না। খাওয়ার অন্তত দুই ঘণ্টা পর বিছানায় যাবেন।

চর্বি এড়িয়ে চলুন:

যে কোনো পশুর চর্বি খাওয়া এমনিতেই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। কোরবানির সময় এ বিষয়টি বিশেষভাবে খেয়াল রাখা উচিত। গুরু বা ছাগলের মাংসকে এক কথায় বলা হয় লাল মাংস বা রেড মিট। লাল মাংস প্রোটিনের সমৃদ্ধ উৎস, শরীরের বৃদ্ধি সাধন, ক্ষয়পূরণ ও শরীরের গঠনে যার ভূমিকা অপরিসীম। তবে লাল মাংসের যেমন উপকার আছে, তেমনি রয়েছে অনেক ঝুঁকিও। এতে আছে প্রচুর স্যাচুরেটেড ফ্যাট যেমন ট্রাইগ্লিসারাইড ও এলডিএল, যা ক্ষতিকর কোলেস্টেরল হিসেবে পরিচিত। এগুলো শরীরের ওজন বৃদ্ধি করে, রক্তচাপ বাড়ায়, রক্তনালীতে চর্বি জমিয়ে রক্তপ্রবাহকে ব্যাহত করে স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায়, ডায়াবেটিস সংক্রান্ত জটিলতা বৃদ্ধি করে। এছাড়া বিভিন্ন ধরণের ক্যান্সারর যেমন-কোলন ও স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকিও বাড়ার সম্ভাবনা থাকে লাল মাংসে। যতটুকু সম্ভব মাংসের চর্বি ছাড়িয়ে খাওয়া ভালো। মাংসের সঙ্গে যথেষ্ট পরিমাণে সবজি খাওয়া যেতে পারে। টাটকা সবজি পাকস্থলীকে সাবলীল রাখে।

বয়স্কদের সচেতনতা গুরুত্বপূর্ণ:

মধ্যবয়সী এবং বয়স্কদের খাবার সম্পর্কে সচেতন থাকা আরও জরুরি। এমনকি উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, রক্তে অতিরিক্ত চর্বি ইত্যাদি না থাকা সত্বেও এই বয়সের সবাইকেই ঈদের খাবারের ব্যাপারে বাড়তি সতর্ক থাকা দরকার। অতিভোজনে তাদের পেট ভরা ভাব বা অস্বস্তিকর অনুভূতি হতে পারে। বেশি গোসত খেলে তা পরিপূর্ণভাবে হজম করতে অনেক সময় লাগতে পারে। এতে পেটে অস্বস্তিকর অনুভূতি, ভরা ভরা ভাব, বারবার ঢেকুর ওঠা এমনকি বুকে ব্যথা পর্যন্ত হতে পারে।

স্ট্রোক ও হৃদরোগে আক্রান্তদের জন্য:

স্ট্রোক এবং হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীরা অবশ্যই তৈলাক্ত মাংস কমিয়ে খাবেন। সারা বছর তারা যে ধরণের নিয়মকানুন পালন করেন খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে, কোরবানির সময়ও সেই ভাবে চলা উচিত। কোরবানির মাংস একটু আধটু খেলে শরীরের যে খুব ক্ষতি হয়ে যাবে তা নয়, তবে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। যাদের ওজন বেশি তাদের অবশ্যই ঈদের সময় অতিরিক্ত খাওয়া পরিহার করতে হবে। গেঁটে বাত বা ইউরিক এসিড বেশি যাদের এবং যারা কিডনির সমস্যায় ভোগেন, তাদেরকে প্রোটিন জাতীয় খাদ্য কম খেতে বলা হয়।

লেখক: সাবেক ডিন ও চেয়ারম্যান

মেডিসিন অনুষদ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

error20
fb-share-icon0
Tweet 10
fb-share-icon20


© All rights reserved 2020 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial
error: Content is protected !!