সোমবার, ২৫ মে ২০২০, ০৪:২৪ পূর্বাহ্ন

আতঙ্কিত হবেন না
করোনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

ক্রিকেটার তুষারের মৃত্যু আর নিজের শিহরে উঠা বনানী ট্রাজেডি!

আমি তখন চাকুরিচ্যুত। হন্য হয়ে কাজ খুঁজছি। অফিস থেকে ‘দায়িত্ব অবহেলা ও কর্মে সন্তুষ্টি না হওয়ায় আপনাকে অব্যাহতি প্রদান করা হল’ এমন কিছু কথা লিখে একটি টার্মিনেশন লেটার হাতে ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। আমি একদম বিচলিত নই। চুপচাপ কাজ খুঁজি।

হঠাৎ ডেইলি স্টারের এক সাংবাদিক বড় ভাই বললেন, বনানীতে এক পত্রিকা অফিসে ইন্টারভিউ দিতে। আমি চলে গেলাম একখানা সিভি হাতে করে। গিয়ে দেখি সেই পত্রিকা অফিসে কেউ আসেনি, শুধু পিয়ন ছাড়া। নতুন অফিস স্টাফ সব নিয়োগ হয়নি। আমাকে বলা হল বসতে হবে, স্যার আসতে দেরি হবে। নতুন পত্রিকা অফিস ১৭ তলার উপরে।

আমি বসে আছি, হঠাৎ পিয়ন দৌড়ে এল। বলল, যেভাবে পারেন পালিয়ে যান। আগুন ধরেছে। পিয়ন উধাও, আমি কিছুক্ষণ ভেবে নিচে নামবার চেষ্টা করলাম। আশপাশে কাউকে দেখছি না। সিঁড়ি বেয়ে নামার চেষ্টা করছি। ৯ তলার আগ পর্যন্ত সম্ভব হল আর পারলাম না। চারদিকের ধোঁয়ার কুন্ডুলি পাকিয়ে উপরে উঠছে। আমার বুঝতে বাকি নেই, আমি উপরে উঠার চেষ্টা করছি শরীর আর চলে না। শুধু মন ঠিক মত নিজেকে সাহস যোগাচ্ছে বাঁচার উৎসাহে।

কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারলাম বড় কোন বিপদের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। আগুনের কি অবস্থা কিছুই বুঝতে পারছি না। তখন মনে হল আজ হতে পারে জীবনের শেষ দিন।

নিজেকে খুব ঠান্ডা ঠান্ডা মনে হচ্ছিল। খুব স্বাভাবিক ছিলাম। তখন মাথায় এল আমি যে ইন্টারভিউ দিতে আসছি সেটা তো কেউ জানে না।

তখন সেই পত্রিকা অফিসের মধ্যে ঢুকলাম। কেউ নেই। মোবাইলে নেটওয়ার্ক চলে গেছে। আমি ল্যান্ডফোন তুলে কাউকে ফোন করবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু ততক্ষণে ফোনের সংযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। মোবাইল ফোন এর নেটওয়ার্ক বেশ ডাউন, বেশ কিছুক্ষণ পর নেটওয়ার্ক পেলাম কোন রকমে। কাকে জানাব বিষয়টি? ছোটবেলার মাগুরার এক বন্ধুকে ফোন করলাম। প্রথমে তার সঙ্গে কুশল বিনিময় করলাম খুব সুন্দর সহজ ভঙ্গিতে। এবার বললাম বন্ধু তুমি কি একটু কাগজ কলম হাতে নিতে পারবে! সে বলল হ্যাঁ, আমি বললাম আমি যা বলব তুমি লিখবে। একটুও ঘাবড়াবে না কিন্তু…

সেই বন্ধুটি খুব যত্ন করে পুরো ঘটনা লিখতে শুরু করল। আমি প্রথমে অফিসের লোকেশন, আমার বর্তমান অবস্থান কোথাই, কেন এবং কী কারণে এখানে এসেছি সেটা বললাম। তারপর বললাম, আমার পরনে কী আছে, কী রংয়ের পোশাক ইত্যাদি ইত্যাদি বিষয় স্পষ্ট জানালাম।

শুধু বন্ধুটিকে বললাম, যদি আগুন থেকে জীবন নিয়ে না ফিরতে পারি, অন্তত আমার মৃত লাশ যেন পরিবার খুঁজে পেতে পারে এজন্যই তোকে এই বিষয়টি স্পষ্ট করে জানালাম।

আমার বন্ধু ফোনের ওপারে কাঁদছে। আমি কিছু বলছি না, তখন শুধু বেশ কিছু পরিবারিক এবং ব্যক্তিগত বিষয় তাকে বললাম। এরপর আবার ফোনের সংযোগ কেটে গেল নেটওয়ার্ক না থাকায়।

একা একটি রুমে আমি ২ ঘন্টা মত অবরুদ্ধ থাকলাম। এরপর ফায়ার সার্ভিসের লোক এসে বলল সাবধানে নেমে যেতে। সিড়িতে পানি আর পোড়া গন্ধ।

বনানীর ওইদিনের কথা আজ খুব মনে পড়ছে। টিভির পর্দায় দেখছিলাম। ৪/৫ বছর মত আগের কথা এইটা।

আজ ২৮ মার্চ রাত সাড়ে ১০টায় অভি ফোন করল। বলল, আমাদের মাগুরার এক বন্ধু তুষার বনানীতে আজ আগুনে পুড়ে মারা গেছে। এই তুষার হল যে বাঁ হাতি পেস বোলার ছিল। আমরা সবাই লেফটি তুষার বলে তাকে ডাকতাম। মাগুরা জেলা টিমের ক্রিকেটার ছিল। স্টেডিয়ামের অপর পাশে আদর্শ পাড়াতে থাকত ওরা। তুষারের বাবার চাকরির সুবাদে মাগুরা থাকত। দারুণ এক হাসিখুশি বিনয়ী ছেলে। সবার পরিচিত মুখ ছিল সে।

সবার নিহতদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। আহতের জন্য দোআ। লেফটি তুষারকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন জান্নাতে দান করুন। ওর মৃত দেহ এখন কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের মর্গে রয়েছে বলে বনি আমিন অভি জানাল।

শুধু মনে পড়ছে, এমন মৃত ঘটনার শিরোনাম তো আমিও হতে পারতাম।

হয়তো আপনাদের দোআ’তে আজ আমি..

লেখক: খান নয়ন, ম্যানেজার, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স

error20
fb-share-icon0
Tweet 10
fb-share-icon20


© All rights reserved 2020 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial
error: Content is protected !!