ক্ষমতায় অন্য কেউ থাকলে মহামারিতে ফায়দা লুটত

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একমাত্র আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাই মহামারির মধ্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে সরকার সহায়তা করেছে। ক্ষমতায় আওয়ামী লীগের সরকার না থাকলে অন্য যে কোনো শক্তি থাকলে মানুষকে সহায়তা না করে শুধু ফায়দা লুটার উপায় খুঁজত। ভবিষ্যতে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে রাষ্ট্র পরিচালনায় পরবর্তী প্রজন্মের জন্য দিকনির্দেশনা তৈরির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী।

বুধবার সকালে গণভবনে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম প্রেসিডিয়ামের সভায় সূচনা বক্তৃতায় শেখ হাসিনা আরো বলেন, ‘রাজনৈতিক দল হিসেবে একমাত্র আওয়ামী লীগেরই ইকোনমিক পলিসি আছে। সেটাকে মাথায় রেখেই কিন্তু আমরা কাজ করে যাচ্ছি। জাতির পিতার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ দেশের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। যেহেতু আমরা ক্ষমতায় আছি, তাই পরবর্তী প্রজন্ম শুধু বর্তমানেই নয়, বরং ভবিষ্যতেও কীভাবে দেশ পরিচালনা করবে এবং দেশকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে, তার উপায় বের করার দায়িত্বও আমাদেরই নিতে হবে। আর সে লক্ষ্যে আমাদের এখন থেকেই প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে।’

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বর্তমানে তার বয়স ৭৪ বছর উল্লেখ করে সবাইকে মনে করিয়ে দেন যে, ‘আমি আর কতদিন দেশ চালাব? আমার তো ৭৪ বছর বয়স, আর কতদিন! সেটাও মাথায় রাখতে হবে। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য দেশ পরিচালনা সম্পর্কিত একটা ফ্রেমওয়ার্ক, একটা ধারণাপত্র অথবা একটা দিকনির্দেশনা প্রস্তুত করতে হবে, যেন তারা পথ হারিয়ে না ফেলে। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকে।’

গতকাল সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত বৈঠক চলে। প্রধানমন্ত্রীর সূচনা বক্তব্যের পর তার সভাপতিত্বে নেতৃবৃন্দের রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়। সূত্র জানায়, তৃণমূলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল ও মজবুত করতে প্রেসিডিয়াম সদস্যদের প্রধান করে টিমওয়ারি সাংগঠনিক সফরে নামার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ লক্ষ্যে আট বিভাগের জন্য আটটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই সাংগঠনিক সফরের মাধ্যমে দীর্ঘদিন সম্মেলন না হওয়া মহানগর-জেলা-উপজেলাসহ সব স্তরের সম্মেলনের মাধ্যমে দলকে শক্তিশালী করে গড়ে তুলবে দলটি। সম্মেলন হওয়া যেসব মহানগর-জেলা-উপজেলা ও সহযোগী সংগঠনের পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি সেখানে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি এবং কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির তালিকা সম্পূর্ণ করা এবং ত্যাগী ও দুঃসময়ের নেতাদের মূল্যায়ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সূত্র আরো জানায়, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ উত্তর, দক্ষিণ এবং সহযোগী সংগঠনগুলোর জমা দেওয়া পূর্ণাঙ্গ কমিটিগুলো দ্রুত ঘোষণা করার জন্য দলের সাধারণ সম্পাদককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে ওবায়দুল কাদের শিগিগরই সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে তা ঘোষণা করবেন।

প্রসঙ্গত, আওয়ামী লীগের ৭৮টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে সম্মেলন হয়েছে ৩১টি। মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পরও ৪৭টি জেলায় সম্মেলন হয়নি। সম্মেলন হওয়া ১৭টি সাংগঠনিক জেলা নির্ধারিত সময়সীমা গত ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি কেন্দ্রে জমা দিতে পারেনি। তাদের আগামী সাত দিনের মধ্যে কমিটি জমা দিতে বলা হয়েছে।

চলমান বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের সেকেন্ড ওয়েভ তথা দ্বিতীয় পর্যায়ে সংক্রমণ বেড়ে গেলে দলীয়ভাবে করণীয় ও আগাম প্রস্তুতি নিয়ে বিশদ আলোচনা হয় বৈঠকে। পাশাপাশি আসন্ন পাঁচটি সংসদীয় আসনে উপনির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের বিজয়ের লক্ষ্যে সবাইকে কাজ করার নির্দেশনা দিয়ে নির্বাচন যাতে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হয় সেদিকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।

সূচনা বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘করোনা ভাইরাস ছাড়াও বন্যাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকার কাজ করে যাচ্ছে। রাজনৈতিক দল হিসেবে অন্যদের দেখেছি, কেবল লিপ সার্ভিস দিতে। মুখে মুখে কথা বলেছে, আশ্বাস দিয়েছে কিন্তু প্রকৃতভাবে মানুষের কাছে গিয়ে সাহায্য করার বিষয়টিতে অন্য দলগুলো বা এনজিওসহ কোনো সংস্থার উপস্থিতি সেভাবে দেখা যায়নি।’

তিনি বলেন, ‘করোনা ভাইরাসের পর থেকেই বিশ্বব্যাপী একটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি চলছে। তার পরও চেষ্টা করে যাচ্ছি, এই করোনাকে মোকাবিলা করে আমরা কীভাবে আমাদের দেশের অর্থনীতির গতিটা অব্যাহত রাখতে পারি। আমরা প্রত্যেকের জন্য বিশেষ প্রণোদনা দিয়েছি। এই প্রণোদনা আমাদের বাজেটের প্রায় ৪ শতাংশ।’

কোভিড-১৯ মহামারির মধ্যেও সরকার ৫ লাখ কোটি টাকার মতো বিশাল বাজেট দিয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘জানি না করোনার জন্য কতটুকু করতে পারব, যদি অবস্থা ভালো হয় আমরা সবটুকু অর্জন করতে পারব।’ এ সময় ডেল্টা প্ল্যান, প্রেক্ষিত পরিকল্পনা, এসডিজি বাস্তবায়নসহ দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ ও পরিকল্পনার কথা সভায় তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। সভায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আজীবন সংগ্রাম ও পঁচাত্তরের ১৫ই আগস্ট তাকে সপরিবারে হত্যার কথা তুলে ধরে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন শেখ হাসিনা।

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে সভায় করোনা ভাইরাসে প্রাণ হারানো দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম ও সাহারা খাতুনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। বৈঠকে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, প্রেসিডিয়াম সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, কাজী জাফর উল্লাহ, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, নুরুল ইসলাম নাহিদ, ড. আবদুর রাজ্জাক, লে. কর্নেল (অব.) মুহম্মদ ফারুক খান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করোনা ভাইরাসের সেকেন্ড ওয়েভ আঘাত হানতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ইউরোপের কোনে কোনো দেশে দ্বিতীয় দফায় সংক্রমণ শুরু হয়েছে? তাই এ ব্যাপারে নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকার পাশাপাশি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকারও নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। এদিকে বৈঠকে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী দলের ত্যাগী নেতাদের নতুন কমিটিতে জায়গা দেওয়ার নির্দেশনা দিয়ে বলেন, নতুন ও পুরোনোদের মিলিয়ে কমিটি দিতে হবে। যারা দলের জন্য সব সময় কাজ করেন, যারা ত্যাগী, তাদের কমিটিতে নিয়ে আসতে হবে।