রবিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২০, ০৮:০৯ পূর্বাহ্ন

আতঙ্কিত হবেন না
করোনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

‘খবরের ফেরিওয়ালা’ চম্পা

এভাবে সাইকেল নিয়ে প্রতিদিন বের হন খবরের ফেরিওয়ালা চম্পা

image_pdfimage_print

পবিত্র তালুকদার : জান্নাতুল সরকার চম্পা, হার না মানা জীবনের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছেন। পাবনার ৩১ বছর বয়সী এই নারী প্রতিদিন মানুষকে জানাচ্ছেন জানা-অজানার সংবাদ।

চম্পা সবার কাছে পরিচিতি পেয়েছেন খবরের ফেরিওয়ালা হিসেবে। জীবিকার তাগিদে পত্রিকা বিক্রি করতে তিনি মাইলের পর মাইল ছুটে চলেন বাইসাইকেলে।

গতিময় পথে অনেক মন্থর অভিব্যক্তিও দেখেছেন চম্পা। কিন্তু তিনি থামেননি। শত প্রতিকূলতা মাড়িয়ে লড়াই করছেন, এগিয়ে চলেছেন।

চাটমোহর পৌর সদরে পত্রিকা বিক্রি করেন চম্পা। মির্জা মার্কেটের এজেন্ট অজয় পালের কাছ থেকে পত্রিকা নিয়েই কাক ডাকা ভোরে দেন ছুট। প্রায় ২০/২৫ কিলোমিটার বাইসাইকেল চালিয়ে খবরের কাগজ বিক্রি করে জোগান পরিবারের অন্ন।

এ প্রতিবেদকের কাছে জান্নাতুল সরকার চম্পা তুলে ধরেছেন সংগ্রামী জীবনের নানা দিক। তিনি বলেন, ‘উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর থেকেই খবরের কাগজ বিক্রি করছি। চাকরি হয়নি, বয়সও চলে গেছে।’

‘সংসার চালাতে হবে। অভাবের কাছ হার মানতে রাজি নই আমি। তাই পত্রিকা বিক্রি করছি। এই কাজকেই এখন উপভোগ করছি’, বলে চলেন চম্পা।

উপজেলার পার্শ্বডাঙ্গা ইউনিয়নের মল্লিক বাইন গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য মৃত ইসাহাক আলী সরকারের দ্বিতীয় সন্তান চম্পা। ২০০০ সালে তিনি উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন।

এরপর ২০০২ সালে ঈশ্বরদী আলহাজ্ব টেক্সটাইল মিলে নিরাপত্তা বিভাগের হাবিলদার হিসেবে চাকরি নেন। ২০০৫ সালে উপজেলার ডিবিগ্রাম ইউনিয়নের কাঁটাখালী গ্রামের জনৈক যুবকের সঙ্গে তার বিয়ে হয়।

বেশ ভালোই চলছিল টোনাটুনির সংসার। বিয়ের পর হাবিলদারের চাকরি ছেড়ে দেন চম্পা, নেন একটি বীমা কোম্পানিতে চাকুরি। তবে বছর না ঘুরতেই স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয় চম্পার।

এরপরই জীবনের উল্টা পিঠ দেখতে শুরু করেন। চম্পা চলে আসেন বাবার বাড়ি। সেখানেও দিন এনে দিন পারের অবস্থা। ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে পরিবার ফের চম্পাকে বিয়ে দিতে চান।

কিন্তু এক জীবনে যাকে মন দিয়ে আঘাত পেয়েছেন, সেই মনের ভাগ আর কাউকে দিতে রাজি নন চম্পা। এরই মাঝে দুনিয়া থেকে বিদায় নেন বাবা। বিয়ের পর বড় বোন সংসার করছেন। জমাজমি নেই। যা ছিল বড় ভাই নিজ নামে লিখে নিয়ে মা ও ভোট ভাইয়ের প্রতি উদাসীন। মেজ ভাইও মনোযোগী নিজ সংসার নিয়ে।

মা ও ছোট ভাইয়ের দায়িত্ব আসে চম্পার কাঁধে। শুরু হয় জীবনের আসল লড়াই। বেছে নেন পত্রিকার হকারি।

কথা বলার সময় আপ্লুত চম্পা বলেন, ‘কোনো কাজকেই আমি ছোট করে দেখি না। প্রথম দিকে অনেকে কটূক্তি করতো, আমারও খারাপ লাগতো। কিন্তু এখন সব ঠিক হয়ে গেছে।’

তিনি বলেন, ‘জীবনে চলার পথে যে যাই বলুক, দিন শেষে জীবনটা আপনার। না খেয়ে থাকলেও কেউ খাবার দিত না। সুতরাং কারও কথায় কি যায় আসে।’

চম্পা বলেন, ‘কাজ নিয়ে আমি হীনমন্যতায় ভূগী না। মনোবল আছে, অন্যরকম জীবন যুদ্ধে আছি বলতে পারেন। ঘাম ঝরিয়ে রোজগার করে খাচ্ছি, পরিবারকে খাওয়াচ্ছি। কারও কাছে হাত পাতছি না, এতেই আমার প্রশান্তি।’

এরই মধ্যে চম্পা ২০১০ সালে ইউপি নির্বাচনে অংশ নেন। মাত্র ৭০ ভোটে হেরে যান। কিন্তু তিনি দমে যাননি, ২০১৬ সালে আবারও নির্বাচনে অংশ নেন। কিন্তু একই পরিণতি হয়।

চম্পার ভাষ্যে, ‘প্রথমবার হেরে যাওয়ায় অভাবে পড়ি। বাধ্য হয়ে একটি কোম্পানির স্থানীয় বিপণন কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেই। তবে দোকানে দোকানে গিয়ে সিগারেট বিক্রি করতে খারাপ লাগতো। তারপরও সংসারের কথা ভেবে চালিয়ে নিচ্ছিলাম।’

তিনি জানান, এরই মধ্যে ২০১১ সালের শেষের দিকে আমাকে সিরাজগঞ্জে বদলি করা হয়। তখন মা-ভাইয়ের কথা চিন্তা করে চাকরিটা ছেড়ে দেই। খবরের কাগজ বিক্রি শুরু করি। ছোট ভাই সুজনও সহায়তা করে।

চম্পা বলেন, ‘দৈনিক গড়ে ৩৫০ কপি পত্রিকা (জাতীয় ও স্থানীয় মিলে) বিক্রি হয়। মাসে আয় হয় প্রায় ১০/১১ হাজার টাকা। এতেই চলে যাচ্ছে তিনজনের সংসার। কারও কাছে হাত পাততে হয় না, বেশ আছি।

0
1
fb-share-icon1

Best WordPress themes


© All rights reserved 2020 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!