শনিবার, ১১ জুলাই ২০২০, ১২:১২ পূর্বাহ্ন

আতঙ্কিত হবেন না
করোনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

খাঁচাবন্দি কাশ্মীর

।। রণেশ মৈত্র।।

কাশ্মীর পরিস্থিতি আজ বিশ্ববাসীকে ভাবিত করে তুলেছে। পরিস্থিতি নিয়ে এই দুর্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে ভারতের বিজেপি নেতা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ মোদি কর্তৃক আকস্মিকভাবে একজন সামরিক শাসকের কায়দায় ৭০ বছরের একটি আইন বাতিল করে দেওয়ায়। ভারতের পার্লামেন্ট, লোকসভা এবং তার উচ্চকক্ষ উভয় ক্ষেত্রেই বিজেপি এখন যথেষ্ট সংখ্যক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে মন্ত্রিত্ব করছে। তাই সংবিধানের কোনো ধারা-উপধারা বাতিল বা অন্য যে কোনো ধরনের সংশোধনী ভারতের হালের ওই শাসকদের জন্য আদৌ কঠিন কিছু নয়। সেই সুযোটিই নিয়েছেন মোদি। প্রকাশ করেছেন তার আজন্ম লালিত উগ্র সাম্প্রদায়িকতা, যা মারাত্মকভাবে মুসলিম বিরোধিতারূপে নতুন করে আত্মপ্রকাশ করল কাশ্মীর সংক্রান্ত ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ এবং ৩৫-এ ধারা বাতিলের মধ্য দিয়ে। ওই দুটি ধারা অতীতের কংগ্রেস সরকার পণ্ডিত জওয়াহেরলাল নেহরু প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে আজ থেকে দীর্ঘ ৭০ বছর আগে কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা দিয়েছিলেন। এক কলমের খোঁচায় তা বাতিল করে দেওয়া হলো মাত্র সপ্তাহ দুয়েক আগে। ধারা দুটি বাতিলের ৩-৪ দিন আগে থেকেই কোনো প্রকার ঘোষণা না দিয়ে হাজার হাজার সৈন্য, ট্যাঙ্ক ও অপরাপর মারণাস্ত্রে সজ্জিত করে ছোট্ট ওই পাহাড়ি রাজ্যটিতে পাঠানো হয়; যেন ভারত সরকার কাশ্মীরবাসীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে কোনো আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক ঘোষণা না দিয়েই। বিশ্ববাসীর উদ্বেগের কারণ ওই মুহূর্ত থেকেই শুরু, যার সহসা নিরসনের কোনো সহজ-সংক্ষিপ্ত পথ দেখা যাচ্ছে না। ১৫ আগস্ট বাংলাদেশে জাতীয় শোক দিবস। ওই দিন ভারতের স্বাধীনতা দিবস। স্বাধীনতা দিবসে প্রতি বছরই অপরাপর দেশের মতো অনেক অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়ে থাকে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে। কিন্তু সব কর্মসূচির মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য হলো দিল্লির লালকেল্লায় সামরিক বাহিনীর কুচকাওয়াজে প্রধানমন্ত্রীর সালাম গ্রহণ ও ভাষণ। ওই ভাষণে প্রধানমন্ত্রী সাধারণত তার আমলের সাফল্য ও ভবিষ্যৎ কর্মসূচি সম্পর্কে আলোকপাত করে থাকেন। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আমাদের দেশের সংবাদপত্রগুলো এবারের ১৫ আগস্টে প্রদত্ত ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ বেশ গুরুত্ব সহকারে সংক্ষিপ্ত আকারে প্রকাশ করেছে। মোদি বলেছেন, ‘কাশ্মীরের অতীত গৌরব ফিরিয়ে আনা হবে। এটি তার সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতি।’ তিনি বলেছেন, দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার দশ সপ্তাহের অর্থাৎ মাত্র ৭০ দিনের মধ্যেই তিনি কাশ্মীরের ৭০ বছরব্যাপী বিরাজিত ‘সমস্যার’ সমাধান করেছেন। তার মতো কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার করে সমগ্র ভারতবাসীর এবং সব অঞ্চলের জন্য (কাশ্মীরসহ) সমানাধিকার পুনরুদ্ধার করেছেন।’

বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কলামিস্ট রণেশ মৈত্র

৯২ মিনিটব্যাপী প্রদত্ত দীর্ঘ ভাষণে প্রধানমন্ত্রী মোদি আরও দাবি করেন, ভারতশাসিত কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের সিদ্ধান্ত কাশ্মীরের অতীত গৌরব ফিরিয়ে আনবে। একই সঙ্গে ভারতের উন্নয়নে কাশ্মীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও প্রত্যয় ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। তিনি বলেন, ‘এক দেশ, এক জাতি এখন বাস্তব, এর জন্য গর্বিত ভারত।’ তিনি বলেন, জম্মু ও কাশ্মীর থেকে বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা প্রত্যাহার এবং তাকে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করার মধ্য দিয়ে সাবেক (চরম দক্ষিণপন্থি) কংগ্রেস নেতা সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেলের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া ভারতের সংবিধানের ৩৭০ ধারা কাশ্মীরে শুধু দুর্নীতিকেই অনুপ্রেরণা দিয়েছে।’ কিন্তু কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল পরবর্তী কাশ্মীরের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি বা কাশ্মীরবাসী ওই সিদ্ধান্তকে কতটা সমর্থন জানিয়েছে বা বিরোধিতা করেছে, এসব বিষয়ে নরেন্দ্র মোদি তার দীর্ঘ ভাষণে একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। তিনি তার ভাষণে ‘নতুন ভারত’ গড়ার কথা বলতে গিয়ে প্রথমবারের মতো বলেছেন, ‘জনসংখ্যা বৃদ্ধি’ নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন। পাশাপাশি যেসব দম্পতির দুই সন্তান রয়েছে, তারাই প্রকৃত দেশপ্রেমিক এবং সম্মানীয়।

কাশ্মীর থেকে ফিরে এসে ১৪ আগস্ট বুধবার দিল্লিতে সেই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের কর্মীরা। পাঁচ দিনের সফর শেষে সেখানকার পরিস্থিতি নিয়ে তারা যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন তার নাম দেওয়া হয়েছে ‘কাশ্মীর খাঁচাবন্দি’। তারা কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগরসহ অঞ্চলটির নানা প্রান্ত ঘুরে, সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে এমন সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, ৩৭০ ধারা বিলোপ করার ক্ষেত্রে যেভাবে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে, তা নিয়ে একটা ব্যাপক ক্ষোভ রয়েছে কাশ্মীরিদের মধ্যে। কিন্তু সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ করার কোনো সুযোগ নেই। ওই দলের সদস্য অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রঁজ বলেছেন, ‘শ্রীনগর হোক বা তার বাইরে কোনো স্থান- মানুষ সব জায়গাতেই ক্ষুব্ধ। তারা বলেছেন, যেন একটি জেলখানায় তাদের রেখে দেওয়া হয়েছে। খুব বেশি প্রতিবাদ করতে পারছেন না মানুষ। সরকার নিষেধাজ্ঞা একটু শিথিল করলেই মানুষ প্রতিবাদ জানাতে বেরিয়ে পড়ছেন, তৎক্ষণাৎ আবার নিষেধাজ্ঞা বলবৎ করা হচ্ছে। আর সৌরার মতো যেখানেই কিছুটা প্রতিবাদ হয়েছে, সেখানেই ছররা গুলি চালাচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে ছররা গুলিতে আহত বেশ কয়েকজনকে চিকিৎসারত অবস্থায় তারা দেখেছেন বলে জানান জঁ দ্রঁজ। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রায় ৬০০ রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে আটকে রাখা হয়েছে। এ ছাড়াও শহরে বা গ্রামে যেখানেই তারা গেছেন, সেখানেই দেখেছেন তরুণ বা যুবক- এমনকি স্কুল শিক্ষার্থীদেরও আটকে রাখা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বাহিনী মাঝরাতেও বাড়িতে ঢুকে তল্লাশি চালিয়ে আটক করছে। এক বৃদ্ধকে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই রাস্তায় যেতে দিতে নিরাপত্তা বাহিনীকে অনুরোধ করায় তার দিকে ছররা গুলি ছোড়া হয়েছে। প্রতিনিধি দলটির অপর সদস্য সারা ভারত মহিলা সমিতির নেত্রী মইসুনা মোল্লা জানান, ‘মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর সর্বোচ্চ ও দ্বিতীয় পর্যায়ের নেতাদের তো আটক করা হয়েছে। কিন্তু প্রায় প্রতিটি গ্রাম থেকেই অনেককে আটক করা হয়েছে। প্রতিবাদ বা বিক্ষোভ সংঘটিত করার দক্ষতা আছে, এমন ব্যক্তিদেরই আটক করা হয়েছে। কত মানুষ যে কারাগারে আছেন, তা কেউ জানেন না।

এদিকে অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রঁজ আরও জানান, ‘সেখানে সংবাদমাধ্যমের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। কাশ্মীরি সংবাদমাধ্যম তো কোনো কাজই করতে পারছে না। ইন্টারনেট বন্ধ, রাস্তায় যানবাহনও তেমন চলাচল করছে না, কারফিউ প্রভৃতি নিষেধাজ্ঞার ফলে তাদের খবর সংগ্রহ করারও কোনো উপায় নেই। দুটি-একটি খবরের কাগজ হয়তো কোনোভাবে বেরোচ্ছে। কখনও দু’পাতা, কখনও চার পাতার কাগজ হয়তো কোনোভাবে বেরোচ্ছে। তাও আবার সেই কাগজ বিক্রি করার কোনো সুযোগ বিশেষ নেই। তাদের (সংবাদপত্র বিক্রেতাদের) ওপরও খবরদারি চলছে। আর ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের হাতেগোনা কয়েকজন সাংবাদিক আছেন, যারা সত্যিকারের চিত্রটা তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। তবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো অনেকটা প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে পারছে বলে মন্তব্য করেন দ্রঁজ। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বেশিরভাগ ভারতীয় সাংবাদিকই শ্রীনগরের যে অংশ থেকে কাজ চালাচ্ছেন, সেখানে মাঝেমধ্যে যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে না, তা নয়। কিন্তু সেটাকেই কাশ্মীরের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়ে আসছে বলে যে সংবাদ পরিবেশন করা হচ্ছে, তা বহুলাংশে অসত্য।

কাশ্মীরের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি বাংলাদেশের মানুষও তা জানতে পারছে না। রয়টার্স বা এএফপি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও খবর সংগ্রহ এবং পরিবেশন করতে পারছে না। ভারতের বর্তমান ‘গণতান্ত্রিক’ সরকারের অসাধারণ গণতান্ত্রিক আচরণের জন্যই যে তা সম্ভব হচ্ছে না, তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু এই কঠোরতা যে একদিন ওই ‘গণতান্ত্রিক’ সরকারের গলার কাঁটা হিসেবে দেখা দেবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বিস্ম্ফোরণ যেদিন ঘটবে কোনো নিষেধাজ্ঞা দিয়েই তা আর থামানো সম্ভব হবে না। মাঝখান থেকে বিজেপি সরকারের এহেন কার্যকলাপ কাশ্মীর, পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশসহ উপমহাদেশজুড়ে যে এক সাম্প্রদায়িক আবহ রচনা করেছে, তাও সব দেশের গণতন্ত্রের জন্যই বিপজ্জনক হতে পারে। সর্বত্র উগ্র জঙ্গিবাদের উত্থানের আশঙ্কাও পুরোপুরি বাতিল করা যায় না।

প্রবীণ রাজনীতিক, একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক
[email protected] 

error20
fb-share-icon0
Tweet 10
fb-share-icon20


© All rights reserved 2020 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial
error: Content is protected !!