খাতুনে জান্নাত হজরত ফাতেমাতুজ জোহরা (রা.)

।। এবাদত আলী ।।  বিশ্বের বিস্ময় সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব, রাহমাতুল্লিল আলামিন, মহান আল্লাহ পাকের প্রিয় নবী, বিশ্ব নবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) এরশাদ করেন, “ বেহেস্তের নারীদের মধ্যে চারজন হবে সর্বশ্রেষ্ঠ। মোজাহামের কন্যা আছিয়া, ইমরানের কন্যা মরিয়ম, খুয়াইলিদের কন্যা খাদিজা এবং মুহাম্মদের কন্যা ফাতেমা।

হজরত মোহাম্মদ (সা.) আরো বলেন,“ বেহেস্তের নারীদের নেতৃত্ব দান করবে আমার কন্যা ফাতেমা এবং বেহেস্তে পুরুষদের নেতা হবে তার পুত্রদ্বয় হাসান ও হুসাইন।”

খাতুনে জান্নাত ফাতেমা (রা.) ছিলেন দুনিয়ার সর্বশেষ্ঠ মহিয়সী। তাঁর সমতুল্য কোন নারী আজ পর্যন্ত এই দুনয়িাতে আগমণ করেননি। পূণ্যময় জীবনের অধিকারি এই মহিয়সী হজরত মোহাম্মদ (সা.) এর নবুয়ত লাভের পঞ্চম বছর ৬১৫ খ্রিষ্টাব্দের ২০ জমাদিউস সানি শুক্রবার ভোরে হজরত খাদিজাতুল কোবরা (রা.)এর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন।

হজরত মোহাম্মদ (সা.) এর কন্যা গণের মধ্যে ফাতেমা ছিলেন সকলের ছোট এবং শিক্ষা-দীক্ষা ও রূপে-গুণে সর্বদিকেই শ্রেষ্ঠ। ফাতেমার মত রূপবতি মেয়ে তৎকালিন আর দিত্বীয় কেই ছিলোনা।তাঁর মুখাকৃতি ছিল অবিকল হজরত মোহাম্মদ (সা.) এর মতো। ফাতেমার রূপ সম্মন্ধে হজরত মোহাম্মদ (সা.) বলেন, দুজন রমনীকে আল্লাহ তায়ালা সমগ্র পৃথিবীর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ রূপসি করে সৃষ্টি করেছেন, তাদের মত রূপসি আর কেউ জন্মগ্রহণ করে নি এবং আর করবেনা।

তার মধ্যে একজন মানব জাতির আদি মাতা হাওয়া (আ.) এবং আমার কন্যা ফাতেমা।” হজরত ফাতেমা (রা.) বাল্যকাল হতেই পিতার আদর্শে গড়ে উঠেছিলেন।

রাসুলে পাক (সা.) এর প্রতিটি গুণাবলী তাঁর চরিত্রে পরিলক্ষিত হতো। ফাতেমা ছিলেন, লাজুক, নম্র, বিনয়ী, সদালাপি ও তাপসি। হজরত ফাতেমা কোন বিদ্যালয়ে শিক্ষা লাভ করেন নি বটে কিন্তু দুনিয়ার যে কোন উচ্চ শিক্ষিত নর-নারী তাঁর অমূল্য শিক্ষার কাছে মাথা নত করতে বাধ্য।

এই অমূল্য শিক্ষা তিনি লাভ করেছিলেন তাঁর পিতা বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ মহা মানব বিশ্ব নবী হজরত মোহাম্মদ (.) ও পরম বিদুষী মাতা হজরত খাদিজা (রা.) এর নিকট থেকে।

একদা রাসুল (সা.) তাঁর সাহাবীগণকে বলেন,“ যে পর্যন্ত তোমরা আমাকে তোমাদের পিতা-মাতা, ভাই-বোন, সন্তান-সন্ততি, আপনজন ও ধন সম্পদ ইত্যাদি অপেক্ষা বেশি ভালো বাসতে না পারবে সেই পর্যন্ত তোমরা প্রকৃত মুমিন হতে পারবেনা।” রাসুলুল্লাহ (সা.) এর বাণী হজরত ফাতেমার কানে পৌছালে তাঁর অন্তরে এই বাণী এতই রেখাপাত করেছিলো যে, সেদিন হতেই তিনি রাসুল (সা.) কে পিতা হিসেবে ভালো বাসতেনই অপর দিকে পূর্ণ মুমিন হওয়ার আশায় আল্লাহর নবী হিসেবে তাঁকে আরো অধিক ভালো বাসতেন এবং শ্রদ্ধা ও খেদমত করতেন।

হজরত মোহাম্মদ (সা.) ফাতেমাকে এতই স্নেহ করতেন যে, একদিন সাহাবাগণকে কথাপ্রসঙ্গে বলেন, ফাতেমা আমারই দেহের অংশ, যে তাকে কষ্ট প্রদান করবে সে যেন আমাকেই কষ্ট প্রদান করলো।আর যে তাকে সন্তুষ্ট করবে সে যেন আমাকেই সন্তুুষ্ট করলো।

হিজরি তৃতীয় সনের শাওয়াল মাসে হজরত ফাতেমা (রা.) কে হজরত আলী (রা.) এর সঙ্গে বিবাহ দেওয়া হয়। বিয়ের পর স্বামী গৃহে যাবার পর হতেই তাঁর জীবন দুঃখ-কষ্টের আষ্টে-পৃষ্ঠে বাধাপড়ে যায়। অভাবের সংসারে যাঁতা ঘুরিয়ে গম পিঁষে আটা তৈরি করে রুটি তৈরি করেন। সকলকে খাওয়ানোর পর যা কিছু অবশিষ্ট থাকে তাই তিনি নিজে খান।

যেদিন কিছুই অবশিষ্ট থাকেনা সেদিন তিনি এক গ্লাস পানি পান করে দিন অতিবাহিত করেন। এই সব কথা তিনি শাশুড়ি বা স্বামীকে জানতে বা বুঝতে দিতেননা। সংসারের যাবতিয় কাজ তিনি নিজ হাতে করতেন, বৃদ্ধা শাশুড়ি স্বেচ্ছায় কোন কাজ আরম্ভ করলে তাঁকে সে কাজ হতে বিরত রাখতেন এবং সর্বদাই শাশুড়ির খেদমত করতেন।

দেবর জাফরকে তিনি ছোট ভাইয়ের মতই স্নেহ করতেন, এইজন্য তাঁর শাশুড়ি ও দেবর উভয়েই তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন। তাঁর সংসারে এমন অভাব লেগে ছিলো যে কোন কোন সময় হজরত ফাতেমাকে একাদিক্রমে দু তিন দিন অনাহারে কাটাতে হতো। তবু সেজন্য তাঁর মনে কোন দুঃখ বা অভিযোগ ছিলোনা। শত দুঃখ কষ্টের মধ্যেও সর্বদা হাসি যেন তাঁর মুখে লেগেই থাকতো। কি অসিম ধৈর্য, অগাধ ভক্তি ও বিশ্বাস ছিলো মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের উপরে।

একদিন ফাতেমা (রা.) এর কঠিন অসুখের সংবাদ পেয়ে রাসুলে পাক (সা.) জনৈক সাহাবীকে সঙ্গে নিয়ে তাঁকে দেখতে গেলেন। হজরত ফাতেমা তখন ঘরের মধ্যে শুয়ে ছিলেন, হজরত আলী (রা.) বাড়িতে ছিলেন না। রাসুলুল্লাহ (.) বাড়ির বাইরে থেকে হজরত ফাতেমাকে সম্বোধন করে বলেন, মা! তোমার অসুখের সংবাদ পেয়ে তোমাকে দেখতে এসেছি, আমার সঙ্গে জনৈক সাহাবী রয়েছে, আমি ঘরের ভিতরে আসতে পারি কি? হজরত ফাতেমা উত্তরে বলেন, আব্বাজান! আমার পরিধানে মাত্রএকটি বস্ত্র আছে, কাজেই আপনি ঘরের ভিতরে আসবেননা।

রাসুল (সা.)বলেন, তুমি উহা দ্বারাই সর্বাঙ্গ আবৃত করে নাও। হজরত ফাতেমা উত্তরে বলেন, না আব্বাজান“ বস্ত্রটা এতই খাটো যে, তা দ্বারা সর্বাঙ্গ আবৃত করা সম্ভব নয়। এরপর রাসুল (সা.) তাঁর নিজের চাদরখানা ঘরের জানালা দিয়ে ভিতরে দিয়ে বলেন, মা! এর দ্বারা তোমার আবৃত করে নাও। হজরত ফাতেমা উক্ত চাদর দ্বারা শরীর আবৃত করে নিলেন।

হজরত মোহাম্মদ (সা.) এর আদরের দুলালি হজরত ফাতেমা (রা.) শত দুঃখ-কষ্টের মধ্যে নিাতিপাত করলেও কোন দিন পিতার নিকট কোন অভিযোগ করেন নি। হজরত ফাতেমা (রা.) এর দুই পুত্র হজরত ইমাম হাসান (রা.) এবং হজরত হুসাইন (রা.) মায়ের দুঃখ ও সংসারের অভাব অনটন হাসি মুখে মেনে নিতেন।

হজরত মোহাম্মদ (সা.) এর ওফাতের মূহুর্তে হজরত ফাতেমা (রা.) তাঁর নিকট ছিলেন। ওফাতের পূর্ব মূহুর্তে হজরত ফাতেমা (রা.) এর মুখের নিকট কান পাতলে তিনি বলেন, কন্যা আমি আজ দুনিয়া ত্যাগ করছি।

শোনার সঙ্গে সঙ্গে হজরত ফাতেমা কেঁদে উঠলেন। হজরত মোহাম্মদ (সা.) পুনরায় বলেন, আমার আহলে বাইয়াতের মধ্যে সর্ব প্রথম তুমিই আমার সঙ্গে এসে মিলিত হবে। এই কথা শোনামাত্র তিনি হেঁসে উঠলেন।

হজরত মোহাম্মদ (সা.) এর ওফাতের পর মাত্র ছয় মাস তিনি জীবিত ছিলেন। এই সময়ের মধ্যে কেউ কোনদিন তার মুখে কোন হাসি দেখেনি। হিজরি একাদশ সনের ৩ রমজান তারিখে হজরত ফামোতুজ জোহরা (রা.) ইন্তেকাল করেন।

তাঁর অছিয়ত অনুসারে তাঁর ইন্তেকালের পর কাউকে কোন সংবাদ না দিয়ে অতি সামান্য লোকের উপস্থিতিতে জানাজা সমাধা করে রাতেই তাঁকে দাফন করা হয়। (লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)।