গুজবের ডালপালা

।। এবাদত আলী।।

সামাজিক বিজ্ঞানের ভাষায়, গুজব হলো এমন কোন বিবৃতি যার সত্যতা অল্প সময়ের মধ্যে অথবা কখনই নিশ্চিত করা সম্ভব হয়না। অনেকের দৃষ্টিভঙ্গিতে গুজব হলো প্রচারনার একটি উপসেট মাত্র। আঙ্গুর গাছের লতায় পাতায় কোনটা আগা আর কোনটা গোড়া যেমন খুঁজে পাওয়া যায়না তেমনি গুজবেরও কোন সঠিক ঠিকানা পাওয়া যায়না।

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে,পৃথিবীতে প্রত্যেক সমাজে কিছু সুবিধাভোগি ব্যক্তি আছে। যারা মিথ্যা বিভ্রান্তিকর, কাল্পনিক ও বানোয়াট কথা রটনা করে শান্ত পরিবেশকে অশান্ত করে আনন্দ লাভ করে থাকে। সমাজের লাভক্ষতি তাদের কাচ্ছে তুচ্ছ। এধরনের গুজব ছড়িয়ে তারা আত্মতৃপ্তি লাভ করে। বাংলাদেশেও একটি মহল সুযোগ পেলেই গুজব রটনা করে থাকে। গ্রামাঞ্চলে একটি প্রবাদ আছে যে, ‘চিল কান নিয়ে গেল, কানে হাত দিয়ে না দেখে চিলের পেছনে দৌড়ানো।’ গুজব যেন ঠিক তেমনি। মিথ্যা ও কাল্পনিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রচারিত বিষয়কে সত্য বলে বিশ্বাস করে তা অপরের নিকট প্রচার করাই যেন সেই সকল ব্যক্তিদের কাজ। গুজব আলোক লতা বা স্বর্ণলতার মত। অন্য গাছের ওপর ভর করে বেড়ে ওঠে তার ডাল-পালার বিস্তার ঘটায়।

বালক বেলায় এমনি এক গুজবের পাল্লায় পড়েছিলাম বলতে হয়। যার কিয়দাংশ এখানে উল্লেখ করা হলো। ষাটের দশকের প্রথম দিকের কথা। সবেমাত্র হাইস্কুলে ভর্তি হয়েছি। হঠাৎ করে চারদিকে রব উঠলো দেশে হায়েনা এসেছে। হায়েনা মানুষ ধরে খায়। কিন্তু কোথায় হায়েনা। কে দেখেছে হায়না। এর কোন সঠিক তথ্য পাওয়া যায়না। হায়েনা প্রাণীটি দেখতে কেমন তাও কেউ বলতে পারেনা। অথচ হায়েনার ভয়ে সবাই যেন জড়সড়।

প্রকৃত পক্ষে হায়েনা হলো আফ্রিকা মহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল, তুরস্ক, ইরান ও ভারতীয় উপমহাদেশে বিচরনকারি একটি প্রাণী। হায়েনা মাংসাশী, শিকার করে খায়। অনেকের মতে এটি নিশাচর। হায়েনা খুব সাহসি প্রাণী। এদের চোয়াল ও থাবা খুব শক্তিশালি। দাঁত ধারালো। শিকারে পটু। হায়েনার শরীর বিশ্রি গন্ধময়। রাতের বেলা এটি প্রায় পাগলের মত চিৎকার ও চেচামেচি করে যা শুনে অনেকেই ভয় পায়। কিন্তু তখনকার চারদিকে নদী বেষ্টিত পুর্ব-পাকিস্তানে হায়েনা আসবে কি করে এসব বাচবিচার কেউ করেনি। এখন যেমন ডিসকভারি এবং চিড়িয়াখানার বদৌলতে হায়েনার দেখা মেলে তখন তেমন কোন সুযোগ ছিলোনা। অথচ সেই আজব জন্তু হায়েনার ভয়ে লোকজন সকল সময় ভীত সন্ত্রস্ত থাকতো। স্কুলের ছেলে মেয়েদের স্কুলে যাতায়াত বন্ধ।

গ্রামাঞ্চলের হাট-বাজার, রাস্তা-ঘাট প্রায় জনশুন্য। সন্ধ্যা হতে না হতেই প্রায় সকলেই ঘরে দোর দিয়ে বসে। হায়েনা যে কি চিজ তা দেখার মত লোক পাওয়া যায়না। অথচ সেই হায়েনার ভয়ে রাতে ঘরের বারান্দায় বসে পেসাব করার মত বীর পুরুষ অনেককেই দেখা যায়।

এবাদত আলী

দিন যতই যায় হায়েনার ভয় ততই বেশি হতে থাকে। হায়েনার নাম করে শৃগাল ও বনবিড়ালগুলো রাতের বেলা মনের আনন্দে গৃহে পোষা মোরগ-মুরগি খাওয়া শুরু করে দেয়। যদি মোরগ-মুরগি পাখা ঝাপটায় বা চিৎকার করে তাহলে সকলেরই বিশ্বাস হায়েনা এসেছে। আবার ঘুমের ঘোরে স্বামীর হাত যদি স্ত্রীর গায়ে পড়ে তো হায়েনা হায়েনা করে চেঁচিয়ে পাড়াশুদ্ধ লোককে আতঙ্কের চরম শিখরে তুলে দেয়। এমনি অবস্থায় দিনাতিপাত করতে করতে একসময় সেই হায়েনা গুজবের ভয় আপনা আপনিই কেটে যায়।

২০০০ সালের কথা। এবার রীতিমত গুজব উঠলো এবছর ৫ মে তারিখে এই পৃথিবী ধংস হয়ে যাবে। অর্থাৎ কিনা রোজ কিয়ামত হবে। জ্যোতিষীগণ গণনা করে দেখেছেন এই তারিখে দুনিয়া ধংস হবে। সারা দেশময় এমন গুজব ছড়িয়ে তার ডাল পালা এমনি বিস্তৃতি লাভ করে যে, অনেক লোকজন মৃত্যুভয়ে গোসল- খানা-পিনা সব বন্ধ করে দেয়। শুধু বাংলাদেশ নয় সমগ্র ভারত জুড়ে একই অবস্থা বিরাজ করতে থাকে। দিন যতই গড়ায় মরনভয় যেন ততই তাড়া করে ফেরে।

ধর্ম ভিরু মুসলমানদের মধ্যে দুর্বল ইমানদারের অনেকেই তা বিশ্বাস করে বসে। কারন ৫ মে দিনটি শুক্রবার, জু’মার নামাজের দিন। জ্যোতিষীদের ভাষ্যমতে এদিন বেলা দ্বিপ্রহরের পর পৃথিবী ধংস হবে। ইসলাম ধর্মীয় মতে মহররম মাসের ১০ তারিখ শুক্রবার দুনিয়া ফানা হবে অর্থাৎ ধংস হবে।

হজরত ইসরাফিল আলাইহেস সালাম মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের আদেশে তার হাতের শিঙ্গা ফুতকার করবেন এবং সঙ্গে সঙ্গে কিয়ামত শুরু হবে। মহররম মাসের ১০ তারিখ না হলেও সেদিন জ’ুমা বার হওয়ায় অনেকের মনেই ঘুণ বসে যে, দুনিয়া ফানা হলেও হতে পারে। সচেতন ও সাহসি ব্যক্তিরা একে নিছক গুজব বলে মনে করলেও অনেকে এ গুজবে দুর্বল হয়ে পড়ে। এদিন আমাদের মহল্লার বাজার মসজিদের মুয়াজ্জিন জু’মার নামাজের জন্য দুপুর সাড়ে বারোটার পরিবর্তে ভুল বশতঃ সকাল সাড়ে ১১ টায় আজান দিয়ে বসেন। এতে আশেপাশের মানুষের মধ্যে হৈচৈ পড়ে যায়। মুয়াজ্জিন ভুল স্বিকার করে পুণরায় সঠিক সময়ে আজান দেন। এদিকে খবর ছড়িয়ে পড়ে পাশের গ্রামের এক স্কুল শিক্ষক মৃত্যুবরণ করেছেন। আসলে তিনি হার্ট এটাকে মারা যান।

২০১৩ সালের মে মাসের ৫ তারিখে বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা ভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম লংমার্চ এবং ঢাকা অবরোধের কর্মসুচি দিয়ে ঢাকা অবরোধে শাপলা চত্বরে অবস্থান নেয়। দুপুর দেড়টার দিকে ঢাকার প্রবেশ পথ গুলো থেকে হেফাজতে ইসলামের নেতা কর্মিরা অবস্থান নেয় শাপলা চত্বরে। কিন্তু অন্যদিকে হেফাজতে ইসলামের কর্মিরা মতিঝিল, পল্টন, জিরো পয়েন্ট, গুলিস্তান ও দৈনিক বাংলার মোড়ও আশোপাশের এলাকায়বহু প্রতিষ্ঠানে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে।

বায়তুল মোকাররম মার্কেট ও তার আশেপাশে প্রায় ৩০০ টি দোকান ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। তাতে ১৮ কোটি টাকার ক্ষতি হয় বলে অভিযোগ করা হয়। ৬ মে রাতে তাদেরকে সরিয়ে দিতে পুলিশ স্টান্ট গ্রেনেড, জল কামান, কাঁদানে গ্যাসের শেল ও রাবার বুলেট ব্যবহার করে। এতে প্রাং ৩০ জন নিহত হয়। ব্রিটিশ দৈনিক টেলিগ্রাফের খবরে বলা হয়, ঢাকায় ইসলামি মৌলবাদিদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষে কমপক্ষে ২২জন নিহত হয়। শুরু হয় গুজবের ডালপালা বিস্তারের পালা।

হেফাজতের দাবি রাতের আঁধারে বর্বর হত্যা কান্ডে ৩ হাজার আলেম উলামা শাহাদৎ বরণ করেছেন। মিডিয়া কর্মিদের উদ্ধৃতি দিয়ে ১৫ মে দৈনিক সংগ্রামের সম্পাদকীয়তে বলা হয় ২ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। অথচ এই অভিযানে নেতৃত্বে থাকা অন্যতম একজন পুলিশ কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেনের মতে ট্রাকের উপর ভ্রাম্যমান মঞ্চ খালি হবার পর সেই মঞ্চের পাশে একটি ভ্যানের উপর কাফনের কাপড় এবং পলিথিন দিয়ে মোড়ানো ৪টি মৃতদেহ ছিলো। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৫ ও ৬ মে দুদিনে সারা দেশে ২৮ জনের নিহত হওয়ার কথা বলেছিলো। যাহোক সেসময় হেফাজতের নেতা-কর্মির মৃত্যু নিয়ে গুজবের অবসান হয়েছিলো। অর্থাৎ সেসময়কার গুজবের ডালপালা ততটা বিস্তৃতি লাভ করতে পারেনি।

সাঈদীকে চাঁদে দেখার গুজব ছড়িয়ে জামাতিরা ফায়দা হাসিল করতে ব্যর্থ হয়েছিলো ২০১৩ সালের ৩ মার্চ তারিখে। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন সময়ে রাজাকার বাহিনীর সদস্য হিসেবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত থেকে দেলোয়ার হোসেন সাঈদী ওরফে দেইল্যা রাজাকারের বিরুদ্ধে হত্যা, অপহরণ, নির্যাতন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুন্ঠন, ধর্মান্তর করাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের ৮টি অভিযোগ সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার আদেশ দেওয়া হয়।

আর তাতেই জামাতিরা একটি পরিকল্পনা তৈরি করে গুজব ছড়ায়। আগের মধ্যরাতের পর হতে শুরু হয় পরিকল্পিত অভিযান। গভীর রাতে বগুড়া শহর ও শহরতলি এলাকা ছাড়িয়ে আশেপাশের এলাকায় গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয় যুদ্ধ অপরাধের বিচারে সাজাপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীকে চাঁদে দেখা গেছে। এই গুজব সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। জামাতিদের তান্ডব শুরু হয়। ঐদিন জেলা জুড়ে এই সকল ঘটনায় ১৩ জন নিহত হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে ৬৬টি মামলা দায়ের করা হয়।

২০১৫ সালে আবার গুজব রটে যে, ২২ সেপ্টেম্বর থেকে ২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পৃথিবী ধংস হবে। গুজব রটনাকারিদের যুক্তি হলো মোক্ষম সময়টা ২৮ সেপ্টেম্বর। কেননা সেদিন পৃথিবীর আকাশে ব্লাডমুনের দেখা মিলবে। সেবার নাসার বিজ্ঞানীরা সে গুজবকে মিথ্যা প্রমাণ করেছিলো।

অতি সম্প্রতি যে গুজব ছড়ানো হয়েছে তা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। মার্ক জাকারবার্গ এর বদৌলতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘মুখ বই’ বা ফেস বুক এর মাথ্যমে এই গুজবের শাখা-প্রশাখা অতি দ্রুততম সময়ে সমগ্র দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়ে। তা হলো পদ্মা সেতুতে নর মুন্ডু বা মানুষের মাথা লাগবে।

বাংলাদেশে বর্তমানে ৬ কোটি ফেসবুক চালু আছে। আর এই ফেস বুকের ভিডিওর মাধ্যমে যে গুজব ছড়ানো হয়েছে তা একেবারে তরতাজা। যাকে বলে গরম খবর।কথায় বলে কু সংবাদ বাতাসের আগে ধায়। ফলে ছেলে ধরা আতঙ্কে অনেক অভিভাবকই আতঙ্কিত। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলেছেন, এটা নিছক গুজব। এখন পর্যন্ত এধরনের কোন ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।

এধরনের গুজবের শিকার হয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে অপহরণকারি ধারণা করে অনেক মানসিক ভারসাম্যহীনকে মারধর করে পুলিশে হস্তান্তর করার ঘটনা ঘটেছে। পরে এ ঘটনাকে গুজব ও ভিত্তিহীন উল্লেখ করে ০৯ জুলাই,২০১৯ তারিখে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয় হতে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে , “পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজ পরিচালনায় মানুষের মাথা লাগবে বলে একটি কুচক্রি মহল বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে অপ প্রচার চালাচ্ছে তা প্রকল্প কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে।

আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই এটি একটি গুজব। এর কোন সত্যতা নেই। এমন অপ প্রচার আইনত দন্ডনীয় অপরাধ।এ ধরনের গুজবে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য দেশবাসীকে অনুরোধ করা যাচ্ছে।

বর্ণিত বিষয়টি গুজব হিসেবে চিহ্নিত করে দেশবাসীকে অবহিত করতে গণমাধ্যমে প্রচারের প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থা গ্রহনের অনুরোধ জানচ্ছি।”

এ ক্ষেত্রে এ কথা বলা যায় যে, বাংলাদেশে একটি মহল অনেক দিন ধরেই বিভিন্ন ধরনের গুজব ছড়িয়ে সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছে। বাংলাদেশের অব্যাহতবহুমুখি উন্নয়ন ধারাকে বাধাগ্রস্থ করতে মহলটি বেশ তৎপর। কিন্তু এদেশের সচেতন মানুষ তাদের হীন চক্রান্ত সম্পর্কে সজাগ ও সচেতন। অপর দিকে দেশের আইন শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীও এ ধরনের গুজবকে প্রতিহত করার জন্য বেশ তৎপর।

ইতোমধ্যে গুজব রটনাকারি হিসেবে চিহ্নিত করে কয়েকজনকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তাই এধরনের গুজবের ডাল পালা যাতে বিস্তৃতি লাভ করতে না পারে সেজন্য সকল নাগরিককে সজাগ থাকতে হবে ।

(লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)