শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২০, ০২:০০ পূর্বাহ্ন

আতঙ্কিত হবেন না
করোনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

চলনবিল অঞ্চলে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে নৌকা স্কুল

চলনবিল অঞ্চলে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে নৌকা স্কুল

image_pdfimage_print

আরিফ আহমেদ সিদ্দিকী, পাবনা : পাবনার চাটমোহরসহ বৃহত্তর চলনবিল অঞ্চলের অসহায়, সুবিধাবঞ্চিত শিশু ও যুবকদের মাঝে নৌকা স্কুল শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে।

ইতোমধ্যে নৌকা স্কুল চলনবিল অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাড়া জাগিয়েছে। এমনকি বিশ্বের পরিবেশবিদদের দৃষ্টি কেড়েছে। নৌকা স্কুলে শুধু পাঠদানই নয়, পাঠাগার ও ইন্টারনেট সুবিধাও রয়েছে।

শিশু শিক্ষার্থীরা শিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি ডিজিটাল প্রযুক্তি সম্পর্কেও জানতে ও শিখতে পারছে।

বিল বা নদীবেষ্টিত চলনবিল এলাকার শিক্ষার্থীদের এখন সরকারি স্কুলে যেতে হয় না। নৌকা স্কুলই তাদের কাছে চলে আসে।

বিশেষ ধরনের নৌকায় বিদ্যালয় ছাড়াও পাঠাগার, ইন্টারনেট ক্যাফে, এমনকি বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য বিশেষ সোলার প্যানেল রয়েছে।

নাটোর জেলার গুরুদাসপুর, সিংড়া ও পাবনা জেলার চাটমোহর উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকায় বিশেষত সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে নৌকা স্কুল এখন অত্যন্ত সুপরিচিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম।

আত্রাই, নন্দনকুঞ্জা, গুমানি, করতোয়া ও বড়াল নদীর ৫০টি ঘাটে লাগানো নৌকা স্কুল এখন চলনবিলের নিম্নবিত্ত ও দরিদ্র মানুষের সন্তানদের শিক্ষা কার্যক্রমে আধুনিক পাঠদানে পরিবর্তনের হাওয়া এনে দিয়েছে।

জাতিসংঘের তথ্যমতে, এ শতকের শেষ নাগাদ বাংলাদেশের অন্তত ১৮ শতাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে যাবে। কমপক্ষে ৩০ মিলিয়ন মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়বে।

তাই পানিতে বেঁচে থাকার নানা উপায় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণা চলছে। এমনি এক গবেষণায় চলনবিলেরই সন্তান স্থপতি আবুল হাসনাত মোহাম্মদ রেজোয়ান এগিয়ে এসেছেন।

নাটোর জেলার গুরুদাসপুর উপজেলার প্রত্যন্ত সিঁধুলাই গ্রামে তিনি সিঁধুলাই স্ব-নির্ভর উন্নয়ন সংস্থা নামের একটি বেসরকারি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছেন। তার সৃজনশীল চিন্তার ফসলই আজকের নৌকা স্কুল।

শিক্ষার্থীরা এসব ভাসমান স্কুলে সপ্তাহে ৬ দিন গড়ে প্রায় ৫ ঘণ্টা লেখাপড়া করে। অধিকাংশ শিক্ষার্থী তাদের বাড়ির ঘাট থেকেই নৌকা স্কুলে ওঠে।

আবুল হাসানাত মোহাম্মদ রেজোয়ান জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইতোমধ্যেই দেশে দেখা দিয়েছে। উত্তরাঞ্চলের নদীগুলো ভাঙনের কারণে বড় হচ্ছে। তাই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সবাইকে ভাবতে হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের চিন্তা থেকেই তার নৌকা স্কুল মডেল এখন বিশ্ব পরিসরে পরিবেশবিদদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।

সম্প্রতি চাটমোহর এলাকায় নৌকা স্কুল পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গেছে, বিশেষভাবে তৈরি নৌকার প্রায় পুরোটা জুড়েই শ্রেণিকক্ষ। অন্তত ৩০/৩২ শিক্ষার্থী বেশ ভালোভাবেই শ্রেণিকক্ষে বসতে পারে।

পাঠ্যশিক্ষা ছাড়াও নৌকায় মাল্টিমিডিয়া শিক্ষার ব্যবস্থা, কম্পিউটারের সব ধরনের ব্যবহার ও প্রশিক্ষণের সুবিধা রয়েছে। নৌকা স্কুলের ছাদে (ছইয়ের ওপর) সৌরবিদ্যুতের সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমেই কম্পিউটার চলে ও আলো জ্বলে।

নৌকা স্কুলের শিক্ষার্থী চাটমোহরের বরদানগর গ্রামের শিশু ওয়াসিম (৬) জানায়, সেখান থেকে বই-খাতা-কলম সবই বিনামূল্যে দেয়া হয়। শিক্ষকরাও আন্তরিকতার সঙ্গে পাঠদান করেন। আরেক শিক্ষাথী নঈম জানায়, বর্ষাকালে তার এলাকার সব স্কুলে পানি উঠে বন্ধ হয়ে যায়। নৌকা স্কুল বন্ধ হয় না।

সিঁধুলাই স্ব-নির্ভর উন্নয়ন সংস্থার কর্মসূচি ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী সুপ্রকাশ সরকার জানান, ২০০২ সালে নৌকা স্কুল চালু করা হয়েছে।

এতে পাঠাগার, কৃষি প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা, কম্পিউটার শিক্ষা, ইন্টারনেট ব্যবহার, সোলার সার্ভিস, অতিরিক্ত বিদ্যুতের হারিকেন চার্জসহ অনেক কর্মসূচিই রয়েছে।

স্থপতি আবুল হাসনাত রেজোয়ান জানান, ১৯৯৮ সালে সংস্থাটি চালু হওয়ার পর তারা ২০০২ সালে একটি নৌকা স্কুলে ৪টি ক্লাস করার মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন।

এখন ৯টি নৌকা স্কুলে ৪০টি ক্লাসে প্রায় ১ হাজার ২০০ শিক্ষার্থী শিক্ষা লাভের সুযোগ পাচ্ছে। তিনি জানান, বর্তমানে সংস্থাটি চলনবিল অঞ্চলের ৮৮ হাজার মানুষকে নানা ধরনের সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে।

প্রত্যন্ত এলাকার শিশুদের আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। চলনবিল এলাকার ১ লাখ ৮০ হাজার শিশু-কিশোরকে নৌকা স্কুলের শিক্ষার আওতায় আনার নিরন্তর চেষ্টা চলছে।

এ জন্য আরো নৌকা ও আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। রেজোয়ানের সিঁধুলাই স্ব-নির্ভর উন্নয়ন সংস্থাও ইতোমধ্যে বিল গেটস ম্যারিন্ডা ফাউন্ডেশন পুরস্কার, সাসাকাওয়া এওয়ার্ড, ইন্টেল পরিবেশ এওয়ার্ডসহ আরো অনেক সম্মাননা পেয়েছে।

সিএনএন গার্ডিয়ানসহ আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে নৌকা স্কুলের খবর প্রকাশিত হয়েছে।

Best WordPress themes


© All rights reserved 2020 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!