রবিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২০, ০৫:১২ অপরাহ্ন

আতঙ্কিত হবেন না
করোনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

টঙ্গীতে কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণ, নিহত ২৪

টঙ্গীতে কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণ, নিহত ২৪

image_pdfimage_print
টঙ্গীতে কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণ, নিহত ২৪

টঙ্গীতে কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণ, নিহত ২৪

বার্তাকক্ষ : গাজীপুরের টঙ্গী বিসিক শিল্প নগরীতে একটি প্যাকেজিং কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণে নিহতের সংখ‌্যা ২৪ বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

শনিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সকালে অগ্নিকাণ্ডের পর ট‌্যাম্পাকো ফয়েলস নামে ওই কারখানা থেকে লাশ উদ্ধার করে টঙ্গী হাসপাতাল, উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হয়।

ফলে বিভিন্ন স্থান থেকে তথ‌্য আসছিল। উত্তরা মেডিকেলে থাকা লাশ দুটি দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হলেও সেখানে দুজনের মৃতদেহ রয়েছে বলে হিসাব করছিলেন গণমাধ‌্যমকর্মীরা।

বিকালে সব লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে নেওয়ার পর জানানো হয়, টঙ্গীর ওই কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে মোট নিহতের সংখ‌্যা ২৪ জন।

ট‌্যাম্পাকো ফয়েলসের পাঁচ তলা ওই কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণের পর আগুন ধরে যায় বলে জয়দেবপুর ফায়ার স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার মো. রফিকুজ্জামান জানান।

দুপুরে আগুন নেভানোর আগে বেশ কয়েকজনের লাশ বের করে আনা হয়, কয়েকজন হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান।

এদের কেউ অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেছেন। আগুনে কারখানার কাঠামো ভেঙে পড়ে তার নিচে চাপা পড়ে মারা যান কেউ কেউ।

আহত অন্তত ৩৫ জন টঙ্গী সরকারি হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

নিহতদের প্রত‌্যেকের পরিবারকে ২ লাখ টাকা অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। গাজীপুর জেলা প্রশাসন নিহতদের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে এবং আহতদের ৫ হাজার টাকা করে দিচ্ছে।

কারখানার মালিক সিলেটের সাবেক বিএনপি সাংসদ সৈয়দ মো. মকবুল হোসেন হতাহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

এই ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস‌্যের কমিটি গঠন করেছে গাজীপুর জেলা প্রশাসন। কমিটিকে ১৫ দিনের মধ‌্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে বলে জানান জেলা প্রশাসক এস এম আলম।

মকবুল জানান, ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত তার এই কারখানায় সাড়ে ৪শর মতো শ্রমিক রয়েছে। সবার ঈদের বোনাসসহ বেতন-ভাতা কয়েকদিন আগেই পরিশোধ করা হয়েছিল।

“শুক্রবার রাতের পালায় ৭৫ জনের মতো কাজ করছিলেন। শনিবার ঈদের ছুটি হওয়ার কথা ছিল।”

সকাল ৬টায় আগুনের খবর পেয়ে জয়দেবপুর, টঙ্গী, কুর্মিটোলা, সদর দপ্তর, মিরপুর ও উত্তরাসহ আশে-পাশের ফায়ার স্টেশনের ২৫ ইউনিট নেভানোর কাজ শুরু করে বলে জানান জয়দেবপুরের জ‌্যেষ্ঠ স্টেশন কর্মকর্তা রফিকুজ্জামান।

ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেন, সকাল ৬টার দিকে কাজ চলার সময় নিচ তলায় বয়লার বিস্ফোরণের পর কারখানার পুরো ভবনে আগুন ছড়িয়ে পড়ে।

নিহত প্রকৌশলী আনিসুর রহমানের স্ত্রী নিগার সুলতানা জানান, পৌনে ৬টার দিকে একটি বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পান।

কারখানার পাশে গোপালপুর এলাকায় তার বাসা। শব্দ শুনে বেরিয়ে স্বামীর কারখানা থেকে কালো ধোঁয়া বের হতে দেখে ছুটে যান নিগার। গিয়ে দেখেন তার স্বামীসহ কয়েকজনের লাশ বের করা হচ্ছে।

টঙ্গী রেল স্টেশনের কর্মী লিখন জানান, পাঁচ তলা কারখানার চতুর্থ তলায় বেশ কিছু শ্রমিক জানালা দিয়ে হাত নেড়ে তাদের বাঁচানোর আকুতি জানাচ্ছিলেন। এসময় স্থানীয়রা মই নিয়ে শ্রমিকদের উদ্ধারের চেষ্টা চালায়। কিন্তু ধোঁয়া ও তাপের কারণে তাদের ওই চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

“কিছুক্ষণ পরে ওই তলায় থাকা শ্রমিকদের আর কোনো সাড়া দেখা যায়নি। ততক্ষণে আগুন পুরো কারখানায় ছড়িয়ে পড়ে। কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে আশপাশের এলাকাও অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।”

দুপুর সাড়ে ১২টার দিকেও কারখানাটিতে আগুন জ্বলতে দেখা যাচ্ছিল। তার আগে ভবনের একাংশের ছাদ ধসে পড়ে। আগুন নেভাতে গিয়ে সোহেল নামের এক দমকলকর্মী আহত হন।

আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চললেও বাতাসের কারণে বেগ পেতে হচ্ছিল বলে জানান ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা।

ভেতরে দেয়াল চাপা পড়ে কিংবা অগ্নিদগ্ধ হয়ে আর কেউ মারা গেছেন কি না, তা আগুন পুরোপুরি নেভানোর আগে বলতে পারছেন না ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা।

হতাহতরা

নিহতদের মধ্যে ১৭ জনকে নেওয়ার পর তাদের মৃত‌্যু নিশ্চিত করেন টঙ্গী হাসপাতালের চিকিৎসকরা। দুজনের মৃত‌্যু নিশ্চিত করেন উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক। পাঁচজনের মৃত‌্যু ঘটে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

টঙ্গী হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক মো. পারভেজ মিয়া জানান, হাসপাতালে ১৫ জনের লাশ আনা হয়েছিল। এছাড়া আহত ১২ জনকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। গুরুতর কয়েকজনকে ঢাকা মেডিকেলে পাঠানো হয়।

গাজীপুর সিভিল সার্জন ডা. আলী হায়দার খান জানান, নিহতদের মধ্যে ঢাকার নবাবগঞ্জের গোপাল দাস, একই এলাকার শংকর সরকার (ক্লিনার), পিরোজপুরের আল মামুন, চাঁদপুরের মতলবের আব্দুল হান্নান (নিরাপত্তাকর্মী), কুড়িগ্রামের ইদ্রিস আলী, ভোলার দৌলতখান এলাকার জাহাঙ্গীর আলম (নিরাপত্তাকর্মী), টাঙ্গাইলের গোপালপুর এলাকার সুভাস চন্দ্র, ময়মনসিংহের ত্রিশাল এলাকার রফিকুল ইসলাম, একই জেলার ঈশ্বরগঞ্জ এলাকার আব্দুর রাশেদ (রিকশাচালক), কারখানার শ্রমিক সিলেটের গোপালপুর এলাকার ওয়ালি হোসাইন, একই এলাকার মো. সোলায়মান, সাইদুর রহমান, মাইন উদ্দিন ও এনামুল হক, ময়মনসিংহের ত্রিশালের মো. আনিসুর রহমান (প্রকৌশলী), পথচারী হবিগঞ্জের রোজিনার নাম জানা গেছে।

অগ্নিকাণ্ডের পরপরই কারখানার শ্রমিকদের স্বজনরা টঙ্গী ৫০ শয্যার হাসপাতালে গিয়ে ভিড় জমায়। লাশ দেখে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। অনেকে স্বজনদের খুঁজছিল।

নিখোঁজ ক্লিনার রাজেশের দাদি জানান, ঘটনার পর থেকে তার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।

উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার সাব্বির আহমেদ জানান, সেখানে দুজনকে নেওয়া হয়েছিল। তারা মৃত ছিলেন। লাশ তারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠিয়ে দিয়েছেন।

ঢামেক পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপ-পরিদর্শক বাচ্চু মিয়া জানান, এই হাসপাতালে আনার পর পাঁচজনের মৃত‌্যু নিশ্চিত করেন চিকিৎসকরা। তাছাড়া ভর্তি রয়েছেন আরও ১৯ জন, তারা সবাই পুরুষ।

মৃত পাঁচজন হলেন- অপারেটর সিরাজগঞ্জের ওয়াহিদুজ্জামান স্বপন (৩৫), আনোয়ার হোসেন (৪০), দেলোয়ার হোসেন (৫০), তাহমিনা আক্তার ও আশিক (১২)।

ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটের আবাসিক চিকিৎসক পার্থ শঙ্কর পাল জানান, আহতদের মধ্যে চারজন তাদের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন। এরমধ্যে একজনের শরীরের ছয় ভাগ, আরেকজনের আট ভাগ পুড়েছে। একজনের শরীরের ৯০ ভাগ পুড়ে গেছে, তার অবস্থা আশঙ্কাজনক।

দেহের ছয় শতাংশ পুড়েছে শাহ আলমের (৪৬), দিলীপ দাসের (৩৬) পুড়েছে আট শতাংশ বার্ন। রিপন দাসের (৩০) দেহের ৯০ ভাগ পুড়েছে। এছাড়া রাসেল খান (২৬) নামে একজনও বার্ন ইউনিটে রয়েছেন।

ভর্তি অন‌্যরা নানাভাবে আঘাত পেয়ে আহত হয়েছেন। তারা হলেন- রাসেল (২২), আনোয়ার (৫০), কামরুল (২৭), মনোয়ার (৩৫), মিজু মিয়া (২৫), ইকবাল (৩৫), আশিক (১২), শিপন (৩৫), শাহীন আকমল (৩০), রোকন (৩৫), কামরুল (২৭), প্রাণকৃষ্ণ (৩৮), অজ্ঞাত পুরুষ (৫০)।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিজানুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা আশঙ্কাজনক রোগীদের আগে সেটল করছি। যার যার রক্ত-স্যালাইন প্রয়োজন, আমরা দিচ্ছি।”

১২ বছরের একটা শিশুর কথা উল্লেখ করে তিনি দুপুরে বলেছিলেন, “বাচ্চাটি শকে আছে। তার অপারেশন প্রয়োজন। আমরা তৈরি আছি। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা দিচ্ছি।”

আশিক নামে ওই শিশুটি বেলা ৩টার দিকে মারা যান।

তদন্ত কমিটি, ক্ষতিপূরণ

গাজীপুরের জেলা প্রশাসক এস এম আলম কারখানা পরিদর্শনের পর পাঁচ সদ‌স‌্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠনের কথা সাংবাদিকদের জানান।

অতিরিক্ত জেলা ম‌্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) রাহেদুল ইসলামকে প্রধান করে গঠিত এই কমিটিকে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক আনিস মাহমুদ জানান, বাহিনীর উপ-পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মো. বদিউজ্জামানকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করেছেন তারা। কমিটিকে ১০ দিন সময় দেওয়া হয়েছে।

নিহত শ্রমিকদের প্রত‌্যেকের পরিবারকে দুই লাখ টাকা দেওয়া হবে বলে শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানিয়েছেন।

শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন থেকে এই অনুদান দেওয়া হবে। নিহতদের মধ‌্যে শ্রমিক ছাড়া এক রিকশাচালকের নামও পাওয়া গেছে। তবে তার অনুদান পাওয়ার বিষয়টি এখনও স্পষ্ট নয়।

এদিকে গাজীপুর জেলা প্রশাসন নিহতদের প্রত‌্যেকের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে দিচ্ছে।

জেলা প্রশাসক এস এম আলম ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময় এই ঘোষণা দেন। আহতদের প্রত‌্যেককে ১০ হাজার টাকা করে দিচ্ছে জেলা প্রশাসন।

আহতদের চিকিৎসার বন্দোবস্ত করার কথা কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক সৈয়দ আহাম্মদও জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, “আহত শ্রমিকদের চিকিৎসাও করানো হবে। সেই সাথে কারখানার মালিকদের প্রত্যেক শ্রমিকের পাওনা পরিশোধ করতেই হবে।”

শ্রম প্রতিমন্ত্রী চুন্নু ছাড়াও স্থানীয় সংসদ সদস্য জাহিদ আহসান রাসেল, ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার মো. হেলাল উদ্দিন আহমদ, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র মো. আসাদুর রহমান কিরণ, জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মতিউর রহমান ঘটনাস্থলে উদ্ধারকাজ তদারকি করেন। তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

0
1
fb-share-icon1

Best WordPress themes


© All rights reserved 2020 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!