রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২০, ০১:৫৪ পূর্বাহ্ন

আতঙ্কিত হবেন না
করোনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

থমথমে ঈশ্বরদী- পুলিশের টহল জোরদার

image_pdfimage_print

বার্তাকক্ষ : আসন্ন পাবনা- ৪ আসনের উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলায় আওয়ামীলীগের দুইপক্ষের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। এতে উভয়পক্ষের অন্তত ১২ জন আহত হয়েছে।

এ ঘটনার পর থেকে উপনির্বাচনকে নিয়ে সরগরম হয়ে ওঠা ঈশ্বরদী এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

এদিকে ঈশ্বরদী শহরে পুলিশ মোতায়েন ও নিরাপত্তার জোরদার করা হয়েছে।

থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সেখ নাসীর উদ্দীন জানান, আওয়ামীলীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে এই সংঘর্ষ হয়েছে।

তবে এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই থানায় অভিযোগ করেনি বলে জানান তিনি।

ঘটনার সূত্রপাত:

উপজেলা আওয়ামী লীগের উদ্যোগে আসন্ন উপনির্বাচন উপলক্ষ্যে আয়োজিত বর্ধিত সভায় প্রধান অতিথি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেনসহ আগত অতিথিদের বরণ করার জন্য কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম লিটনকে সঙ্গে নিয়ে পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইসাহক আলী মালিথা দাঁড়িয়ে ছিলেন।

এই সময় পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি মেয়র আবুল কালাম আজাদ মিন্টু তাঁর সমর্থিত ২০-২৫ জন যুবলীগ, ছাত্রলীগ সমর্থকদের নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন।

মেয়র মিন্টু তাঁর লোকজন নিয়ে লিটনের সামনে এসে দাঁড়ান। এই সময় তাঁদের ধাক্কা ধাক্কি শুরু হয়। এক পর্যায়ে সংঘর্ষ বেঁধে যায়। এই সময় মেয়র মিন্টুর পক্ষের লোকজন ইসাহক মালিথাসহ তাঁর পক্ষের লোকজনকে কিল, ঘুষি ও ইট পাটকেল দিয়ে আঘাত করে।

এতে ইসাহক মালিথা, বক্কার মালিথা, কবির মালিথা রক্তাক্ত হন।

ঘটে ছুরিকাঘাতের ঘটনা:

পরে এই সংঘর্ষ দফায় দফায় অন্য নেতা-কর্মীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়লে আওয়ামীলীগ কার্যালয়ের মধ্যে ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হন যুবলীগ নেতা সানোয়ার হোসেন লাবু ও উপজেলা চেয়ারম্যানের ছেলে রনি হোসেন।

তাদের দুইজনকে প্রথমে পাবনা সদর হাসপাতাল ও পরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

এছাড়াও সংঘর্ষ ও ছুরিকাঘাতে আহতরা হলেন ঈশ্বরদী পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইছাহক আলী মালিথা, মুলাডুলি ইউনিয়ন কৃষকলীগের সাধারণ সম্পাদক আবু বক্কার মালিথা, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক কবির মালিথা, পৌর যুবলীগের সভাপতি আলাউদ্দিন বিপ্লব, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সজিব মালিথা, যুবলীগ কর্মী নাজিম উদ্দিন রনি, পৌর যুবলীগের সাবেক সভাপতি সানোয়ার হোসেন লাবু, রিকশা চালক ওলিউর রহমান, ৪নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল আজিজ, ৭নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল কাশেম গোলবার হোসেন, যুবলীগ নেতা আমিরুল ইসলাম, সেলিম রেজা ও আওয়ামী কর্মী আবু কালাম।

সংঘর্ষের সময় উপস্থিত ছিলেন যে নেতারা:

এ সময় কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের রাজশাহী বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন, বিশিষ্ট শিল্পপতি স্কয়ার গ্রুপের সত্ত্বাধিকার মুক্তিযোদ্ধা অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম ফারুক প্রিন্স এমপি, অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান টুকু এমপি, পাবনা উপজেলা চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন, পাবনা পৌর মেয়র কামরুল হাসান মিন্টু, ঈশ্বরদী আটঘরিয়া আসনে উপনির্বাচনে প্রার্থী নুরুজ্জামান বিশ্বাসসহ জেলা ও উপজেলার জেলা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।

শান্ত করার চেষ্ট করেও ব্যর্থ হন নেতারা:

ঘটনার আকস্মিকতায় কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন ঈশ্বরদী পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে শান্ত করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।

মধ্যস্থতার পরেও সংঘর্ষ :

আহত ইসাহক মালিথা হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে সভাস্থলে আসলে পুনরায় উত্তেজনা দেখা দেয়।

তখন কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশে ইসাহক মালিথা কার্যালয়ের ভিতরে সভাস্থলে যান।

তখন অতিথিবৃন্দ মেয়র মিন্টু ও ইসাহক মালিথা মধ্যে মিল করিয়ে দেন।

আর নিজের ভুলের জন্য মেয়র মিন্টু হাত জোড় করে সকলের নিকট ক্ষমা চান।

এরপর অতিথিদের নির্দেশে কার্যালয়ের বাইরে থাকা উভয় গ্রুপের উত্তেজিত কর্মী সমর্থকদের শান্ত করতে মেয়র মিন্টু ও ইসাহক মালিথা বাইরে বের হন।

তখন ইসাহক গ্রুপের লোকজন মেয়র মিন্টুর ওপর হামলা করার চেষ্টা করেন।

এই সময় পুনরায় উভয় গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে।

তখন পুলিশের কঠোর ভূমিকায় মেয়র মিন্টু ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। অবস্থা আরো উত্তপ্ত হয়ে উঠে। পুরো শহরে আতংক ছড়িয়ে পড়ে।

তখন নৌকা প্রার্থী নুরুজ্জামান বিশ্বাসকে পুলিশ পাহারায় দ্রুত আওয়ামী লীগ কার্যালয় থেকে নিজ বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

কেন্দ্রীয় নেতার বক্তব্য:

এসব ঘটনাকে অত্যন্ত দুঃখজনক বলে মন্তব্য করে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের রাজশাহী বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ঈশ্বরদী পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি মেয়র আবুল কালাম আজাদ মিন্টু ও সাধারণ সম্পাদক ইসাহক আলী মালিথায় মূল দায়ী।

তবে উভয় পক্ষেই ছাত্রলীগ ও যুবলীগ সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে।

তাই দোষীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণের পূর্বে তদন্তের জন্য ঈশ্বরদী উপজেলা ও পৌর ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সকল কার্যক্রম স্থগিত করতে জেলা যুবলীগ ও ছাত্রলীগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, কোনো সন্ত্রাসী ও অপরাধী আওয়ামী লীগে থাকতে পারবে না।

নির্বাচনের মাঠে না যাওয়ার নির্দেশ:

নৌকা প্রার্থী নুরুজ্জামান বিশ্বাস সাংবাদিকদের বলেন, নৌকার জনজোয়ার যদি পৌর আওয়ামী লীগের দুই নেতা কারণে নষ্ট হয়। তাহলে তাঁরা দায়ী থাকবেন। একই সঙ্গে মেয়র মিন্টু ও ইসাহক মালিথাকে পৌরসভার বাইরে নির্বাচনের মাঠে না যাওয়ার জন্য নির্দেশ দেন।

সভাপতির বক্তব্য :

ঈশ্বরদী পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি মেয়র আবুল কালাম আজাদ মিন্টু সাংবাদিকদের বলেন, আওয়ামী লীগের মধ্যে লুকিয়ে থেকে ষড়যন্ত্রকারীরা নৌকার তলা কাটছে।

তাদের উদ্দেশ্যমূলক ষড়যন্ত্রের কারণেই আজকে আমার ও আমার কর্মীবাহিনীর ওপর হামলা চালিয়ে আহত করা হয়েছে।

সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্য:

পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইসাহক আলী মালিথা সাংবাদিকদের বলেন, নৌকার জোয়ারকে নষ্ট করতে মেয়র মিন্টু তার বাহিনী নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে পরিকল্পনা করে আসছিল।

আমরা তা সহ্য করে আসছি। বিগত পৌর নির্বাচনে আমি (ইসাহক মালিথা) প্রার্থী হতে চাওয়া থেকে মেয়র মিন্টু আমার সঙ্গে গ্রুপিং শুরু করেছে। আমার বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর, লুটপাট করেছে।

আজকে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া নুরুজ্জামান বিশ্বাসের বাড়িতেও মিন্টু তার লোকজন দিয়ে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট করেছে।
ঘটনার সময় উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে মিন্টু আমাকেসহ আমার লোকজনের ওপর হামলা চালিয়ে রক্তাক্ত জখম করেছে।

ইসাহক মালিথা আরো বলেন, মেয়র মিন্টু তার বাহিনী দিয়ে শহরে নানা রকম চাঁদাবাজি, দখলবাজিসহ নানা রকম অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছেন।

কি বলছে ঈশ্বরদী থানা:

ঈশ্বরদী থানা সূত্র মতে, বেশ কয়েকদিন পূর্বে থেকে মেয়র মিন্টু গ্রুপ ও ইসাহক আলী গ্রুপের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। বিষয়টি জানতে পেরে পুলিশের পক্ষ থেকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা হয়।

এই জন্য ঘটনার সময় প্রাণহানির মতো বড়ো কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে পারেনি।

তবে মেয়র মিন্টু ও ইসাহক মালিথা গ্রুপের মধ্যে কয়েক দফা সংঘর্ষ ঘটলেও পুলিশ তা কঠোর হস্তে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছে।
এই সময় প্রার্থী নুরুজ্জামান বিশ্বাসকে পুলিশী নিরাপত্তায় একটি মাইক্রোযোগে নিজ বাসাতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

কি বলছে ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে:

ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সূত্র মতে, এই ঘটনায় হাসপাতালে রক্তাক্ত অবস্থায় ইসাহক মালিথা, আবু বক্কার মালিথা, লাবু ও রনিসহ অন্তত ১৫ জনকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে লাবু ও রনি চাকুবিদ্ধ হওয়ায় তাদের রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের বক্তব্য:

ঈশ্বরদী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফিরোজ কবির বলেন, আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামনে দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে অতিরিক্ত পুলিশসহ উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি শান্ত করা হয়।

এই ঘটনায় বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। এই বিষয়ে থানায় কোনো পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়নি। কাউকে গ্রেপ্তারও করা হয়নি। শহরের পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।

তারপরও শহরে পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। আর যেন কোনোরূপ ঘটনা না ঘটে সেই জন্য সতর্ক দৃষ্টি রাখা হয়েছে।

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ঈশ্বরদী শহর থমথমে অবস্থা বিরাজ করছিল।

Best WordPress themes


© All rights reserved 2020 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!