দেশে ভুঁইফোড় মানবাধিকার সংগঠনের ছড়াছড়ি!

বার্তাকক্ষ : দেশে মানবাধিকার সংগঠনের ছড়াছড়ি। সাইনবোর্ড ও প্যাডসর্বস্ব ভুঁইফোড় এসব সংগঠনের কর্মকাণ্ডে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে প্রতিষ্ঠিত মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ভাবমূর্তি। এসব সংগঠনের মানবাধিকার বাণিজ্য এখন বেশ জমজমাট।

নামসর্বস্ব কথিত মানবাধিকার সংগঠনগুলো লব্ধ প্রতিষ্ঠিত মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে এমনভাবে নিজেদের নাম রাখছে, যাতে বিভ্রান্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা সংগঠনগুলো দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অপপ্রচার চালানোর মাধ্যমে বিদেশি অর্থ আদায় থেকে শুরু করে থানা ও আদালতে তদবিরের মাধ্যমে অপরাধী ছাড়ানোর মতো কাজেও লিপ্ত রয়েছে।

পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েও নির্যাতিতদের আইনি সহায়তা দেয়ার নামে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে যাচ্ছে। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে দ্রুত বাদী-বিবাদীর কাছে পৌঁছে যান কথিত এসব সংগঠনের তদন্ত কর্মকর্তারা। তার পর সালিশ-বৈঠক ও সমঝোতা করে দেয়ার নাম করে হাতিয়ে নেয়া হয় টাকা।

জেলা, উপজেলা ও সিটি করপোরেশন এলাকার প্রতিটি ওয়ার্ডে মানবাধিকার সংগঠনের শাখা অফিস তৈরি করে এবং মানবাধিকারকর্মীর পরিচয়পত্র বিক্রির মাধ্যমেও টাকা হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে। কথিত এসব মানবাধিকার সংগঠনের পরিচালনা পর্ষদে সর্বজনগ্রহণযোগ্য বিচারপতি, উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা ও অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের নাম রেখে প্রতারণা করা হচ্ছে। দেশের বিশিষ্ট মানবাধিকার সংগঠক ও বিচারপতিদের নাম ভাঙিয়ে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ধনাঢ্য ব্যক্তি ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কাছ থেকেও মাসোয়ারা নেয়ার অভিযোগ উঠেছে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত মানবাধিকার সংগঠনের নামের সঙ্গে মিল রেখে প্রতারণার জাল ছড়ানো হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের নামে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ও রাস্তার পাশে টানিয়ে দেয়া হয়েছে নানা চটকদার সাইনবোর্ড। সাইনবোর্ডে বিবাহ, তালাক, যৌতুক, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, পারিবারিক বিরোধ, জমি নিয়ে ঝামেলা, দেনমোহরসহ গরিব-অসহায়দের বিনামূল্যে আইনি সহায়তা দেয়ার আশ্বাস দিয়ে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলা হচ্ছে।

প্রতারণার ফাঁদে ফেলা এমন একটি সংগঠন বাংলাদেশ মানবাধিকার কাউন্সিল। সংগঠনটির চেয়ারম্যানের পড়াশোনার গণ্ডি উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত। অথচ নামের আগে ব্যবহার করেন ডক্টরেট। তিনি ফরিদ উদ্দিন ফরিদ। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সব তথ্য নকল করে গড়ে তোলেন মানবাধিকার কাউন্সিল। এই প্রতিষ্ঠানের জেলা কমিটিতে রেখেছেন মন্ত্রী ও এমপিদের। আর ওয়েবসাইট সাজিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওয়েবসাইটের আদলে। আর সেখানে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ঠকাচ্ছেন চাকরি প্রার্থীদের।

প্রতারণার এই কৌশলে শেষ রক্ষা হয়নি সংগঠনটির চেয়ারম্যান ফরিদের। পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছেন। এর আগে গত ৫ সেপ্টেম্বর থানা ও জেলা কো-অর্ডিনেটর পদে ১৪৭ জনের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বাংলাদেশ মানবাধিকার কাউন্সিল। ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আগ্রহী প্রার্থীদের আবেদনের কথা বলা হয়। বিজ্ঞপ্তিটি দেখার পরই জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আর বাংলাদেশ মানবাধিকার কাউন্সিল গুলিয়ে ফেলেন অনেকে।

সরকারি প্রতিষ্ঠান ভেবে ১৪৭ পদের বিপরীতে আবেদন করেন ১৮ হাজার চাকরিপ্রার্থী। কমিশন খোঁজ নিয়ে দেখে ওয়েবসাইটে দেয়া সব তথ্য নকল করে তথাকথিত এনজিওটি মানুষকে বোকা বানিয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটির তথ্য নকল করার অভিযোগে গত ৯ সেপ্টেম্বর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে রাজধানীর তেজগাঁও থানায় মামলা করেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের উপ-পরিচালক এম রবিউল ইসলাম। এরপর গত ১৬ সেপ্টেম্বর বনানীতে অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করা হয় প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানসহ সাতজনকে। এ সময় তাদের বনানী কার্যালয়ে পুলিশ ভুয়া সরকারি নথিপত্র জব্দ করে।

গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন- প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ফরিদ উদ্দিন ফরিদ, মঈন উদ্দিন শেখ, ফিরোজ আলী রাসেল, শামসুদ্দিন, সাইফুল ইসলাম, ফারজানা মেরী, মেহেদী হাসান ও রিফাত রহমান। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পরদিন ফরিদ উদ্দিনকে দুই দিনের এবং মঈন উদ্দিনকে এক দিনের রিমান্ডে আনে পুলিশ।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের উপপরিচালক এম রবিউল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, আমাদের কাছে অনেকেই ফোন করে জানতে চাচ্ছিল যে, আমরা চাকরির কোনো বিজ্ঞপ্তি দিয়েছি কি না। কিংবা মানবাধিকার কাউন্সিল আমাদের কি না বা সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান কি না। এতে আমরা বিচলিত হই, কারণ আমাদের এখান থেকে কোনো চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়নি। তাদের কথা অনুযায়ী আমি বাংলাদেশ মানবাধিকার কাউন্সিল নামের ওই ওয়েবসাইটে গিয়ে অবাক হয়ে যাই। পুরো ওয়েবসাইটটি আমাদের নকল করে বানানো হয়েছে। এমনকি আমাদের ওয়েবসাইটে দেয়া প্রধানমন্ত্রীর বাণীটিও হুবহু ওই ওয়েবসাইটে দেয়া আছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ গণমাধ্যমকে জানান, রাষ্ট্রীয় মানবাধিকার কমিশনের লোগো ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, প্রতারণা এবং মানুষকে ঠকানোর মতো কাজও করে আসছিল ওই চক্রটি। এর পেছনে আরো কারা জড়িত আছে এবং কারা মদদ দিচ্ছে তা বের করার চেষ্টা চলছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, অভিযানের পরদিন কথিত মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে অনেক চাকরিপ্রার্থী মৌখিক পরীক্ষা দিতে আসেন। প্রতিষ্ঠানটি শুধু চাকরিপ্রার্থীদের কাছে নয়, পারিবারিক সমস্যা সমাধানের নামেও অনেকের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানটির ফেসবুক পেজে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনেরই একজন সাবেক চেয়ারম্যানকে তাদের প্রোগ্রামে উপস্থিত থাকতে দেখা গেছে। তাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সাবেক ও বর্তমান মন্ত্রীদেরও প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দিতে দেখা গেছে। কথিত এই প্রতিষ্ঠানের সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন একজন সাবেক অতিরিক্ত সচিব।

কথিত মানবাধিকার সংগঠনগুলো এনজিও ব্যুরো, সমাজসেবা, সমবায়, সমাজকল্যাণ, জয়েন্ট স্টক কোম্পানি ও ফার্মসের দপ্তর থেকে সোসাইটি অ্যাক্টের অধীনে নিবন্ধন নিয়ে মানবাধিকারের নামে প্রতারণা করে যাচ্ছে। এসব প্রতারক চক্রের একটি অংশ বিভিন্ন অখ্যাত আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকার কার্ডধারী সাংবাদিক। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মতো একই ধরনের বা কাছাকাছি নাম রয়েছে বেশ কয়েকটি সংগঠনের। বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট কমিশন ও বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন, মানবাধিকার কমিশন ও বাংলাদেশ মানবাধিকার জাতীয় কমিশন নামে একাধিক বেসরকারি সংস্থা রয়েছে। হঠাৎ করে কেউ নাম শুনলে মনে করবে, এ সংগঠনগুলো জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মতো সংবিধিবদ্ধ স্বাধীন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান।

মানবাধিকার কমিশন নিয়ে বিভ্রান্ত হওয়ায় সম্প্রতি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পক্ষ থেকে পত্রিকায় সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তিও দেয়া হয়েছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সচিব এম এ সালাম গণমাধ্যমকে বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের নাম ব্যবহার করে কিছু অসাধু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার ব্যক্তিদের আর্থিক ও মানসিকভাবে হয়রানি এবং প্রতারিত করছে। এসব অসাধু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নিজেদের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে জনগণকে প্রতারিত করছে। এসব বিষয়ে মন্ত্রণালয়গুলোকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। গত মাসে এমন দুটি ভুঁইফোড় সংগঠনের নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে।