শনিবার, ১৬ অক্টোবর ২০২১, ০৫:৩৫ অপরাহ্ন

কুমিল্লায় পবিত্র কোরান অবমাননা সংক্রান্ত খবরটির প্রতি সরকারের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে সকলকে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য অনুরোধ করা যাচ্ছে।- ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়

নক্শবন্দিয়া তরিকার ইমাম- হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নক্শবন্দ (র.)


।। এবাদত আলী।।
পবিত্র ইসলাম ধর্মে সুফি মতবাদে নক্শবন্দিয়া, মোজাদ্দেদিয়া, কাদরিয়া ও চিশতিয়া এই চার তরিকার উল্লেখ রয়েছে। তন্মধ্যে হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নক্শবন্দ (র.) হলেন নক্শবন্দিয়া তরিকার ইমাম বা প্রবর্তক। জগৎ প্রসিদ্ধ শ্রেষ্ঠ আওলিয়া হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নক্শবন্দ (র.) হিজরি ৭০৮ মতান্তরে হিজরি ৭১৮ সালের মহররম মাসের ৪ তারিখে বোখারা নগরী হতে দু’ মাইল দুরে কাছরে আরফান নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পবিত্র নাম ছিল মোহাম্মদ বিন মোহাম্দ বোখারি (র.)। কিন্তু তিনি সর্বত্র হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নক্শবন্দ (র.) বলে চির পরিচিত ছিলেন।

হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নক্শবন্দ (র.) এর জন্মগ্রহণের পূর্বে যখন হযরত খাজা মোহাম্মদ বাবা ছামাছি (র.) কোশাকে হিন্দওয়ান মহলের দিকে গমণ করতেন তখন তিনি বলতেন এই মাটি হতে এক মরদে খোদা মহাপুরুষের খসবু আসছে। এবং অতিশিঘ্র এই কোশাকে হিন্দওয়ান আরেফের অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালার তত্ত¡জ্ঞানী মহাপুরুষের মহল বলে পরিগণিত হবে। এইস্থানে এক আরেফে কামেল আওলিয়া শ্রেষ্ঠ জন্মগ্রহণ করবেন।

পুনরায় যখন তিনি ঐ স্থানে তশরিফ নিলেন তখন তিনি বল্লেন, “এই স্থানে আমি পূর্বে যে সুবাস পেয়েছিলাম তা এখন বৃদ্ধি পেয়েছে।” প্রকৃতপক্ষে হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নক্শবন্দ (র.) তার তিন দিন পূর্বে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর জন্মের তিনদিন পর তাঁর পিতামহ তাঁকে কোলে নিয়ে হযরত বাবা ছামাছি (র.) এর খেদমতে হাজির হন। হযরত বাবা ছামাছি (র.) তাঁর প্রিয় খলিফা হযরত ছৈয়দ আমির কুলাল (র.) এর প্রতি লক্ষ্য করে বল্লেন “এই ছেলেকে তরিকতের ছলুক শিক্ষা প্রদানে কোন ত্রুটি করবেনা।”

পরবর্তীকালে তরিকত শিক্ষাদান অন্তে হযরত বাহাউদ্দিন নক্শবন্দ (র.) কে বলেন যে, “দেখ হে বাহাউদ্দিন আমার পীরের নির্দেশ অনুযায়ি তোমাকে তাওয়াজ্জাহ দিতে দিতে আমার সিনা শুকিয়ে গেছে।” হযরত খাজা বাহাউদ্দিন (র.) আরবি ভাষায় বিশেষ দক্ষতা ও পান্ডিত্য লাভ করেছিলেন। তিনি হযরত সৈয়দ আমির কুলাল (র.) এর নিকট হতে খেলাফতি লাভ করার পর সাত বছরকাল হযরত মওলানা আরেফ (র.) এর সহবতে অবস্থান করে মওলানা সাহেবকে যথাযোগ্য আদব ও সন্মান প্রদর্শন করতঃ তাঁর সাথে ছলুক শিক্ষা সমাপ্ত করেছিলেন।

নক্শবন্দ উপাধি লাভ সম্পর্কে যতদুর জানা যায় যে, হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নক্শবন্দ (র.)দুবার হেজাজ সফর করেছিলেন। দ্বিতীয় বার যখন তিনি হজ্ব করার জন্য যাত্রা করলেন তখন একমাত্র মওলানা জয়েনউদ্দিন (র.) এর সাথে সাক্ষাৎ করার উদ্দেশ্যে হেরাত গমন করেন। তিনদিন পর্যন্ত তিনি সেখানে অবস্থান করেন। একদিন সেখানে ফজরের নামাজ আদায় করার পর মওলানা সাহেব উচ্চ শব্দে ওজিফা পাঠে মশগুল হন এবং তাঁকে বলেন খাজা সাহেব আপনি আমার এই নকশা বাঁধুন অর্থাৎ আমি যেভাবে অজিফা পাঠ করি আপনিও সেভাবে পাঠ করুন। তখন খাজা বাহাউদ্দিন (র.) অতি নম্রভাবে তার জবাব দিয়ে বল্লেন যে, আমি নিজেই নক্শ হবার জন্য এসেছি অর্থাৎ আমার প্রবর্তিত তরিকা লোকদেরকে শিক্ষা দেয়ার জন্যই আমার এই জগতে আবির্ভাব।

নক্শবন্দ শব্দের অর্থ কাপড়ে বুটি বা ফুল তোলার কার্যকারক। অথবা কাপড়ের রং মিস্ত্রি। এই অর্থ পরিগ্রহণ করতঃ কোন এক লেখক বর্ণনা করেন যে, এই তরিকতের অনুসারি সালেকগণ (জেকের দ্বারা) দেলের বাহ্যিক দিক দমন করেন এবং এলেম ও জ্ঞান দ্বারা দেলের মধ্যে পরিপূর্ণ করেন। এই তরিকতে পীরের ছুরত ধ্যান করার বিধান পরিচালিত আছে। পীরের ছুরত ধ্যান করার সাহায্যে ছালেকগণ অতি অল্প সময়ে অনায়াসে তার মঞ্জেলে মকসুদ পর্যন্ত পৌঁছতে সক্ষম হন। অর্থাৎ ফানাফিস শেখ, ফানাফির রাসুল(সা.) এবং ফানাফিল্লাহ হাছেল করে আল্লহ পাকের মনোনীত পেয়ারা বান্দায় পরিণত হতে পারেন।

নক্শবন্দিয়া তরিকার গুরুত্ব সম্পর্কে হযরত বাহাউদ্দিন (র.) নামক একখানি কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, একবার এমামোত তরিকত হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নক্শবন্দ (র.) ৫০ জন কামেল আওলিয়াসহ ১৫ দিন সেজদায় পড়ে (অন্য বর্ণনায় ১২ দিন) মহান আল্লাহর নিকট এই মোনাজাত করেন যে, আয় আল্লাহ আমাকে একটি নতুন তরিকা প্রদান কর যে তরিকাতে অল্প পরিশ্রম করে তোমার নৈকট্য লাভ করতঃ তোমার রেজামন্দি হাছেল করা যায়। পরম করুণাময় আল্লাহ তায়ালা তাঁর সেই আবেগপূর্ণ প্রার্থনা কবুল করে এই সহজ তরিকা এনায়েত করেন। সেজন্য এই আখেরি জামানার লোকজন অতি অল্প সাধনা দ্বারা এই তরিকতের মাধ্যমে অধিক ফল লাভ করে থাকেন।

এই তরিকার প্রবর্তক বা ইমাম হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নক্শবন্দ (র.) এর আধ্যাত্মিক উন্নতি সম্পর্কে হযরত শেখ আহম্মদ ছরহান্দি মোজাদ্দেদ আলফেছানি (র.) ফরমায়েছেন যে, হযরত বাহাউদ্দিন নক্শবন্দ (র.) তরিকতে খাজেগানের জজবার হাল অতিক্রম করার পর উপরের ছলুক বা রান্তার দিকে রুজু হয়েছিলেন এবং এই ছলুকের শেষ সীমা পর্যস্ত উপনীত হয়েছিলেন। হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নক্শবন্দ (র.) ফরমায়েছেন ‘ গাফিলতি বা অলসতা দুর হওয়ার নাম হলো জেকের। যখন গাফলাতি দুর হয়ে যাবে তখন সে ব্যক্তি জাকের বলে পরিগণিত হবে।’ তিনি বলতেন যে, যখন আমার আখেরি সময় অর্থাৎ ওফাতের সময় নিকটবর্তী হবে তখন আমি সকলকে শিক্ষা দান করবো কেমন করে মরতে হয়। সুতরাং যখন তাঁর মৃত্যু নিকটবর্তী হলো সেসময় তিনি উভয় হাত দোয়া করার জন্য উঠালেন এবং বহুক্ষণ দোয়া প্রার্থনা করতে লাগলেন। অতঃপর দোয়া শেষ করে যখন উভয় হাত মুখের উপর ফিরালেন তখন তাঁর রুহু শরীর পরিত্যাগ করলো। ওফাতের সময় তাঁর বয়স ছিল ৭৩ বছর। ইমামত তরিকত বা নক্শবন্দিয়া তরিকার ইমাম হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নক্শবন্দ (র.) হিজরি ৭৯১ সালের রবিউল আওয়াল মাসের ৩ তারিখ সোমবার দিন ইন্তেকাল করেন। (লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)।

0
1
fb-share-icon1


© All rights reserved 2021 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
x
error: Content is protected !!