নুসরাত হত্যা- ‘আষাঢ়ে গল্প’ বানানোর চেষ্টা হয়েছিল

নুসরাত জাহান রাফি হত্যার পরিকল্পনাকারীরা স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে গোপন সমঝোতার মাধ্যমে শুরু থেকেই ঘটনাটি ভিন্নভাবে প্রচার করার চেষ্টা চালান। শুধু সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন নন, ফেনীর প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও ঘটনাটি আকারে-ইঙ্গিতে ‘আত্মহত্যা’ বলে উপস্থাপনের চেষ্টা চালিয়েছিলেন। চরম সংকটাপন্ন অবস্থায় নুসরাত যখন বারবার খুনিদের সম্পর্কে নানা তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন, তখনও প্রভাবশালীদের কেউ কেউ তার গায়ে ‘কলঙ্কচিহ্ন’ লেপ্টে দেওয়ার অপচেষ্টা অব্যাহত রাখেন। নানা ‘আষাঢ়ে গল্প’ বানানোর চেষ্টা করে চক্রান্তকারীরা। স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদেরও ষড়যন্ত্রকারীরা ব্যবহারের চেষ্টা চালিয়েছে। ভুল তথ্য পরিবেশন করে তারা ফাঁদ পাতে।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, ফেনীর পুলিশ সুপার, সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সভাপতি ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (রাজস্ব) এবং কমিটির অন্য সদস্যরা কেন ঘটনার গুরুত্ব বুঝতে ব্যর্থ হলেন? নিহতের পরিবার ও স্থানীয় সুশীল সমাজের ভাষ্য, মাদ্রাসাটিকে ঘিরে যে সংঘবদ্ধ দুর্বৃত্ত চক্র গড়ে উঠেছিল, তাদের প্রভাবের কারণে স্থানীয় প্রশাসন ঘটনার সঠিক তদন্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। প্রশাসনের অবহেলাতেই নুসরাতের এই মর্মান্তিক পরিণতি হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের এক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, স্থানীয় প্রশাসন ও মাদ্রাসা পরিচালনা পর্ষদ যথাসময়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে নুসরাত হত্যাকাছ। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শিগগিরই ফেনী প্রশাসনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে রদবদল আসতে পারে। দ্রুতই অবহেলায় জড়িতদের চিহ্নিত করে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এদিকে, নুসরাতের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে আরও তিনজনকে গ্রেফতার করেছে মামলার তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তাদের মধ্যে নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার ঘটনায় কেরোসিন সরবরাহকারী কামরুন নাহার মণিও রয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ছয়জনের বিদেশযাত্রায়ও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। তাদের সব তথ্য ইমিগ্রেশন পুলিশকে দিয়েছে পিবিআই।

এ ছাড়া স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের দায়িত্বে অবহেলার বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। এই কমিটির প্রধান করা হয়েছে পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি এস এম রুহুল আমিনকে। আজ তদন্ত কমিটির সদস্যরা সোনাগাজীর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করবেন।

একাধিক সূত্র জানায়, সোনাগাজী থানার ওসি গণমাধ্যমের কাছে এমন বক্তব্যও দিয়েছেন, ‘নুসরাতের ঘটনাটি আত্মহত্যার চেষ্টা হতে পারে।’ একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে গণমাধ্যমে দেওয়া তার এ বক্তব্য অনেককেই বিস্মিত করেছে। পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তাও বলেন, ঘটনার পরপরই স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের কেউ কেউ অনেকের কাছে বলাবলি করেছেন, এটি ‘আত্মহত্যা’ হতে পারে। নুসরাতের বিপক্ষে যায়- এমন সব যুক্তি সাজানোর চেষ্টা করেন তারা। এমনকি প্রথম দফায় করা মামলাটিও এত দায়সারা ছিল যে তাতে অধ্যক্ষকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। গণমাধ্যম ও নুসরাতের পরিবারের চাপে মামলার এজাহার পরিবর্তন করতে বাধ্য হয় স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন। যদিও পিবিআই আসল সত্য তুলে আনার কারণে নিহতের পরিবার এবং সাধারণ মানুষ পুলিশ প্রশাসন ও তদন্তের ওপর আস্থা হারায়নি।

পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, ওসি মোয়াজ্জেমের একেকটি কর্মকাণ্ড থেকেই সুস্পষ্ট, নুসরাতের অভিযোগ আমলেই নেননি তিনি। নামকাওয়াস্তে মামলা করে মাদ্রাসার অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করেই তিনি দায় সারতে চেয়েছিলেন। এমনকি মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটিও অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। ২৭ মার্চ অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে নিপীড়নের অভিযোগ ওঠার পর, এমনকি তাকে গ্রেফতারের পরও তাকে মাদ্রাসা থেকে বহিস্কার করা হয়নি। উল্টো অধ্যক্ষ মুক্তি পরিষদের ২০ সদস্যকে নেপথ্যে থেকে নানাভাবে ইন্ধন দেওয়া হয়েছে। সারাদেশে তোলপাড় করার পর গভর্নিং বডির টনক নড়ে। মাদ্রাসা থেকে তখন সিরাজকে সাসপেন্ড করা হয়।

নুসরাত হত্যায় জড়িত নুর উদ্দিন ও শাহাদাতের সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিল সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সহসভাপতি রুহুল আমিনের। অধ্যক্ষ সিরাজ গ্রেফতার হওয়ার পর তারই নির্দেশে নুর উদ্দিন, শাহাদাত প্রমুখ মুক্তির দাবিতে আন্দোলনে নামে। নুসরাতের শরীরে আগুন দেওয়ার পর মোবাইল ফোনে রুহুল আমিনকে বিষয়টি জানিয়েছিল শাহাদাত। নুসরাতের ঘটনার পর পুলিশকে ম্যানেজ করার দায়িত্ব রুহুল আমিনের। গ্রেফতার একাধিকজনের বক্তব্যে রুহুলের নাম এলেও এখনও তাকে আটক করা যায়নি। তিনি প্রকাশ্যে রয়েছেন। তার মোবাইল ফোনও খোলা আছে। এর আগে সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি নিয়ম ভেঙে থানায় নুসরাতের বক্তব্য ভিডিও ধারণ করেন, যা ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের ২৬ ধারা অনুযায়ী ফৌজদারি অপরাধ।

ঘটনার পর রুহুল আমিন দাবি করেন, নুসরাতের পরিবার মামলা করার পরপরই তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। যদিও এলাকাবাসী বলছেন, জনরোষ থেকে বাঁচাতে তাকে পুলিশের হাতে দেওয়া হয়।

সেই মণি গ্রেফতার : নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা মামলায় আরও তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা হলো- কামরুন নাহার মণি, জান্নাতুল আফরোজ ও মো. শামীম। শামীমকে মঙ্গলবার সকালে আদালত থেকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। ঘটনার দিন মণি তিনতলা ছাদের ওপর নুসরাতের শরীরে আগুন দিয়েছিল। জান্নাতুল অপর আসামি শামীমের ভাগ্নি।