পদ্মা সেতু রেল প্রকল্পের নতুন নক্সা তৈরির নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

বার্তাকক্ষ : পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্প নতুন করে নক্সা তৈরি করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আন্তর্জাতিক নিয়ম না মেনে গার্ডার তৈরি করায় ও পদ্মা সেতুতে বড় যানবাহন ও লরি, কাভার্ড ভ্যানসহ উচ্চতার যানবাহন চলাচল করতে বাধা ও নানা সমস্যার সৃষ্টি হবে বিধায় ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

নির্মাণে ত্রুটি পেয়ে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প কর্তৃপক্ষকে এর নকশা সংশোধন করতে বলা হয়েছে। মূল সেতু প্রকল্পের কর্মকর্তারা বলছেন, রেললাইন যে উচ্চতায় হচ্ছে, তাতে সড়ক দিয়ে সেতুতে ওঠার সময় লরি আটকে যাবে।

পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প (পিএমবিপি) কর্তৃপক্ষ উদ্বেগ জানানোর পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এ নির্দেশনা দিয়েছে। সেতুর দুই প্রান্তের ভায়াডাক্ট (সেতু থেকে সড়ক পর্যন্ত উড়াল রেললাইন) নকশায় একই সমস্যা আছে বলে জানা গেছে।

জাতীয় মহাসড়কের জন্য আন্তর্জাতিক মান বিবেচনায় প্রস্থ ও উচ্চতা দুই দিকেই জায়গা খুব কম থাকায় ত্রুটিপূর্ণ নকশাটি সংশোধন করার দাবি জানিয়েছে পিএমবিপি কর্তৃপক্ষ।

মূল সেতু প্রকল্পের কর্মকর্তারা বলেছেন, বর্তমান নকশা অনুযায়ী রেলওয়ে ভায়াডাক্ট নির্মাণ করলে আকারে উচ্চ লরিগুলো চলাচল করতে পারবে না। পিবিআরএলপি কর্তৃক করা নকশায় যে আনুভূমিক সীমার কথা বলা হয়েছে, সেটি বাস্তবায়িত হলে দেশের দীর্ঘতম সেতুর সংযোগকারী রাস্তাগুলোকে সংকুচিত করবে।

এদিকে, রেল সংযোগ প্রকল্পের কর্তৃপক্ষের দাবি, ২৫(১) ও ২৫(২) নম্বর পিলার নিয়েই সমস্যা দেখা দিয়েছে। তাদের ঠিকাদার এখন নকশা সংশোধন করছে। এ ছাড়াও, কর্মকর্তারা এখন সংকুচিত জায়গা নিয়ে বিকল্প সমাধান খুঁজতে বুয়েট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করছেন বলে জানা গেছে।

মূল সেতু কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিরোধিতার মধ্যে জুলাইয়ের মাঝামাঝিতে পিবিআরপিএল কর্তৃপক্ষ প্রশ্নবিদ্ধ পিলার নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেয়। তবে, এটি প্রকল্পের সামগ্রিক ব্যয় ও সময়ের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না বলে দাবি করেছে পিবিআরপিএল কর্তৃপক্ষ।

বাংলাদেশ রেলওয়ের পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের (পিবিআরএলপি) পরিচালক গোলাম ফখরুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ নকশা সংশোধন করা জন্য আমাদের কিছু নির্দেশনা দিয়েছে। আমরা সেগুলো অনুসরণ করছি।

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ) দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে সড়ক ও রেল লাইনের মাধ্যমে রাজধানীর সঙ্গে সংযুক্ত করতে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা ব্যয়ে পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। পাশাপাশি, বাংলাদেশ রেলওয়ে ৩৯ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন পদ্মা সেতুর উপরে ১৬৯ কিলোমিটার (ঢাকা থেকে যশোর) রেললাইন ‘পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প’ বাস্তবায়নে কাজ করছে।

ট্রেনগুলো ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার ডাবল ডেক ব্রিজের নিচের ডেক ব্যবহার করবে ও যানবাহনগুলো উপরের রাস্তাটি ব্যবহার করবে। যেহেতু সেতুর দুই পাশের রেলওয়ের ভায়াডাক্টগুলো দীর্ঘ স্লোপ প্রয়োজন, তাই এগুলো ব্রিজের দুই দিকে সংযোগকারী রাস্তার ওপর দিয়ে অতিক্রম করবে।

আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ভায়াডাক্টের নিম্নভাগ থেকে সড়কের উচ্চতা হতে হবে ৫ দশমিক ৭ মিটার। যাতে সব ধরনের যানবাহন চলাচল করতে পারে। এ ছাড়াও, একটি জাতীয় মহাসড়কের আদর্শ প্রস্থ ১৫ দশমিক ৫০ মিটার হওয়া উচিত।

বিষয়টি সমাধানের জন্য গত ১৯ আগস্ট পিবিআরএলপি একটি বৈঠক করেছে ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পাঠানো এক চিঠিতে সমস্যার কিছু বিবরণ দিয়েছে। পদ্মা সেতুর সংযোগকারী রাস্তাটি সেতুর জাজিরা পয়েন্টে রেলপথের ২৫ (১) ও ২৫ (২) পিলারের নিচে দিয়ে যাবে।

মূল সেতু প্রকল্পের কর্মকর্তারা জানান, রেল সংযোগ প্রকল্পের ঠিকাদার যখন পিলার বসাতে রাস্তাটি খনন করেন, তখনই (১৯ জুলাই) ঠিকাদারকে কাজ বন্ধ করতে বলেন তারা। সেসময় উচ্চতা, প্রস্থ ও সংযোগ পয়েন্টের নকশা সম্পর্কে নথিও চেয়েছিলেন।

চিঠিতে জানানো হয়েছে, ঠিকাদার কাজটি বন্ধ করে দেয়। পিবিআরএলপির পক্ষ থেকে সেই নথিগুলো পাঠানো হয়। পিলারের নিচে ও সংযোগকারী রাস্তার মধ্যে উচ্চতার সীমা ৫ দশমিক ৫১ মিটার এবং দুটি পিলারের মধ্যে পাশাপাশি দূরত্ব জায়গা ৯ দশমিক ৬৫ মিটার রয়েছে বলে চিঠিতে জানানো হয়। চিঠিতে আরো জানানো হয়, সংযোগকারী রাস্তার প্রস্থ ৯ দশমিক ৩৬ মিটার রয়েছে।

পিএমবিপি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই উল্লম্ব ও আনুভূমিক সীমা পর্যাপ্ত নয়। উচ্চতায় ৬ মিটার ও প্রস্থে ১৫ দশমিক ৫ মিটার হওয়া উচিত।

চিঠিতে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালে বিবিএর কাছ থেকে মতামত নিয়ে রেল সংযোগ প্রকল্পের নকশা তৈরি করা হয়েছিল। উভয় প্রকল্পের ইন্টারফেস কমিটির বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।

২৫ (১) ও ২৫ (২) পিলারের পাইল স্থাপন এবং ২৭ থেকে ৪৭ পর্যন্ত সব পিলার নির্মাণের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। সুতরাং রেললাইনের স্তর পরিবর্তন করা সম্ভব না। তাই পিবিআরপিএল কর্তৃপক্ষ ভায়াডাক্টের উচ্চতা যা আছে তা রেখে সংযোগ সড়কের স্তরকে কমিয়ে দেয়ার পরামর্শ দিয়েছিল। তবে, পিএমবিপি জানিয়েছে, নকশাটি মোটেই গ্রহণযোগ্য না।

এ বিষয়ে রেলপথ সচিব সেলিম রেজা গণমাধ্যমকে বলেন, পদ্মায় রেলসেতু লিংক প্রকল্পের কাজ সরেজমিনে দেখতে শুক্রবার প্রকল্পে গিয়েছিলাম সেতু বিভাগের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে সঙ্গে নিয়ে। মূলত গার্ডার নিয়ে একটি সমস্যা তৈরি হয়েছে। সেটি তেমন বড় কোন সমস্যা নয়। পুরো সেতুর নকশা রি-ডিজাইন করতে হবে এমনটা নয়।

তিনি বলেন, ডিজাইন নিয়ে একটু সমস্যা ছিলো তা আমরা সেতু কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতেই সাইট ভিজিট করেছি। তবে যেটুকু ছোটখাট সমস্যা ছিলো তা সমাধানে আমাদের টেকনিক্যাল টিম কাজ করছে। অতিদ্রুতই তা সমাধান করা হবে।