ঢাকাসোমবার , ১১ অক্টোবর ২০২১

পদ্ম ফুলেই জীবন জীবিকা নাজিম উদ্দিনের!

News Pabna
অক্টোবর ১১, ২০২১ ৯:২১ অপরাহ্ণ
Link Copied!

মোঃ নূরুল ইসলাম, চাটমোহর, পাবনা : জীবন জীবিকা নির্বাহে মানুষ বিচিত্র পেশার আশ্রয় নিয়ে থাকেন। অপেক্ষাকৃত দরিদ্র সুবিধা বঞ্চিত এমন অনেক মানুষ আছেন যারা পুজির অভাবে সম্পৃক্ত হতে পারেন না ব্যবসা বানিজ্যে। নিজের শ্রমকে পুজি করে অর্থ উপার্জন করেই সংসার পরিচালনা করতে হয় তাদের। এজন্য তাদের সংগ্রামও করতে হয় নিরন্তর।

এরকমই একজন সংগ্রামী মানুষ পাবনার চাটমোহর উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের ধরইল মৎসজীবি পাড়ার বাসিন্দা নাজিম উদ্দিন (৬০)। গত ৬ বছর যাবত চাটমোহর ও এর পার্শ্ববর্তী বিলসমূহ থেকে পানিতে ভাসমান জলজ উদ্ভিদ এর মনোলোভা পদ্ম ফুল তুলে বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি। মানুষের উদ্ভিদ নির্ভতার এটিও একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

নাজিম উদ্দিন বলেন, “প্রতিটি মানুষ যার যার অবস্থান থেকে স্বচ্ছল ভাবে চলার স্বপ্ন দ্যাখে। চলার চেষ্টা করে। ছোট বেলা থেকে অভাবের মধ্যে বড় হই। পড়া লেখা করতে পারিনি। স্ত্রী, দুই ছেলে এক মেয়ে আর আমি এ পাঁচজনের সংসার পরিচালনা করতাম। বড় ছেলে আজদুল পড়া লেখা করেনি। কর্মক্ষম হবার পর বিয়ে দিলে স্বস্ত্রীক পৃথক সংসার পাতে।

মাছ ধরার খলসুনী বানিয়ে হাটে হাটে বিক্রি করে। মেজ মেয়ে রাহিলাকে অনেক কষ্টে ৪০ হাজার টাকা যৌতুকে ডাহিয়া গ্রামে বিয়ে দেই। এখন ছোট ছেলে সাইদুল, তার স্ত্রী ও আমরা স্বামী স্ত্রী এ চারজনের সংসার পরিচালনা করতে হয় আমাকে। সাইদুল খলসুনী বানিয়ে বিক্রি করে আমাকে কিছু সহায়তা করে। কয়েক বছর আগে আমার স্ত্রী খাজুরবি খাতুনের পায়ে সেপটিক ঘা হয়। অনেক টাকা পয়সা খরচ করে চিকিৎসা করাই। কিন্তু তা কোন কাজে আসে না।

অবশেষে বছর তিনেক আগে তার পা কেটে ফেলতে বাধ্য হই। আমি ভূমিহীন ছিলাম। চাটমোহরের বিল কুরুলিয়ার খাস জমি বন্দোবস্তের সময় ১০ কাঠা খাস জমি বন্দোবস্ত পেয়েছি। ধান হলে এতে কয়েক মাসের পেটের ভাত হয়। দৈনিক অন্তত তিনশ টাকা সংসার খরচ। এছাড়া কাপড় চোপর রোগ ব্যাধিসহ অন্যান্য প্রয়োজনও মেটাতে হয়। বয়স হয়ে যাওয়ায় এখন আর আগের মতো কাজ করার সক্ষমতা ও নেই। তা ছাড়া পরের বাড়ি কাজ করতে ভাল ও লাগে না।

তাই বছরের ৬ মাস বৈশাখ থেকে আশ্বিন বিলকুরুলিয়া, সাতৈল বিল, গল্যার বিলসহ বিভিন্ন জলাশয় থেকে লাল পদ্ম ফুল তুলে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছি। খুব ভোড়ে ঘুম থেকে উঠে নৌকা নিয়ে বিলে চলে যাই। সকাল সকাল ফুল তুলে পাবনার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া ও নাটোরের গুরুদাসপুরের বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করি। একেক দিন একেক এলাকায় যাই।

স্কুল কলেজের গেটসহ রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ফুল বিক্রি করি। ৪ থেকে ৫ টাকা জোড়া ফুল বিক্রি করি। বিকেল নাগাদ রাস্তার অলি গলিতে কয়েক কিলমিটার হেটে ফুল বিক্রি করি। কখনো কখনো কিছু ফুল অবিক্রিত থেকে যায়। কাছাকাছি কোথাও মেলা খেলা বা অন্য কোন অনুষ্ঠানাদী হলে সেখানে চলে যাই ফুল বিক্রি করতে। এভাবেই পদ্ম ফুল বিক্রি করে কোন মতে জীবন জীবিকা নির্বাহ করছি”।

কেবল নাজিম উদ্দিন নয় এমন আরো অনেক অভাবী মানুষ বিল ঝিল হাওর বাওর থেকে পদ্ম ফুল তুলে বিক্রি করে সংসার পরিচালনা করছেন। যেসব বিল খালে সারা বছর পানি জমে থাকে এমন জায়গা গুলোতে এ উদ্ভিদ জন্মে। বর্ষা ও শরৎ কালে এ ফুল বেশি ফুটে থাকে। পদ্মের লাল গোলাপী ও সাদা রঙের সুগন্ধি ফুল মানুষকে আকৃষ্ট করে।

এর মূল কান্ড ও ফুলের বীজ খাওয়া যায়। শুভ্রতার প্রতীক বলে পুজো পার্বনেও ফুলের রানী পদ্মের ব্যবহার পরিণক্ষিত হয়। কবি সাহিত্যিকেরা সাহিত্যের পরতে পরতে লিখে রেখেছেন পদ্ম ফুলের কথা। প্রকৃতি প্রেমীরা সৈন্দর্যে তৃষ্ণা মেটাতে ছুটে যান পদ্ম সমৃদ্ধ বিল খাল জলাশয়ের পাশে।