বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২০, ০৭:০৬ পূর্বাহ্ন

আতঙ্কিত হবেন না
করোনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

পাবনায় প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধ

আমিরুল ইসলাম রাঙা
১৯৭১ সালের ২৮ এবং ২৯ মার্চ পাবনায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল। দুইদিনব্যাপী যুদ্ধে পাবনায় অবস্থানরত সমস্ত পাকসেনাদের হত্যা করে পাবনাকে হানাদার মুক্ত করা হয়েছিল। ১০ এপ্রিল পর্যন্ত পাবনা মুক্তাঞ্চল ছিল। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এটি ছিল এক বিরল ঘটনা। যে যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিল পাবনার সর্বস্তরের জনগন।

আমিরুল ইসলাম রাঙা

১৯৭১ সালের মার্চ মাস। স্বাধীনতার দাবীতে উত্তাল গোটা দেশ। ১ মার্চ থেকে অসহযোগ আন্দোলন, ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পতাকা উত্তোলন, ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ, ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষন। সব মিলিয়ে ২৫ মার্চ পর্যন্ত একদিকে স্বাধীকার আন্দোলন অন্যদিকে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রস্তুুতি । ২৫ মার্চ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর সাথে পাকজান্তাদের ক্ষমতা হস্তান্তরের আলোচনা অন্যদিকে ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষনের পর থেকেই ছাত্র, তরুন, যুবকদের মুক্তিযুদ্ধের প্রস্ততি গ্রহন চলতে থাকে।

৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষনের পর পাবনায় স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোঃ আমজাদ হোসেনকে আহবায়ক করে সাত সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠিত হয়। কমিটির সদস্যরা হলেন, আব্দুর রব বগা মিয়া ( এমপিএ), এডভোকেট আমিন উদ্দিন ( এমপিএ), দেওয়ান মাহবুবুল হক ফেরু ( আওয়ামী লীগ নেতা), গোলাম আলী কাদেরী ( আওয়ামী লীগ নেতা), আমিনুল ইসলাম বাদশা ( ন্যাপ নেতা) ও আব্দুস সাত্তার লালু ( জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি)। ২৫ মার্চের পর তৎকালীন জেলা প্রশাসক নুরুল কাদের খান এবং পুলিশ সুপার আবদুল গাফফার উক্ত কমিটির সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন।

৭ মার্চের পর থেকে গোটা দেশে পাক সরকারের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন তীব্র আকার ধারন করে। হরতাল, অবরোধ এবং মিটিং মিছিলের সাথে জেলা ছাত্রলীগের নেতৃত্বে পাড়া মহল্লায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কমিটি গঠন করা হয়। সেই সাথে ছাত্রলীগের উদ্যোগে তরুণ যুবকদের সংগঠিত করে সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয় । পাবনা শহরে জেলা স্কুল মাঠ, জিসিআই স্কুল মাঠ, নয়নামতি অভিযান ক্লাব এবং রাধানগর মক্তবপাড়ায় অধিনায়ক ক্লাবের উদ্যোগে প্রশিক্ষন কার্যক্রম শুরু হয়। বাঁশের লাঠি ও স্কাউটদের ব্যবহৃত ডামী রাইফেল দিয়ে ট্রেনিং দেওয়া হতো। স্কুলের স্কাউট স্যার, আনসার এবং অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকরা প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন।

২৫ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনী সারাদেশে একসাথে অবস্থান গ্রহন করে। ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন জেলায় অপারেশন সার্চ লাইটের নামে হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। পাবনায় ২৬ মার্চ ভোর থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী তথ্য অফিসের গাড়ীতে কার্ফ্যু আইন জারীর ঘোষনা দেয় । সমস্ত মানুষকে ঘরের মধ্য থাকতে বলা হয় । রাস্তায় বের হলে গুলি করা হবে। মুহুর্তে গোটা শহর যেন নীরব হয়ে গেল। বাইরে কি হচ্ছে বুঝার বা জানার উপায় নাই। তখন সারাদেশের কি অবস্থা তা জানার একমাত্র মাধ্যম হলো রেডিও। সেটা থেকে ভারতের আকাশবানী, বিবিসি এবং ভয়েস অব আমেরিকার সংবাদ ছাড়া প্রকৃত ঘটনা জানার উপায় নাই । পাবনা শহরে মাঝে মাঝে সেনাবাহিনীর গাড়ীর শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ নাই।

২৭ মার্চ সকাল থেকেই পাড়ায় পাড়ায় তরুন, যুবকরা সংঘটিত হচ্ছে। পাশাপাশি উৎসুক জনতা সমাবেত হওয়ায় ক্রমেই কার্ফ্যু আইন দুর্বল হয়ে পড়ছে। বিকাল সন্ধ্যার মধ্যে খবর আসতে থাকলো বহু মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ২৫ মার্চ রাতেই শহর থেকে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য এডভোকেট আমিন উদ্দিন, ভাসানী ন্যাপের জেলা সভাপতি ডাঃ অমলেন্দু দাক্ষী, তৃপ্তি নিলয় হোটেলের মালিক সাঈদ তালুকদার, মোশাররফ হোসেন মুক্তার, অধ্যাপক শফিকুল হায়দার, মুছা মোক্তার, এডরুক ঔষধ কারখানার মালিক আবদুল হামিদ খান, সিগারেট কোম্পানির এজেন্ট হাবিবুর রহমান, পৌরসভার ট্যাক্স কালেক্টর খালেক তালুকদার, কাপড় ব্যবসায়ী সাহাজ উদ্দিন মুন্সি সহ প্রায় শতাধিক মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

২৫ মার্চ রাতে রাধানগর এলাকায় নক্সাল নেতা মাসুদের বাড়ীতে মটর শ্রমিক শুকুর আলীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ২৬ মার্চ সন্ধ্যার পর কৃ্ষ্ণপুরে শুকুর আলীর জানাজা নামাজের সময় সেনাবাহিনীর টহলদল মুসল্লিদের উপর গুলিবর্ষণ করে। এতে শেখ আব্দুস সামাদ নিহত এবং মাওলানা ইব্রাহিম হোসেন ও শেখ বদিউজ্জামান আহত হয়। ২৭ মার্চ দিনভর পাড়ায় পাড়ায় তরুন-যুবকরা, লাঠি-ফালা, তীর-ধনুক এবং দেশী অস্ত্র নিয়ে সংঘটিত হতে থাকে। পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় লাইসেন্সকৃত বন্দুক সংগ্রহ ও স্থানীয় বোমা সংগ্রহের কাজ চলতে থাকে।

২৭ মার্চ রাত থেকেই থেমে থেমে গুলির শব্দ শুরু হলো। রাত যত বাড়ছে গুলির শব্দ তত বাড়ছে। তখন পাড়া মহল্লা জনতার দখলে। মধ্য শহরে টেলিফোন একচেঞ্জে একদল সৈনিককে অবরুদ্ধ করে চতুর্মুখী আক্রমন করা হয়। পাকিস্তান সেনাদের আরেকটি দল শহরের উপকন্ঠ বিসিক শিল্পনগরীতে আটকা পড়ে আছে। পাবনার ডিসি এবং এসপি’র নির্দেশে পুলিশ লাইনের অস্ত্রাগার খুলে দেওয়া হয় । তখন পুলিশ সহ ছাত্র-জনতা পাকসৈন্যদের উপর ব্যাপক গোলাবর্ষণ শুরু করে। সারারাত ধরে গুলাগুলি চলার পর ভোর থেকে তুমুল আক্রমন শুরু হয় । দুপুরের আগেই টেলিফোন একচেঞ্জে অবস্থানরত ২৮ জন পাকসেনাকে হত্যা করা হয়। ২৮ মার্চ টেলিফোন একচেঞ্জ দখল করার পর একইদিন লস্করপুর ( বর্তমান বাস টার্মিনাল) আর্মী চেকপোস্টে আক্রমন করা হয়। লস্করপুর যুদ্ধে ৩ জন এবং বালিয়াহালট গোরস্থান যুদ্ধে ২ জন পাকসেনাকে হত্যা করা হয়। লস্করপুর যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে শহীদ হন শামসুল আলম বুলবুল ( যার নামে সরকারী শহীদ বুলবুল কলেজ), আমিরুল ইসলাম ফুনু, মুকুল এবং আফসার উদ্দিন।

২৯ মার্চ সকালের দিকে মুক্তিকামী জনতা বিসিক শিল্পনগরীতে অবস্থিত পাকবাহিনীর ক্যাম্প আক্রমন করে। এদিকে বিসিকে আটকে পড়া সেনাদের উদ্ধারে রাজশাহী সেনানিবাস থেকে বেশ কয়েকটি ট্রাক নিয়ে পাবনা অভিমুখে রওয়ানা হয়। আকাশে জঙ্গীবিমানের ছত্রছায়ায় ট্রাকগুলি পাবনা বিসিকে প্রবেশ করে আটকে পড়া সৈন্যদের নিয়ে মানসিক হাসপাতাল থেকে পাকশী অভিমুখে রওয়ানা হয়। পথিমধ্যে দাপুনিয়া, মাধপুর, দাশুড়িয়া হয়ে লালপুর পৌছানোর আগেই সকল সৈন্য নিহত হয়। অসমর্থিত সুত্রে জানা যায়, পাবনার প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধে মেজর আসলাম সহ প্রায় ২ শতাধিক পাকিস্তানী সৈন্য নিহত হয়েছিল। এদিকে পলায়নরত পাকিস্তানী সৈন্যদের সাথে মালিগাছা যুদ্ধে আটঘরিয়া থানার দারোগা আব্দুল জলিল শহীদ হন। মাধপুর, দাশুড়িয়া, ঈশ্বরদী, লালপুর পর্যন্ত প্রতিরোধ যুদ্ধে প্রায় ১২ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয় । বিসিক মুক্ত হবার পর পাকসেনাদের হাতে আটক সংসদ সদস্য এডভোকেট আমিন উদ্দিন, ন্যাপ নেতা ডাঃ অমলেন্দু দাক্ষী, সাঈদ তালুকদার, রাজন পাগল সহ অজ্ঞাত অনেকের ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ পাওয়া যায়।

২৯ মার্চ পাবনা প্রথম জেলা হিসেবে হানাদার মুক্ত হয় । ১০ এপ্রিল পর্যন্ত পাবনা শত্রু মুক্ত থাকে। প্রায় ১২ দিন পাবনার ঘরে ঘরে মানচিত্র খচিত লাল সবুজ পতাকা উড়েছে। এই বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধে যাদের অগ্রণী ভূমিকা ছিল, তাঁরা হলেন পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আমজাদ হোসেন এমএনএ, সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রব বগা মিয়া এমপিএ, ন্যাপ নেতা আমিনুল ইসলাম বাদশা, রনেশ মৈত্র, আওয়ামী লীগ নেতা গোলাম আলী কাদেরী, দেওয়ান মাহবুবুল হক ওরফে ফেরু, ওয়াজি উদ্দিন খান, নবাব আলী মোল্লা, পাবনা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আব্দুস সাত্তার লালু, সাধারন সম্পাদক রফিকুল ইসলাম বকুল সহ প্রমুখ নেতৃবৃন্দের। পাবনার প্রতিরোধ যুদ্ধের সেই গৌরবময় ইতিহাসের কথা লিখতে গেলে আরো কয়েকজন বরেন্য ব্যক্তির কথা বলতে হবে, তাঁদের একজন পাবনার তৎকালীন জেলা প্রশাসক নূরুল কাদের খান। যিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া প্রথম জেলা প্রশাসক এবং আরেকজন হলেন তৎকালীন পুলিশ সুপার আব্দুল গাফফার।

প্রসঙ্গগত উল্লেখ্য যে, পাবনার প্রতিরোধ যুদ্ধের কথা লিখতে গেলে আরো কিছু বিষয়ে বলা দরকার।প্রতিরোধ যুদ্ধে তৎকালীন ভাসানী ন্যাপের ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের নেতা টিপু বিশ্বাস যারা পাবনায় নক্সাল নামে পরিচিত। তারা প্রথমদিকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ভূমিকা রাখলেও পরবর্তীতে তারা মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে ভুমিকা রেখেছিল । এছাড়া প্রতিরোধ যুদ্ধে ছাত্র ইউনিয়নের ( মতিয়া) রবিউল ইসলাম রবি ও শিরিন বানু মিতিল সহ তাদের নেতাকর্মী গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছিল। প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধে ছাত্রলীগের ইকবাল হোসেন, সাহাবুদ্দিন চুপ্পু, বেবী ইসলাম, মোঃ ইসমত ,ফজলুল হক মন্টু, মোখলেছুর রহমান মুকুল, সাঈদ আকতার ডিডু প্রমুখ ছাত্রনেতাদের গুরুত্বপূর্ন ভুমিকা ছিল। তাঁদের সেই সাহসী ভুমিকার কথা ইতিহাসের পাতায় উজ্জল হয়ে থাকবে। মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে পাবনার প্রতিরোধ যুদ্ধটি ছিল প্রথম জনযুদ্ধ, প্রথম জেলা হিসেবে হানাদার মুক্ত করা সহ পাকিস্তানি সেনাদের হাতে প্রথম সংসদ সদস্য এডভোকেট আমিন উদ্দিন নিহত হওয়ার বিষয়গুলি উল্লেখযোগ্য ।

পরিশেষে পাবনার প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধে জীবন উৎসর্গকারী বীর শহীদদের স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা এবং অসীম সাহসী সেই বীর জনতার প্রতি সশ্রদ্ধ সালাম জানিয়ে এই লেখা শেষ করছি। শহীদ স্মৃতি অমর হোক – বাংলাদেশ দীর্ঘস্থায়ী হোক। জয় বাংলা। (সমাপ্ত)

লেখক পরিচিতি-
আমিরুল ইসলাম রাঙা
রাধানগর মজুমদার পাড়া
পাবনা।


About Us

COLORMAG
We love WordPress and we are here to provide you with professional looking WordPress themes so that you can take your website one step ahead. We focus on simplicity, elegant design and clean code.

© All rights reserved 2020 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial