শুক্রবার, ২২ অক্টোবর ২০২১, ০৬:১৬ পূর্বাহ্ন

কুমিল্লায় পবিত্র কোরান অবমাননা সংক্রান্ত খবরটির প্রতি সরকারের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে সকলকে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য অনুরোধ করা যাচ্ছে।- ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়

পাবনার আকাশে বিজয় পতাকা

|| কামরুন্নাহার||

১৯৭১ সালে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে পাবনার অবস্থান ছিল অন্যান্য জেলার চেয়ে ভিন্ন। পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের প্রথম প্রহরে জেলা প্রশাসক নূরুল কাদের খানের নেতৃত্বে এক রক্তক্ষয়ী প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলে। এই প্রতিরোধ যুদ্ধে শামিল হয়েছিল ছাত্র, শিক্ষক, যুবক, কৃষক, শ্রমিকসহ আপাময় সাধারণ মানুষ পাকিস্তানি বাহিনী প্রথম পর্যায়ে এতটা প্রতিরোধের মুখোমুখি অন্য কোনো জেলায় হয়নি। এই প্রতিরোধ যুদ্ধ পাকিস্তানি বাহিনীর পরবর্তী কর্মকাণ্ডে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে। পাবনা ছিল দেশের অভ্যন্তরীণ একটি জেলা। ভারত সীমান্তের সঙ্গে যুক্ত না হওয়ার কারণে মুক্তিবাহিনীর তত্পরতা এই জেলার কিছুটা দেরিতে শুরু হয়। ঐ অঞ্চলে নকশালপন্থি তত্পরতা ছিল লক্ষণীয়। নকশালদের এক অংশ পাকিস্তানি বাহিনীকে সাহায্য করে। বৃহত্ অংশ দেশের ভিতরে থেকেই পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নেয়। মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ ৯ মাস আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণ, মুক্তাঞ্চল সৃষ্টিতে এ জেলার মুক্তিযোদ্ধারা সাহসিকতার সঙ্গে নানা অভিযান অব্যাহত রেখেছিল। নভেম্বরের শেষদিকে এবং ডিসেম্বরের প্রথম থেকেই জনগণের মধ্যে উত্সাহ ও উদ্দীপনা বাড়তে থাকে। জেলার বিভিন্ন হাট-বাজারের গুঞ্জন আর বেশি দেরি নাই। খুব শিগগিরই মুক্ত হবে দেশ। ৩ ডিসেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বেতার ভাষণ এবং ৪ ডিসেম্বর মধ্যরাত হতে পাক-ভারত যুদ্ধ তথা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে ৬ ডিসেম্বর ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ইতোমধ্যে ভারতীয় সেনা, বিমান এবং নৌবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী ঐক্যবদ্ধভাবে দেশে প্রবেশ করে চারদিক থেকে দখলদার পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর উপর আক্রমণ শুরু করে। যশোর সেনানিবাসে পাকিস্তানি বাহিনীর পতন ঘটে। তাদের গোলাবারুদসহ দুর্বারগতিতে পালিয়ে এসে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পেরিয়ে পাবনা জেলায় আশ্রয় নেয়। পাবনা জেলার ফরিদপুর থানা আক্রমণ করতে বড়াল ব্রিজ ও বাঘাবাড়ী ঘাট থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর আসার রাস্তা বিচ্ছিন্ন করে প্রচণ্ড প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়। শেষ পর্যন্ত পার্শ্ববর্তী উল্লাপাড়া থানার আব্দুল লতিফ ও শামসুল ইসলামের নেতৃত্বে ৪ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা থানা আক্রমণ করে যুদ্ধের মধ্যদিয়ে পাকসেনাদের বিতাড়িত করে ৫ ডিসেম্বর প্রথম ফরিদপুর থানা মুক্ত করে বিজয় উল্লাসে মেতে ওঠে।

১১ ডিসেম্বর ভোর ৬টার সময় ইকবাল হোসেন, মকবুল হোসেন, রফিকুল ইসলাম বকুল, সন্টু, জহুরুল ইসলাম বিশু, মন্টু, মো. ইসমত ও প্লাটুন কমান্ডার দুলালের নেতৃত্বে সুজানগর থানা ও হাইস্কুল আক্রমণ করলে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের গুলির শব্দে জনগণও তাদের সঙ্গে যোগ দিলে বাংকারে অবস্থানরত রাজাকার ও মিলিশিয়াদের সকলকেই মেরে ফেলে। এরপর ১৪ ডিসেম্বর পাবনা থেকে আগত হানাদার বাহিনী ও রাজাকারদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের তারাবাড়িয়া এবং সুজানগর আতাইকুলা রাস্তায় যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এদিন হানাদার বাহিনী নাজিরপুর গ্রামে প্রায় ৫৮ জনকে গুলি করে হত্যাসহ সুজানগরে তিনদিনের যুদ্ধে নুরুল ইসলাম নুরু, মোস্তফা কামাল দুলাল, মো. আবু বকর এবং ইব্রাহীম জলিলসহ কয়েকজন যোদ্ধা শহীদ হন। মুক্ত সুজানগর থানার দায়িত্ব গ্রহণ করেন ইকবাল। অন্যদিকে ১১ ডিসেম্বর আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা আটঘরিয়া থানা আক্রমণ করে সারারাত পাকসেনা ও রাজাকারদের সঙ্গে প্রচণ্ড যুদ্ধ করে সূর্যোদয়ের পূর্বেই তারা নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যায়। কিন্তু সূর্যোদয়ের পরে পুনরায় আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে হানাদার বাহিনী পাবনা সার্কিট হাউজে পালিয়ে যাওয়ায় মুক্তিযোদ্ধারা মুক্ত থানায় মানচিত্র খচিত বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে।

১৪ ডিসেম্বর মিত্রবাহিনীর চারটি বোমারু বিমান বাঘাবাড়ি ঘাটে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পে বোমাবর্ষণ করলে ছত্রভঙ্গ হয়ে পলায়ন করে। ধীতপুরে চৌহালী থানার জয়নুল কমান্ডারের নেতৃত্বে জহিরুল ইসলাম এস.এম আমীর আলীসহ পার্শ্ববর্তী অন্যান্য থানার অনেক মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। এদিকে পাবনা জেলার চাটমোহর ও ঈশ্বরদী থানা ১৬ ডিসেম্বরের পরেও পাকবাহিনীর দখলে থাকায় ১২ ডিসেম্বর প্লাটুন কমান্ডার মোজাম্মেল হক ময়েজ, মুজিব বাহিনীর টুআইসি ইদ্রিস আলী চঞ্চল এবং এ.এস.এম মোজাহারুল হকের পরিকল্পনা অনুসারে চাটমোহর থানা চারদিক হতে আক্রমণ করলে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রচণ্ড যুদ্ধ টিকতে না পেরে পাকসেনারা পতাকা বৈঠকের মধ্যদিয়ে ছদ্মবেশী এবং রফিকুল ইসলাম বকুলকে মিত্রবাহিনী ভেবে আত্মসমর্পণ করলে মুক্ত হয় থানা। অন্যদিকে ঈশ্বরদী থানায় ইক্ষু গবেষণা কেন্দ্র, রেশম বীজাগার, আলহাজ সুতাকলে পলায়নরত পাকসেনারা অবস্থান করে মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের ইচ্ছা প্রকাশ করে। ১৮ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা বিনা বাধায় ঈশ্বরদী শহরে প্রবেশ করলেও ১৯ ডিসেম্বর অবাঙালিদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে এবং রফিকুল ইসলাম বকুলের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত এবং শেষপর্যন্ত ২১ ডিসেম্বর ভারতীয় সেনা ১৬৫ রঘুবীর সিং পান্নুর নিকট আত্মসমর্পণের মধ্যদিয়ে মুক্ত ঈশ্বরদী থানায় বিজয় পতাকা ওড়ে।

লেখক: পিএইচডি গবেষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

0
1
fb-share-icon1


© All rights reserved 2021 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
x
error: Content is protected !!