পাবনার ঐতিহ্যবাহী গাজনার বিলের মুখে একাধিক অবৈধ সোঁতি বাঁধ

সুজানগর সংবাদদাতা : পাবনা সুজানগর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী গাজনার বিলের মুখে একাধিক অবৈধ সোঁতি বাঁধ নির্মাণ করে মাছ ধরা, স্লুইসগেটের পাল্লা বন্ধ রাখা ইত্যাদির কারনে গাজনার বিল ভরে আছে কচুরিপানায়।

বিপাকে রয়েছে হাজারও কৃষক।

পাবনার অনেকের কাছে বিল গণ্ডহস্তী নামে পরিচিত। শস্য-মৎস্য সম্পদসহ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি পাবনার এ বিল গাজনার জমির পরিমাণ ১৭ হাজার হেক্টর।

বিপুল সম্ভাবনাময় এবং একসময়ে বিলপাড়ের মানুষের কাছে সোনার খনি খ্যাত এ বিল গাজনা এখন তাদের শুধুই দুঃখ। কিন্তু সেটি প্রাকৃতিক নয়, প্রভাবশালী ও স্বার্থান্বেষী মহলের সৃষ্ট।

৩-৪ বছর ধরে বিলের মুখে পাউবোর স্লুইচগেটের পাল্লা বন্ধ রেখে অবৈধ সোঁতিবাঁধ দিয়ে প্রভাবশালীদের মাছ শিকারের কারণে জলাবদ্ধতাসহ বিলের ৯০ ভাগই ভরে গেছে কচুরিপানায়।

এ কচুরিপানা অপসারণ ব্যয়বহুল হওয়ায় কৃষক পড়েছেন বিপাকে। ফলশ্রুতিতে কমপক্ষে ১০ হাজার হেক্টর জমি অনাবাদি থাকার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এদিকে কয়েক বছর আগে গাজনা বিল উন্নয়নের নামে জলে গেছে সরকারি প্রায় সোয়া ৪শ’ কোটি টাকা। প্রাপ্ত তথ্যমতে, স্বাধীনতার আগে পদ্মা-যমুনা এবং শাখা বাদাই ও আত্রাই নদীর পানিতে গাজনা বিলসহ পাবনা জেলার ৯০ শতাংশ প্লাবিত হতো।

স্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাবনা জেলাকে বন্যামুক্ত করার বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণ করেন এবং ১৯৭২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি বেড়া উপজেলার নগরবাড়িতে ১৫৮ কিলোমিটার দীর্ঘ বন্যা নিয়ন্ত্রণ ‘মুজিব বাঁধ’ নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন।

এই বাঁধ নির্মাণের ফলে গাজনা বিল, বিল গ্যারকাসহ এ অঞ্চলের কৃষি, অর্থনীতিসহ প্রাকৃতিক পরিবেশ বদলে যায়।

এ অবস্থার মধ্যে ২০১২ সালে ৪১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে গাজনার বিল বহুমুখি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়, কৃষি, প্রাণী সম্পদ, বনবিভাগ, পাউবো, মৎস্য বিভাগ, এলজিইডিসহ বিভিন্ন সরকারি বিভাগ। এলজিইডি ৪৩টি সাবমারসিবল পাকা রোড নির্মাণ করা। কিন্তু এসবের মধ্যে, একমাত্র এলজিইডির কিছু সাবমারসিবল রোড ছাড়া বিলে কিছুই দৃশ্যমান নেই।

বিশাল বিলের যেদিকে চোখ যায়, শুধু কচুরিপানা আর কচুরিপানা। বিলের পূর্বে যমুনার শাখা বাদাই নদীর মুখে পাউবোর স্লুইচ গেটে পানি বন্ধ রেখে অবৈধ সোঁতিবাঁধ দিয়ে মাছ শিকার করছেন স্থানীয় প্রভাবশালীচক্র।

জেলা কৃষকলীগের সম্পাদক তৌফিকুর আলম তৌফিক বলেন, সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর অবহেলা, অব্যবস্থাপনা এবং দুর্নীতির কারণে বিলের এ অবস্থা হয়েছে।

তিনি বলেন, ৩-৪ বছর ধরে প্রভাবশালী মহল বিলের পানি বন্ধ রেখে অবৈধ সোঁতিবাঁধ দিয়ে মাছ শিকার করায় পুরো বিলের কচুরিপানা বের হতে পারছে না।

ফলশ্রুতিতে এখন বিলের ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হতে বসেছে।

জেলা পল্লী উন্নয়ন সমবায় ফেডারেশনের চেয়ারম্যান কৃষক নেতা হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, ২০১২ সালে গাজনার বিল উন্নয়নের জন্য যে সোয়া ৪শ’ কোটি টাকা ব্যয় করা হয় তা কোনো কাজে আসেনি।

তিনি বলেন, এ প্রকল্পের একমাত্র এলজিইডির কিছু সাবমারসিবল রোড ছাড়া বিলে কিছুই দৃশ্যমান নেই।

বিল গাজনার সমস্যার কথা স্বীকার করে জেলা কৃষি বিভাগের উপপরিচালক কৃষিবিদ আজাহার আলী (অতিরিক্ত পরিচালক পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত) বলেন, গাজনা অপার সম্ভাবনার একটি বিল।
এটি শস্য ও মৎস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত।

তিনি বলেন, পাবনা জেলা দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পেঁয়াজ উৎপাদনের জেলা। এর মধ্যে শুধু গাজনার বিলেই ৯ হাজার হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। কিন্তু জলাবদ্ধতা ও কচুরিপানার কারণে এ আবাদ ব্যাহত হচ্ছে।

পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. নাজমুল ইসলাম বলেন, অনুপম সৌন্দর্যের আধার বিল গাজনার জলাবদ্ধতা ও কচুরিপানা অপসারণ করে এর সুস্থ প্রাকৃতিক ও বিনোদনের পরিবেশ ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি।

পাবনা পাউবো’র নির্বাহী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) আহম্মদ উল্লাহ জানান, স্থানীয়ভাবে সুবিধাভোগী একাধিক মহল স্লুইচ গেটের পানি অপারেটিং করে থাকেন। পাউবো শুধু অবকাঠামোগত বিষয়টি দেখভাল করে থাকে।

পাবনার জেলা প্রশাসক কবীর মাহমুদও গাজনার বিলের সমস্যার কথা স্বীকার করে বলেন, তাদের একার পক্ষে সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়।