মঙ্গলবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২০, ০৩:০৩ অপরাহ্ন

আতঙ্কিত হবেন না
করোনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

পাবনার গাজনার বিলে হঠাৎ বন্যায় কৃষকের সর্বনাশ

পাবনার গাজনার বিলে হঠাৎ বন্যায় কৃষকের সর্বনাশ

image_pdfimage_print

বার্তাকক্ষ : পাবনার সুজানগর উপজেলার গাজনার বিল এলাকার চাষি নবী শেখ জানান, তিনি এবার ১০ বিঘা জামিতে বোরো চাষ করেছিলেন। অতিবৃষ্টি আর বিলে অকাল বন্যায় ফলন ভালো হয়নি। পুষ্ট হওয়ার আগেই ধান কেটে নিতে হচ্ছে। বিঘাপ্রতি প্রায় চার হাজার টাকা ক্ষতি হবে তাঁর।

বাঁধেরহাট-সুজানগর সড়কের (মুজিব বাঁধ) সাগরকান্দি গ্রামে বাদাই নদের ওপর পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্লুইসগেট। এই স্লুইসগেট খোলা থাকায় আকস্মিক বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে বিলের ১ হাজার ৩০০ হেক্টরের বোরো ধান ও প্রায় ২ হাজার হেক্টরের পাট।

যমুনার পানি গাজনায় প্রবেশ করে সাধারণত আষাঢ় মাসের শেষ দিকে। এবার বাদাই নদের স্লুইসগেট দিয়ে আগাম পানি এসেছে। এ ছাড়া এবার অতিবৃষ্টি হয়েছে। সেই পানিও বিলে আটকে গেছে।

গতকাল রোববার (০৭ মে) সেখানে গিয়ে দেখা যায়, গেটের ছয়টি কপাটের প্রথম ও ষষ্ঠটি নষ্ট। বাদাই নদ যমুনার সঙ্গে সংযুক্ত। যমুনায় পানি বেড়েছে। সেই চাপে এই স্লুইসগেট দিয়ে পানি ঢুকে পড়েছে বিশাল গাজনা বিলে। এক থেকে দেড় ফুট পানিতে সয়লাব হয়ে গেছে গোটা বিল।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়া বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল হামিদ বলেন, এক সপ্তাহ আগে যমুনায় আকস্মিকভাবে পানি বাড়ে। যমুনার পানি বাদাই নদ নিয়ে গাজনার বিলে আসে। বাদাই নদের মুখে স্লুইসগেটের একটি জলকপাট বিকল থাকায় সেদিক দিয়ে পানি বিলে প্রবেশ করে।

গত শনিবার (০৬ মে) সেটি বন্ধ করা হয়েছে। এখন বিলের পানির উচ্চতার চেয়ে যমুনায় পানির উচ্চতা বেশি বলে কপাট বন্ধ রাখা হয়েছে। যমুনার পানির উচ্চতা না কমলে কপাট খুলে বিলের পানি বের করা যাবে না।

তবে কৃষকেরা বলেছেন, তাঁদের সন্দেহ স্থানীয় মৎস্যচাষিদের সঙ্গে যোগসাজশ করে রাতে গোপনে স্লুইসগেটের জলকপাট কয়েক দিন খোলা রাখা হয়েছিল। যমুনার প্রথম জোয়ারে মাছ ডিম ছাড়ে। এই ডিম বিলে এসে রেণুতে পরিণত হয়। মৎস্যচাষিরা এই রেণুপোনা ধরেন।

তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওই নির্বাহী প্রকৌশলী ও সুজানগর উপজেলার উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মেহেদী হাসান এই অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, একটি জলকপাটে যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল। এটি হতেই পরে। যমুনায় বন্যা এবার আগাম এসেছে। তা ছাড়া বৃষ্টির পানিও বিলে জমে ছিল।

গাজনার বিল সুজানগরের সবচেয়ে বড় বিল। এর আয়তন প্রায় ১২ বর্গমাইল। আবাদি জমি ১০ হাজার হেক্টর। এই বিশাল বিলের অধিকাংশই একফসলি জমি।

সুজানগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মঈনুল হক সরকার জানান, এবার গাজনার বিল এলাকায় প্রায় ১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে একটু আগাম জাতের বিআর ২৮ ও বিলম্বিত জাতের বিআর ২৯ বোরো চাষ হয়েছিল। রোগবালাইয়ের প্রকোপ তেমন ছিল না।

তবে মৌসুমের মাঝে যখন ধানের ‘থোড়’ অর্থাৎ শিষ বের হয়, তখন প্রবল ঝড়বৃষ্টি হওয়ায় পরাগায়ন ভালো হয়নি বলে শিষে চিটার পরিমাণ অন্যান্য বছরের চেয়ে বেড়েছে। আর আকস্মিক বন্যাতেও কিছু ক্ষতি হয়েছে।

এ ছাড়া গাজনার বিলের ৭ হাজার হেক্টরে পাটের চাষ হয়েছে। এর বেশ কিছু জমি জলমগ্ন হয়েছে। তবে ধান-পাটের ক্ষতির পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।

গতকাল রোববার গাজনার বিলের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, এক থেকে দেড় ফুট পানি জমেছে ফসলের মাঠে। তার ওপর কোনো রকমে ধানগাছের মাথা জেগে আছে। হাঁটুপানিতে নেমে কৃষক ও দিনমজুরেরা ধান কাটছেন। সেই ধানের আঁটি নৌকায় বা মহিষের গাড়িতে আনা হচ্ছে বিলের ভেতরের রাস্তায়।

সেখান থেকে ‘ভটভটি’ (স্থানীয়ভাবে বানানো দুর্বল প্রযুক্তির যন্ত্রযান) বা মহিষের গাড়িতে বাড়িতে নেওয়া হচ্ছে। কর্দমাক্ত রাস্তায় প্রায়ই আটকে যাচ্ছে মহিষের গাড়ি।

কেউ কেউ রাস্তার পাশেই ধানের আঁটি স্তূপ করে রেখেছেন। পানিতে ডোবা ধান দ্রুত বাড়িতে নিয়ে রোদে শুকাতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন বিল এলাকার শিশু থেকে বয়স্ক সবাই।

সবচেয়ে তীব্র সংকট ধান কাটা মজুরের। আহম্মদপুর ইউনিয়নের চরবোয়ালিয়ার চাঁদ মোল্লা জানান, এক সপ্তাহ আগেও দিনমজুরি ছিল তিন বেলা খাবার, এক প্যাকেট সিগারেট, মাঠে যাতায়াত ভাড়াসহ ৩৫০ টাকা। এখন ৭০০ টাকাতেও দিনমজুর পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ পানিতে নেমে ডুবে থাকা ধান কাটা বেশ কষ্টকর। তারপর সেই ধান আঁটি করে খেত থেকে বয়ে নিয়ে আসা আরও কষ্টের। তাই দিনমজুরেরা বিলের ধান কাটতেই রাজি হচ্ছেন না। এ ছাড়া মজুরও বেশি লাগছে।

রানীনগর ইউনিয়নের বকশিয়ার খাপালে (খালকে খাপাল বলা হয়) খোকা মোল্লা চার বিঘায় বিআর ২৮ ধান চাষ করেছেন। তিনি বললেন, এক বিঘায় ধান কাটতে লাগত চারজন মজুর। খরচ হতো ১৬-১৮ শ টাকা। এখন লাগছে সাতজন। শুধু কাটার খরচই পড়ে যাচ্ছে প্রায় ৭ হাজার টাকা। এর ওপর নৌকার ভাড়া দিতে হচ্ছে শতকরা ৫ আঁটি ধান, আর ভটভটি বা মহিষের গাড়ির ভাড়া দূরত্ব বুঝে ১০ থেকে ১২ আঁটি ধান।

ওদিকে চাষ, সার, কীটনাশক ইত্যাদি মিলিয়ে বিঘাপ্রতি আবাদের খরচ পড়েছে ৮ হাজার টাকার বেশি। ফলে আবাদ আর ফসল কেটে বাড়িতে আনতেই খরচ হচ্ছে বিঘাপ্রতি প্রায় ১৫ হাজার টাকা। আর ধান পাওয়া যাচ্ছে ১০ থেকে ১২ মণ। বাজার দর ৯০০ টাকা ধরলে দাম আসে ১০ থেকে বড়জোর ১১ হাজার টাকা। এ হিসাবে বিঘাপ্রতি ন্যূনতম ৪ হাজার টাকা করে নগদ লোকসান হচ্ছে গাজনার বিল এলাকার কৃষকদের। চার বিঘায় বোরো আবাদ করে খোকা মোল্লার লোকসান প্রায় ২০ হাজার টাকার।

চরবোয়ালিয়ার কৃষক হায়দার আলী বলছিলেন, বোরো ধান ভালো হলে বিঘাপ্রতি ২৫ মণ পর্যন্ত ফলন হয়। চাষাবাদের খরচ বাদে হাজার চারেক টাকা থাকে। পর্যায়ক্রমে অল্প অল্প খরচ করতে হয়। কিন্তু ফসল তোলার পর বিক্রি করে একসঙ্গে টাকা ঘরে আসে, এটাই মূলত লাভ। অথচ ইদানীং বোরোতে নানা ধরনের দুর্যোগ হচ্ছে। এ বছর ক্ষতি হলো সবচেয়ে বেশি।

তুষ্টি খাপালের আকরাম মোল্লা ১৮ বিঘায় চাষ করেছিলেন। তিনি বললেন, ‘যে যত বড় কৃষকই ক্যান না হন, এইবারে সংসার চালানি কঠিন হয়্যা যাবিনি।’

গাজনার বিলের দুলাই ইউনিয়নের চিনাখড়া গ্রামের জামাল শেখ সোনাপানির খাপালে চার বিঘায় পাট চাষ করেছেন। তাঁর দেড় বিঘা পানিতে ডুবুডুবু। এই পাট আর হবে না।

কানা বিলে দুই বিঘার ধান আর পাঁচ বিঘার পাট ডুবে গেছে ওসমান গণির। এই এলাকায় রবি ফসল হিসেবে পেঁয়াজ চাষের পর বৈশাখের শুরুতে পাট বপন করা হয়। সবে এক থেকে দেড় ফুট হয়েছে চারা। এর মধ্যেই অনেক এলাকার পাট ডুবে গেছে পানিতে। এই পাট আর বাড়বে না। সূত্র: প্রথম আলো

0
1
fb-share-icon1

Best WordPress themes


© All rights reserved 2020 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!