সোমবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২১, ১০:৫৪ অপরাহ্ন

আতঙ্কিত হবেন না
করোনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

পাবনায় বাউত উৎসবে লাখো মানুষের ঢল

image_pdfimage_print

বিশেষ প্রতিনিধি : ভোরের আলো ফোটেনি। ঘন কুয়াশা ও কনকনে ঠাণ্ডা। বিলের দিকে মানুষের ঢল। যেন কী এক বাঁধভাঙ্গা ঊচ্ছাস আর আনন্দের হাসি। কারও কাঁধে পলো, আবার কারও হাতে ঠোলা জাল, খুইরা জাল, বাদাই জাল সহ মাছ ধরার নানা উপকরণ।

দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ জড়ো হয় এক স্থানে। শিশু থেকে বৃদ্ধ সববয়সী মানুষের উপস্থিতিতে বিলপাড়ে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। দল বেঁধে বিলের পানিতে নেমে মাছ শিকারের আনন্দে মেতে ওঠেন তারা।

মঙ্গলবার (০১ ডিসেম্বর ) কাকডাকা ভোর থেকে বেলা গড়িয়ে দুপুর পর্যন্ত এ চিত্র পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার পারভাঙ্গুড়া ইউনিয়নের পাটুলিপাড়া গ্রামের ‘রুহুল বিলের’।

বাউত উৎসবকে কেন্দ্র করে এই চিত্র।

গ্রামীণ ঐতিহ্য হিসেবে পাবনার ভাঙ্গুড়া- চাটমোহরের মধ্যবর্তী চলনবিল অঞ্চল জুড়েই প্রতিবছর এ সময়টিতে ধাপে ধাপে চলে এ বাউত উৎসব।

জানা গেছে, পাবনার দুটি উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে রয়েছে চলনবিলের বেশকিছু অংশ। এর মধ্যে বিল রুহুল অন্যতম। রুহুল বিলের পশ্চিমে চাটমোহর উপজেলার পার্শ্বডাঙ্গা টেংগজানি, বোয়ালিয়া, উত্তরে পাটুলিপাড়া রঙ্গালিয়া দক্ষিণে লাউত কান্দি মধুরগাতি, আলমনগর, পূর্বে হাটগ্রাম, কালিকাদহ অবস্থিত।

এরই মাঝখানে ঐতিহ্যবাহী রুহুল বিল অবস্থিত। বন্যার পানি নেমে গেলে বিল রুহুলে প্রচুর দেশীয় প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়। এর মধ্যে রয়েছে, বোয়াল, রুই, কাতলা, গজার। প্রতিবছরের মতো এবারও শুরু হলো এই উৎসব।

এই উৎসবে মেতেছেন এবার টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, নাটোর পাবনার আটঘরিয়া, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুরসহ চলনবিলের মানুষ।

পাবনার আশেপাশের বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও আশপাশের জেলার মানুষও যোগ দেন বাউত উৎসবে।

ভোর থেকে বিভিন্ন জেলা থেকে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে দলবেঁধে মাছ ধরার বিভিন্ন উপকরণ নিয়ে তারা এসে হাজির হয়।

মঙ্গলবার ভোরে বিল রুহুলে গিয়ে দেখা যায়, পাবনা, নাটোর, সিরাজগঞ্জ জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে শীত উপেক্ষা করে শত শত শৌখিন মাছ শিকারি দলবেঁধে পলো, জালি (ছোট জাল), বাদাই জাল, ঠেলা জাল, ধর্মখরা ইত্যাদি মাছ ধরার উপকরণ নিয়ে জড়ো হয়েছেন।

এ যেন মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে নানা বয়সী লক্ষাধিক মানুষের মিলনমেলা। দল বেঁধে হাজারো মানুষ বিলে নেমেছেন মাছ ধরতে। সবার চোখে-মুখে খুশির ঝিলিক।

সারিবদ্ধভাবে পলো ফেলে সকলে সামনের দিকে ডাক ভেঙে আগ্রসর হওয়ায় মাছগুলো পেছনের দিকে যেতে না পেরে সারিবদ্ধ লোকদের সামনে দিয়ে লাফালাফি করতে করতে ছুটতে থাকে।

এ সুযোগে শিকারীরা বড় বড় মাছগুলো লক্ষ্য করে তাদের পলো নিক্ষেপ করে। কোন মাছ পলোতে আটকা গেলে মাছটি পলোর ভেতর লাফালাফি করতে থাকে, আর শিকারিরা পলোর উপর দিকের খোলা অংশ দিয়ে হাত ঢুকিয়ে মাছটি ধরে জালের থলি বা রশি দিয়ে কৌশলে আটকে কোমড়ে বেঁধে রাখে।

কেউ পলোতে বোয়াল ধরেছেন, কেউ জালে চিতল। কেউ মাছ না পেয়ে ফিরছেন খালি হাতে। মাছ যে পেতে হবে তা নয়। শখের বসে মাছ ধরতেই বিলের পানিতে নামা।

কথা হয়, মাছ ধরতে আসা পাবনার ফরিদপুর মডেল স্কুল এ্যান্ড কলেজের সহকারী শিক্ষক আরমান হোসেনের সাথে। তার অনুভূতি জানিয়ে তিনি জানান,’অনেকটা শখ করে বাউত উৎসবে আসেন মাছ শিকার করতে, ছোটবেলা তার বাবার সাথে আসতেন, এখন নিজের ছেলেকে নিয়ে আসেন।

পাবনার ফরিদপুর মোহাম্মদ ইয়াছিন ডিগ্রী অনার্স কলেজের শিক্ষার্থী বরাত আলী (২০) অনুভূতি ব্যক্ত করে ‘বছরে এই দিনটির জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করি। মাছ পাই না পাই সবাই মিলে যে একসাথে মাছ ধরতে আসি, এই মজাটাই অনেক’।

পাবনার ভাঙ্গুড়া পাথরঘাটা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রেজাউল করিম জানান, ২০ বছর আগের থেকে বাবা-বড় ভাইদের সাথে আসতাম রুহুলবিলে।

১০/১৫ কেজি ওজনের বড় বড় মাছ পাওয়া যেতো। এই বিলটি প্রভাবশালীদের দখলে চলে যাচ্ছে। গড়ে উঠছে তাদের মাছের অভয়াশ্রম। বিল-জলাশয় খনন করে মাছের অভয়াশ্রম না বাড়ালে কিছুদিন পর আর মাছও থাকবে না, মাছ ধরার এই উৎসবও আর থাকবে না।

ভাঙ্গুড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সৈয়দ আশরাফুজ্জামান তার অনুভূতি জানিয়ে বলেন, পাবনার ভাঙ্গুড়া ও চাটমোহর উপজেলা কিছু অংশ মিলে অবস্থিত বিল রুহুলে এই মাছ ধরার উৎসব হয়।

শৌখিন মাছ শিকারিরা প্রতি বছর এই উৎসব পালন করে থাকে। এই অঞ্চলের বাসিন্দারা বাউত উৎসব এই অঞ্চলের বড় একটি উৎসব। যে উৎসবে মিলিত হন শখের বসে বিভিন্ন উপজেলার মানুষ। এটা বাংলার একটি ঐতিহ্য।

ইউএনও আরও বলেন, ‘আমরা যেহুতু মাছেভাতে বাঙালি। তাই টিকে থাকুক যুগের পর যুগ ধরে যে ঐতিহ্যটা। যা আজও এই অঞ্চলের মানুষ ধরে রেখেছে।

দেশীয় মাছ রক্ষা করার জন্য বর্তমান সরকার বিভিন্নভাবে কাজও করছে। সুতরাং এই ঐতিহ্য যেন বিলুপ্ত হয়ে না যায়, সকলকে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।

গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য হিসেবে বাউত উৎসবকে টিকিয়ে রাখতে এবং এর পক্ষে জনমত তৈরি ও বাউত উৎসবকে সরকারি স্বীকৃতি দিতে উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান ইউএনও।

0
1
fb-share-icon1

Best WordPress themes


© All rights reserved 2020 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!