শুক্রবার, ২৯ মে ২০২০, ০৯:৫১ অপরাহ্ন

আতঙ্কিত হবেন না
করোনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

পাবনায় বৈশাখী উৎসবে নেই হালখাতা

পাবনায় বৈশাখী উৎসবে নেই হালখাতা। ছবি : সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক : আজ ১ বৈশাখ। যত দিন যাচ্ছে বৈশাখের আয়োজনে যুক্ত হচ্ছে ভিন্নমাত্রা। হারিয়ে যাওয়া অনেক সংস্কৃতি ফিরে এলেও বৈশাখের মূলমন্ত্র হালখাতার কোনো আয়োজন হয় না পাবনায়। দীর্ঘদিন থেকে এ অবস্থা চলে আসছে। ফলে বৈশাখের উৎসব মহা-সমারোহে উদযাপন করা হলেও হালখাতার প্রচলন হারিয়ে যেতে বসেছে।

পাবনার বিভিন্ন এলাকায় আমাদের প্রতিনিধিরা খোঁজ নিয়ে জেনেছেন, কোথাও হালখাতার তেমন আয়োজন নেই। এতে বর্তমান প্রজন্ম হালখাতা শব্দটির সঙ্গে তেমন পরিচিত হতে পারছে না।

তবে বর্তমান সময়ে পয়লা বৈশাখে হালখাতা না হলেও ইংরেজি মাস জুন অথবা ডিসেম্বর মাসে হালখাতা বেশি হয়। এছাড়াও বোরো বা রোপা আমন ধান কাটা-মাড়াই হলে ব্যবসায়ীরা হালখাতা করে থাকেন।

হিন্দু ব্যবসায়ীরা অনেকেই এখনও আগের ধারাবাহিকতায় চৈত্র সংক্রান্তি থেকে শুরু করে পয়লা বৈশাখের পরের দিন পর্যন্ত হালখাতা করেন। তবে এ সংখ্যা অনেক কম। হালখাতা শহরে তেমনভাবে না হলেও প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে এর আয়োজন বেশি হতো। দোকানে টাকা পরিশোধ করতে গেলে মিলত মতিচুরের লাড়ু, বাতাসা, জিলাপি। সার্বজনীন উৎসব হিসেবে ‘হালখাতা’ ছিল বাংলা নববর্ষের প্রাণ। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ‘হালখাতা’র সামাজিক গুরুত্বও ছিল ব্যাপক।

দু’দশক আগেও বৈশাখের প্রথম দিনে গ্রামাঞ্চলের হাটবাজারে অবস্থিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকরা মূলত এর আয়োজন করতো। বিশেষ করে আড়ত ও দোকানগুলোতে হালখাতার যে জাঁকজমক অনুষ্ঠান দেখা যেত, তা এখন আর নেই।

আগে ব্যবসায়ীরা মুখের কথায় বিশ্বাস করে টালি খাতায় লিখে রেখে লাখ লাখ টাকা বাকি দিতেন। তার বেশির ভাগই উসুল হতো হালখাতার দিনে। এখন লেনদেনটা অনেকে ব্যাংকের মাধ্যমেই চুকিয়ে নেন।

অনুষ্ঠানের এক সপ্তাহ আগে থেকেই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকেরা সাদা অথবা হলুদ রংয়ের কার্ডের মাধ্যমে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি হালখাতার দাওয়াত দিতেন। সেই দাওয়াতপত্রে বকেয়া অর্থের কথা উল্লেখ থাকতো।

আর পয়লা বৈশাখের আগের দিন গভীর রাত পর্যন্ত রং বেরঙের কাগজের নকশা দিয়ে সাজানো হতো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে। সকাল থেকেই প্রতিটি মানুষ তাদের পাওনা পরিশোধ করতে দোকানে আসতেন। চলতো রাত পর্যন্ত। প্রতিষ্ঠানের মালিকরা মতিচুরের লাড়ুসহ বিভিন্ন মিষ্টি জাতীয় খাবার দিয়ে আপ্যায়ন করতেন আগত ক্রেতাদের।

বাংলা নববর্ষের উৎসবের অন্যতম আয়োজন ছিল রাজপুণ্যাহ ও হালখাতা। ১৯৫০ সালে জমিদার প্রথা বন্ধ হয়ে গেলে পুণ্যাহ সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়। হালখাতা টিকে থাকলেও নতুন যুগে তার অবস্থাও মলিন। পুণ্যাহ ছাড়া পয়লা বৈশাখের আরেকটি অনুষ্ঠান অল্পকিছু পরে চালু হয়েছিল, সেটি হালখাতা।

গ্রামের কৃষকেরা সাধারণত তাদের দৈনন্দিন প্রয়োজনের কেনাকাটা করতেন বাকিতে। ফসল ঘরে উঠলে তারা ফসল দিয়েই ঋণ শোধ করতেন। মুদি দোকানিরা লম্বা খাতায় ক্রেতাদের নাম লিখে রাখতেন। বছরের শুরুতে পুণ্যাহর অনুসরণে নিজ নিজ দোকানে আমন্ত্রণ জানাতেন তাদের। ক্রেতারা পুরোনো বকেয়া শোধ করে কিছু আগাম হিসেবেও কিছু শস্য দিতেন। এ দিন বেচাকেনা তেমন হতো না।

পাবনার বিভিন্ন উপজেলা ও গ্রামাঞ্চলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে এবার বৈশাখের নানান আয়োজন হলেও হালখাতা অনুষ্ঠান তেমন নেই। বছরের প্রায় সময় দোকান মালিকরা এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। তাছাড়াও দোকান মালিকরা এখন আর সারা বছর ধরে বাকিতে প্রয়োজনীয় পণ্য দেন না। মূলত মাসিক হিসেবে প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী বিক্রি করেন।

সুজানগরের কাপড় ব্যবসায়ী ইসাহাক খান জানান, তার বাপ-দাদারা প্রতি বছর পয়লা বৈশাখে হালখাতার আয়োজন করতেন। কিন্তু এখন তা করা হয় না। কারণ ব্যবসায় ধার-বাকিতে কাপড় দেওয়া হলেও এক মাস বা দু’মাস পরেই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা তা পরিশোধ করে দেন। তবে বছরের যে কোনো সময় একবার হালখাতার আয়োজন করা হয়। তা কেবল ব্যবসায়ীদের নিয়ে একদিন একটু কোনো বড় রেস্টুরেন্টে অনুষ্ঠানের জন্য।

চাটমোহরের মুদি ব্যবসায়ী নিবরাণ সরকার জানান, এখন সারামাস পণ্য বাকিতে দেওয়া হলেও নতুন মাস শুরুর এক সপ্তাহের মধ্যে বাকি পরিশোধ করে নতুনভাবে পণ্য নেওয়া শুরু করেন ক্রেতারা। যার কারণে তেমনভাবে হালখাতার আয়োজন করা হয় না।

তবে আধুনিকতার ছোঁয়ায় এই পরিবর্তন এসেছে বলে অনেকের ধারণা। ক্রেডিট কার্ড, ক্যাশ পেমেন্ট, অনলাইনের মাধ্যমে অনেকে এখন পণ্য কিনে থাকেন। তাছাড়া ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো আগের মতো দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া রাখতে চান না। বড় অংকের বকেয়া হবার আগেই আদায়ের চেষ্টা করেন। ক্রেতারা এখন যে কোনো সময় বকেয়া পরিশোধ করে থাকেন, ফলে পাবনায় আগের মতো সেইভাবে হালখাতা অনুষ্ঠানের তেমন আয়োজন হয় না।

error20
fb-share-icon0
Tweet 10
fb-share-icon20


© All rights reserved 2020 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial
error: Content is protected !!