সোমবার, ৩০ নভেম্বর ২০২০, ০৪:২৬ পূর্বাহ্ন

আতঙ্কিত হবেন না
করোনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

পাবনায় মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও জেলা মুজিববাহিনী প্রধান ইকবাল হোসেন

image_pdfimage_print

। আমিরুল ইসলাম রাঙা।
পাবনায় মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, মুজিববাহিনী প্রধান, জাসদের সাধারন সম্পাদক ও সাবেক এমপি ইকবাল হোসেন। পাবনার রাজনৈতিক অঙ্গনে এক আলোকিত নাম। মধ্য শহরের গোপালপুর মহল্লায় ১৯৪৮ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ডাক্তার মোঃ ইসহাক ও মাতা মোচ্ছাঃ হামিদা বেগম। তিন ভাই এক বোনের মধ্য ইকবাল হোসেন হলেন বড়। ছোট দুইভাই মোঃ ইসমত হোসেন ও মোঃ ইলিয়াস হোসেন । উনারা তিনভাই একসাথে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেছিলেন। চাচা ও মামার ছেলেরা সহ পবিবারে প্রায় ১০ জন মুক্তিযোদ্ধা। তাঁদের পরিবারের সদস্যদের মধ্য বীর মুক্তিযোদ্ধা দুলাল সুজানগর যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এমন পরিবার বিরল।

আমিরুল ইসলাম রাঙা

পাবনা শহরের মধ্যস্থল হলো গোপালপুর মহল্লা। মুক্তিযুূ্দ্ধ এবং রাজনীতির কেন্দ্র হিসেবে মানুষের কাছে পরিচিত। স্বাধীনতার পুর্বকালীন, যুদ্ধকালীন এবং স্বাধীনতার পরবর্তী সময়কালের অসংখ্য ঘটনা আছে যা উল্লেখ করার মত। গোপালপুর মহল্লায় পাবনা জিলা স্কুল, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ, জেলখানা, পুলিশ লাইন সহ বিভিন্ন অফিস আদালত অবস্থিত । মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভে ২৭ ও ২৮ মার্চ পাকিস্তান সৈন্যদের সাথে প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধ হয়েছিল টেলিফোন এক্সচেঞ্জে। যে যুদ্ধে ২৯ মার্চ পাবনায় অবস্থানরত সমস্ত পাকিস্তানী সৈন্যদের হত্যা করে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত পাবনা শহরকে শত্রুমুক্ত করা হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের আগে এবং পরে গোপালপুর মহল্লার ইকবাল হোসনের বাড়ী হামিদা ভিলা ছিল কেন্দ্রবিন্দু। মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতে গেলে কিংবা ইকবাল হোসেনের কথা বলতে হলে আরেকটি নাম বারবার বলতে হবে, যার নাম বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বকুল। যিনি ছিলেন ইকবাল হোসেনের বাল্যবন্ধু এবং নিকট প্রতিবেশী। রফিকুল ইসলাম বকুল ছিলেন, তাঁর খুব কাছের মানুষ। প্রিয় মানুষ এবং মনের মানুষ। একসাথে ছাত্র রাজনীতি করেছেন, একসাথে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। ভিন্নতা হলো স্বাধীনতার পরের রাজনীতি। একজন হলেন জাসদের প্রধান নেতা আরেকজন আওয়ামী লীগ নেতা। অভিন্নতা হলো দুইজনই সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। রাজনৈতিক মহলে মুখরোচক গল্প প্রচলিত আছে, জাসদ এবং আওয়ামী লীগের বৈরী সম্পর্কের মধ্যেও এই দুইনেতা ছিলেন এক এবং অভিন্ন।

ইকবাল হোসেনের পাড়ায় ছাত্র রাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধের সাথে জড়িত ছিলেন, রফিকুল ইসলাম বকুল, বেবী ইসলাম, ইমদাদ হোসেন ভুলু, মোঃ ইসমত, ফজলুল হক মন্টু, মোঃ ইলিয়াস, গোলাম মাহমুদ, আবুল কালাম আজাদ, আলী হাসান, আলী হোসেন প্রমুখ। এই মহল্লায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের শীর্ষ নেতারা এসেছেন। এই পাড়াতেই বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ নাসেরের শ্বশুরবাড়ী। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু একাধিকবার এই মহল্লায় এসেছেন, পরিবহন ব্যবসায়ী হোসেন আলী খাঁ’র বাড়ীতে। উল্লেখ্য এই হোসেন আলী খাঁ’র ঢাকা পুরানা পল্টনের বাড়ী ছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় অফিস। আর স্বাধীনতার আগে ৬৯/৭০ সালে ইকবাল হোসেনের বাড়ীতে এসেছেন তৎকালীন ছাত্র নেতৃবৃন্দ। বিভিন্ন সুত্রে জানা যায়, তৎকালীন নেতৃবৃন্দদের মধ্যে আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, কাজী আরেফ আহমেদ, নুর আলম জিকু, মার্শাল মনি, আসম আব্দুর রব, নুরে আলম সিদ্দিকী, শাহজাহান সিরাজ, হাসানুল হক ইনু, শরীফ নুরুল আম্বিয়া সহ প্রমুখ ইকবাল হোসেনের বাড়ীতে এসেছেন এবং থেকেছেন। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, স্বাধীনতার আগে ইকবাল হোসেনদের ঢাকা গ্রীন রোডের বাড়ী শিরীন মহল ছিল উল্লেখিত নেতাদের মিলনকেন্দ্র। ইকবাল হোসেন সম্পর্কে আরেকটি তথ্য হলো, তৎকালীন সময়ে উনার পরিবারে ছিল সম্পদশালী । উনি বন্ধুদের মাঝে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতেন এবং অসচ্ছল বন্ধুদের আর্থিকভাবে সহযোগীতা করতেন। এছাড়া নম্রতা, ভদ্রতা এবং বন্ধুবৎসল স্বভাবের কারনে সহজেই কাউকে আকৃষ্ট করতে পারতেন। সকল ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেবার গুনাবলী ছিল অপরিসীম।

ইকবাল হোসেন পাবনা জিলা স্কুল থেকে ১৯৬৫ সালে এসএসসি পাশ করেন। ১৯৬৭ সালে নেত্রকোনা কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসী বিভাগে ভর্তি হন। মেধাবী ছাত্র মোঃ ইকবাল ছোট বেলা থেকে খেলাধুলা এবং স্কাউটিং এ সুনাম অর্জন করেছিলেন। পাবনা জিলা স্কুলে পড়ার সময় তাঁর নেতৃত্বে হকি খেলায় পুর্ব পাকিস্তান চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। নেত্রকোনা কলেজে পড়ার সময় তাঁর নেতৃত্বে ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে খেলাধুলায় বিশেষ নৈপুণ্যের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ব্লেজার প্রাপ্ত হন। তখন রাজনীতির উত্তাল সময়। ১৯৬৯ এর গনআন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ১৯৭০ সালে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছিলেন। ইকবাল হোসেন তখন থেকে ছাত্রলীগের নিউক্লিয়ার্স গ্রুপের সাথে যুক্ত হন। সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মনি, আব্দুর রাজ্জাক এবং তোফায়েল আহমেদের আস্থাভাজন হওয়ায় অল্পদিনেই কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ এবং ছাত্রলীগ নেতাদের দৃষ্টিতে পড়েন। ১৯৬৯/৭০ সালে পাবনার আহমেদ রফিক, আতাউল হক হকু, ইকবাল হোসেন, রফিকুল ইসলাম বকুলকে নিউক্লিয়ার্সে সম্পৃক্ত করা হয় । পাবনায় শুরু হয়ে যায় স্বাধীনতার স্বপক্ষে প্রচারনা। ১৯৭০ সালের মাঝামাঝি সময় থেকেই ছাত্রলীগের প্রচার প্রচারনায় প্রাধান্য পায়, জয় বাংলা, আমি কে তুমি কে বাঙালী বাঙালী, ঢাকা না পিন্ডি, ঢাকা ঢাকা, আমার তোমার ঠিকানা পদ্মা, মেঘনা, যুমনা সহ বাঙালী চেতনাকে জাগ্রত করার শ্লোগান।

১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্টা অর্জনের পরেও পাকিস্তানীরা ক্ষমতা হস্তান্তর না করে ১ মার্চ জাতীয় সংসদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষনা করে। ২ মার্চ থেকে শুরু হয় হরতাল, ধর্মঘট এবং অসহযোগ আন্দোলন। ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে ডাকসুর ভিপি আসম আব্দুর রব পতাকা উত্তোলন করেন(যে পতাকা মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস ব্যবহার করা হয়েছে)। ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে ছাত্রলীগের সাধারন সম্পাদক শাহজাহান সিরাজ স্বাধীনতার ইশতেহার ঘোষনা করেন। ( ইশতেহারে ঘোষনা করা হয়, দেশের নাম বাংলাদেশ, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং জাতীয় সংগীত আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি) এরপর ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ভাষনে, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম বলে পরোক্ষভাবে স্বাধীনতা ঘোষনা করলেন। যা আনুষ্ঠানিক ঘোষনা করা হয় ২৫ মার্চ রাতে। মুলতঃ ৮ মার্চ থেকে সারাদেশে স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়ে যায়।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চ ভাষনের পর স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্তে ইকবাল হোসেন পাবনায় আসেন। এখানে তাঁর সতীর্থ সহযোদ্ধাদের নিয়ে পাড়া মহল্লায় স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কমিটি গঠন করেন । ছাত্র তরুণ যুবকদের সংগঠিত করে সশস্ত্র ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করেন। ১২ মার্চ থেকে পাবনা জিলাস্কুল মাঠ, পুরাতন পলিটেকনিক মাঠ, সাহারা ক্লাবের উদ্যোগে জিসিআই স্কুল মাঠ, নয়নামতি অভিযান ক্লাব এবং রাধানগর মক্তব পাড়ায় অধিনায়ক ক্লাবের উদ্যোগে ট্রেনিং শুরু হয়। অবসরপ্রাপ্ত আর্মী, আনসার, স্কাউট শিক্ষকরা প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে ২৩ মার্চ সারাদেশে পাকিস্তান প্রজাতন্ত্র দিবসের পরিবর্তে বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্র দিবস পালনের কর্মসুচী ঘোষনা করা হয়। সেই মোতাবেক পাবনায় পুলিশ লাইন মাঠে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন পাবনা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আব্দুর সাত্তার লালু। এর আগে স্থানীয়ভাবে ছাত্র নেতৃবৃন্দ এডওয়ার্ড কলেজ চত্বর, ডিসি অফিস এবং টাউন হল মাঠে পতাকা উত্তোলন করেছিলেন ।টাউন হল মাঠে পতাকা উত্তোলন করেছিলেন, জেলা ছাত্রলীগের সাধারন সম্পাদক রফিকুল ইসলাম বকুল। ২৫ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনী পাবনায় আগমন করে নব নির্বাচিত সংসদ সদস্য এড. আমিন উদ্দিন সহ শতাধিক মানুষকে গ্রেপ্তার এবং তাঁদের অনেককে হত্যা করে। ২৭ তারিখ রাত থেকে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে পাবনায় প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয়। ২৮ তারিখ দুপুরের মধ্যে পাবনা শহরের টেলিফোন এক্সচেঞ্জে অবস্থানরত সমস্ত পাকসৈন্যদের হত্যা করা হয়। ২৯ মার্চ বিসিক শিল্পনগরীতে অবস্থিত আর্মীরা খন্ড খন্ড যুদ্ধে নিহত হলে পাবনা জেলা প্রথম হানাদার মুক্ত হয়।

২৯ মার্চ পাবনা হানাদার মুক্ত হবার পর পাকিস্তান সেনাবাহিনী কয়েকগুন বেশী শক্তি নিয়ে ঢাকা আরিচা হয়ে পাবনা প্রবেশের চেষ্টা করে। পাবনার সর্বস্তরের জনতা নগরবাড়ী ঘাটে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন । একপর্যায়ে পাকিস্তানীদের আক্রমনে টিকতে না পেরে মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটে। ১০ এপ্রিল পাকিস্তানী সৈন্যরা নগরবাড়ী ঘাট অতিক্রম করে পুনরায় পাবনায় প্রবেশ করে। পাবনার উল্লেখযোগ্য মুক্তিযোদ্ধারা বিশেষ করে ইকবাল হোসেন , রফিকুল ইসলাম বকুল প্রমুখেরা পাবনা কুষ্টিয়া হয়ে ভারতে প্রবেশ করেন । পাবনার উল্লেখযোগ্য নেতারা কলকাতায় অবস্থিত প্রবাসী সরকারের সহযোগিতায় নদীয়া জেলার কেচুয়াডাঙ্গায় পাবনার মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য একটি ট্রানজিট ক্যাম্প স্থাপন করেন। যে ক্যাম্পটি পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন, পাবনার ওয়াজি উদ্দিন খান, গোলাম আলী কাদেরী, এড. গোলাম হাসনায়েন, আহমেদ তফিজ উদ্দিন, শামসুর রহমান শরীফ ডিলু, আজিজুর রহমান ফনি প্রমুখ আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ। ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দের মধ্যে আবদুস সাত্তার লালু এবং রফিকুল ইসলাম বকুল ছিলেন। মে মাসের শুরু থেকে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং শুরুর উদ্যোগ গ্রহন করা হয়। উল্লেখ্য মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য দুটি বাহিনী ছিল। একটি মুজিববাহিনী ( বিএলএফ) আরেকটি এফ,এফ ( ফ্রন্ট ফাইটার)। এফ,এফ বাহিনী মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানীর নিয়ন্ত্রনে থাকলেও মুজিববাহিনী নিয়ন্ত্রন করতেন সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মনি, আব্দুর রাজ্জাক এবং তোফায়েল আহমেদ। মুজিববাহিনীকে ভারতীয় জেনারেল উবানের তত্বাবধায়নে ট্রেনিং দেওয়া হতো ভারতীয় সামরিক একাডেমী দেরাদুনে। রাজনৈতিক প্রশিক্ষনের দায়িত্বে ছিলেন, হাসানুল হক ইনু, শরীফ নুরুল আম্বিয়া, আফম মাহবুবুল হক প্রমুখ। মুজিববাহিনীতে বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজে অধ্যায়নরত উচ্চ শিক্ষিতদের রিক্রুট করা হতো। মুক্তিযুদ্ধে ১১ টি সেক্টরের অধীনে থাকলেও মুজিববাহিনী ৪ টি বিভাগে ভাগ ছিল। মুজিববাহিনীর উত্তর এবং দক্ষিন বিভাগের প্রধান ছিলেন তোফায়েল আহমেদ।

মে মাসের প্রথম দিকে পাবনা থেকে মুজিববাহিনীর ১ম ব্যাচ ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বে ভারতের দেরাদুনে রওয়ানা হন। প্রথম ব্যাচের ১৫ জন হলেন, ইকবাল হোসেন , জহুরুল ইসলাম বিশু, মোঃ ইসমত, ফজলুল হক মন্টু, শাহনেওয়াজ খান হুমায়ুন, শাহ আলম হেলাল, আলমগীর খান বেলাল, রিদ্দিক, আঃ হান্নান রানু ওরফে কানা মুন্সী, আবুল কালাম আজাদ বাবু, গোলাম মাহমুদ, হানিফ মোহাম্মদ রেজা খান,আব্দুর রাজ্জাক মুকুল, জাহাঙ্গীর ও সেলিম। উল্লেখ্য রফিকুল ইসলাম বকুল একটি বিশেষ কারনে ট্রেনিং এ যেতে পারেননি। এই গ্রুপ প্রায় দুইমাস প্রশিক্ষন গ্রহন করে কলকাতার ব্যারাকপুরে চলে আসেন। সেখানে কিছুদিন অবস্থান করার পর ইকবাল হোসেনকে বৃহত্তর পাবনা জেলার মুজিববাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্বে দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করার নির্দেশ দেন। ইকবাল হোসেন ২০ আগষ্ট পাবনায় প্রবেশ করে সদরের কিছু এলাকা এবং সুজানগর থানা এলাকায় অবস্থান গ্রহন করেন। এরপর পরবর্তী পর্যায়ে ইকবাল হোসেনের ছোটভাই মোঃ ইলিয়াস, চাচাতে ভাই শরাফত হোসেন, শাহাদত হোসেন, নজরুল হোসেন এবং বড় মামার ছেলে হাসান ও হোসেন ভারতে গমন করেন এবং মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রশিক্ষন গ্রহন করেন। তার ফুপাতো ভাই দুলাল ১০ ডিসেম্বর সুজানগর যুদ্ধে শহীদ হন। ১৪ ডিসেম্বর সুজানগর মুক্ত হবার পর ১৬ ডিসেম্বর পাবনা মুক্ত হলে ইকবাল হোসেন জেলা প্রশাসনের দায়িত্ব পালন করেন। সরকারীভাবে ডিসি নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত উনি ডিসির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ইকবাল হোসেন ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতার পর থেকে জানুয়ারীর শেষ সপ্তাহ পর্যম্ত এবং ঢাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র সমর্পন না হওয়া পর্যন্ত পাবনা ক্যাডেট কলেজে অবস্থানরত সাড়ে ৩ হাজার মুক্তিযোদ্ধার দায়িত্বে ছিলেন। তবে এসবের সব কিছুতেই বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বকুল জড়িত ছিলেন। বলা যায় ইকবাল হোসেন এবং রফিকুল ইসলাম বকুল স্বাধীনতা পরবর্তী যৌথভাবে কাজ করেছিলেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা ইকবাল হোসেন কে নিয়ে লেখতে গিয়ে অনেক অপ্রাসাঙ্গিক বিষয়ে বলতে হলো। এই লেখায় কাউকে ছোট করা অথবা কাউকে বড় করার উদ্দেশ্যে নয়, এই প্রজন্মের পাঠকদের জানানোর লক্ষ্য নিয়ে বলা। তবে মুক্তিযুূূূদ্ধের কয়েক দশক পরে পাবনার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়েছে। পাবনায় মুজিববাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর প্রধান নিয়ে এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পতাকা উত্তোলন নিয়ে একটি বিরোধ অমিমাংশিত আছে।

মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়কালে ইকবাল হোসেন জাসদ রাজনীতিতে জড়িত হন। ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর জাসদ গঠন হলে প্রধান সংগঠকের ভুমিকা এবং পাবনা জেলা জাসদের সাধারন সম্পাদক হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৪ সালে ঢাকার গ্রীন রোডের বাড়ী থেকে পুলিশ গুলি করে তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিলেন এবং প্রায় তিনবছর কারাগারে বন্দী ছিলেন। উনি ১৯৭৩ এবং ১৯৭৯ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাবনা সদর আসন থেকে জাসদ মনোনীত প্রার্থী ছিলেন। ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে পাবনা সদর আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন । ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি থেকে সুজানগর – বেড়া আসনে প্রার্থী ঘোষনা করলে স্থানীয় নেতাকর্মীর চাপে তাঁর মনোনয়ন বাতিল করে ওজি খানকে নমিনেশন দেওয়া হয়েছিল। এরপর ১৯৯৮ সালে জাতীয় পার্টির পাবনা জেলা কমিটির আহবায়ক হয়েছিলেন। ১৯৯৯ সালে তাঁর সহধর্মিণী লায়লা আরজুমান বানু ইন্তেকাল করলে উনি মানসিকভাবে খুব ভেঙে পড়েন। পরবর্তীতে রাজনীতি সহ সমস্ত কর্মকান্ড থেকে নিজেকে গুটিয়ে ফেলেন। এরপর ২০০৫ সালে ১৮ জানুয়ারী হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ঢাকায় জাতীয় হৃদরোগ ইনিষ্টিটিউট ও হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। মাত্র ৫৭ বছর বয়সে এই অকাল মৃত্যুতে তাঁর দুই ছেলে আরিফ ইকবাল টিংকু ও আফিফ ইকবাল অংকুর মা এবং বাবা হারা হন।

ইকবাল হোসেন তাঁর জীবদ্দশায় রাজনীতির পাশাপাশি অনেক সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি তাঁর গ্রামের বাড়ী সাদুল্লাহপুর ইউনিয়নের চোমরপুর ও শ্রীকোল এলাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তিনি শ্রীকোল আজিজা স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয় এবং জালালপুর মাওলানা কসিমুদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি ছিলেন। এছাড়া ঢাকাস্থ পাবনা সমিতির আজীবন সদস্য, মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের সদস্য, জাতীয় যক্ষা নিরোধ সমিতির সদস্য, ঢাকা মোহামেডান ষ্পোটিং ক্লাবের গভার্নিং বডির সদস্য, রেডক্রস কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, ঢাকা অনির্বান ক্রীড়া সংসদের উপদেষ্টা এবং পাবনা ডায়াবেটিক সমিতির আজীবন সদস্য ছিলেন।

পরিশেষে মুক্তিযুদ্ধের এই মহান বীরকে অম্লান করার মানসে পাবনার কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাকে তাঁর নামে নামকরণ করা প্রয়োজন। দলমত নির্বিশেষে পাবনায় বীর মুক্তিযোদ্ধা ইকবাল হোসেনের স্মরণে একটি স্মৃতি পরিষদ গঠন করে প্রতিবছর তাঁর মৃত্যুদিবসে স্মরণ সভার আয়োজন করা দরকার। বর্তমান এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে বীর মুক্তিযোদ্ধা ইকবাল হোসেনের কৃতকর্মকে অমর করে রাখা দরকার। (সমাপ্ত)

লেখক পরিচিতি –
আমিরুল ইসলাম রাঙা
রাধানগর মজুমদার পাড়া
পাবনা।

0
1
fb-share-icon1

Best WordPress themes


© All rights reserved 2020 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!