মঙ্গলবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২০, ০৩:১৪ অপরাহ্ন

আতঙ্কিত হবেন না
করোনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

পাবনা জেলায় ভাষা-আন্দোলন

image_pdfimage_print




ড. এম আবদুল আলীম

ইতিহাস-ঐতিহ্য, পুরাকীর্তি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ জেলা পাবনা। পাবনা নামের উৎপত্তি ফারসি ‘পানবহ’ (তুলা বা তুলাজাত দ্রব্য) শব্দ থেকে। (ভারতকোষ) সময়ের প্রবহমানতায় পদ্মা, যমুনা, ইছামতি, আত্রাই, বড়াল আর চিকনাইসহ বিভিন্ন নদী এবং অসংখ্য বিল-জলাশয়ের উর্বর পলির আবাহনে গড়ে উঠেছে এ জনপদ। যতদূর জানা যায়, প্রাগৈতিহাসিক কালে এ মাটিতে নীড় বেঁধেছিল পুণ্ড্র ও বঙ্গ জনগোষ্ঠীর মানুষ। কালে কালে এখানে শাসন করেছে মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন ও মুসলমান শাসকেরা। এক সময় পাবনা ছিল বঙ্গ ও পুণ্ড্র জনপদের অংশ, বৌদ্ধযুগে পৌণ্ড্রবর্ধন বিভাগের অধীন আর পাল ও সেন আমলে হয় বরেন্দ্রভূমির অন্তর্ভুক্ত। মুসলমান রাজত্বকালে এ-অঞ্চল সরকার সোনাবাজু, বাজুহার, বার্বাকাবাদ, জান্নাতাবাদ প্রভৃতি সরকারগুলোর অধীনে ছিল। জমিদারি ব্যবস্থা প্রবর্তিত হলে পাবনা অঞ্চল ভাতুরিয়া পরগনার অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রথমে রাজশাহী জমিদারির মধ্যে এবং ইংরেজ আমলে রাজশাহী বিভাগের অধীন হয়।(রাধারমণ সাহা) পাবনা জেলার মর্যাদা লাভ করে ১৮২৮ সালের ১৬ই অক্টোবর। বর্তমানে এ জেলার আয়তন ২৩৭১.৫০ বর্গকিলোমিটার, লোকসংখ্যা ২১৭৬২৭০ জন। (বাংলাপিডিয়া)

অতীত ঐতিহ্য আর সমৃদ্ধ বর্তমান মিলিয়ে পাবনা আজ হয়ে উঠেছে কল্লোলিনী তিলোত্তমা। সমাজ শাহী মসজিদ, ভাঁড়ারার মসজিদ জোড়বাংলা মন্দির, হান্ডিয়ালের শিবমন্দির, তাড়াশ ভবন, শতিলাই হাউস, হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, লালন শাহ সেতু, জজকোর্ট, মানসিক হাসপাতাল, অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরি, বনমালী শিল্পকলা কেন্দ্র, শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আশ্রম, চাটমোহরের কিনু সরকারের ধর পাবনাতেই অবস্থিত। এখানকার ঘি, তাঁতের শাড়ি, গেঞ্জি, লুঙ্গি, গামছা সারা দেশে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরী, প্রিয়ম্বদা দেবী, পরিমল গোস্বামী, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, সরদার জয়েনউদদীন, বন্দে আলী মিয়া, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, আবদুল গনি হাজারী, জিয়া হায়দার, দাউদ হায়দার, রশীদ হায়দার, মাকিদ হায়দার; কিংবদন্তী অভিনেত্রী সুচিত্রা সেন, বাপ্পী লাহিড়ী, মনীশ ঘটক, ঋত্বিক ঘটক, গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, ওস্তাদ বারীণ মজুমদার, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মাইম শিল্পী পার্থপ্রতীম মজুমদার, বৃন্দাবন দাস, চঞ্চল চৌধুরী; রাজনীতিবিদ ভীম ওঝা, বাঙাল ওঝা, জটাধর নাগ, ব্যারিস্টার আশুতোষ চৌধুরী, এম. সেরাজুল হক, আমজাদ হোসেন এম এন এ, আবদুর রব বগা মিয়া; জমিদার রায় বাহাদুর বনওয়ারী লাল রায়, রায় বাহাদুর বনমালী রায়, আজিম উদ্দীন চৌধুরী, বিজয় গোবিন্দ চৌধুরী; কৃষক বিদ্রোহের নেতা ছালু সরকার, বাজু সরকার; শিল্পপতি স্যামসন এইচ চৌধুরী; ভাষাসংগ্রামী এ. এম. এ হামিদ, ডা. সাঈদ হায়দার, এ এল এম মাহবুবুর রহমান, আমিনুল ইসলাম বাদশা, সেলিনা বানু, রণেশ মৈত্র; মুক্তিযুদ্ধের উপ-প্রধান সেনাপতি এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ কে খন্দকার বীর উত্তম, শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. ফজলে রাব্বি, শহীদ আমিন উদ্দীন, শহীদ মওলানা কসিমউদ্দীন, শহীদ আহমেদ রফিক; মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বকুল, বেবী ইসলামসহ আরও অসংখ্য খ্যাতিমান মানুষ এ মাটিতে জন্মগ্রহণ করেছেন। (এম আবদুল আলীম (সম্পা.), পাবনার ইতিহাস) পাবনার মানুষ চিরকালই প্রতিবাদী। দৃষ্টান্ত কৈবর্ত বিদ্রোহ, সিপাহী বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ, কৃষক বিদ্রোহ, খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন, স্বদেশি আন্দোলন, ভাষা-আন্দোলন, মার্শাল ’ল বিরোধী আন্দোলন, শিক্ষা কমিশন আন্দোলন, ৬ দফা আন্দোলন, ভুট্টা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান এবং সর্বোপরি সংগ্রামী ঐতিহ্যের সারণি ধরে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাবনার মানুষ বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। (বিস্তারিত দেখুন : এম আবদুল আলীম ‘পাবনা জেলার আন্দোলন-সংগ্রাম’, পাবনার ইতিহাস) গৌরবময় রাজনৈতিক ইতিহাসের উত্তরাধিকারী এ জেলার মানুষ ভাষা-আন্দোলনের দুই পর্বেই (১৯৪৮ ও ১৯৫২) রেখেছে অসামান্য অবদান।

দেশবিভাগের পর ১৯৪৮ সালের শুরু থেকেই পাবনা জেলায় ভাষার প্রশ্নে জনসচেতনতা বাড়তে থাকে। এর কারণ ‘পাবনা রাজনীতিসচেতন জেলা; শহরের রাজনৈতিক অবস্থানও ভিন্ন নয়। তাঁতশিল্পের জন্য বিখ্যাত পাবনায় আন্দোলনের নানা ধারায় শ্রমজীবীদের ভূমিকাও উল্লেখযোগ্য। তা ছাড়া পাবনার ঐতিহাসিক খ্যাতি কৃষক আন্দোলন ও কৃষক বিদ্রোহে, সেই উনিশ শতক থেকেই। এসব ঘটনা সমাজে নিঃশব্দ রাজনৈতিক প্রভাব ও সচেতনতা গড়ে তুলতে সাহায্য করে। হয়তো এসব কারণে পাবনায় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন সর্বাত্মক চরিত্র অর্জন করে, সূচনা ১৯৪৮ সালে।’ (আহমদ রফিক, ভাষা আন্দোলন : টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া) দেশভাগের পর থেকে পাকিস্তান সরকার দাপ্তরিক কাজে বাংলা ভাষা বাদ দেওয়া শুরু করলে পূর্ববঙ্গের মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। পাবনায় সর্বপ্রথম বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার আনুষ্ঠানিক দাবি তোলেন এবং একই সঙ্গে এই দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান স্থানীয় সংবাদপত্র প্রতিনিধিরা। ১৯৪৮ সালের ২৯শে জানুয়ারি সাপ্তাহিক নও-বেলাল পত্রিকায় প্রকাশিত এক সংবাদে বলা হয় : [১৯৪৮ সালের] জানুয়ারী মাসেই পাবনার স্থানীয় সংবাদপত্র প্রতিনিধি সমিতির এক সভায় বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ করার দাবী জানানো হয়। এ ছাড়া এই দাবীর ভিত্তিতে আন্দোলন গড়ে তোলার জন্যেও একটি স্বতন্ত্র প্রস্তাব গ্রহণ করেন।
বাংলা ভাষা নিয়ে মুসলিম লীগ সরকারের বৈরী আচরণে যখন ধীরে ধীরে ক্ষোভ দানা বেঁধে ওঠার এই পরিস্থিতিতে রাজশাহীর প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ আতাউর রহমান গণতান্ত্রিক যুবলীগের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে পাবনায় আসেন। তাঁর উপস্থিতিতে এক কর্মীসভায় শিক্ষমন্ত্রী ফজলুর রহমান ও যোগাযোগ মন্ত্রী হাবিবুল্লাহ বাহারের উর্দুপ্রীতির তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করা হয়। প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ ও ছাত্রনেতাদের পাশাপাশি পাবনার স্থানীয় সংবাদপত্র প্রতিনিধি সমিতি বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করার দাবি তোলে।

১৯৪৮ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ভাষাবিষয়ক প্রস্তাব নাকচ হলে পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন স্থানের মতো পাবনার প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ এবং সাংস্কৃতিক কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। গণতান্ত্রিক যুবলীগ, জনকৃষ্টি পরিষদ, কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র কংগ্রেস, র‌্যাডিক্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি ও পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা ভেতরে ভেতরে সংগঠিত হয় এবং আন্দোলনের জন্য শক্তি সঞ্চয় করে। এদের সাথে যুক্ত হন মুসলিম লীগের উদারপন্থী অংশের নেতা-কর্মীরা। তাঁরা ‘আন্দোলনের সপক্ষে মতামত ব্যক্ত করে গণপরিষদের সরকারি অভিমত বিপজ্জনক, অগণতান্ত্রিক, প্রতিক্রিয়াশীল বলে মত দেন।’ (আবু মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন (সম্পা.), ভাষা আন্দোলনের আঞ্চলিক ইতিহাস ) এ ‘তৎপরতায় সমর্থন দেন পাবনা জেলা মুসলিম লীগ সম্পাদক এম এল এ দেওয়ান লুৎফর রহমান সাহেবসহ মুসলিম লীগের একটি অংশ। … জেলা মুসলিম লীগের অপর সারির নেতা পরিষদের সদস্য ও প্রাদেশিক গণপরিষদের সদস্য জনাব এ এম এ হামিদ সাহেবের পুত্রসহ মুসলিম লীগের নেতৃস্থানীয় কয়েকজনের পুত্ররাও এই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে সমর্থনের জন্য এগিয়ে আসেন। কলিকাতা থেকে প্রাক্তন ছাত্র হাশিম-শহীদ গ্রুপের মুসলিম লীগ কর্মী আমজাদ হোসেন, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী সাবেরা মুর্শেদ, শাহজাহান মোহাম্মদ, জেলা স্কুলের শিক্ষক মাওলানা কসিমুদ্দীন, এডওয়ার্ড কলেজের অধ্যাপকদের বৃহৎ অংশও আন্দোলনের সপক্ষে মতামত ব্যক্ত করে…।’ (আমিনুল ইসলাম বাদশা, সাপ্তাহিক বিবৃতি)

পাবনা জেলা মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান লুৎফর রহমানের বিশেষ উদ্যোগে তাঁর বাসভবনে ১৯৪৮ সালের ২৬শে ফেব্রুয়ারি এক ঘরোয়া বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ২৮শে ফেব্রুয়ারি প্রতিবাদ-কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। পূর্বঘোষিত কর্মসূচিত অংশ হিসেবে ২৮শে ফেব্রুয়ারি পাবনা শহরে প্রচণ্ড বিক্ষোভ হয়। বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা ক্লাস বাদ দিয়ে ‘বাংলা ভাষার দাবি মানতে হবে’ প্রভৃতি স্লোগান দিতে দিতে শহর প্রদক্ষিণ করে। পরে এ. এল. এম. মাহবুবুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানানো হয়। ২৮শে ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় দেওয়ান লুৎফর রহমানের সভাপতিত্বে পাবনা টাউন হলে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় দেওয়ান লুৎফর রহমানকে আহ্বায়ক এবং পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের ছাত্র এ . এল . এম. মাহবুবুর রহমান খান এবং জি সি ইনস্টিটিউশনের ছাত্র আমিনুল ইসলাম বাদশাহকে যুগ্ম-আহবায়ক করে গঠন করা হয় ‘পাবনা জেলা রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’।

কর্মসূচি সফল করতে ‘শুরু হয় কর্মতৎপরতা। শহরের দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার সাঁটা, ব্যাপক হারে ইশতেহার বিলি, ছোট শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ (যেমন বিড়ি শ্রমিক, সুতা শ্রমিক, রিকশা শ্রমিক ইত্যাদি)। হরতালের জন্য সূচিত কার্যক্রম দ্রুততার সঙ্গে চলতে থাকে।’ (আহমদ রফিক, ভাষা আন্দোলন : টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া) আন্দোলন দমনে স্থানীয় প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে। সব উপেক্ষা করে ২৯শে ফেব্রুয়ারি পাবনায় হরতাল পালিত হয়। সকলপ্রকার যানবাহন, শিল্প-কারখানা, অফিস-আদালত এবং দোকানপাট বন্ধ থাকে। সকাল থেকেই ছাত্ররা এডওয়ার্ড কলেজের মাঠে জমায়েত হয়। এরপর খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে শহরের দিকে যাত্রা করে। পথে ছাত্রদের মিছিলে যোগ দেয় হোসিয়ারী শিল্পের শ্রমিক, বিড়ি শিল্পের শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ। সকলের কণ্ঠে আওয়াজ ওঠে ‘রাষ্টভাষা বাংলা চাই, তা না হলে ছাড়া নাই’। ‘পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে ছাত্রদের মিছিল এগিয়ে যেতে থাকলে পুলিশ বেয়নেট চার্জ করে। এর ফলে এই প্রথমবারের মতো পাবনা শহরের রাজপথ ‘রক্তরঞ্জিত হয়।’ (ড. মোহাম্মদ হাননান, বাংলাদেশের ছাত্রআন্দোলনের ইতিহাস ১৮৩০ থেকে ১৯৭১) গ্রেফতার করা হয় অনেক নেতা-কর্মীকে। পরে তাঁদের কোর্টে হাজির করা হলে ম্যাজিস্ট্রেট সবাইকে নিঃশর্ত মুক্তি দেন। এ প্রসঙ্গে স্মৃতিচারণ করে আমিনুল ইসলাম বাদশা লিখেছেন : ‘১০টায় এডওয়ার্ড কলেজ থেকে চার জন চার জন করে চার হাত ব্যবধানে মিছিল এগিয়ে চলল-কাচারী এলাকায়। মিছিল এগুচ্ছে-মিছিলের পরিধিও বাড়ছে-সরকারী বিদ্যালয়ের ছাত্ররাও যোগ দিল-মিছিল জেলখানা ও পোস্ট অফিসের মোড়ে বাধা পায়। সুশঙ্খল মিছিল এগিয়ে যাবার চেষ্টায় অগ্রসর হলে প্রথমে ৪০ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ ব্যারাকের সামনে রাখা হয়। এর মধ্য থেকে যুগ্ম আহ্বায়ক আমিনুল ইসলাম পালিয়ে গিয়ে আর এক মিছিল নিয়ে আসে-তারপর সারা দিন ধরে চলে মিছিল আর গ্রেফতার। ৬৪ জনকে থানায় রেখে আর সবাইকে ছেড়ে দেওয়া হয়।’ (আমিনুল ইসলাম বাদশা, সাপ্তাহিক বিবৃতি)
আটককৃতদের মুক্তি দেওয়া হলেও আন্দোলন দমনে পুলিশ ধর-পাকড় অব্যাহত রাখে। ১লা মার্চ এ. এল. এম. মাহবুবুর রহমান খানকে তাঁদের আটুয়া মহল্লার বাড়ি থেকে গ্রেফতার করা হয়। এমতাবস্থায় ২রা মার্চ সন্ধ্যা ৭টায় এডওয়ার্ড কলেজের টাউন হোস্টেলে এক গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে আমিনুল ইসলাম বাদশা, লুৎফর রহমান এবং অন্যান্য ছাত্র ও যুবনেতারা যোগ দেন। ৩রা মার্চ এ. এল. এম. মাহবুবুর রহমান খানের মুক্তির জন্য আইনজীবীর পরামর্শ আনতে গিয়ে পাবনার ছাত্র-কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র লুৎফর রহমান এবং জি. সি. ইনস্টিটিউশনের ছাত্র ও পাবনার রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম-আহ্বায়ক আমিনুল ইসলাম বাদশা আদালত প্রাঙ্গণ থেকে গ্রেফতার হন। এরপর গ্রেফতার করা হয় পাবনা সদর মহকুমা ছাত্র-কংগ্রেসের নেতা শ্রীপ্রণতি কুমার রায়কে। ছাত্রনেতাদের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কামিটির আহবানে ৪ঠা মার্চ পাবনা শহরে প্রতিবাদসভা অনুষ্ঠিত হয়। ঐ সভায় বক্তৃতা করেন র‌্যাডিক্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা ডাক্তার মণীন্দ্রকুমার মজুমদার এবং পাবনা জেলা মুসলিম লীগের প্রগতিশীল অংশের নেতা ডা. তোফাজ্জল হোসেন।

৪ঠা মার্চ শহরের দিলালপুর মহল্লার ‘ফিরোজা মহলে’ ভাষা-আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের এক গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মুসলিম লীগের প্রগতিশীল অংশের নেতা ডা. তোফাজ্জল হোসেন, এ্যাডভোকেট বজলুর রহমান আলমাজী, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের নেতা আমজাদ হোসেন, র‌্যাডিক্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা রওশনজান চৌধুরী প্রমুখ। এ সময় সরকার ও মুসলিম লীগের প্রবল চাপে ভাষা-আন্দোলনকারীদের অনেকেই আত্মগোপন করে। ৫ই মার্চ ‘পাখি শিকারের উদ্দেশ্যে ডাক্তার তোফাজ্জল হোসেন গ্রামাঞ্চলে এবং বজলুর রহমান আলমাজী পাবনা থেকে রাজশাহী চলে যান।’ (মাহমুদ আলম খান, ‘ভাষা আন্দোলনের প্রথম অধ্যায় : পাবনা’) প্রশাসনের কড়া নজরদারি ও দমন-পীড়নের ফলে পাবনা শহরের বিভিন্ন ছাত্রাবাসে এবং মহল্লায় মহল্লায় গোপন বৈঠক চলতে থাকে। এসব বৈঠকে আটককৃত নেতাদের মুক্তির দাবিতে প্রবল আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য প্রচার চালানো হয়। এমতাবস্থায় ঢাকার রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে ১১ই মার্চ পূর্ববঙ্গের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালনের আহ্বান জানানো হয়। এ কর্মসূচি সফল করতে এবং বন্দিদের মুক্তির দাবিতে শুরু হয় প্রচার-প্রচারণা। ১০ই মার্চ পাবনার কোহিনূর প্রেসে একটি প্রচারপত্র ছাপতে গিয়ে গ্রেপ্তার হন আমজাদ হোসেন ও রওশনজান চৌধুরী। একই দিনে গ্রেপ্তার হন কমিউনিস্ট পার্টির পাবনা জেলা কমিটির সদস্য শ্রীপ্রদীপ কুমার রায়, মোসলেম উদ্দিন মোক্তার, মহসিন মোক্তার, আমজাদ হোসেন প্রমুখ। (এম আবদুল আলীম, পাবনায় ভাষা আন্দোলন) প্রশাসনের দমননীতি উপেক্ষা করে রাজনৈতিক অঙ্গনের যাঁরা আন্দোলনের পক্ষে সমর্থন যুগিয়েছেন, তাঁদের উল্লেখযোগ্য সৈয়দ ওয়ারেছ আলী, আনছার আলী, আবুল ফজল, ইদ্রিছ আলী, শামসুল ইসলাম, মতিয়ার রহমান, সুনীল চৌধুরী, সেলিনা বানু প্রমুখ।’(এম আবদুল আলীম, পাবনায় ভাষা আন্দোলন)

১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ পাবনায় সর্বাত্মক ধর্মঘট পালিত হয়। বিশেষ ক্ষমতা অর্ডিন্যাস অমান্য করে এডওয়ার্ড কলেজ, জি. সি. ইনস্টিটিউশন, আর. এম. একাডেমী ও পাবনা জেলা স্কুলের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। পাবনার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা এডওয়ার্ড কলেজের সামনে এসে স্লোগান দেয়। এতে ছাত্র-ছাত্রীরা ক্লাস বর্জন করে রাজপথে নেমে আসে এবং মিছিলে অংশ নেয়। মিছিলের স্লোগান ছিল ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘রাজবন্দিদের মুক্তি চাই’ প্রভৃতি। ১১ই মার্চের হরতাল ও মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য ঢাকা থেকে আবদুল মতিন এবং রাজশাহী থেকে আসেন মোহাম্মদ সুলতান। ১১ই মার্চের ধর্মঘট ‘কর্মসূচী সফল করার জন্য সেই মুহূর্তে সরকারি রক্তচক্ষু ও দমননীতি উপেক্ষা করে যারা উল্লেখযোগ্য উদ্যোগী ভূমিকা গ্রহণ করেন তারা হলেন সৈয়দ ওয়ারেছ আলী, আনসার আলী, আবুল ফজল, হেদায়েতুল ইসলাম, শামসুল ইসলাম, ইদ্রিস আলী, ফখরুল ইসলাম, সেলিনা বানু, আতা কোরেশী, মতিয়ার রহমান, সুনীল চৌধুরী, শ্রীপতি চাকী ও গণতান্ত্রিক যুবলীগের মাহমুদ আহমেদ খান (ঈশ্বরদী) প্রমুখ।’ (আবু মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন (সম্পা.), ভাষা আন্দোলনের আঞ্চলিক ইতিহাস) ১১ই মার্চ মিছিল থেকে গ্রেফতার হওয়া পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের তৎকালীন ছাত্র ফখরুল ইসলাম (সরকারি শহীদ বুলবুল কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ) স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন : ‘১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ কলেজে গেটের সামনের ঐতিহ্যবাহী আমতলায় সমাবেশ করলাম এবং সিদ্ধান্ত হল আমরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল করব। যে কথা সেই কাজ। বেলা ১১টার দিকে মিছিল বের হল। আমরা মিছিল করে প্রধান পোস্ট অফিসের পাশের ট্রাফিক মোড়ে পৌঁছলাম। উদ্দেশ্য ছিল জেলা প্রশাসক সাহেবকে স্মারকলিপি দেব। পুলিশ বাধা দিল। সেই বাধা আর অতিক্রম করা সম্ভব হল না। পুলিশ মিছিলটিকে ঘুরিয়ে সবাইকে পাবনা থানায় নিয়ে গেল। সারাদিন আমরা থানা চত্বরে ছিলাম। সন্ধ্যায় আমাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হল।’ (ফখরুল ইসলাম, সাক্ষাৎকার)

ভাষাসংগ্রামী রণেশ মৈত্র বলেছেন : ‘১৯৪৮-এর শুরুতে পাবনায় ভাষার দাবিতে জোরদার আন্দোলন গড়ে ওঠে। আমি তখন পাবনা গোপালচন্দ্র ইনিস্টিটিউশনের নবম শ্রেণীর ছাত্র। সেদিনের মিছিলে ছিল বিপুল জনতার অংশগ্রহণ। মুসলিম লীগের এক অংশ, কংগ্রেসের নীচুতলার নেতারা, ছাত্র ফেডারেশন, ছাত্র কংগ্রেস, মুসলিম ছাত্রলীগ সবার মিলিত উদ্যোগে সংগঠিত হয় ওই আন্দোলন। নেতৃত্বে ছিলেন প্রয়াত এ এল এম মাহবুবুর রহমান খান, আমিনুল ইসলাম বাদশা, প্রয়াত রওশনজান চৌধুরী, আমজাদ হোসেনসহ অনেকেই। ঢাকা থেকে এসে ঐ মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন ছাত্রনেতা আবদুল মতিন (পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক)।’ (রণেশ মৈত্র, ‘পাবনায় ভাষা আন্দোলন’)

পাবনার এই ধর্মঘট সম্পর্কে এডওয়ার্ড কলেজের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বি. এল. বোস কলেজের সভাপতি ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে এক প্রতিবেদনে লেখেন। এডওয়ার্ড কলেজের ছাত্রনেতা (জি. এস ১৯৫০-১৯৫১ শিক্ষাবর্ষ) আবদুল মমিন তালুকদার লিখেছেন : ‘এই আন্দোলনে আমাদের কলেজের বিপ্লবী যুবক কর্মীদের সহায়তায় ও অনুপ্রেরণায় পাবনার সমস্ত স্কুল ও মাদ্রাসার ছাত্রবন্ধুদের নিয়ে আমরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২০০০ ছাত্রের শোভাযাত্রা ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ ধ্বনি সহকারে সমস্ত শহর প্রদক্ষিণ করি।’ (আবদুল মমিন তালুকদার, সাধারণ সম্পাদকের কার্যবিবরণী)

১১ই মার্চের ধর্মঘট ও এ উপলক্ষে পাবনার ভাষা-আান্দোলনের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার সম্পর্কে দৈনিক আজাদ ও আনন্দবাজার পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়। আনন্দবাজার পত্রিকায় ‘পাবনায় হরতাল ও খানাতল্লাশী’ শীর্ষক সংবাদে বলা হয় : ‘পাবনা, ১২ই মার্চ। রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে সাধারণ ধর্মঘটের দিন গতকল্য ছাত্রগণ হরতাল পালন করে এবং বিশেষ ক্ষমতা অর্ডিন্যান্স অমান্য করিয়া বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। এই সম্পর্কে গত বুধবার কয়েকস্থানে তল্লাশী করা হয় এবং রোসেন জান, আমজাদ হোসেন ও অন্য তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়।’ দৈনিক আজাদ পত্রিকা থেকে জানা যায় : ‘পাবনায় বিশেষ ক্ষমতা অর্ডিন্যান্স-বলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলেও এদিন ছাত্ররা তা অমান্য করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। পুলিশ রওশনজান, আমজাদ হোসেন ও অন্য তিনজনকে গ্রেফতার ও কয়েকটি গৃহ তল্লাশি করে।’

১৯৪৮ সালের ১৮ই মার্চ বন্দি সকল নেতা-কর্মীকে মুক্তি দেওয়া হয়। ১৯শে মার্চ পাবনা টাউন হলে তাঁদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ১৯৪৮ সালের পরেও পাবনায় ভাষা-আন্দোলনের স্রোতধারা একেবারে থেমে যায়নি। বিভিন্ন রকম পোস্টার ও প্রচারপত্রের মাধ্যমে এ কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হয়। এ জাতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে ১৯৪৯ সালের জানুয়ারি মাসে গ্রেপ্তার হন আমিনুল ইসলাম বাদশা। এ বছর ১৩ই আগস্ট গ্রেপ্তার করা হয় কমিউন্টি পার্টির কর্মী প্রসাদ রায় ও লিলি রায়কে। (এম আবদুল আলীম, পাবনায় ভাষা আন্দোলন)

ভাষা-আন্দোলনের প্রথম পর্বে ঢাকার বাইরে পূর্ববাংলার যে-কয়টি জেলায় তীব্র আন্দোলন, প্রতিবাদ, হরতাল ও সমাবেশ হয়েছে তার মধ্যে পাবনা জেলা অন্যতম শীর্ষস্থান দকল করে আছে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র আট মাসের মাথায়, মুসলিম লীগের প্রবল প্রতাপের যুগে পাবনার মতো মফস্বল জেলা শহরে এমন আন্দোলন ছিল সত্যিই অভাবনীয়। এখান ছাত্র, শ্রমিক, রাজনীতিবিদ, সাধারণ মানুষ-সকলেই রাষ্টভাষা বাংলার দাবিতে পাবনার রাজপথে নেমে এসেছিল। এ-আন্দোলন ছিল স্বতঃস্ফূর্ত ও ব্যাপক গণসম্পৃক্ত। আটচল্লিশের ভাষা-আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলন পাবনায় আরও তীব্রতা লাভ করে।

মাতৃভাষা বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবিতে এবং আরবি হরফে বাংলা প্রচলনের প্রতিবাদে ১৯৪৮ সালের পর পূর্ব পাকিস্তানের সংগ্রামী ছাত্রজনতা সীমিত পরিসরে হলেও তাঁদের আন্দোলন-সংগ্রাম ও প্রতিবাদ অব্যাহত রাখে। এ সময় পাবনার রাজনৈতিক অঙ্গনে চলে নানা ভাঙা-গড়া। মুসলিম লীগ সরকারের দমনপীড়ন ও পুলিশি নির্যাতনে প্রদেশের অন্য স্থানের মতো এখানেও ছাত্র ফেডারেশন, ছাত্রকংগ্রেস, গণতান্ত্রিক যুবলীগ ও কমিউনিস্ট পার্টির নেতাকর্মীরা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। আমিনুল ইসলাম বাদশা, প্রসাদ রায়, লিলি রায়-এঁদের সকলকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে আটক রাখা হয়। এর মধ্যে রাজশাহী কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ডে ঘটে লোমহর্ষক ও নিষ্ঠুর হত্যাকা-। পাবনায় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের জনপ্রিয়তা তখন তুঙ্গে।
এ সংগঠনের ছাত্রনেতা আবদুল মোমিন তালুকদার ১৯৫০-৫১ শিক্ষাবর্ষে এডওয়ার্ড কলেজের ছাত্র সংসদের জি.এস. নির্বাচিত হন। এরই মধ্যে ১৯৫১ সালের ৮ই সেপ্টেম্বর ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদে’র আহ্বায়ক আবদুল মতিন একটি প্রচারপত্রে আহ্বান জানান ‘স্থানীয়ভাবে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি স্থাপন করুন এবং বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করুন’। (আবদুল মতিন ও আহমদ রফিক, ভাষা আন্দোলন : ইতিহাস ও তাৎপয) এরই প্রেক্ষিতে এডওয়ার্ড কলেজের টাউন হোস্টেলের এক সভায় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের নেতা আবদুল মমিন তালুকদারকে আহ্বায়ক করে গঠন করা হয় ‘পাবনা জেলা রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’। এর যুগ্ম-আহ্বায়ক নির্বাচিত হন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের পাবনা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক এ. কে. এম. আজিজুল হক। এই রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে আরও সম্পৃক্ত ছিলেন- আজাহার আলী, ফজলুল আজিম, আনসার আলী, ফজলে কবির, আব্দুল আজিজ, শওকত আলী, মাহমুদ আলম খান, মো. আলাউদ্দিন, হাসান আলী মোল্লা, শামসুজ্জোহা, জয়নাল আবেদীন খান প্রমুখ। (এম আবদুল আলীম, পাবনায় ভাষা আন্দোলন) রাজনীতিবিদদের মধ্যে যাঁরা এই সংগ্রাম পরিষদ গঠনে সহায়তা করেন তাঁদের মধ্যে এম. মনসুর আলী, আব্দুর রব বগা মিয়া, আমজাদ হোসেন প্রমুখ। এর আগে আরেকটি ঘটনা পাবনার ছাত্রসমাজকে উজ্জীবিত করে, তা হলো-ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ভাষণ। ১৯৫১ সালের অক্টোবর/নভেম্বর মাসে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের বার্ষিক মিলাদের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে এসেছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্। ঐ অনুষ্ঠানে তাঁর বাংলা ভাষাবিষয়ক বক্তৃতা ছাত্রদের উদ্বুদ্ধ করে। (জয়নাল আবেদীন খান, সাক্ষাৎকার)

পাবনা শহরের মোক্তার পাড়ায় গড়ে ওঠা প্রগতিশীল তরুণদের সংগঠন ‘শিখাসংঘ’ এখানকার ভাষা-আন্দোলন সংঘটনে ভূমিকা রাখে। ‘শিখা সংঘে’র সদস্যবৃন্দ যথাক্রমে আবদুল মতিন (লাল মিয়া), রণেশ মৈত্র, জয়নাল আবেদীন খান, আনোয়ারুল হক, মোজাম্মেল হক, কামাল লোহানী প্রমুখ প্রগতিশীল তরুণ রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে আন্দোলন করার জন্য পাবনার রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আবদুল মমিন তালুকদারের সঙ্গে আলোচনা করে তাঁদের করণীয় ঠিক করেন। (রণেশ মৈত্র, সাক্ষাৎকার) এ সময় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর একটি ভাষণ ছাত্রদের বিশেষভাবে উজ্জীবিত করে। তিনি ১৯৫২ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি পাবনা এডওয়ার্ড কলেজমাঠে এক ছাত্রসভায় বক্তৃতা করেন। তিনি একুশে ফেব্রুয়ারি ধর্মঘট পালন সম্পর্কে ছাত্রদের উদ্বুদ্ধ করেন। আবদুল মমিন তালুকদার লিখেছেন : ‘মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী তার জামাতা পাবনার বিশিষ্ট এডভোকেট আব্দুস সবুর খান সাহেবের বাড়িতে যান এবং আমাকে তার সঙ্গে দেখা করার জন্য লোক দিয়ে ডেকে পাঠান। আমি দেখা করতে গেলে আমরা বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষা করার ব্যাপারে কি করছি জিজ্ঞাসা করেন। আমরা তার সঙ্গে আলোচনা করে ১৭ ফেব্রুয়ারি এডওয়ার্ড কলেজ মাঠে একটি ছাত্র-জনসভা করার সিদ্ধান্ত নিই এবং ওই সভায় বক্তব্য রাখার জন্য অনুরোধ করি। তিনি রাজি হন। … ১৭ ফেব্রুয়ারি সমগ্র পাবনা শহরে উত্তেজনা। বিকাল ৩টায় কলেজ মাঠে বিশাল ছাত্র-জনতার সমাগম ঘটে। … অবশেষে মওলানা সাহেব এলেন কিন্তু সামান্য বক্তব্য রাখলেন ২১শে ফেব্রুয়ারির আন্দোলনের ডাক সম্পর্কে। … ছাত্র-জনতা উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। শুরু হয়ে যায় সারা শহরে আন্দোলনের ঢেউ।’ (আবদুল মমিন তালুকদার, ‘আমার স্মৃতিতে একুশ’)

২১শে ফেব্রুয়ারি সকাল থেকেই এডওয়ার্ড কলেজের আমতলায় শত শত শিক্ষার্থী জমা হতে থাকে। এরপর এখানকার সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আবদুল মমিন তালুকদারের নির্দেশনা ও নেতৃত্বে সুশৃঙ্খলভাবে ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করে। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগান দিতে দিতে তারা পাবনা শহরের মূল সড়ক প্রদক্ষিণ করে। রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, রওশনজান চৌধুরী, মাহবুবুল হক ফেরু দেওয়ান, আবদুর রব বগা মিয়া, আমজাদ হোসেনসহ অনেকে মিছিলে যোগ দেন। এছাড়া আবদুল মোমিন তালুকদার, ফজলে কবির, ফজলুল আজিম, আব্দুল আজিজ, আবুল আতা কোরেশী, শওকত আলী, আজাহার আলী, আলাউদ্দিন, হাসান আলী মোল্লা, শামসুজ্জোহা, নঈমুল হাসান, রণেশ মৈত্র, আবদুল মতিন লাল মিয়া, জয়নাল আবেদীন খান, সৈয়দ রেজা কাদের, কামাল লোহানী, এস. এম. গোলাম হাস্নায়েন, আনসার আলী, তাহাজ্জাদ হোসেন, আনোয়ারুল হকসহ হাজার হাজার নেতা-কর্মী ও সাধারণ শিক্ষার্থী এই মিছিলে অংশগ্রহণ করে। মিছিলটি শহরের ইন্দারা পট্টিতে পৌঁছালে পুলিশ বেরিগেড সৃষ্টি করে এবং বাধা দেয়। তখন ছাত্ররা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে রাস্তার দুই দিকে বসে পড়ে। পুলিশ মিছিলকারীদের সামনের দিকে অগ্রসর হতে নিষেধ করে, এমনকি গুলিবর্ষণের ভয় দেখায়। ছাত্রদের সাথে পুলিশের বাদানুবাদ চলে। ছাত্ররা পুলিশি বাধা অতিক্রম করে মিছিল নিয়ে শহরের মূল রাস্তা দিয়ে কালেক্টরেট ভবনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। মিছিলটি বাণী সিনেমা হলের কাছে গেলে প্রচন্ড পুলিশি বাধার মুখে পড়ে। পুলিশ তিন দিক থেকে মিছিলে বেরিগেড দেয়। সেখান থেকে কয়েকজন ছাত্রকে গ্রেফতার করা হয়। মিছিল শেষে ছাত্ররা যার যার মতো বাড়ি ও ছাত্রাবাসে ফিরে যায়। বিকালে এডওয়ার্ড কলেজ মাঠে বিশাল সমাবেশ হয়। সমাবেশে বক্তৃতা করেন আবদুল মোমিন তালুকদার, শওকত আলী, ফজলে কবির, আব্দুল আজিজ প্রমুখ। সভায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি এবং উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। (এম আবদুল আলীম, পাবনায় ভাষা আন্দোলন) দৈনিক আজাদ পত্রিকায় বলা হয় : ‘পাবনা, ২২শে ফেব্রুয়ারী। গতকল্য পূর্ব্বাহ্ণ ১১ ঘটিকায় পাবনায় প্রায় ৩, ০০০ ছাত্র ধর্ম্মঘট করিয়া “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই” “ছাত্র বন্দীদের মুক্তি চাই” প্রভৃতি ধ্বনিসহ সমস্ত শহর প্রদক্ষিণ করেন। অপরাহ্ণে কলেজ প্রাঙ্গণে এক বিরাট জনসভা হয়। সভায় মির্জ্জা শওকত হোসেন সভাপতিত্ব করেন। সভায় বাংলা ভাষাকে পূর্ব্ব পাকিস্তানের সরকারী ভাষা হিসেবে গ্রহণের এবং আরবী হরফে বাংলা ভাষা প্রচলনের অদ্ভুত প্রস্তাব প্রত্যাহারের এবং অবিলম্বে ছাত্রদের মুক্তি দাবী করিয়া প্রস্তাব গৃহীত হয়।’ সাপ্তাহিক সৈনিক পত্রিকাতেও এ সংবাদ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করা হয় : ‘বিগত ২১শে ফেব্রুয়ারী পাবনার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় তিন হাজার ছাত্র ধর্মঘট করিয়া মিছিল সহকারে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দিতে দিতে শহরের প্রধান প্রধান রাস্তাগুলি প্রদক্ষিণ করে। অপরাহ্ণে কলেজ প্রাঙ্গণে এক বিরাট জনসভা হয়। সভায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবীতে এবং উর্দু হরফে বাংলা লিখার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রস্তাব গৃহীত হয়।’

ঢাকার ছাত্র-জনতার উপর পুলিশের গুলিবর্ষণের খবর পাবনায় পৌঁছে ২১শে ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যার পর। এ মর্মান্তিক ঘটনার খবর পাবনা পৌঁছালে পাবনার রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আবদুল মমিন তালুকদার তাৎক্ষণিকভাবে এডওয়ার্ড কলেজের টাউন হোস্টেলে এক জরুরি বৈঠক করে ২২শে ফেব্রুয়ারি হরতাল ও বিক্ষোভ কর্মসূচির ঘোষণা দেন। ২২শে ফেব্রুয়ারি পাবনা শহরে সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। ঐদিন একটি বিক্ষোভ মিছিল শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। বিকেলে এডওয়ার্ড কলেজে মির্জা শওকত হোসেনের সভাপতিত্বে প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ থেকে ২৩শে ফেব্রুয়ারি হরতাল পালনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। সে মোতাবেক ২৩ তারিখেও এখানে সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। প্রতিবাদ-মিছিল ও শোভাযাত্রা শেষে বিকেলে পাবনা টাউন হলে বিশাল সমাবেশ হয়। সমাবেশে বক্তৃতা করেন এম মনসুর আলী, এ. এম. এ. হামিদ, আমজাদ হোসেন, আব্দুল মমিন তালুকদার প্রমুখ। ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল লিখেছেন : ‘হঠাৎ একদিন সারা শহর তোলপার করে খবর উঠলো-পুলিশের গুলিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বরকত মারা গেছেন। মারা গেছেন আরো অনেকে। তাদের দোষ তারা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য মিছিল করেছিলেন। এই খবর পেয়ে চারদিক কেমন থমথম করতে লাগলো। পাবনা শহরেও ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে মিছিল বেরুলো। সেই মিছিলে স্লোগান উঠলো : রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। পাবনার গণ-পরিষদ সদস্য হামিদ সাহেব এই মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। টাউন হলের সভায় আমাদের বন্ধু আলতাফ এক কান্ড করে বসেছিলো। হামিদ সাহেব তখন বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। আলতাফ তার বক্তৃতার ভেতরেই চিৎকার করে উঠলো : আপনাকে আমি বিশ্বাস করি না। তিন বছর আগে আপনিই তো বলেছিলেন, ‘আমরা বেশি বাড়াবাড়ি করলে কাশ্মীরের সাথে পূর্ব-বাংলা বদলে নেয়া হবে।’ একটা বাচ্চা ছেলের কথা শুনে সভার লোকজন হতভম্ব হয়ে গেলো। যাই হোক হামিদ সাহেব স্বীকার করেছিলেন যে, তিন বছর আগে তিনি ভুল করেছিলেন। এবার তিনি করাচীতে গিয়ে বাংলা ভাষার পক্ষে বলবেন গণপরিষদে।’’ (আবু হেনা মোস্তফা কামাল, ইচ্ছামতির সোনালী-রুপালী)

পাবনা জেলা মুসলিম লীগের সভাপতি এ. এম. এ. হামিদ কেবল টাউন হলের সমাবেশের বক্তৃতায়ই নয়, সংবাদপত্রে বিবৃতির মাধ্যমেও তিনি এ ঘোষণা দেন। দৈনিক আজাদ-এর ‘বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করিতে না পারিলে পদত্যাগ করিব/গণ-পরিষদের সদস্য জনাব এ. এম. এ হামিদের প্রতিশ্রুতি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয় : ‘পূর্ব্ববঙ্গ ব্যবস্থা পরিষদ ও পাকিস্তান গণ-পরিষদের সদস্য জনাব এ. এম. এ হামিদ সংবাদপত্রে প্রকাশার্থ নিম্নলিখিত বিবৃতি দিয়াছেন ঃ “আমি সম্যক উপলব্ধি করিতেছি যে, বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবী বাঙ্গালীর ন্যায্য দাবী। জনগণের প্রতিনিধি হিসাবে তাঁহাদের দাবী প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচেষ্টা চালানোই আমার কর্ত্তব্য। বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার মর্য্যাদাদানের জন্য আমি পাক গণপরিষদে যথাসাধ্য চেষ্টা করিব।” “আমি ঘোষণা করিতেছি যে, যদি আমি ইহাতে অসমর্থ হই, তবে আমি অবশ্যই গণপরিষদ হইতে পদত্যাগ করিব।” এ. এম. এ. হামিদ এই অঙ্গীকার অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন এবং তার জন্য করুণ পরিণতি ভোগ কনে। (এম আবদুল আলীম, ভাষা-আন্দোলন-কোষ, প্রথম খন্ড)

২৪শে ফেব্রুয়ারিতেও পাবনায় হরতাল পালিত হয়। পাবনা শহরে এদিন হাজার হাজার মানুষ মিছিল বের করে। পরে প্রতিবাদসভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয় এবং ঢাকায় গুলির প্রতিবাদে বেসরকারি তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি করা হয়। তাছাড়া আরবি হরফে বাংলা লেখার ষড়যন্ত্রের বিরোধিতা করা হয়। ৫ই মার্চ রাষ্ট্রভাষা দিবসে টাউন হলে বিশাল সমাবেশ হয়। সেখানে বক্তৃতা করেন ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী, আমজাদ হোসেন, আব্দুর রব বগা মিয়া, আবদুল মোমিন তালুকদার প্রমুখ। ২১শে ফেব্রুয়ারির পরে পাবনা শহরে যে ভাষা-আন্দোলন সংঘটিত হয়, সে সংবাদ তখনকার সাপ্তাহিক সৈনিক, সাপ্তাহিক ইত্তেফাক. দৈনিক আজাদ, আনন্দবাজার পত্রিকাসহ বিভিন্ন পত্রিকায় গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়। ২৭শে ফেব্রুয়ারি দৈনিক আজাদ-এ ‘পাবনার সভায় প্রতিবাদ’ শীর্ষক সংবাদে বলা হয় : ‘‘পাবনা, ২৫শে ফেব্রুয়ারী।গতকল্য ছাত্র ও জনসাধারণের দুই ছাত্র ও জনসাধারণের দুই মাইল দীর্ঘ এক শোভযাত্রা “মন্ত্রিদের পদত্যাগ চাই” ধ্বনি সহকারে বিভিন্ন রাস্তা প্রদক্ষিণ করে। মোছলেম লীগ, বণিক সমিতি ও ছাত্রদের যুক্ত উদ্যোগে গতকল্য অনুষ্ঠিত এক সভায় ঢাকা শহরে ছাত্রদের উপর গুলীবর্ষণ ও ১৪৪ ধারা জারীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হয়। প্রতিবাদে শহরে পূর্ণ হরতাল পালিত হয়। মোছলেম লীগ নেতা জনাব বজলুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জনসভায় পুলিশের গুলীতে শহীদদের জন্য গভীর দুঃখ প্রকাশ করিয়া বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবী জানানো হয় এবং আরবী হরফে বাংলা লেখার প্রচেষ্টা ত্যাগ করিতে বলা হয়।’

২৮শে ফেব্রুয়ারি দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ‘পাবনায় দুই মাই দীর্ঘ শোভাযাত্রা ও হরতাল’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদনে এখানকার হরতাল ও শোভাযাত্রার সংবাদ প্রকাশিত হয়। মার্চের প্রথম সপ্তাহেও এরূপ কর্মসূচি পালিত হওয়ার কথা জানা যায় দৈনিক আজাদ-এর ‘পাবনায়ও অনুরূপ জনসভা ও হরতাল পালিত হয়’ শিরোনামের সংবাদ থেকে। এ আন্দোলন কেবল পাবনা শহরেই নয়, জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে। সাঁথিয়া, বেড়া, সুজানগর, ভাঙ্গুড়া, চাটমোহর, ঈশ্বরদী প্রভৃতি স্থানে ছাত্রজনতার নেতৃত্বে ভাষা-আন্দোলন গণআন্দোলনে পরিণত হয়। তৎকালীন পত্র-পত্রিকার পাতায় এর সাক্ষ্য মেলে। প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ থেকেও এর ব্যাপকতা সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়। ২১শে ফেব্রুয়ারির হৃদয়বিদারক ঘটনার প্রতিবাদে পাবনার সাঁথিয়ার মানুষ প্রতিবাদমিছিল ও সভা-সমাবেশ করে। ছাত্রনেতা জয়নাল আবেদীন খান, মোজাম্মেল হক, তাছির উদ্দিন প্রমুখের নেতৃত্বে সাঁথিয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রতিবাদী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয়ভাবে দৌলতপুর গ্রামের মাজেদ আলী মিয়া, সাঁথিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক হাসান আলী সাঁথিয়াতে ভাষা-আন্দোলন সংগঠিত করতে সহায়তা করেন। তবে সাঁথিয়ার অনেক তরুণ মুসলিম লীগ নেতা ভাষা-আন্দোলনকারীদের সভা-সমাবেশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন। (এম আবদুল আলীম, পাবনায় ভাষা আন্দোলন)

রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে পাবনা শহরের বাইরে সবচেয়ে বড় সমাবেশ হয়েছিল ভাঙ্গুড়ায়। এ-সম্পর্কে ১৯৫২ সালের ৯ই মার্চ ঢাকার সাপ্তাাহিক সৈনিক পত্রিকায় ছাপা হয় : ‘পাবনা, জেলার অন্তর্গত ভাঙ্গায় [ভাঙ্গুড়া] স্থানীয় স্কুল ময়দানে গত ২৭/২/৫২ তারিখে মৌঃ সিরাজুল ইসলাম সাহেবের সভাপতিত্বে এক বিরাট জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রায় চারি সহস্র লোকের সমাগম হয়। উক্ত সভার নিম্নলিখিত প্রস্তাবাবলী গৃহীত হয় । (১) বাংলা ভাষাকে অবিলম্বে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বলিয়া ঘোষণা করা হউক; (২) রাষ্ট্রভাষা সংশ্লি¬¬ষ্ট বন্দী ব্যক্তিবর্গকে অবিলম্বে বিনাশর্তে মুক্তি প্রদান করা হউক; (৩) শহীদদের পরিবারবর্গকে আজীবন উপযুক্ত খেসারত দেওয়া হউক; (৪) আরবি হরফে বাংলা লেখার পাগলামী অবিলম্বে বন্ধ করা হউক; (৫) ছাত্র ও জনতার উপর গুলী বর্ষণ সম্পর্কে নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার করা হউক; (৬) পাকিস্তান অভজার্ভার এর উপর যে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হইয়াছে তাহা উঠাইয়া লওয়া হউক। (৭) রাষ্ট্রের স্বার্থের খাতিরে নুরুল আমিন মন্ত্রীসভার পতন ঘটানো হউক।’

পাবনা জেলার চাটমোহরেও ভাষা-আন্দোলনের মিছিল-সমাবেশ হয়েছিল। বায়ান্নর ২১শে ফেব্রুয়ারির আগেই এখানে স্থানীয় ছাত্রদের নেতৃত্বে গৌরচন্দ্র সরকারকে সভাপতি এবং আবুল হোসেনকে সাধারণ সম্পাদক করে ১১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়। ২১শে ফেব্রুয়ারির মর্মান্তিক ঘটনার খবর চাটমোহরে পৌঁছার পর ২২শে ফেব্রুয়ারি বালুচর খেলার মাঠে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। ময়েন উদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় ছাত্ররা অনির্দিষ্ট কালের জন্য ক্লাস বর্জন করেন। পরে চাটমোহরে মিছিল বের হয়। ২৪শে ফেব্রুয়ারি নারায়ণচন্দ্র চৌধুরীর সভাপতিত্বে এক সভা হয়। চাটমোহরের অবুল হোসেন এ সময় ১ মাস ৮ দিন কারাভোগ করেন। এখানকার ভাষা-আন্দোলনে যাঁরা অবদান রেখেছেন তাঁরা হলেন অমূল্য লাহিড়ী, আবদুল হামিদ, দেওয়ান আফজাল হোসেন, মির্জা আবদুল কাদের, আব্দুস সালাম, হাবিবুর রহমান, ময়েন উদ্দিন, কার্তিক কুন্ডু, ওসমান গণি, আজহার সরকার, আজগর উদ্দিন, মির্জা আব্দুল কাদের, কেরামত উদ্দিন প্রমুখ। (আবু মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন (সম্পা.), ভাষা আন্দোলনের আঞ্চলিক ইতিহাস)

২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্রদের ওপর পুলিশের নির্মম গুলিবর্ষণের খবর কলকাতার আকাশ বাণীর মাধ্যমে ঈশ্বরদীতে এসে পৌঁছে। এর ফলে এখানে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। স্থানীয় স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা মিছিল-সমাবেশ ও প্রতিবাদসভা করে। ‘এ সময় ছাত্রনেতাদের মধ্যে নূরুল ইসলাম চৌধুরী, আবু মোঃ মুসা, বীরেন্দ্রনাথ, ডা. আফসার উদ্দিন, দ্রুত সাঁড়া মারোয়ারী স্কুলে যান। স্কুলের সকল ছাত্রকে একত্র করে বর্তমানের খবিরের চায়ের দোকানের মোড়ে একটি পুরনো বটগাছের নীচে ঢাকায় ছাত্র মিছিলে গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে এক সমাবেশের আয়োজন করেন। সমাবেশে বক্তব্য রাখেন ১০ম শ্রেণীর ছাত্র আব্দুল্লাহ মামু, বীরেন্দ্রনাথ রায়, বীধুভূষণ মজুমদার, আবু মুসা প্রমুখ। সমাবেশ শেষে মিছিল করে বালিকা বিদ্যালয়ে যেয়ে ছাত্রীদের ক্লাস বর্জনের আহ্বান জানানো হয়। ছাত্রীরাও তাদের সঙ্গে একাত্ম ঘোষণা করেন। আন্দোলনে ছাত্রদের পাশাপাশি যে সব ছাত্রী সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন তাদের মধ্যে সুফিয়া বেগম, জাহানারা প্রধান, নূরজাহান বেগম, হালিমা খাতুন, রাবেয়া খাতুন উল্লেখযোগ্য। (আবু মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন (সম্পা.), ভাষা আন্দোলনের আঞ্চলিক ইতিহাস) পাবনার সুজানগর, নাকালিয়া ও পাকশীতে ভাষা-আন্দোলনের কর্মসূচি পালন সম্পর্কে দৈনিক আজাদ পত্রিকায় উল্লেখ আছে : ‘পাবনা, নাকাথিয়ার [নাকালিয়ায়] ২৪শে ফেব্রুয়ারি মির্জা আব্দুল আউয়াল সাহেবের সভাপতিত্বে [,] ২৭শে ফেব্রুয়ারী সাতবাড়ীয়া হাইস্কুল প্রাঙ্গণে বাবু অচিন্ত্য কুমার চক্রবর্তীর সভাপতিত্বে [,] গত ২৪শে ফেব্রুয়ারী ঈশ^রদী ডাকবাংলো প্রাঙ্গণে ডাঃ মোহাম্মদ ইসমাইলের সভাপতিত্বে এবং ২৮শে ফেব্রুয়ারী পাকশী ঈশ^রদী গার্লস স্কুল ও হাইস্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের সভা হয়। ’
এভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ভাষা আন্দোলনের সময় পাবনা জেলার বিভিন্ন স্থানের মানুষ প্রতিবাদে ফেটে পড়েছিল। এ-সময় পুলিশ পাবনার ছাত্রজনতার উপর দমন-পীড়ন চালায়। অনেককে গ্রেফতার ও নির্যাতন করা হয়। ঢাকার খ্যাতিমান রাজনীতিক মনোরঞ্জন ধরকে ঐ সময় গ্রেফতার করে পাবনা কারাগারে আনা হয়। কারাজীবনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন : ‘পাবনা জেলেও দেখলাম ৪০-৫০ জন ছেলে ভাষা আন্দোলনের কারণে জেলে এসেছে। ওদের দেখে ভালোই লাগল।’ (উদ্ধৃত, বশীর আল্ হেলাল, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস) সরকার পুলিশি নির্যাতন করার পাশাপাশি ঢাকায় যাঁরা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে তাঁদের ধরার জন্য জেলায় জেলা প্রশাসকদের কাছে নির্দেশ পাঠায় এবং অভিযুক্তদের ৩০ দিনের মধ্যে হাজির হতে বলে। পাবনার আবদুল মতিন ও সৈয়দ এম. নুরুল আলমকে এই নির্দেশ দেওয়া হয়। ঢাকায় ভাষা-অন্দোলনে সক্রিয় নেতৃত্ব দেন পাবনার কৃতী সন্তান আবদুল মতিন (বৃহত্তর পাবনা), ফখরুল ইসলাম, ডা. ফজলে রাব্বি (শহিদ বুদ্ধিজীবী), ডা. সাঈদ হায়দার প্রমুখ।

ভাষা-আন্দোলনে পাবনার নারীদের অবদান ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে। সকল বাধা উপেক্ষা করে পাবনার যে সকল নারী ভাষা-আন্দোলনের সময় রাজপথে নেমে এসেছিলেন তাঁদের মধ্যে সেলিনা বানু, সাবেরা মুর্শেদ, সারোয়ারী জাহান, রোকেয়া বেগম প্রমুখ। ১৯৫২ সালের ২৭শে এপ্রিল ঢাকার বার এসোসিয়েশন হলে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের মহাসম্মেলন আবদুল মমিন তালুকদার বলেন : ‘এর আগে পাবনা শহরে কোনোদিন মহিলারা রাস্তায় বের হয় নি, কিন্তু ভাষা আন্দোলনের মিছিলে তাঁরা দলে দলে যোগদান করেন।’ (গাজীউল হক, স্মৃতিচারণ) নারীদের পাশাপাশি এখানকার শিশু-কিশোররাও রাজপথে নেমে এসেছিল। (রশীদ হায়দার, ‘৫২ সালের রণেশদা’)

পাবনায় ভাষা-আন্দোলনের বিরোধিতা করতে অনেকেই মাঠে নেমেছিল। মুসলিম লীগ নেতা ডা. মোফাজ্জল হোসেন, সোবহান হাজি, ফজর আলী ও তাদের সাঙ্গপাঙ্গরা প্রায়ই ভাষা-আন্দোলনের মিছিলে লাঠিসোটা, তীর, বল্লম ইত্যাদি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আক্রমণ চালাতো। (বিস্তারিত দেখুন : এম আবদুল আলীম, পাবনায় ভাষা আন্দোলন) মওলানা আব্দুল্লাহেল কাফীর অনুসারীরাও বিভিন্ন সময় ভাষা-আন্দোলনের মিছিলে হামলা চালিয়েছে। ড. মোহাম্মদ হাননান লিখেছেন : ‘ঢাকায় ২১শে ফেব্রুয়ারির ঘটনার জের হিসেবে পাবনাতেও ৫ই মার্চ শহীদ দিবস পালিত হয়। এদিন পীর আব্দুল¬াহেল কাফী সাহেবের মুরিদান লোকমান আলীর নেতৃত্বে একদল ধর্মান্ধ পীরভক্ত আদিষ্ট হয়ে লাঠি, বড় ছোরা নিয়ে ছাত্রমিছিলে হামলা চালালে ১০/১২ জন ছাত্র গুরুতরভাবে আহত হয়।’

মুসলিম লীগের দোর্দন্ড প্রতাপের যুগে পাবনার সংগ্রামী মানুষ যেভাবে ভাষা-আন্দোলন গড়ে তুলেছে, তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। পুলিশী জুলুম, মুসলিম লীগের গুন্ডাদের হামলা, মামলা-মকদ্দমা কোনো বাধাই তাঁদের আন্দোলনের গতি থামাতে পারে নি। পাবনায় ১৯৫৩ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ভিন্ন আবেগ নিয়ে পালিত হয়। এ বছর ১৫ই ফেব্রুয়ারি মুসলিম লীগের সম্মেলন উপলক্ষে নূরুল আমীন, আবদুর রব নিস্তারসহ মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের পাবনায় আগমন রুখে দেয় এখানকার ছাত্রসমাজ। শহীদদেও স্মৃতি স্মরণীয় করে রাখতে পাবনায় শহীদ মিনার নির্মিত হয় ১৯৫৪ সালে। (আহমদ রফিক, ভাষা আন্দোলন : টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া)

ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাসে এখানকার সংগ্রামী মানুষের অবদান ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। অসংখ্য ভাষাংগ্রামীর নাম পাবনা জেলার ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাসে চির স্মরণীয় হয়ে আছে। ভাষা-আন্দোলন স্মরণ করায় পাবনার মানুষ সবসময়ই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী। এ জেলার নীলবিদ্রোহ, প্রজাবিদ্রোহের মতোই ভাষা-আন্দোলনও ইতিহাসে স্থায়ী আসন লাভ করেছে। এ-আন্দোলনের পথ ধরে পাবনার সংগ্রামী মানুষ নানা আন্দোলন-সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে এবং স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় রেখেছে অনন্য অবদান।

লেখক-পরিচিতি : ড. এম আবদুল আলীম, গবেষক-প্রাবন্ধিক; শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়] বি. দ্র. : পাবনা জেলার ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে জানতে পড়ুন ড. এম আবদুল আলীমের কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কারপ্রাপ্ত গ্রন্থ ‘পাবনায় ভাষা আন্দোলন’; বইটির পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত সংস্করণ বের করেছে আগামী প্রকাশনী।



0
1
fb-share-icon1

Best WordPress themes


© All rights reserved 2020 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!