শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২০, ০৪:৩৬ পূর্বাহ্ন

আতঙ্কিত হবেন না
করোনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

পাবনা মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট

পাবনা মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট

image_pdfimage_print
পাবনা মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট

পাবনা মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট

বিশেষ প্রতিনিধি : ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি মানসিক স্বাস্থ্য সেবার জন্য একমাত্র বিশেষায়িত ৫০০ শয্যার পাবনা মানসিক হাসপাতাল।

প্রয়োজনানুযায়ী চিকিৎসক ও কর্মকর্তা কর্মচারীর অভাবে হাসপাতালটি নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েছে। মাত্র ৪ জন ডাক্তার দিয়ে চলছে ৫’শ বেডের এই হাসপাতালটি। এরপরও রোগীর আত্মীয় স্বজনদের অবহেলা আর উদাসীনতায় ২১জন রোগী সুস্থ হওয়ার পরও বাড়িতে ফিরতে পারছেন না। আসন সংকটের জন্য ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে দূর দূরান্তের রোগীদের।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ১৯৫৭ সালে দেশে মানসিক রোগীদের সেবার জন্য পাবনায় প্রথম বিশেষায়িত এই মানসিক হাসপাতালটি স্থাপন করা হয়। প্রথমে এটি শহরের শীতলাই হাউসে প্রতিষ্ঠা হয়। এর দু’বছর পর ১৯৫৯ সালে শহরের অদূরেই হেমায়েতপুর নামকস্থানে ১১১ দশমিক ২৫ একর জমিতে এটি স্থানান্তর করা হয়।

শুরুতে হাসপাতালটির শয্যা সংখ্যা ছিল ৬০টি। দিনে দিনে এর পরিধি বেড়ে এখন ৫০০ শয্যায় পরিণত হয়েছে। বেডের সংখ্যা বাড়লেও বাড়েনি সেবার মান। মাত্র ৪ জন চিকিৎসক দিয়ে চলছে কোনমতে চিকিৎসা সেবা। প্রতিদিন ৫০০ বেডের ৫০০ জন নিয়মিত রোগী এবং আউট ডোরে কমপক্ষে দেড় থেকে দু’শ জন রোগী দেখতে হিমশিম খেতে হয় চিকিৎসকদের।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, হাসপাতালের মোট ৫২২টি মঞ্জুরিকৃত পদের মধ্যে ১৬১টি পদ শূন্য রয়েছে। এদের মধ্যে চিকিৎসকের ৩০টি পদের মধ্যে ২৪টি শূন্য, প্রথম শ্রেণির অন্যান্য ৭টি পদের মধ্যে ২টি শূন্য, দ্বিতীয় শ্রেণির ১৯৬টি পদের মধ্যে ৩৬টি শূন্য, তৃতীয় শ্রেণির ১১৯টি পদের মধ্যে ২২টি এবং চতুর্থ শ্রেণির ১৭০টি পদের মধ্যে ৬৭টি পদ শূন্য।

শূন্যপদের মধ্যে সিনিয়র কনসালটেন্ট ২টি, ক্লিনিক্যাল সাইকিয়াট্রিস্ট ১টি, ক্লিনিক্যাল অ্যাসিস্টেন্ট ৭টি, মেডিকেল অফিসার ৪টি, সাইকিয়াট্রিক সোশ্যাল ওয়ার্কার ১টি, সহকারী রেজিস্ট্রার ২টি, এসএলপিপি ১টি, ডেন্টাল সার্জন ১টি, অ্যানেসথেটিস্ট ১টি, আবাসিক সাইকিয়াট্রিস্ট ১টি, ক্লিনিক্যাল প্যাথলজিস্ট ১টি, বায়োকেমিস্ট ১টি, সিনিয়র স্টাফ নার্স ১৬টি, স্টাফ নার্স ১৮টি, সহকারী নার্স ৬টি, লন্ড্রি সুপারভাইজার ১টি, ড্রাইভার ১টি, সহকারী অকুপেশনাল থেরাপিস্ট ৫টি,

এ ছাড়াও স্টেনোগ্রাফার ১টি, ইমাম ১টি, অফিস সহকারী কাম মুদ্রাক্ষরিক ৩টি, ইইজি টেকনিশিয়ান ১টি, টেলিফোন অপারেটর ১টি, এমএলএসএস ২৩টি, ওয়ার্ডবয় ৩৫টি, কুক মশালচী ৬টি, মালি ৩টি, সুইপার ১৪টি পদ খালি রয়েছে অনেক দিন ধরে। এতগুলো পদ শূন্য থাকায় ৫০০ জন মানসিক রোগীর চিকিৎসা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

এই সুযোগ হাতিয়ে নিচ্ছে হাসপাতালের আশেপাশে গড়ে উঠা ক্লিনিকগুলো। তাদের নিয়োগকৃত দালালদের কাছে নিয়মিত প্রতারিত হচ্ছেন চিকিৎসা সেবা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা।

হাসপাতাল ক্যাম্পাসে এক রোগীর স্বজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এখানে মানসিক রোগীদের সেবার নামে চলছে রমরমা ব্যবসা। রোগীদের খাবার, পরিস্কার পরিচ্ছন্ন নিয়ে রয়েছে তাদের বিস্তর অভিযোগ। তিনি অভিযোগ করে বলেন, সরকার কর্তৃক নির্ধারিত টাকার অর্ধেকও রোগীদের পিছনে খরচ করা হয় না।

এরপরও পরিবারের লোকজনের অবহেলা আর উদাসীনতার কারণে ১৫ থেকে ২০ বছর ধরে ভর্তি হওয়া ২১ জন রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার পরও বাড়ি ফিরতে পারছেন না। সুস্থ হওয়ার পরও তাদেরকে থাকতে হচ্ছে অসুস্থদের সাথে।

এদের মধ্যে ঢাকা সবুজ বাগের বদিউল আলম, চুয়াডাঙ্গার আশরাফুজ্জামান মিন্টু, রাজশাহীর বোয়ালিয়ার ইতেমাতুদ্দৌলা, ঢাকা মিরপুরের কাজী আকরামুল জামান, ঢাকা মগবাজারের সাঈদ হোসেন, ঢাকা ধানমন্ডির মাহবুব আনোয়ার, পাবনা নাজিরপুরের মিনহাজ্ব উদ্দিন, ঢাকা শাঁখারী বাজারের শিপ্রা রানী, ভুল ঠিকানায় ছকিনা খাতুন, জাকিয়া সুলতানা, ডলি খাতুন, গোলজার বিবি পলু, কাজী খোদেজা, আরজু বেগম, নাজমা আক্তার, নাঈমা চৌধুরী, শাহানা আক্তার, নাজমা নিলুফা, আমেনা খাতুন বুবি, সাহিদা খাতুন।

হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স নার্গিস সুলতানা জানান, পৃথিবীটা বড় আজব জায়গা। সম্পদের ভাগ বাটোয়ারা এবং পরিবারের বোঝা ভেবেই সুস্থ হওয়া সত্বেও এদের বাড়ি নিয়ে যাচ্ছে না তাদের স্বজনেরা। এদের নিয়ে গেলে আরো নতুন ২১টি রোগী সিট পাওয়ার সুযোগ পেত। এদের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না।

এসব সুস্থ রোগীদের বাড়ি ফিরে নিতে হাইকোর্টের অ্যাডভোকেট মেসবাউল ইসলাম ২০১৪ সালে স্ব-প্রণোদিত হয়ে হাইকোর্টে একটি রিট করেন। তার রিটের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও মানসিক হাসপাতালের পরিচালককে এদের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ প্রদান করেন।

এসব বিষয়ে কথা বলতেই পাবনা মানসিক হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডাক্তার তন্ময় প্রকাশ বিশ্বাস জানান, মাত্র ৪ জন ডাক্তার দিয়ে কিভাবে ৫’শ বেডের একটি হাসপাতাল চলে ? চাহিদা অনুযায়ী সেবা নিতে আসা রোগীদের কাঙ্খিত সেবা দেয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।

পাবনার সচেতন মহল মনে করেন বর্তমান সরকার পাবনার মানসিক হাসপাতালের দিকে বিশেষ নজর দিবেন। হাসপাতালের চাহিদানুযায়ী ডাক্তার, কর্মকর্তা কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে এবং অবকাঠামোর মান উন্নয়ন করে মানসিক সেবার মান নিশ্চিত করবেন। এটাই পাবনাবাসীর প্রত্যাশা।

Best WordPress themes


© All rights reserved 2020 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!