পাবনা সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটির নিকট সবিনয়ে আকুল আবেদন-৪

মহাত্মন,

সম্মানিত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও পাবনা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমার শশ্রদ্ধ সালাম গ্রহণ করবেন। আজ আমি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধকালিন সময়ের বীজয়ের  ক্রান্তিলগ্নে পাবনা সদর উপজেলার দাপুনিয়া ইউনিয়নের শ্রীকৃষ্টপুর গ্রামে ভারতীয় এবং স্থানীয় প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের পূর্বপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নিরীহ মানুষের জান-মাল রক্ষার্থে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির বাম হটকারি রাজনৈতিক দল (নকশাল) বাহিনীর বিরুদ্ধে জীবন-মরণের ঝুঁকি নিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কৌশলগত অভিযান পরিচালনার বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের চমকপদ কাহিনী নিয়ে।

এছাড়াও এ পর্বে থাকছে পাবনা সদর উপজেলার হিমায়েতপুর ইউনিয়নের নাজিরপুর গ্রামে গনহত্যার লোমহর্ষক বেদনা দায়ক ঘটনার বিবরণ। বীর মুক্তিযোদ্ধারা নকশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযানের মাত্রা বাড়িয়ে দিলে অনেক নকশাল বাহিনীর সদস্য মারা যায়।

আমি এর আগে তিন পর্ব নিয়ে লিখেছি।

মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমন থেকে প্রাণ বাঁচাতে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ঈশ্বরর্দীর আলাউদ্দিনের নেতৃত্বে আত্রাই এর রানীগ্রাম, পাবনার বেড়া অঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকার নকশালরা একসাথে সমবেত হতে থাকে। তারা পাবনা সদর উপজেলার দাপুনিয়া ইউনিয়নের শ্রীকৃষ্টপুর গ্রামে মাটির নিচে বাংকার তৈরি করে অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অবস্থান গ্রহণ করে।

শ্রীকৃষ্টপুর গ্রামে ওই বাংকারে নিরাপদে অবস্থান নিয়ে তারা দাপুনিয়া ইউনিয়নের জোতাদম, তবলপুর এবং মালিগাছা ইউনিয়নের নতুন বাংগাবাড়িয়া, পুরাতন বাংগাবাড়িয়া, নওদাপাড়া, রুপপুর, ঘরনাগড়া হয়ে শহরতলী টেবুনিয়া পর্যন্ত তাদের অবস্থান জোরদার করতে থাকে।

এ সমস্ত গ্রামের নারী পুরুষেরা নকশালদের আক্রমন থেকে প্রাণ বাঁচাতে নিজ নিজ গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। বিভিন্ন গ্রামে শুরু হলো অস্ত্রধারী নকশালদের মহড়া।

এসময় পাবনার পশ্চিমাঞ্চলে নিরিহ সাধারন মানুষদের মধ্যে নকশাল ভিতি আতংক বিরাজ করছিল।

এমনই যখন অবস্থা তখন বীর মুক্তিযোদ্ধারা নকশালদের প্রতিহত করতে গ্রহণ করলেন নুতন রণকৌশল । ওই রণকৌশল বাস্তবায়নের জন্য বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে একাধিক গ্রুপ গঠন করা হলো। অর্পিত দায়িত্ব অনুযায়ী শ্রীকৃষ্টপুর গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল আজিজ মন্ডল, বাদাল পাড়া গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আফছার মোল্লা এবং টিকরী গ্রামের ইয়াছিন সরদারকে বানানো হলো রাজাকার।

রাজাকার সেজে ওই ৩ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা জীবন-মরনের ঝুঁকি নিয়ে পাজামা-পাঞ্জাবী পরিধান করে মাথায় টুপি দিয়ে উপস্থিত হলেন, পাকিস্তানী শত্রু সেনাদের সহায়তাকারি পাবনা শহরের আটুয়া মহল্লার মগবের মুন্সির বাড়ীতে।

তারা সাক্ষাৎ করলেন মগবের মুন্সির ছেলে কালুর সংগে। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী কালুকে জানানো হলো, দাপুনিয়া ইউনিয়নের শ্রীকৃষ্টপুর গ্রামে মুক্তিযোদ্ধারা ঘাটি করে আমাদের মতো নিরীহ মানুষের উপর অত্যাচার চালাচ্ছে।

পাকিস্তানী শত্রু সেনাদের সহায়তাকারি কালু ৩জনকে সাথে নিয়ে হাজির হলেন পাবনা শহরের রাধানগরের ডাক বাংলায় অবস্থিত পাকিস্তানী সেনা ক্যাম্পে।

মুখভর্তি দাড়ি টুপি জুব্বা পরা দেখে পাকিস্তানী শত্রু সেনারা ৩ জন বীর মুক্তিযোদ্ধার কথা শুনে বিশ্বাস করে রাতের বেলা শ্রীকৃষ্টপুর অপারেশনে আসতে সম্মতি প্রকাশ করে।

বীর মুক্তিযোদ্ধাদের পাতানো খেলা মোতাবেক ১৯৭১ সালের ১০ নভেম্বর আজিজুল মন্ডল ও আফছার মোল্লা পাকিস্তানী শত্রু সেনাদের সাথে থেকে যান।

ইয়াছিন সরদারকে পাঠানো হয় মুক্তিযোদ্ধাদের সংবাদটি জানানোর জন্য। এ সংবাদটি পাওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে পাবনার পশ্চিমাঞ্চলের মুজিব বাহিনীর পিসি কমান্ডো বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম আজাদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা ইসরাইল হোসেন মেছের, বীর মুক্তিযোদ্ধা তোফাজ্জল হোসেন তক্কেল, তরিকুল ইসলাম নিলু, সিরাজুল হক মোল্লা, আমার ক্লাশ ফ্রেন্ড ইয়াকুব আলী ডুগু এবং নাজিরপুর গ্রামের ছিদ্দিকুর রহমানের নেতৃত্বে ২০০ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা রাতের অন্ধকারে শ্রীকৃষ্টপুর গ্রামের বাংকারে অবস্থানকারী নকশালদের দক্ষিণ দিক থেকে অবস্থান নিয়ে ঘিরে ফেলা হলো।

বীর মুক্তিযোদ্ধারা শ্রীকৃষ্টপুর গ্রামের দক্ষিণ পাশে বাংগোর নদীর পূর্ব পাশে বাংগাবাড়িয়া গ্রাম এবং শ্রীকৃষ্টপুর গ্রামের পাকা ধানের মাঠ। পাবনা ঈশ্বরর্দী পাকা সড়ক দিয়ে যে রাস্তাটি রুপপুর গ্রাম হয়ে শ্রীকৃষ্টপুর গ্রামে পৌছেছে সে রাস্তাটি ফাকা রাখা হলো পাকিস্তানী শত্রু সেনাদের শ্রীকৃষ্টপুরে অবস্থান কারি নকশালদের আস্তানার নিকট যাওয়ার জন্য।

ভোর ৪ টার দিকে শ্রীকৃষ্টপুর গ্রামে এসে পাকিস্তানী শত্রু সেনারা ফায়ার শুরু করে।

ফায়ারের শব্দ শুনে নকশালরা মনে করলো মুক্তিযোদ্ধারা তাদের সেল্টার ঘিরে ফেলেছে।

এ সময় নকশালরাও ফায়ার শুরু করে। দু’পক্ষের মধ্যে প্রচন্ড গুলিবিনিময় হয়। ভোরের অন্ধকার কেটে ফর্শা হলে নকশালরা বুঝতে পারলো পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাদের আক্রমন করেছে।

এ সময় নকশালরা পূর্ব থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের পজেশন নেয়া অবস্থানের দিকে প্রাণ বাঁচাতে পালানোর সময় মুক্তিযোদ্ধাদের পাতানো ফাঁদে ধরা পড়ে।

ততক্ষণে পাকিস্তানী সৈন্যারা নকশালদের বাংকারের মধ্যে প্রবেশ করে বাংকারে অবস্থানকারি অধিকাংশ নকশালকে গুলি করে হত্যা করে।

পাকিস্তানী শত্রু সেনারা জমসেদ সহ ৭-৮জন কে ধরে নিয়ে যায় পাবনা-ঈশ্বরর্দী সড়ক সংলগ্ন মালিগাছা বাসস্ট্যান্ডে এবং এখানে গুলি করে হত্যা করে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ঈশ্বরর্দীর আওতাপাড়া এলাকার নকশাল নেতা আশরাফকে।

পাকিস্তানী সেনারা জমসেদসহ ৭ নকশালকে পাবনা-ঈশ্বরর্দী সড়কের মালিগাছা গ্রামের মোসলেম প্রাং এর বাড়ীর পাশে পাকা সড়কের ধারে গুলি করে হত্যা করে।

নকশালদের মধ্যে এদিন যারা প্রাণ বাঁচাতে পাকা ধানের মাঠের মধ্যে গিয়েছিল তাদের সকলকেই মুক্তিযোদ্ধা ও নকশালদের হাতে নির্যাতিত মুক্তিকামী মানুষ কুপিয়ে হত্যা করে।

মালিগাছা পাকা সড়কের ধারে যাদের হত্যা করা হয়েছিল তাদের মৃত দেহ জোতকলসা গ্রামের বাছের দফাদারের ছেলে তছিম উদ্দিন নূর বকশো ব্যাপারীর বাশ বাগানের কাছে মাটির মধ্যে গর্ত করে পুতে রাখে।

এদিন শ্রীকৃষ্টপুর গ্রামে যে সমস্ত নকশালদের মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল তাদের মধ্যে অনেকেই অপরিচিত।

আত্রাই এর রানীনগরসহ পাবনা জেলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তারা এসে শ্রীকৃষ্টপুর গ্রামটি নিরাপদ মনে করে অবস্থান নিয়েছিল।

এদিন মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ব্যাংগাড়ী এলাকার সেকেন আলী নামক একজন আহত হয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধোদের মধ্যে এদিন কেউ কোনোরুপ ক্ষতির সম্মুখিন হননি, এমনকি কেউ মারাও যাননি।

এদিনের অভিযানে রনকৌশলে নেতৃত্ব দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ লড়াইয়ে বিজয়ী হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন, স্থানীয় প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধারা।

এদিনের স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন-মরণ যুদ্ধের কথা কোনো দিন ভুলবার নয়। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (নকশাল) এর হটকারী রাজনীতি ছিল ভুল।

তাদের মারাত্মক ভুলের কারনে শুধুমাত্র দেশের নিরীহ মানুষই ক্ষতিগ্রস্থ হননি। এ বাহিনীর ভুল রাজনীতির কারনে নকশাল বাহিনী সদস্যদের পরিবারের নিরপরাধ অনেক মানুষকে এর জন্য চরম মুল্য দিতে হয়েছে।

কোন হঠকারি রাজনীতিই মানুষের জন্য কল্যাণকর নয়। আমাদের দেশে রাজনীতিবীদরা অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা গ্রহণ করলে গোটা জাতীর জন্য সেটা শুখকর হবে।

১৯৭১ সনের ১ ডিসেম্বর। সমগ্র জাতি ৯ মাস ধরে রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা যুদ্ধ করার পর যখন মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌছেছে।

এদিন সবে মাত্র মসজিদে ভোরের আযান শেষ হয়েছে অনেক মুসুল্লী অজু করে ফজরের নামাজ আদায় করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

এসময় পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির বেঁচে থাকা নকশালরা পাকিস্তানী শত্রু সেনাদের সংগে নিয়ে পশ্চিম দিক থেকে নাজিরপুর গ্রামটি ঘিরে ফেলেছিল। অনেক মুসুল্লী পবীত্র নামাজ আদায় করার জন্য মসজিদে যাচ্ছিলেন।

পথিমধ্যে থমকে দাঁড়ালেন তারা, সামনে রাস্তায় ওরা কারা? সকলেই বুঝতে পারলেন পাকিস্তানী শত্রুসেনারা পুরো নাজিরপুর গ্রামটি ঘিরে ফেলেছে।

রাতের অন্ধকার ভেঙ্গে ভোর হওয়ার আগেই শুরু হলো নাজিরপুর গ্রামের নিরস্ত্র মানুষের ছুটাছুটি।

শুরু হলো ফায়ার। হঠাৎ ঘুম ভেংগে কিছু বুঝে উঠার আগেই পাকিস্তানী শত্রুসেনাদের হাতে ধরা পড়লো অনেকেই। নকশাল বাহিনীর সহায়তায় পাকিস্তানী শত্রুসেনারা গ্রামের অনেককেই এসময় ধরে ফেললো।

এদিন যারা গ্রামের পূর্ব দিকে হেমায়েতপুর গ্রামের দিকে গিয়েছিলেন, তারা সবাই বেঁচে গিয়েছিলেন।

এদিন পাকিস্তানী শত্রুসেনারা মুক্তিযোদ্ধাসহ ৬৬ জনকে নিষ্ঠুরতম নির্যাতন করে পাবনা- রুপপুর সড়কের ডান পাশে নাজিরপুর গ্রামের মকবুল মাস্টার এর বাড়ির পাশে একটি গর্তের মধ্যে গুলি করে হত্যা করে।

এদিন মহান আল্লাহতা’আলার কৃপায় কোনো মতে বেঁচে গিয়েছিলেন আমার ছোট মামা আবদুল হামিদ প্রাং।

এখানে উল্লেখ্য, ১৯৫৩ সালের ২৬ অক্টোবর নাজিরপুর গ্রামের নানা বাড়ীতে আমার জন্ম। আমার নানার নাম ছিল আহেদ আলী প্রাং। আমার নানার ৪মেয়ে এবং ২ছেলে ছিল। আমার আম্মা ছিলেন ২ মামারই বড়। নাজিরপুর গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা নজরুল ইসলাম হাবু (সাবেক চেয়ারম্যান) যাকে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ১৯৭৪ সালের ১৮ মার্চ হেমায়েতপুর বোর্ড ঘরের সামনে নকশাল বাহিনীর সদস্যরা প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করে।

নজরুল ইসলাম হাবুর সহধর্মীনি এবং আমার আম্মা ছিলেন আপন মামাতো ফুপাতো বোন। এ সুবাধে নজরুল ইসলাম হাবুকে আমি খালু বলে ডাকতাম।

শশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের শেষে মাতৃভূমি বাংলাদেশ যখন বীজয়ের দ্বারপ্রান্তে তখন নাজিরপুর গ্রামে ঘটে ইতিহাসের জঘন্যতম গনহত্যা। আমরা ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের বিশেষ গেরিলা বাহিনীর সদস্য মুক্তিযুদ্ধারা দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ঈশ্বরর্দী, আটঘরিয়া, এবং পাবনা সদর উপজেলার নিজেদের অবস্থান এলাকায় ফিরে এসেছি।

সংবাদ পেলাম আমার ছোট মামা আবদুল হামিদ প্রাং পাকিস্তানী শত্রুসেনাদের আক্রমন থেকে কোনো মতে বেঁচে এসে আমাদের মালিগাছা এলাকায় অবস্থান নিয়েছেন।

আমি এদিন সন্ধ্যার পর ছোট মামার সংগে সাক্ষাৎ করলাম। এদিন কোনো মতে মামাকে নিজেদের এলাকায় রাখতে পারলাম না।

তাই বাধ্য হই মামাকে সংগে নিয়ে অস্ত্র হাতে মালিগাছা ইউনিয়নের ঘরনাগড়া গ্রামের পাশ দিয়ে হেমায়েতপুর ইউনিয়নের চকচিরট হয়ে নাজিরপুর গ্রামের বিলপাড়া মাঠের মধ্যে দিয়ে অতি সতর্ক অবস্থায় পৌছালাম নাজিরপুর গ্রামের মামা বাড়ীতে।

মামা প্রথমে যেখানে উলুর জমির মধ্যে তার লাইসেন্সকৃত বন্দুকটি রেখেছিলেন সেখানে গেলেন। যে সাহসে মামা নাজিরপুর গ্রামে গেলেন তার সে সাহস আর থাকলো না।

উলুক্ষেতের জমিতে রক্ষিত বন্দুকটি পাওয়া গেল না। মামা বাড়ীতে একটি ঘরের মধ্যে দেখলাম অনেক ডিমের খোসা পড়ে আছে। পাকিস্তানী শত্রুসেনা ও নকশালরা এ ঘরের মধ্যে ডিম রান্না করে ভাত খেয়েছিল।

দেখলাম পুরো গ্রাম নিরব নিস্তব্ধ মামা তার অতি ঘনিষ্ট কয়েকজনের বাড়ী গেলেন, তাদের নাম ধরে ডাকলেন। কোন সাড়া শব্দ নেই।

মামার ডাক শুনে বাড়ীর মধ্য থেকে মহিলারা বের হয়ে সামনে দাঁড়ালেন। এ বাড়ীগুলোর অনেকেই সেদিন গনহত্যার স্বীকার হয়েছিলেন।

তবু কারোর চোখে কোন পানি নেই। গ্রামে কোন বয়স্ক পুরুষ মানুষ নেই। পরবর্তী রাতে পুনারায় পাকিস্তানী শত্রুসেনা ও শশস্ত্র নকশালদের আক্রমন হতে পারে এরকম অজানা আতংকে গ্রামের সবাই ভীত সন্ত্রস্ত্র।

স্বচক্ষে দেখলাম গ্রামের অনেক বাড়ীঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। শত্রুসেনারা এদিন কয়েকজন মহিলার সম্ভম হানি করে।

এ গ্রামে থাকা নিরাপদ নয় ভেবে মামা আমাকে নাজিরপুর বিলপাড়া মাঠের মধ্যে রেখে আমাকে বাড়ী চলে যেতে বললেন। জোৎস্না রাত অস্ত্র হাতে আমি যখন বাড়ী ফিরছিলাম দেখলাম খেসারী মাঠের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে অবস্থানে ভীত সন্ত্রস্ত্র গ্রামবাসী সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন গ্রামের অসংখ্যা মানুষ।

কেউ ভয়ে আতংকে দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক দেখছেন, আবার কেউ কেউ খেসারী ক্ষেতের জমির মধ্যে লুকিয়ে পড়ছেন। বাড়ী ফিরে দেখলাম দুই মামানী এবং সকল মামাতো ভাই বোন গিয়ে উপস্থিত হয়েছেন আমাদের বাড়ীতে।

এদের সংগে কিছু সময় কথা বলে বাড়ী ছেরে নিরাপত্তা জনিত কারণে নিজ সেল্টারে চলে গেলাম।

পরবর্তীতে প্রকাশিত হবেঃ পাবনা সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা যাচাই- বাছাই কমিটির নিকট সবিনয়ে আকুল আবেদন। পর্ব -৫

বিনীত নিবেদক

আবদুল জব্বার
পাবনার ঐতিহাসিক মালিগাছা রণাঙ্গনের সহযোদ্ধা

সাধারণ সম্পাদক, মালিগাছা ইউনিয়ন মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ, পাবনা সদর, পাবনা।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের সনদ নং-ম ১৯৭০০৩।