শনিবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২১, ১২:২৩ অপরাহ্ন

আতঙ্কিত হবেন না
করোনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

পাবনা হানাদারমুক্ত দিবস আজ

দূর্জয় পাবনা

image_pdfimage_print
দূর্জয় পাবনা

দূর্জয় পাবনা

।। শাহীন রহমান ।।
আজ ১৮ ডিসেম্বর। মুক্তিযুদ্ধের ৭ নং সেক্টর পাবনা হানাদার মুক্ত দিবস। একাত্তর সালে ১৬ ডিসেম্বর দেশ শত্রুমুক্ত হলেও পাবনা হানাদার মুক্ত হয় এর দু’দিন পর। ১৮ ডিসেম্বর পাবনার দামাল মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্থানী হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের পরাজিত করে কালেক্টরেট ভবনে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে পাবনাকে শত্রুমুক্ত করেন।

কিন্তু পাবনা মুক্ত দিবস উপলক্ষ্যে জেলা প্রশাসন ও জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলসহ কোনো সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন পাবনা মুক্ত দিবস উপলক্ষ্যে কোনো কর্মসূচী গ্রহণ করতে দেখা যায়নি কখনও।

আলাপকালে পাবনার প্রবীণ কলামিষ্ট-মুক্তিযোদ্ধা এবাদত আলীসহ অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারা জানান, ১৯৭১ সালে ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ঐতিহাসিক ভাষনে স্বাধীনতার ডাক দিলে পাবনার আপামর জনতা দেশকে স্বাধীন করতে প্রস্তুতি গ্রহণ করে।

২৫ মার্চ পাবনার তৎকালীন জেলা প্রশাসক নুরুল কাদের খান পাবনার সর্বস্তরের জনগণকে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ ও পাকবাহিনীকে প্রতিরোধের জন্য আহবান জানান। তার আহবানে সাড়া দিয়ে পাবনা পুলিশ লাইনে সর্বস্তরের দেশপ্রেমিক জনতা উপস্থিত হলে জেলা প্রশাসক নুরুল কাদের খান পুলিশ লাইনের অস্ত্রাগার উন্মুক্ত করে দেন দেশ মাতৃকার টানে উদ্ধুদ্ধ হয়ে।

এদিকে একইদিন বিকেলে শহরের কৃষ্ণপুর মহল্ল¬ার শহীদ শুকুরের জানাজা নামাজে পাকিস্থানী সেনারা গুলি চালালে আব্দুস সামাদ নামের এক ব্যক্তি নিহত হন। আহত হন আরো অনেকে। এ সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে ছাত্র, জনতা, বাঙ্গালী পুলিশ ও ইপিআর সদস্যরা সমবেতভাবে টেলিফোন এক্সচেঞ্জে অবস্থানরত পাকিস্থানী সেনাদের উপরে হামলা চালায়।

২৭ ও ২৮ মার্চ দুইদিনব্যাপী তুমুল যুদ্ধে ২৮ জন পাকিস্থানী বর্বর সেনা নিহত হয়। পাকবাহিনীর অন্য সদস্যরা টেলিফোন এক্সচেঞ্জ থেকে পালিয়ে পাবনা শহরের অদুরে বিসিক শিল্প নগরীতে আশ্রয় নেয়।

মুক্তিকামী জনতা বিসিক শিল্পনগরী আক্রমন করার পরিকল্পনা করে। পাকিস্থানী সেনারা বিসিক শিল্প নগরীতে অবস্থান করা নিরাপদ নয় ভেবে ঢাকায় ওয়্যারলেসযোগে সংবাদ পাঠালে ২৮ মার্চ পাকিস্থানী বিমান বাহিনী এসে পাবনা শহরে বিমান থেকে গুলি বর্ষণ করে এবং পাকিস্থানী সেনাদের পাবনা ত্যাগের নির্দেশ দেয়। ৩০ মার্চ পাকিস্থানী হানাদার বাহিনী’র ১৮০ জন সদস্য সড়ক পথে পাবনা-পাকশী সড়কের দাশুড়িয়া নামক স্থান দিয়ে পালানোর সময় মুক্তিকামী জনতা তাদের উপর গেরিলা হামলা চালালে সকল পাক সৈন্য নিহত হয়।

দাশুড়িয়ায় প্রচুর সংখ্যক পাকিস্তানী সেনা নিহত হওয়ায় তীব্র পরাজয়ের গ্লানী সহ্য করতে না পেরে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে ওঠে। ৪ এপ্রিল থেকে পাকিস্তানী সেনাদের একটি ব্যাটেলিয়ান ঢাকা থেকে আরিচা ঘাট হয়ে পাবনা নগরবাড়ীতে প্রবেশের চেষ্টা চালায়। সংবাদ পেয়ে পুলিশ ও ইপিআর সদস্যের সাথে ছাত্র-জনতা সম্মিলিতভাবে নগরবাড়ী ঘাটে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

৪ এপ্রিল থেকে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত উভয়পক্ষের মধ্যে তীব্র যুদ্ধ শেষে পাকিস্তানী সেনারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। ৩০ মার্চ থেকে ৯ এপ্রিল পাবনা ছিল শত্রুমুক্ত। এরপর শক্তি বৃদ্ধি করে নৌ ও বিমান বাহিনীর সহায়তায় পাক হানাদার বাহিনী নগরবাড়ী ঘাটে প্রবেশ করে ত্রিমূখী হামলা চালায়।

১০ এপ্রিল সকালে নগরবাড়ী থেকে পাবনায় প্রবেশের সময় পাকিস্তানী সেনা সদস্যরা রাস্তার দু’পাশের অসংখ্য ঘরবাড়ী ও দোকানপাট অগ্নিসংযোগ করে এবং ব্যাপক লুটপাট চালিয়ে অগণিত মানুষকে হত্যা করে। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী পাবনায় প্রবেশ করে পাবনা শহরের সার্কিট হাউস, নুরপুর ডাকবাংলো ও সরকারী এডওয়ার্ড কলেজে ক্যাম্প স্থাপন করে।

জুলাই মাসে ভারত থেকে প্রশিক্ষণ শেষে মুক্তিযোদ্ধারা এসময় পাবনায় প্রবেশ করে। পাবনায় এসেই মুক্তিযোদ্ধারা জেলার সুজানগর, আটঘরিয়া, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, সাতবাড়িয়া, দ্বিপচর, ঢালারচর, টিকরী, বাঁশেরবাঁদা, নাজিরপুর, দাপুনিয়া, আওতাপাড়া, চর শানিকদিয়ার, চর সদিরাজপুর ও মাধপুরসহ বিভিন্ন স্থানে অবস্থান গ্রহণ করে।

এখানে উল্লেখ্য পাবনা জেলা ছিল মুক্তিযুদ্ধের ৭ নং সেক্টর। মুক্তিযোদ্ধাদের কমান্ডার ছিলেন মেজর কাজী নুরুজ্জামান। অপরদিকে এ সেক্টরে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর ১২ নং পাঞ্জাব রেজিমেন্টের কমান্ডার ছিলেন মেজর মীর নেওয়াজ খান।

পাবনায় মুক্তিযোদ্ধারা রফিকুল ইসলাম বকুল, বেবী ইসলাম, মকবুল হোসেন সন্টু, ইকবাল হোসেন প্রমূখের নেতৃত্বে কয়েকটি গ্রুপে ভাগ হয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের পাবনায় আগমনের পর থেকেই পাবনায় মুক্তিযুদ্ধের গতিধারা পাল্টে যায়। পাকিস্তানী সেনাদের যাতায়াতের বিঘ্নসহ মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধের কৌশল’র জন্য বেশকিছু কালভার্ট ও ব্রীজ উড়িয়ে দেয়।

পাকিস্তানী সেনারা জেলার বিভিন্ন স্থানে মুক্তিকামী জনতার উপর বর্বরোচিত হামলা চালায়। চরশানিকদিয়ারে পাকসেনাদের হাতে শহীদ হয় সেলিম, হামিদ, দিলু, আফতাবসহ বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা। ৮ আগষ্ট মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল লতিফ পাবনা পাওয়ার হাউজ ধ্বংস করতে গিয়ে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর হাতে শহীদ হন।

১২ ডিসেম্বর পাবনার মুজিব বাহিনী প্রধান রফিকুল ইসলাম বকুলের নেতৃত্বে জেলার সুজানগর থানা আক্রমন করে মুক্তিযোদ্ধারা। দুইদিন তুমুল যুদ্ধের পর ১৩ ডিসেম্বর সুজানগর থানা শত্রুমুক্ত হয়। ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্থানী হানাদার বাহিনী পাবনায় ব্যাপকভাবে বিমান হামলা চালায়।

১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ত্রিমুখী পজিশন নিয়ে ব্যাপক হামলা চালায়। দুইদিন একটানা তুমুল যুদ্ধের পর পাক বাহিনী পাবনা ছেড়ে পালিয়ে গেলে ১৮ ডিসেম্বর পাবনা শত্রুমুক্ত হয়। এদিনই মুক্তিযোদ্ধারা শহরে প্রবেশ করে বিজয় মিছিল শেষে কালেক্টরেট ভবনে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে পাবনাকে শত্রুমুক্ত ঘোষনা করেন।

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে সেই সব বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের নিদর্শন হিসেবে যুদ্ধের ২৮ বছর পর ১৯৯৮ সালে পাবনার তৎকালীন জেলা প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবুর রহমানের উদ্যোগে কালেক্টরেট ভবনের সামনে ‘দূর্জয় পাবনা’ নামে একটি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ নির্মান করা হয়।

এদিকে পাবনা পৌরসভার উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জেলার মুক্তিবাহিনী ও মুজিব বাহিনীর প্রধান বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বকুলের স্মরনে পাবনা পৌর মিলনায়তনকে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বকুল পৌর মিলনায়তন’ নামকরণ করা হয়েছে।

এদিকে পাবনা মুক্ত দিবস উপলক্ষ্যে প্রশাসন, জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলসহ কোনো রাজনৈতক-সামাজিক সংগঠন এবছর কোনো কর্মসূচীর আয়োজন করেনি বলে জানা গেছে।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ পাবনা জেলা ইউনিট কমান্ডার হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, ১৬ ডিসেম্বর যেহেতু সারাদেশে বড় আকারে বিজয় দিবস পালন করা হয়, দু’দিন পর সেহেতু আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে পাবনা মুক্ত দিবস পালন করিনা। ইতিপূর্বে কোনো বছরই আমাদের কেনো কর্মসূচী ছিলোনা বলেও জানান তিনি।

0
1
fb-share-icon1

Best WordPress themes


© All rights reserved 2020 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!