রবিবার, ১৩ জুন ২০২১, ০২:৪০ পূর্বাহ্ন

প্রখ্যাত সুফি সাধক পাবনার মাহমুদপুরের হুজুর শফি উদ্দিন খাঁন (রহ.)


।। এবাদত আলী।।
পাবনা সদর উপজেলার মালঞ্চি ইউনিয়নের মাহমুদপুর গ্রামের শফিউদ্দিন খাঁন ওরফে শফি হুজুর মাহমুদপুরের হুজুর নামে সাধারণ মানুষের নিকট অতি পরিচিত। অনেকেই তাঁকে সুফি হুজুর বলেও জানতেন। তিনি ছিলেন আধ্যাত্মিক পুরুষ। অর্থ-বিত্তশালী পরিবারে জন্মগ্রহণ ও লালিত পালিত হয়েও তিনি ছিলেন অতি সাধারণ বেশি একজন ব্যক্তি। তাঁর পুর্ব পুরুষেরা এই মাহমুদপুরেরই বাসিন্দা। তাঁর পিতার নাম মরহুম নছিম উদ্দিন খান।

শফি উদ্দিন খানের বড় ছেলে আলহাজ আব্দুল কুদ্দুছ খান জানান তাদের ৬ষ্ঠ পুরুষের জনৈক মাহমুদ খানের নামানুসারে এই গ্রামের নামকরণ করা হয়েছে মাহমুদপুর। মাহমুদপুরের হুজুর সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য গত ৯ মার্চ-২০১৪, আমার সুহৃদ দৈনিক সিনসা পত্রিকার বার্তা সম্পাদক সৈয়দ সাইফুল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে মোটর সাইকেল যোগে হাজির হই তাঁরই বড় ছেলে মাহমুদপুর সিনিয়র মাদরাসার সাবেক প্রিন্সিপাল আলহাজ আব্দুল কুদ্দুস খাঁনের বাসায়। কুদ্দুছ খাঁন তার ছোট ভাই আলহাজ সিহাব উদ্দিন খাঁনের নিকট আমাদেরকে নিয়ে গিয়ে বলেন তার ছোট ভাই এব্যাপারে বিস্তারিত বলতে পারবে।

মাহমুদপুরের হুজুর সম্পর্কে যে সকল তথ্য জানা যায় তা হলো তিনি বাংলা ১৩২২ সনে মাহমুদপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বলতে গেলে খুবই সীমিত। বাল্যকালে গোবিন্দপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষা লাভের পর পাবনা আলিয়া মাদরাসায় কিছুদিন লেখা পড়া করেন। তার চাচাতো ভাই নিজামুদ্দিন খান এবং এলাকার মক্তবের শিক্ষক মুন্সি আবির উদ্দিনের সঙ্গে তিনি তৎকালিন ভারত উপমহাদেশের প্রখ্যাত সুফি সাধক ফুরফুরা শরীফের কামেলে মোকাম্মেল পীর হজরত আবু বকর সিদ্দিক (র.) এর দরবারে উপস্থিত হন এবং বায়াত গ্রহণ করেন। পীর সাহেব তাকে তাওয়াজ্জু দেন।

সেখানে তিনি বেশ কিছুদিন অবস্থান করেন এবং পরবর্তীকালে নিজ গ্রামে ফিরে আধ্যাত্মিক সাধনায় মনোনিবেশ করেন। তিনি আজীবন অতি সাধারণ পোষাক পরিধান করতেন এবং তার খাদ্য খানা ছিলো খুবই সীমিত। তিনি রাতে মাত্র এক কাপ দুধ পান করতেন। দুধের সঙ্গে তিনি খৈ খেতেন। খৈ ছিলো তাঁর প্রিয় খাবার। রমজান মাসের রোজাসহ তিনি প্রতি চন্দ্র মাসে কমপক্ষে তিনটি রোজা করতেন। তিনি খুবই অতিথি পরায়ণ ছিলেন। তাঁর বাসায় কেউ গেলে কিছু একটু না খেয়ে ফিরতে পারতেননা। তিনি মানব সেবাসহ জীবজন্তুরও সেবা করতেন। তাঁর কাছে ধনী ও গরীবের কোন পার্থক্য ছিলোনা। একবার তাঁর সহচার্যে কেউ গেলে বার বার সেখানে যেতে মন চাইতো । আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসুল (সাঃ) এর আদেশ নিষেধ অর্থাৎ পবিত্র কোরআন ও পবিত্র হাদিস অনুসারে জীবন যাপনের পাশাপাশি অন্যকেও তা মেনে চলার জন্য তিনি নছিহত করতেন। তাঁর সাবলিল ও প্রাঞ্জল ভাষার বক্তৃতা সকল ধর্মপ্রাণ মুসলমানের মনে দাগ কাটতো। পীর মুর্শিদকে নিয়েই তিনি বেশি ব্যস্ত থাকতেন। তাঁর আমল ও আকিদা ছিলো মজবুত। প্রতি বছর তিনি ফুরফুরা দরবার শরীফে গমণ করতেন।

১৯৪৭ সালে ফুরফুরা শরীফের মেজলা পীর কেবলা হজরত শাহ সুফি আবু জাফর সিদ্দিকী (রঃ) এর নির্দেশক্রমে তিনি মাহমুদপুর গ্রামে নিজস্ব জমিতে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। যা বর্তমানে মাহমুদপুর সিনিয়র মাদরাসা হিসেবে পরিচিত। তখন থেকেই এলাকাবাসি তাঁকে মাদরাসা পরিচালনার জন্য সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব দেন, যা তিনি আমৃত্যু তা পালন করেছিলেন। মাদরাসার পাশেই একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। মসজিদ সংলগ্ন ছিলো তার খানকা বা এবাদত খানা। তিনি প্রায় সময়ে সেখানেই অবস্থান করতেন। তিনি মাদরাসা সংলগ্ন একটি গোরস্থান প্রতিষ্ঠার জন্য জমি দান করেন যা মাহমুদপুর গোরস্থান হিসেবে পরিচিত।

তাঁর জীবদ্দশায় তিনি বিভিন্ন স্থানে বহুসংখ্যক খানকা প্রতিষ্ঠা করেন। এসকল খানকা শরীফের মধ্যে টেবুনিয়া জাফরিয়া খানকা যেখানে প্রতি চন্দ্র মাসের ১৬ তারিখে ভজেন্দ্রপুরের মওলানা মুশফিকুর রহমানের তত্তাবধানে জেকের মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। চন্দ্র মাসের বিভিন্ন তারিখে আরো যে সকল খানকায় জেকের মাহফিল অনুষ্ঠিত হয় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বালিয়াহালট গোরস্থান সংলগ্ন খানকা, পরিচালনার দায়িত্ব প্রাপ্ত খাদেম আব্দুল হান্নান মেম্বর। বাসুদেবপুর গোরস্থান সংলগ্ন খানকা, দায়িত্বে মওলানা ইব্রাহীম হোসেন ও কাজি রফিক উদ্দিন। কামারগ্রাম গোরস্থান সংলগ্ন খানকা, দায়িত্বে মওলানা বেলাল হোসেন। পারগোবিন্দপুর গোরস্থান সংলগ্ন খানকা, দায়িত্বে আলহাজ মোহাম্মদ আলী। কয়রাবাড়ি গোরস্থান সংলগ্ন খানকা, দায়িত্বে মওলানা শহিদুল্লাহ। পাটেশ্বর পশ্চিম পাড়া খানকা, দায়িত্বে জনৈক হাফেজ সাহেব। ফৈলজানা মসজিদ সংলগ্ন খানকা, দায়িত্বে ডাঃ শাহজাহান আলী। ব্যাঙগাড়ি গোরস্থান সংলগ্ন খানকা, দায়িত্বে মওলানা আব্দুল করিম। মতিঝিল গোরস্থান সংলগ্ন খানকা, দায়িত্বে মওলানা শহিদুল ইসলাম। শ্রীধরপুর খানকা, দায়িত্বে মোঃ আব্দুল গাফ্ফার।

চকছাতিয়ানি হাজী কফিল উদ্দিনের বাড়ির খানকায় দায়িত্বে আছেন তারই ছেলে। এছাড়া ধলেশ্বর গোরস্থান সংলগ্ন খানকা এবং রামনগর গোরস্থান সংলগ্ন খানকায় মাসিক মাহফিলের দায়িত্ব পালন করেন তাঁরই ছোট ছেলে আলহাজ সিহাব উদ্দিন খাঁন। এই সকল খানকায় চন্দ্র মাসের নির্ধারিত তারিখে মুরিদ ও ভক্তবৃন্দ একত্রিত হয়ে আসর নামাজের পর হতে এশা’ পর্যন্ত কালেমা শরীফ পাঠ, জেকের আজকার, দরুদ পাঠ, বয়ান, মিলাদ মাহফিল ও মোনাজাত করা হয়। তাবারক পরিবেশনের মধ্য দিয়ে মাহফিলের সমাপ্তি ঘটে থাকে।

অপরদিকে হুজুরের জীবদ্দশায় তাঁরই চাচাতো ভাই এবং পীর ভাই নিজামুদ্দিন খানের মৃত্যু বার্ষিকী উপলক্ষে প্রতি বৈশাখ মাসের শেষ শুক্রবার মাহমুদপুরে বার্ষিক মাহফিল অনুষ্ঠিত হতো, যা অদ্যাবধি চালু আছে।

মাহমুদপুরের হুজুর শফি উদ্দিন খান ওরফে শফি হুজুর গত ২০১০ সালের ১৯ নভেম্বর রাতের বেলা পাবনা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। পরদিন ২০ নভেম্বর মাহমুদপুর মাদরাসা ময়দান ও ময়দান সংলগ্ন বিশাল এলাকা জুড়ে তাঁর নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত জানাজা ছিলো স্মরনকালের সবচেয়ে বেশি মুসুল্লীর উপস্থিতে জানাজা। এতে লক্ষাধিক লোকের সমাগম ঘটে। (প্রসঙ্গত উল্লেখ্য উক্ত জানাজা নামাজে অত্র লেখক এবাদত আলী ও উপস্থিত ছিলেন)।

মাহমুদপুরের হুজুর ডাক্তার কবিরাজ ছিলেননা বটে তবে তাঁর কাছে লোকে বিভিন্ন অসুখ বিসুখ নিয়ে আরোগ্যের আশায় ছুটে আসতেন। তিনি কাউকে নিরাশ করতেননা। তদবির হিসেবে দোয়া করতেন অথবা দোয়া লিখে দিতেন। বিশেষ করে জিনে ভুতে ধরা রোগী তার কাছে এলে বেশি উপকার পেতো।

তাঁর জীবনে অসংখ্য কারামতি প্রকাশিত হয়েছিলো। কারো কোন জিনিষ হারিয়ে গেলে তাঁর কাছে নালিশ দিলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সে তার হারানো জিনিষ ফেরত পেতো। তাঁর ছোট ছেলে আলহাজ সিহাব উদ্দিন খাঁন বলেন, একবার চর এলাকার এক লোকের ৯ মাসের গর্ভবতী একটি গাভী হারিয়ে গেলে তিনি আব্বার নিকট সকাল বেলা এসে কেঁদে তা বলেন। আব্বা কিছু সময় চোখ বন্দ করে থাকেন একটি দোয়া লিখে তাঁকে বিদায় করে দেন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে লোকটি আমাদের বাড়ি থেকে রাস্তায় উঠতেই তার সেই গাভীকে দেখতে পান যে গাভী তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

হুজুরের বড় ছেলে আলহাজ মওলানা আব্দুল কুদ্দস খাঁন বলেন, আব্বার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে নিকট ও দুরের হাজার হাজার মানুষ তাঁর জানাজা নামাজে শরীক হবার জন্য ছুটে আসেন। কিন্তু মাহমুদপুর মাদরাসা মাঠ, রাস্তা এবং আশেপাশের ফাঁকা জায়গা লোকে ভর্তি হয়ে যায়। তখন বাধ্য হয়ে আমদের পরিবারের পক্ষ থেকে এলাকার লোকজনকে অনুরোধ করা হয় এই বলে যে, জানাজা নামাজ আদায় করতে গিয়ে যেসকল লোকের জমির যে ধরনের ফসলের ক্ষতি হবে তা আমরা তাঁদেরকে ক্ষতিপূরণ দেবো। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, জানাজা নামাজ আদায় করতে গিয়ে যেসকল জমির ফসল দারুনভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিলো তা দুদিন বাদে আবার ঠিক হয়ে খাড়া হয়ে যায়। শুধু তাই নয় কারো ফসলের কোন ক্ষয় ক্ষতি তো হয়ই নাই উপরন্ত তাদের সেই সকল জমিতে দ্বিগুন ফসল তারা লাভ করেন।

কামেল বুজর্গ শফি হুজুর স্মরণে প্রতি বছর অগ্রহায়ণ মাসের প্রথম শুক্রবার তাঁর বসত বাড়ি সংলগ্ন মাহমুদপুর মাজার প্রাঙ্গনে বার্ষিক মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট/সদস্য পাবনা প্রেসক্লাব )।

0
1
fb-share-icon1


শৈশব কৈশরের দুরন্ত-দুষ্টু ছেলেটিই আজকের এমপি প্রিন্স

শৈশব কৈশরের দুরন্ত-দুষ্টু ছেলেটিই আজকের এমপি প্রিন্স

শৈশব কৈশরের দুরন্ত-দুষ্টু ছেলেটিই আজকের প্রিন্স অফ পাবনা

Posted by News Pabna on Thursday, February 18, 2021

© All rights reserved 2021 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
x
error: Content is protected !!