ঢাকাবুধবার , ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২১

প্রসঙ্গ বইমেলা

News Pabna
ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২১ ৭:২৭ অপরাহ্ণ
Link Copied!

।। মাসুদ পারভেজ।।

শুরুতেই বইমেলা নিয়ে একটি গল্প বলি।
অমর একুশে গ্রন্থমেলা শুরু হচ্ছে। মধ্যবিত্ত পরিবারের উঠতি বয়সী কয়েকজন ছেলেমেয়ের একটি দল ঠিক করলো তারা প্রতিদিন ক্লাস থেকে আসার পথে মেলা হয়ে বাসায় ফিরবে। কথামত মেলার শুরুর দিন থেকে সকলেই হাজির। প্রথমদিকে স্টলগুলো গোছানো শেষ হয় না, মানুষের আনাগোনাও কম দেখে দু একটি সেলফি-টেলফি তুলে দু-দশ মিনিট গল্প-টল্প করে যে যার বাসায় ফিরে যায়। ক্রমে মেলা গুছিয়ে ওঠে। দলটারও আনন্দ আর সেলফি বাড়তে থাকে। ক’দিন বাদে নামি নামি সব স্টলের সামনের ঠোঁট বাঁকানো সেলফিতে দু-একজনের মন ভরেনা, বই কিনতে ইচ্ছে করে। মাকে বলে বাড়তি কিছু টাকা নেয় বাসা থেকে, বই কেনে। ঐ দু-একজনের দেখাদেখি দলের বাকীরাও বই কেনে, সেলফি তোলে, ফেবুতে দেয়। তারও ক’দিন পর দেখা যায় দু-একজন বই পড়ার অনুভূতি স্ট্যাটাস দিচ্ছে, ইজ্জত থাকেনা! বাকিরাও স্ট্যাটাস লেখা শুরু করে দেয়। সেসব স্ট্যাটাস পড়ে দলের দু-একজনের আরও দুএকটি বই কিনতে ইচ্ছে করে কিন্তু ততদিনে মেলা শেষ।

বইমেলা নিয়ে পরিস্কার কিছু শোনা যাচ্ছে না। এই শুনছি হবে, এই শুনছি হবেনা। বইমেলা হবেনা এই কথাটি উঠলো কেন? করোনা ভাইরাসের কারণে। একমাসের বইমেলায় যা জমায়েত হয় এক মাসে কারওয়ান বাজারে কী তার চাইতে কম জমায়েত হয়? কিংবা রাজধানীর বাইরের কোন বইমেলায় যে মানুষ আসে তার চেয়ে কী কম আসে সেখানকার হাট-বাজারে?

এতদিন বন্ধ ছিলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এখন যোগ হয়েছে বইমেলা। করোনার কারণে আর কী কী বন্ধ আছে জানতে ইচ্ছে করে। পুরো ইউনিট নিয়ে সিনেমার শুটিং চলছে, হাজার হাজার মানুষের সভা সমাবেশ হচ্ছে, পর্যটন কেন্দ্রে উপচে পড়া ভিড়, হাতে হাত রেখে পোশাক কারখানায় ছুটছে সেলাই দিদিমনিরা , লোকাল বাসে কাঁধের উপর কাঁধ রেখে দাঁড়িয়ে অফিস যাচ্ছে লক্ষ মানুষ। কিছুই কিন্তু বন্ধ নেই। বন্ধ আছে শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বইমেলা, কী অদ্ভূত!

দু-একজন ছাত্রকে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিতে দেখেছি যে, ‘ওরা যদি অটোপাশের সুযোগ পায়, আমরা কেন নয়, আমাদেরকেও দিতে হবে’। কি সর্বনাশ! পরিক্ষা না দিয়ে পাশ করতে চাওয়া রীতিমত আন্দোলনের পর্যায়ে চলে গেছে। অটোপাশের এই যে কালচার সৃষ্টি হলো এটা ঠিক না ভুল তা সময় বলবে। সামনে এর থেকেও বড় কোন দূর্যোগ আসবে না তার গ্যারান্টি কী? আবার এই যে বইমেলা সিদ্ধান্তের দোলনায় দুলছে সেটাও ঠিক-বেঠিকের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে। শিক্ষা-দীক্ষা নিয়ে এ দেশের দূর্দশাগ্রস্থ দূরদর্শিতা আরো একবার আমাদের সামনে এসে দাঁত বের করে হাসছে। আমরাও শরীরে দু-একটি মোচর দিয়ে সে হাসি দেখছি। অথচ সর্বাগ্রে গুরুত্ব! পাওয়ার কথা ছিলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পড়াশোনা।

একটি কথা অনস্বীকার্য, স্মার্টফোনের রাজত্বে বই পড়ার চর্চাটি এ দেশে এখন অনেকটাই বইমেলা কেন্দ্রিক। দেশে একাডেমিক বইয়ের বাইরে যা বই বিক্রি হয় তার সিংহভাগ ফেব্রুয়ারি মাসে, বইমেলায়। এটা শুধু বাংলা একাডেমির বইমেলায় তা নয়। ফেব্রুয়ারিতে বাংলা একাডেমির বাইরেও সারাদেশে প্রচুর মেলা হয় যেখানে বই বিক্রির হার উল্লেখযোগ্য। আর এই বইমেলার উপর বলা যায় দেশের পুরো প্রকাশনা শিল্পই নির্ভরশীল। একটি বই শুধুই একজন লেখকের সাথে সম্পৃক্ত তা কিন্তু নয়। লেখক পান্ডুলিপি প্রস্তুতের পরই মূলত প্রকাশনার আসল কাজ শুরু হয়। প্রকাশক থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন মানুষ প্রকাশনা শিল্পের সাথে জড়িত। আর এই মানুষগুলোর উপর নির্ভরশীল অজস্র পরিবার। করোনার কারণে সরকার যে প্রনোদনা দিয়েছে তা কয়টি প্রকাশনা সংস্থা পেয়েছেন জানলে ভালো হত। দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির একটি অংশ কিন্তু প্রকাশনা শিল্পের সাথেও জড়িত।

বিশ্বের সাথে তুলনায় গেলে একথা বলা যায় যে বিশৃঙ্খল স্বাস্থ্যখাত নিয়েও করোনা মোকাবেলায় আমাদের সরকার এখন পর্যন্ত মোটামুটি সফল। আমাদের নিজেদের সচেতনতা বাড়ানো গেলে আমরা হয়ত আরও কিছুটা নিরাপদ থাকতাম। বইমেলা নিয়ে আমাদের অধিকতর ভাবনার অবকাশ এখনো শেষ হয়ে যায়নি। বইমেলা করতে হবে। প্রকাশনা শিল্পে চরমতম ধস ঠেকানোর জন্য এটাই শেষ কথা। সেটা কিছুটা পিছিয়ে করা যেতে পারে। কিভাবে করলে সব ধরণের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় সেই উপায় নীতি নির্ধারকরা বের করবে। তাদের নির্ধারিত নীতি দিয়ে যখন পুরো দেশে যখন করোনা ভাইরাস মোকাবেলা করা গেছে তখন বইমেলার সামান্য আয়তনও তারা নিরাপদ রাখতে পারবে বলেই আমাদের বিশ্বাস।

সেলফি তোলার জন্যেও যদি কেউ মেলায় আসে আসুক। আমি বলব ঘরে বসে ফেসবুক চালানোর চাইতে বইমেলায় গিয়ে সেলফি ওঠানোও ভালো। বইয়ের আশেপাশে তবু যাওয়ার অভ্যেসতো হচ্ছে। সেলফি তোলার জন্য যেতে যেতেই একদিন বই কিনে ফেলবে। একদিন বই পড়ার সেলফি ফেসেবুকে দেয়ার জন্য হলেও বইটা খুলবে। পড়ে কেমন লাগলো বন্ধুদের তা জানানোর স্ট্যাটাস দেয়ার দেওয়ার জন্যে হলেও অবশেষে একদিন বই পড়বে।

আমাদের লেখকরা হয়ত তাঁদের পরম মমতার পান্ডুলিপি প্রকাশকের হাতে দিয়ে দিয়েছে। হয়ত আমাদের প্রচ্ছদ শিল্পীবৃন্দ সেসব পান্ডুলিপি দেখে পৃথিবীর সেরা সেরা সব প্রচ্ছদ এঁকে ফেলেছে। আমাদের প্রকাশকগণ হয়ত সেসব মুদ্রণ কারখানায় দিয়ে দিন গুনছে। আমাদের মুদ্রণ কারখানাগুলোও হয়ত মহা সমারোহে রং-বেরঙের একেকটা বই বাঁধাই করে যাচ্ছে। আমাদের সন্তানেরা বইমেলায় যাওয়ার যাওয়ার জন্য মুখিয়ে আছে। আমাদের এখন বইমেলা প্রয়োজন। সত্যিই প্রয়োজন।

মাসুদ পারভেজ
গণমাধ্যম ও সংস্কৃতিকর্মী