ঢাকারবিবার , ১০ এপ্রিল ২০২২

ফিরে দেখা করোনা কালের জীবন ধারা

News Pabna
এপ্রিল ১০, ২০২২ ১০:১৬ অপরাহ্ণ
Link Copied!

।। এবাদত আলী।।
(এক)
কোলাহল মুখর পরিবেশে কর্ম চঞ্চল মানুষজন দৈনন্দিন জীবনে তাদের নানাবিধ কর্ম সম্পাদনের জন্য একস্থান হতে অন্যস্থানে অবিরাম ছুটে চলতো। না ছিলো কোন নিষেধাজ্ঞা না ছিলো কোন বাধাবিপত্তি। স্বাভাবিক নিয়মেই যার যার কর্তব্য সঠিকভাবে পালন করে চলতো। কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রিরা তাদের বিদ্যাপীঠস্থানে গিয়ে রীতিমত লেখাপড়ায় মশগুল থাকতো। রাস্তা পথে অবাধে যানবাহনগুলো চলাচল করতো। এক কথায় বলতে গেলে আমাদের চলমান জীবনধারা ছিল বহতা নদীর মত।

কিন্তু হঠাৎ করেই যেন সব ওলোট পালট হয়ে গেল। নিকষ কালো অন্ধকার যেন গোটা দেশটাকে, দেশের ১৭ কোটি মানুষকে গ্রাস করতে অগ্রসরমান। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই কবিতা-
নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে /তিল ঠাঁই আর নাহিরে/ওগো আজ তোরা যাস নে গো /তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে
কালি মাখা মেঘ ও পারে আঁধার /ঘনিয়েছে দেখ চাহিে রে।।ওগো আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে ।

না আমাদের বাংলাদেশে ঋতু বদলের পালায় আষাঢ় মাস এখনো অনেক দুরে। কিন্তু তার আগেই একটি সংক্রমণ রোগের কালোছায়া আমাদের জীবনকে স্থবির করে দিলো। আর তার নাম হলো করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯। এই করোনা ভাইরাসটি ভয়াবহ গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে বিশ^ময়। যাকে বলা হচ্ছে বৈশ্বিক বিপর্যয়। এটি প্রতিরোধ করার জন্য প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করার পরও কিছুতেই লাগাম টেনে ধরা সহজতর হচ্ছেনা। কারণ এই মরণঘাতি ব্যাধির এখনো কোন কার্যকর ওষুধ আবিষ্কৃার হয়নি।

করোনা ভাইরাসের ছোবলে সারা বিশ্ব আজ নাজুক পরিস্থিতির সম্মুখিন। প্রবল শক্তিধর দেশ সমুহ সহ বলতে গেলে সারা পৃথিবীর প্রায় ১শ ৮৫ টি দেশে তা সংক্রমিত হয়ে প্রতিনিয়তই নানা ধর্ম-বর্ণের মানুষ এই করোনার থাবায় অকাতরে তাদের মুল্যবান প্রাণ বিসর্জন দিতে বসেছে।

করোনা ভাইরাসের বৈশ্যিক মহামারি বলতে করোনা ভাইরাস রোগ ২০১৯ (কোভিড-১৯)এর বিশ্বব্যাপি প্রাদুর্ভাব ও দ্রুত বিস্তারের চলমান ঘটনাটিকে নির্দেশ করা হয়েছে।

প্রাণঘাতি এই করোনা ভাইরাস ব্যাধি ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে সর্বপ্রথম চীন দেশের হুপেই প্রদেশের উহান নগরিতে সনাক্ত করা হয়। ২০২০ সালের ১১ মার্চ তারিখে বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা ব্যাধিটিকে একটি বৈশ্বিক মহামারি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
রোগ বিশেষজ্ঞদের মতে কেরোনা ভাইরাস রোগ ২০১৯ এ আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি বা হাঁচি দেবার ফলে বাতাসে নিক্ষিপ্ত বহু লক্ষ অভিক্ষুদ্র শ্লেষ্মাকণা বাতাসে ভাসতে শুরু করলে নিকটবর্তী অপর কোন ব্যক্তি সেই ভাইরাসযুক্ত বাতাস শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করলে তার দেহে ভাইরাসটি সংক্রমিত হতে পারে। সাধারণ শ্বাস-প্রশ্বাসের কারণেও খুবই স্বল্প পরিমাণ ভাইরাস কণা বাতাসে ভাসতে পারে। এছাড়া ভাইরাস কণা টেবিলে বা অন্য কোন পৃষ্ঠে হাঁচি-কাশির মাধ্যমে কিংবা ভাইরাসযুক্ত হাত দিয়ে স্পর্শের মাধ্যমে পৃষ্ঠের উপাদান ভেদে কয়েক ঘন্টা বা কয়েকদিন লেগে থাকতে পারে, যেই পৃষ্ঠে আরেকজন ব্যক্তি স্পর্শ করে তারপরে নাকে মুখে বা চোখে হাত দিলে ঐ ব্যক্তির শ্লৈষ্মিক ঝিল্লির মধ্য দিয়ে ভাইরাস দেহে প্রবেশ করতে পারে। যখন কোন রোগি ব্যাধিটির লক্ষন উপসর্গ প্রকাশ করা শুরু করে , তখনই এটি বেশি সংক্রামক থাকে। তবে লক্ষন উপসর্গ দেখা দেয়ার আগেও ব্যাধিটি সংক্রমণ হওয়া সম্ভব।

ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হবার সময় থেকে লক্ষন-উপসর্গ প্রকাশ পাবার গড় সময় সাধারনত পাঁচদিন। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ২ থেকে ১৪ দিন বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে। ব্যাধিটির সাধারণ লক্ষন –উপসর্গগুলি হলো জ¦র, কাশি ও শ্বাস কষ্ট। ব্যাধিটি জটিল রূপ ধারণ করলে প্রথমে ফুসফুস প্রদাহ (নিউমোনিয়া) হতে পারে এবং আরো গুরুতর রূপ ধারণ করলে তিব্র শ্বাস কষ্টমুলক রোগ লক্ষন সমষ্টি প্রকাশ পেতে পারে, যাতে রোগির মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

এই ব্যাধির জন্য কোন প্রতিষেধক টিকা বা কিংবা বিশেষভাবে কার্যকর কোন ভাইরাস নিরোধক কোন ওষুধ এখন পর্যন্ত উদ্ভাবিত হয়নি। এই ব্যাধির চিকিৎসাতে মুলত উপসর্গসমুহের উপশম করা হয় এবং সহায়ক চিকিৎসা প্রদান করা হয়। যাতে রোগি নিজে থেকেই ধিরে ধিরে সেরে উঠতে পারে।

করোনা ভাইরাস প্রতিরোধের জন্য অন্য ব্যক্তিদের সাথে দুরত্ব বজায় রাখা, হাঁচি-কাশি দেবার সময় স্বাস্থ্যসম্মতভাবে মুখ ঢাকা, হাত ধুয়ে জীবানুমুক্ত করা, পর্যবেক্ষনে রাখা এবং সম্ভাব্য সংক্রামিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আত্ম-পৃথকিকরণ (সঙ্গ নিরোধ) করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

বিশেষজ্ঞরা আশংকা প্রকাশ করেছেন, এই ব্যাধিটি বিশ্বজুড়ে একটি মহামারি আকার ধারণ করবে, যাতে মানব জাতি বড় এক সংকটে পড়তে পারে। দেশে দেশে মহামারি নতুন কিছু নয়। এরআগে ইতিহাসে যেসব রোগ-ব্যাধি মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছিলো তার মধ্যে ৪৩০খ্রিষ্টপুর্বে স্মলপক্স নামে রোগটি গ্রিসের এথেন্সে মহামারি আকারে দেখা দিয়েছিলো। সেসময় এথেন্সে ৩০ হাজারের বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিলো।

৫৪১ খ্রিষ্টাব্দে রোমান সাম্রারাজ্যের জাষ্টিনিয়ানে ব্যাকটেরিয়া বাহিত প্লেগ রোগ ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় ২শ বছর এই রোগ মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও ভুমধ্যসাগরিয় এলাকায় ছড়ায়। একে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর মহামারি বলা হয়। ২শ বছরে এই রোগটিতে প্রায় ১০ কোটি মানুষ মৃত্যুবরণ করে।
(চলবে)
(লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)।