সোমবার, ০৬ এপ্রিল ২০২০, ১১:৩০ পূর্বাহ্ন

আতঙ্কিত হবেন না
করোনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

ফিরে দেখা ফ্যাশন ট্রেন্ড ২০১৯

সময়ের বয়ে চলা স্রোতে দাগ রেখে যায় ফ্যাশন। এ যেন এক চক্র। অতীতের সঙ্গে মিলেমিশে হয়ে যাচ্ছে এ কাল। এভাবেই চলে ফ্যাশন দুনিয়ায় রূপান্তর। চলে যেতে বসা ২০১৯ সালটিও রেখে যাচ্ছে ফ্যাশন সার্কিটে কিছু দাগ, যার প্রভাব থাকবে আগামী বছরেও বা আরও দীর্ঘ সময়জুড়ে।

২০১৯ সালের ফ্যাশন বিশ্বে আলোচিত ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা যায় দুটি বিষয়। একটি হচ্ছে অনলাইন মার্কেটিং আর এটিকে আখ্যায়িত করা যায় সবুজের প্রত্যাবর্তন হিসেবে।

সাম্প্রতিক পৃথিবীকে স্নায়ুতন্ত্রের মতো ঘিরে আছে ইন্টারনেট। কিছু নেতিবাচকতা থাকলেও একে বলতে হবে এক আশীর্বাদ। সময় আর শ্রম; এ দুই মূল্যবান বিষয় বাঁচিয়ে দিয়েছে ইন্টারনেট। এই ই-কমার্স ডানা মেলছে দিনে দিনে। আর এর ওপর ভর করছে ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি।

বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের এক তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, ২০১৯ সালে এর আগের বছরের চেয়ে ২৫ শতাংশ বেশি অনলাইনে পোশাক বিক্রি হয়েছে। সামনে আসছে ক্রিসমাস। তাই ইন্টারনেটে বিকিকিনি সামনের ক’দিনে আরও বাড়বে বলেই মনে করছেন বাজার বিশ্নেষকরা।

ইন্টারনেটে ক্রমবিকাশমান বাজার ধরতে তাই ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোও যথেষ্ট সক্রিয়। একটা সময় শুধু পত্রিকা আর টেলিভিশনে পোশাকের বিজ্ঞাপন দেখানো হতো। আজকের দিনে ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো টাকা ঢালছে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে। এর মানে পত্রিকা, টিভি বাদ নয়। সেখান থেকেও ক্রেতারা জেনে পোশাক কিনছেন। বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে অনলাইন মাধ্যমগুলো।

বাজার বিশ্নেষকরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, আগামী ২০২০ সালে ২০১৯ সালের চেয়ে ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো ২৫ শতাংশ বেশি বিনিয়োগ করবে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে। এর বাস্তবতাও স্পষ্ট। নিজের হাতের মোবাইল ফোনে পণ্যটি দেখে সেখানেই অর্ডার করছেন- এমন ক্রেতাই পশ্চিমে এখন বেশি। ইন্টারনেট বিস্তৃতির কারণে এ প্রবণতা বাড়ছে দুনিয়াজুড়ে। এখন ক্রেতারা অপেক্ষা করছেন ডেলিভারি ভ্যানের জন্য। আর তা দরজায় আসামাত্র মিলে যাচ্ছে নতুন পোশাক।

ক্রেতারা যে মোটেই ফ্যাশন স্টোরে যাচ্ছেন না, ব্যাপারটা তেমন নয়। পৃথিবীর বড় বড় শহরে ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর স্টোর বসানো থেমে নেই। সেখানেও ক্রেতারা যাচ্ছেন। দেখে, পরে সেখান থেকেও পোশাক কিনছেন অনেকে।

এবার বছরের আলোচিত ঘটনা বলতে হবে ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর পরিবেশ ভাবনা। প্রতিটি পণ্যের উৎপাদনে যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ হয়েছে, তা পণ্যের গায়ে লিখে দেওয়া। এই কার্বন ফুটপ্রিন্টের চল এবার বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিরও কিছু করার আছে, এ কথা বলছেন ইন্ডাস্ট্রি-সংশ্নিষ্টরা। একই সঙ্গে পশু, প্রাণীর চামড়াজাত পোশাক বা পরিধেয় তৈরি থেকে সরে এসেছে অনেক ব্র্যান্ড। বাংলাদেশ, চীন ও ভিয়েতনামের মতো দেশ যেখানে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডের কাপড় তৈরি হয়, সেখানে কর্মরত শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে সচেষ্ট আছেন অনেকে। তবুও বলতে হয়, এ প্রচেষ্টা এখনও জোরালো নয়।

বিশ্বের অনেক দেশের নামিদামি ফ্যাশন ডিজাইনাররা আগেই বলেছিলেন, এ বছর অনেক ট্রেন্ড পাল্টে যাবে। একরঙা পোশাক থেকে অনেক ভোক্তা স্ট্রাইপে চলে আসবেন। স্ট্রাইপের পাশাপাশি জায়গায় থাকবে প্রিন্ট। কাপড়ে রঙের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন দৃশ্যমান। সাদা রংটির চাহিদা বেড়ে যাবে অনায়াসে। বিশ্বের ফ্যাশন উইকগুলোর রানওয়ে থেকে রাজপথে সাধারণের পোশাকে তা প্রমাণও হয়েছে।

মেয়েদের ফ্যাশনের দিকদিয়ে গোলাপি রং এগিয়ে থাকবে- এ ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন অনেক ফ্যাশন বিশেষজ্ঞ। এটাও সত্য হয়েছে এ বছর। পোশাকের প্রতিটি রঙের ক্ষেত্রেই হালকা রং প্রাধান্য পেয়েছে বেশি। এক রঙের স্কিনি জিন্স এবার ফ্যাশনের তালিকা থেকে বাদ পড়ছে। তবে রঙের সামঞ্জস্যতা এসেছে জিন্সে। এ বছর ফ্যাশনের তালিকায় ঢুকছে প্রচুর রাজনৈতিক আর সংশ্নিষ্ট পরিবেশবাদী স্লোগান লেখা পোশাক।

পোশাকের সঙ্গে এবার পাল্টেছে জুতার স্টাইল। আগের মতো হাইহিলের কদর আর থাকছে না। অনেকে ঝুঁকছেন লো হিল এবং ফ্ল্যাট স্যান্ডেলের দিকে। এ ছাড়া ছেলেদের জুতার ক্ষেত্রে একটু কমপ্লিকেটেড ডিজাইন বেশি চলেছে। ব্যাগের বেলায় ভবিষ্যদ্বাণী ছিল এ বছরে আর থাকছে না বড় অথবা কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ। এটিও অনেকাংশে সত্য হয়েছে।

মেয়েদের অলংকারের ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন এসেছে তা হলো লম্বা লাম্বা স্টেটমেন্ট রিং, যেটা এক কানেও পরা যায়।

এ বছর মেয়েদের টপস ডিজাইনে জনপ্রিয় নাম ফ্রিল স্টাইল। ফ্রিল মানে কুচি। মানে কুচির বিভিন্ন ব্যবহার এ বছর মেয়েদের টপসে লক্ষ্য করা গেছে। বলতে গেলে বিশ্বব্যাপী এই স্টাইল দেখা গেছে। মূলত নিউইয়র্ক ফ্যাশন উইক থেকেই চালু হয় এই ট্রেন্ড। সে সুবাদে তা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে এ বছর। আমাদের দেশেও একই চিত্র। ট্র্যাডিশনাল মেয়েদের ড্রেসে খুব সহজে জায়গা করে নিয়েছে এ স্টাইল। কিছু ক্ষেত্রে পোশাকে কুচি মানেই বর্ণিল সাজসজ্জা। গাউন বা লেহেঙ্গায় আধিপত্য ছাড়িয়ে কুচি এনে দিচ্ছে লেডিস টপসে অন্যরকম এক মাত্রা। আর উৎসব, পার্টিতে তরুণীদের পছন্দের শীর্ষে থাকে রং ঝলমলে টপস, তাই এমন ডিজাইনের জায়গা পেতেও দেরি হয়নি এ বছর। মেয়েদের টপসে ট্রেন্ডের প্রতিফলন দেখা যায় বেশি। এবার সেই জায়গায় পরিবর্তন এনেছে বিভিন্ন ফ্রিল। চলে যাওয়া বছরে ঢিলেঢালা টপসের চল বেশ চোখে পড়ছে। ঢিলেঢালা টপসেও ফ্রিলের ব্যাপকতা দেখা গেছে। টপসের গলার অংশে দেখা গেছে বেশি ফ্রিলের কাজ। এই ফ্রিল টপসের নেকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম মাত্রা এনে দিয়েছে, যা এখন বেশ জনপ্রিয়। এ সময়ের ট্রেন্ডি পোশাকে নতুনত্ব এসেছে ড্রেসে নিচের অংশ, অর্থাৎ বটমে। মানে ফ্রিলের সবচেয়ে বেশি ব্যবহার দেখা যায় এখন বটমেই। এ বছর দেশীয় কামিজে বেশ একই রকম কাটিং দেখা গেছে। বিশ্বমণ্ডলে মানুষের যে বিচরণ, সে ডিজাইনই ব্যক্তির চাহিদা পাল্টে দিয়েছে। বহির্বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাই ডিজাইনের সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন দেখা গেছে ড্রেসের বটম অংশে। কোনো কোনো সময় দেখা গেছে, ফ্রিলগুলো ইলাস্টিকের সাহায্যে বিন্যাসিত থাকে। অর্থাৎ এ ধরনের ফ্রিল ওয়েস্ট বেল্ট থেকে সরাসরি নিচে নেমে আসতে পারে এবং ওয়েস্ট বেল্টে যা ইলাস্টিক দিয়ে আটকানো থাকে। কার্টিজ ফ্রিল এ বছর বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে টিনএজারদের কাছে। বছরজুড়েই তারা তা পরেছেন।

পুরোনো স্টাইল ঘুরেফিরে আসে পোশাকের ট্রেন্ডে। তার সহজ উদাহরণ ছেলেদের ক্যাজুয়াল চেকশার্ট। চেকশার্ট রমরমা ছিল আগের শতকে কয়েক দফায়। বিভিন্ন খ্যাতনামা ব্র্যান্ডেও তার প্রভাব দেখা গেছে। আবারও ঘুরেফিরে মার্জিত ক্যাজুয়ালের তালিকায় চেকশার্টের বিকল্প নেই। এ ফ্যাশন এমন। চেকশার্ট এসেছে আবার এ বছরও।

অন্যান্য ট্রেন্ডের বাইরে কিছু চেনাজানা স্টাইলের জনপ্রিয়তা থেকেছে অটুট। কামিজের যেমন লম্বা প্যাটার্ন, সালোয়ারে তেমনই ঢোলা প্যাটার্ন। মোটিফের মধ্যে বরাবরের মতোই থাকছে ফুলেল ও জ্যামিতিক।

উপমহাদেশে বিশেষ করে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে পাঞ্জাবি একটি পরিচিত পোশাক। এ পোশাক যেমন উৎসবে পরিধান করা হয়, তেমনি সাধারণ দিন যাপনে এটি থাকে। তাই বিশ্ব পোশাকে পাঞ্জাবির রয়েছে আলাদা এক কদর। পাঞ্জাবির বেসিক ডিজাইন খুবই জনপ্রিয়তা পেয়েছে বেশ কয়েক বছর ধরে। এটি অবশ্য ঐতিহ্যের জায়গায়। ঈদেও পাঞ্জাবির ক্ল্যাসিক ডিজাইন চোখে পড়ছে বিশাল অংশজুড়ে।

এভাবেই সময়ের সঙ্গে পাল্টায় ফ্যাশন আর স্টাইলের ট্রেন্ড। এ বছর যা নতুন, আগামীবার তা পুরোনো। একই সঙ্গে চলে নতুন-পুরাতনের ফিউশন। মাঙ্গলিক নতুনকে তাই মানুষ বরণ করে উৎসব দিয়ে। এটাই রীতি। এটা সম্প্রীতি। মানুষের প্রাণে প্রাণ মেলাবার চেষ্টা। পোশাক ছাপিয়ে যা রূপ নেয় অন্তরে।


টুইটারে আমরা

© All rights reserved 2020 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial