ঢাকাবৃহস্পতিবার , ২৭ জানুয়ারি ২০২২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বাংলা একাডেমি পুরস্কার ও সাহিত্যমঙ্গলের কবি মজিদ মাহমুদ

News Pabna
জানুয়ারি ২৭, ২০২২ ১০:১৪ অপরাহ্ণ
Link Copied!

।। মাসুদ পারভেজ ।।

গত কয়েক বছর ধরেই বাংলা একাডেমি পুরস্কার ঘোষণার দিন আমি খুব দ্রুতই দেখার চেষ্টা করি কে কে পুরস্কার পেল।

আগের গুলোর চেয়ে এবার প্রত্যাশার পারদ ছিল চূড়ায়। গোপনে দু-চারজনকে যে আমার প্রত্যাশার কথা বলিনি তা নয়। কিন্তু পুরস্কার ঘোষণার দিন মন খারাপের মেঘ ঢেকে দিল আমার সেই প্রত্যাশার আকাশ।

এবারও বাংলা একাডেমি পুরস্কার বঞ্চিত হয়েছেন দেশের অন্যতম প্রধান কবি মজিদ মাহমুদ!

আমি অনেকবার নিজেকেই জিজ্ঞেস করেছি বাংলা একাডেমি পুরস্কার কি কোন লেখকের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু!
নিজেই উত্তর দিয়েছি, হ্যাঁ!

সাধারণ মানুষের জন্য রাষ্ট্রের যতগুলো স্বীকৃতি আছে তা অবশ্যই যোগ্য ব্যাক্তির জন্য অতীব প্রয়োজন। যোগ্য ব্যাক্তি যদি সে স্বীকৃতি না পায় তাতে সেই ব্যাক্তি দৃশ্যত কিছু প্রকাশ না করলেও প্রকাশ পায় রাষ্ট্রের দৈন্যতা। ভীনদেশের মানুষ বলবে যে অমুক দেশ এখনো অমুক ব্যাক্তিকে তার প্রাপ্য সম্মান জানালো না। কোন মনোনয়ন বোর্ড বা নির্বাচকমন্ডলীরই অধিকার নেই তাদের নিজেদের ক্ষুদ্রতার দায়ভার রাষ্ট্রের উপর বর্তানো।

মজিদ মাহমুদ শুধু বাংলাদেশেরই নয়, বর্তমান সময়ের বাংলা সাহিত্যেরই অন্যতম প্রধান কবি। এই বিরলজাত কবিকে অনেকেই মাহফুজামঙ্গলের কবি বলে। বলার কারণ হলো ৩০ বছরেরও অধিক সময় আগে প্রকাশ পায় কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ মাহফুজামঙ্গল। এই গ্রন্থটির জনপ্রিয়তা শুধু বেড়েছেই। ব্যাপারটা অনেকটা জীবনানন্দের বনলতা সেন কবিতার মত। যে ব্যাটা কোনদিন কবিতাই পড়েনি সেও বনলতার সেনের নাম জানে। ঠিক তেমনি মজিদ মাহমুদকে ছাপিয়ে গেছে তার সৃষ্টি মাহফুজামঙ্গল। এখন অনেকেই মজিদ মাহমুদকে না চিনলেও, মাহফুজাকে চেনে। চেনে রুপকথাতুল্য সেই লাইনটি ‘ঈশ্বরকে ডাক দিলে মাহফুজা সামনে এসে দাঁড়ায়’।

আমি এই কবিকে বলি সাহিত্যমঙ্গলের কবি! কারণ শুধু মাহফুজামঙ্গলে বা কবিতাতেই থেমে নেই মজিদ মাহমুদের নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চর্চা। সাহিত্যের সকল শাখাতেই তার অনিন্দ্য স্বচ্ছন্দ্য বিচরণ। এইতো কদিন আগেই বাংলা একাডেমিতেই আয়োজিত আন্তর্জাতিক লেখক দিবস-২০২১ এর অনুষ্ঠানে ২০২০ সালের সেরা কথাসাহিত্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে তার লেখা বই মেমোরিয়াল ক্লাব। লেখকের ২২ বছরের অভিজ্ঞতার নির্যাস, উপন্যাস মেমোরিয়াল ক্লাব।

সাহিত্যমঙ্গলের কবি মজিদ মাহমুদ আজও কেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার পায়নি তা এক রহস্যই বটে! সে কি মুষ্টিমেয় কোন পক্ষের ঈর্ষার স্বীকার? কিংবা অন্য কোন গায়েবী কারণের!

এটি অত্যন্ত পরিতাপের যে যখন আমরা কথা বলব মজিদ মাহমুদের একুশে পদক প্রাপ্তি নিয়ে তখন বলতে হচ্ছে বাংলা একাডেমি পুরস্কার নিয়ে! আমার মতের সাথে বিরোধীতা করার যথেষ্ট বিজ্ঞজন পাওয়া যাবে। সমসময়ই যে তা পাওয়া যায় না তা কিন্তু নয়। প্রতিবারই যে কোন পুরস্কার ঘোষণার পরই বিরোধিতার কাতার পুর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে বলব বাংলা একাডেমি ও একুশে পদকের কথা। অনেকেই ছ্যা ছ্যা করে ওঠে। অনেককেই বলতে শুনি (এখন দেখি) অমুককে তো চিনিইনা, সে কিভাবে এই পুরস্কার পেল!

কে কিভাবে পুরস্কার পায় সেটায় আমার কোনই মাথা ব্যাথা নাই। আমার মাথা ব্যাথা কারণ হলো মজিদ মাহমুদের বাংলা একাডেমি পুরস্কার না পাওয়া। আমি যে এই কবির অতী উৎসাহী সমঝদার তা কিন্তু নয়। গড়পরতা একজন পাঠক আমি। শিল্প সাহিত্যের নুন্যতম চর্চায় নিজেকে সম্পৃক্ত রাখতে গিয়েই আবিস্কার করেছি যে, মজিদ মাহমুদকে এখনও বাংলা একাডেমি পুরস্কার না দেয়াটা আমাদের সাহিত্যেরই অন্ধকার অংশের প্রকাশমাত্র।

যতদূর জানি মজিদ মাহমুদের মোট রচিত গ্রন্থের সংখ্যা ৪০ এর অধিক! বাংলা একাডেমি যে কটি ক্যাটাগরিতে বাংলা একাডেমি পুরস্কার দেয় বলা যায় দু-তিনটি ব্যতিত সব ক্যাটাগরিতেই আলাদা আলাদা করে শক্তিশালী লেখা রয়েছে মজিদ মাহমুদের এবং মজার ব্যাপার হলো সেসব গত দুচার বছরের মধ্যে লেখা নয় অনেক বছর আগে লেখা। সেসব লেখাকে উপজিব্য করেই সাহিত্যে প্রতিষ্ঠিত কেউ কেউ আবার বই লিখে ফেলেছে, লিখছে।

মোট কথা বাংলা সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার জায়গায় মজিদ মাহমুদ বহু আগেই অনেকের থেকেই অনেক এগিয়ে গেছে। সেসবের স্বীকৃতি যে সে পায়নি তা নয়। ভারতের বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে মজিদ মাহমুদের বিচরণ ঈর্ষণীয়। সেখান থেকে সে অনেক বছর আগে জীবনানন্দ দাশ পুরস্কারও পেয়েছে।

পুরস্কার সে আরো পেয়েছে। তাতে কি! পুরস্কার সে আরো পাবে এবং আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি তার সাহিত্যসাধনা দেশের সর্বোচ্চ সম্মাননায় স্বীকৃত হবে। তার সৃষ্ট সাহিত্য একদিন বিশ্বসাহিত্যে বাংলা সাহিত্যের অবস্থান সমৃদ্ধির চিহ্ন রাখবে।
বাংলা একাডেমি পুরস্কারের সাথে জড়িত কর্তাগণের অবশ্যই শুভ বুদ্ধির উদয় হবে। বিলম্বে হলেও অচিরেই প্রাপ্যকে তার যথাযথ সম্মান দেয়া হবে এই প্রত্যাশা করছি।- লেখক: গণমাধ্যম ও সংস্কৃতিকর্মী।