রবিবার, ২৫ জুলাই ২০২১, ০৬:৪২ পূর্বাহ্ন

‘বুখারী শরীফ’ হাদীস সংকলন রচনাকারি ইমাম ইসমাইল বুখারী (রহ.)

ছবি- গুগল থেকে সংগৃহীত


।। এবাদত আলী।।

সমগ্র বিশ্বের মুসলমানদের নিকট হাদীসের সর্বোত্তম গ্রন্থ বলে বিবেচিত ‘ বুখারী শরীফের’ সংকলন রচনাকারি ইমাম বুখারি ছিলেন একজন বিখ্যাত হাদীস বেত্তা। তাঁর পুরো নাম মুহাম্মদ বিন ইসমাইল বিন ইবরাহীম বিন বারদিযবাহ। তাঁর নাম মুহাম্মদ। উপ নাম হলো আবু আব্দুল্লাহ। তবে তিনি ইমাম বুখারি নামেই সমধিক পরিচিত। তাঁর উপাধী হলো আমিরুল মুমিনিন ফিল হাদীস।

তিনি ১৯৪ হিজরি সনের ১৩ শাওয়াল শুক্রবার (৮১০ খ্রিষ্টাব্দে) খোরাসানের বুখারাতে (বর্তমান উজবেকিস্তানের অংশ) জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ইসমাইল ইবনে ইব্রাহীম। তাঁর পিতা হাদীস শাস্ত্রবিদ হিসেবে মুসলিম বিশ্ষে একজন পরিতি ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁর মাতা ছিলেন বিদুষি ও মহিয়সী মহিলা। ইমাম বুখারী শৈশবে পিতাকে হারান। ফলে মায়ের কাছেই প্রতিপালিত হন। তবে তাঁর পিতা মারা যাবার সময় প্রচুর ধনসম্পদ রেখে যান, ফলে ইমাম বুখারী (রহ.) কে কোনরূপ প্রতিকুল অবস্থার মধ্যে পড়তে হয়নি। মাতাই পুত্রের শিক্ষা-দীক্ষার ভার গ্রহণ করেন।

ইমাম বুখারি প্রথমে পবিত্র কোরআন পাঠ শুরু করেন। মাত্র ৬ বছর বয়সে তিনি কোরআনের হাফেজ হন। শিক্ষার প্রতি তাঁর দুর্বার আকর্ষণ ছিলো তাই তিনি ১০ বছর বয়েসে হাদীস মুখস্থ করা শুরু করেন। ১৬ বছর বয়সে তিনি আব্দুল্লাহ বিন মুবারক ওয়াকীর পান্ডুলিপি সমূহ মুখস্থ করে ফেলেন। মহান আল্লাহ পাক তাঁকে অনন্য সাধারণ স্মরণ শক্তি দান করেছিলেন।

ইমাম বুখারী (রহ.) ১৬ বছর বয়সে মা এবং বড় ভাইয়ের সাথে পবিত্র হজব্রত পালনের জন্য মক্কা শরীফে গমণ করেন। হজ পালন শেষে তিনি মক্কাতেই রয়ে যান এবং হিজাজের হাদীস বিশারদদের কাছ থেকে হাদীস গ্রহণ করতে থাকেন। এসময় তিনি ‘কাজায়াস সাহাবা ওয়াততাবীয়ীন’ নামক গ্রন্থ রচনা করেন। এরপর হাদীস অন্বেষণের জন্য তিনি মক্কা, মদীনা, ইরাক, হিজাজ, সিরিয়া, মিশর এবং আরো বহ দেশ ভ্রমণ করেন। ভ্রমণকালে ১ হাজারেরও অধিক সংখ্যক মুহাদ্দীসের নিকট থেকে হাদীস সংগ্রহ করেন। জ্ঞান অর্জনের জন্য গভীর রাত জেগে তিনি কঠিন পরিশ্রম করতেন। তাঁর স্মরণ শক্তি ছিরৈা অত্যান্ত প্রখর। সহীহ বুখারীর অন্যতম ভাষ্যকার কুন্তুলানীর বক্তব্য অনুযায়ি তিনি ৬ লক্ষ হাদীসের হাফেজ ছিলেন।

আলেমগণ তাঁর জীবনীতে উল্লেখ করেছেন, যে কোন কিতাবে তিনি একবার দৃষ্টি দিয়েই তা মুখস্থ করে পেটরতেন। তাঁর জীবনীতে আরো বর্ণিত হয়েছে যে, একদা ইমাম দাখেলি একটি হাদীসের সনদ বর্ণনা করার সময় ‘জুবাইরের’ স্থলে আবু জুবাইর বলেছেন। ইমাম বুখারী অতি ন¤্রস্বরে বল্লেন, এখানে আবু জুবাইয়ের স্থলে জুবায়ের হবে। অতঃপর ইমাম দাখেলি বাড়িতে গিয়ে কিতাব দেখে তাঁর ভুল সংশোধন করেন। তিনি এক দরগাহে যোদ দিতেন যেখানে বহুসংখ্যক ছাত্র হাদীস শ্রবণের পর সঙ্গে সঙ্গে তা লিখে নিতেন। কিন্তু ইমাম বুখারি তা লিখতেন না। একবার তাঁর সহপাঠিরা তাঁর হাদীস না লিখে রাখার কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি কোন উত্তর দেননি। অতঃপর সহপাঠিগণ তাঁকে হাদীস লেখার তাগিদ দিলে তিনি উত্তর দিলেন, ‘‘আপনারা আপনাদের লেখা কপিগুলো নিয়ে আসুন। তাঁরা কপিগুলো নিয়ে আসলে তিনি ধারাবাহিকভাবে তাঁদের সামনে হাদীসগুলো পাঠ করে শোনান। সেই মজলিসে তাঁদের লেখা অনুসারে প্রায় ১৫ হাজার হাদীস মুখস্থ পাঠ করে শোনান। ইমাম বুখারী বলেন,‘‘ আমার অন্তরে ১ লক্ষ সহীহ হাদীস ও ২ লক্ষ জইফ হাদীস মুখস্থ রয়েছে।’’

ইমাম বুখারী (রহ.) এর জীবনের শ্রেষ্ঠতম কর্ম হচ্ছে এই হাদীস গ্রন্থের রচনা। তিনি স্বীয় শিক্ষক ইসহাক বিন রাহওয়াইহ থেকে এই গ্রন্থ রচনার প্রেরণা লাভ করেন। ২১৭ হিজরি সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে তিনি মক্কার হারাম শরীফে এই গ্রন্থর সংকলন শুরু করেন। দীর্ঘ ১৬ বছর পর ২৩৩ হিজরি সনে এর সংকলনের কাজ সমাপ্ত হয়। বুখারী শরীফের সংকলনকালে তিনি সর্বদা রোজা রাখতেন এবং প্রতিটি হাদীস গ্রন্থ সন্নিবেশিত করার আগে গোসল করে দু রাকাত নফল নামাজ আদায় করে মুরাকাবা ও ধ্যানের মাধ্যমে হাদীসের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতেন। ’’

অপর বর্ণনা হতে জানা যায়, যে, ইমাম বুখারী তাঁর স্বীয় কিতাবের শিরোনাম সমূহ রাসুলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রওজা মুবারক এবং মসজিদে নববীর মধ্যস্থলে বসে লিখেছিলেন।

হাদীস চর্চায় সদা ব্যস্ত থাকলেও বন্দেগিতে তিনি মোটেও পিছিয়ে ছিলেননা। তাঁর জীবনীতে উল্লেখিত হয়েছে যে, তিনি প্রতি বছর রমজান মাসের প্রতি দিনের বেলায় একবার পবিত্র কোরআন খতম করতেন । আবার তারাবিহের নামাজের পর প্রতিদিন রাত্রিতে একবার খতম করতেন।

ইমাম বুখারী প্রচুর ধন সম্পদের মালিক ছিলেন। মুহাম্মাদ বিন আবু হাতিম বলেন, ‘ ইমাম বুখারীর কিছু জমি ছিলো, তা হতে তিনি প্রতি বছর সাত লক্ষ দিরহাম পেতেন। এই বিশাল অর্থ থেকে তিনি খুব সামান্যই নিজের জন্য রাখতেন। তিনি খুব সীমিত খাদ্য গ্রহণ করতেন। বেশিরভাগ সময়ই খাদ্য হিসেবে ,শসা, তরমুজ ও সবজি গ্রহণ করতেন। সামান্য খরচের পর যে বিশাল অর্থ অবশিষ্ট থাকতো তার সম্পুর্ণটাই ইলম অর্জনের পথে দান করতেন। অভাবিদের অভাব পুরনে ব্যয় করতেন। তিনি সবসময় দিনার ও দিরহামের থলি সাথে রাখতেন। মুহাদ্দিসদের মধ্যে যারা অভাবি ছিলেন তাঁদেরকেও তিনি প্রচুর পরিমানে দান করতেন।

ইমাম বুখারী (রহ.) এর শেষ জীবন খুব সুখ-শান্তিতে অতিবাহিত হয়নি। বুখারার তৎকালিন আমিরের সাথে তাঁর মতবিরোধ হয়েছিলো। যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস হিসেবে যখন ইমাম বুখারীর সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো তখন বুখারার তৎকালিন শাসনকর্তা খালিদ বিন আহমাদ যুহলী তাকে দরবারে এসে তার সন্তানদেরকে হাদীস শিক্ষা দানের জন্য বলেন। ইমাম বুখারী (রহ.) এটাকে হাদীসের জন্য অবমাননাকর বলে তা প্রত্যাখ্যান করেন। ফলে উভয়ের মাঝ মনোমালিন্যের সৃষ্টি হয়। এতে তাঁকে বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে রাজ্য থেকে বের করে দেওয়া হয়। তিনি জন্মভুমি বুখারা ত্যাগ করে নিশাপুর চলে যান। নিশাপুরেও অনুরূপ দুঃখজনক ঘটনা ঘটলে তিনি পরিশেষে সমরকন্দের খরতঙ্গ নামক স্থানে চলে যান। সেখানেই তিনি ২৫৬ হিজরির ১ শাওয়াল ঈদুল ফিতরের দিনগত রাতে মোতাবেক ৩১ আগষ্ট ৮৭০ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। পরদিন শনিবার পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন খরতঙ্গেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। তাঁর কবর থেকে সুগন্ধি বিচ্ছুরিত হতে থাকে। লোকজন দলে দলে তাঁর কবরের মাটি নিতে থাকে। কোনভাবে তা নিবৃত করতে না পেরে কাঁটা দিয়ে ঘিরে তাঁর কবর রক্ষা করা হয়।

(লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট /সদস্য পাবনা প্রেসক্লাব)

0
1
fb-share-icon1


শৈশব কৈশরের দুরন্ত-দুষ্টু ছেলেটিই আজকের এমপি প্রিন্স

শৈশব কৈশরের দুরন্ত-দুষ্টু ছেলেটিই আজকের এমপি প্রিন্স

শৈশব কৈশরের দুরন্ত-দুষ্টু ছেলেটিই আজকের প্রিন্স অফ পাবনা

Posted by News Pabna on Thursday, February 18, 2021

© All rights reserved 2021 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
x