শুক্রবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২১, ০৭:১২ পূর্বাহ্ন

বেড়া ও সাঁথিয়ায় দুধ সংগ্রহে খামারিদের কাছে ধরনা!

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

বেড়া প্রতিনিধি: দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানে দুধ বিক্রি করতে না পেরে ছয়-সাত মাস আগেও খোলাবাজারে পানির দরে দুধ বিক্রি করেছেন খামারিরা। এতে ব্যাপক লোকসান হওয়ায় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে পাবনার বেড়া ও সাঁথিয়া উপজেলার বিভিন্ন স্থানে খামারিরা একজোট হয়ে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন।

১৮ ফেব্রুয়ারি বেড়ার আমাইকোলা এলাকায় পাবনা-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করে মহাসড়কে অন্তত ১০ মণ দুধ ঢেলে প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দুধ সংগ্রহ কমিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন খামারিরা।

কিন্তু এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো। যে খামারিরা দুধ বিক্রির জন্য দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে ধরনা দিতেন, এখন সেই খামারিদের কাছেই দুধের জন্য ধরনা দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো। কিন্তু তাতে খুব একটা সাড়া মিলছে না। কারণ, প্রতিষ্ঠানগুলো দুধের যে দাম দিচ্ছে, তার চেয়ে অনেক বেশি দামে ছানা তৈরির কারখানাসহ খোলাবাজারে দুধ বিক্রি করতে পারছেন খামারিরা। এর ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর দুধ সংগ্রহের পরিমাণ অর্ধেকের কাছাকাছি পর্যায়ে নেমে এসেছে। এ অবস্থায় ঢাকা, চট্রগ্রামসহ বিভিন্ন শহরে প্যাকেটজাত তরল দুধের সরবরাহ কমে গেছে।

পাবনার বেড়া, সাঁথিয়া ও সিরাজগঞ্জ জেলার কয়েকটি উপজেলা নিয়ে গড়ে উঠেছে দেশের প্রধান গরুর দুধ উৎপাদনকারী এলাকা। এসব অঞ্চলের লক্ষাধিক খামারে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ লাখ লিটার দুধ উপাদিত হয়। উৎপাদিত দুধ মিল্ক ভিটা, আড়ং দুধ (ব্র্যাক), প্রাণ, ফার্মফ্রেশ, অ্যামোমিল্ক, আফতাব, রংপুর ডেইরিসহ কয়েকটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করে সারা দেশে বিক্রি করে থাকে।

প্রতিষ্ঠানগুলো দুধ সংগ্রহ কমিয়ে দিলেই এই এলাকার দুগ্ধশিল্পে নেমে আসে বিপর্যয়। কয়েক মাস আগে খামারিরা উৎপাদিত দুধ নিয়ে বিপাকে পড়েন। কিন্তু গত রমজান মাস সামনে রেখে দুধের চাহিদা বাড়তে থাকে। প্রতিষ্ঠানগুলোও খামারিদের কাছ থেকে দুধ কেনা বাড়াতে থাকে।

এমনকি দুধের সংগ্রহমূল্যও লিটারপ্রতি দুই টাকার মতো বাড়ানো হয়। এতে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি লিটারে সংগ্রহমূল্য দাঁড়ায় ৩৮ থেকে ৪০ টাকা। ঈদুল ফিতরের পরেও প্রতিষ্ঠানগুলো আগ্রহের সঙ্গে খামারিদের সব দুধ সংগ্রহ করতে থাকে। আর ঈদুল আজহার সামনের এই সময়টাতে তো কোনো কথাই নেই। প্রতিষ্ঠানগুলো রীতিমতো খামারিদের কাছে দুধের জন্য ধরনা দিচ্ছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা চাহিদা মোতাবেক দুধ পাচ্ছে না।

খামারিরা জানান, এমনিতেই বছরের এই সময়টায় দুধের উৎপাদন কমে যায়। এর ওপর বেশ কিছুদিন হলো, স্থানীয় খোলাবাজার ও ছানা তৈরির কারখানাগুলোতে দুধের চাহিদা ব্যাপক বেড়েছে। প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর চেয়ে দাম বেশি পাওয়ায় খামারিরা সেখানেই দুধ বেচতে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। প্রতিষ্ঠানগুলো খামারিদের প্রতি লিটার দুধের দাম ৪০ থেকে ৪২ টাকা দিচ্ছে। অথচ খোলাবাজারে ও ছানা তৈরির কারখানাগুলোতে দুধ বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা লিটারে। কখনো কখনো খোলাবাজারে দুধের লিটার ৮০ টাকাতেও উঠছে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ খামারি ছাড়া অন্য বেশির ভাগ খামারিই প্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরে দুধ বিক্রি করছেন।

বেড়া পৌর এলাকার বনগ্রাম মহল্লার খামারি মাহফুজা খানম বলেন, ‘আমার খামারে এখন প্রতিদিন সাড়ে তিন মণ দুধ হয়। একটি বেসরকারি দুধ সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির সঙ্গে চুক্তি থাকায় তাঁকে প্রতি লিটার ৪০ টাকায় দেড় থেকে দুই মণ দুধ দিই। বাকিটা ৫০ থেকে ৬০ টাকা লিটারে বাইরে বিক্রি করি। দু-তিন দিন আগে আরেকটি দুধ সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা এসে সব দুধ নেওয়ার জন্য অনেক অনুরোধ করলেও রাজি হইনি।’

সাঁথিয়া উপজেলার সোনাতলা গ্রামের খামারি ও দুধ ব্যবসায়ী ফজলু মিয়া বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানগুলোতে দুধ বেচার চাইতে এখন বাইরে বেচাই বেশি লাভ। তাই অনেক খামারি এখন বাইরে দুধ বেচতেছে।’

বাঘাবাড়ী মিল্ক ভিটার উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) ইদ্রিস আলী জানান, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত প্রতিদিন তাঁরা গড়ে ১ লাখ ৬০ হাজার লিটার দুধ সংগ্রহ করতেন। এখন তা ৮০ হাজার লিটারে নেমে এসেছে। তিনি বলেন, বর্ষা মৌসুমে দুধের উৎপাদন এমনিতেই কমে যায়। এর ওপর খামারিরা বাইরে বেশি দামে বিক্রি করায় দুধ সংগ্রহের পরিমাণ কমে গেছে।

প্রাণ ডেইরির সহকারী মহাব্যবস্থাপক শরীফ উদ্দিন তরফদার বলেন, ‘পাবনা-সিরাজগঞ্জ এলাকা থেকে মাস চারেক আগেও আমরা প্রতিদিন প্রায় ৯০ হাজার লিটার দুধ সংগ্রহ করতাম। এখন পাচ্ছি ৫০ থেকে ৫৫ হাজার লিটার। বাজারে আমাদের দুধের প্রচুর চাহিদা। কিন্তু খামারিদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় দুধ না পাওয়ায় বাজারের চাহিদা পুরোপুরি মেটাতে পারছি না।’

0
1
fb-share-icon1


© All rights reserved 2021 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
x
error: Content is protected !!