শুক্রবার, ০৭ মে ২০২১, ০৮:০৬ পূর্বাহ্ন

করোনার সবশেষ
করোনা ভাইরাসে বাংলাদেশে গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু বরণ করেছেন ৬১ জন, শনাক্ত হয়েছেন ১ হাজার ৯১৪ জন। আসুন আমরা সবাই আরও সাবধান হই, মাস্ক পরিধান করি। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখি।  

ভারত উপমহাদেশের প্রখ্যাত সুফি সাধক হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী (রহ.)


।। এবাদত আলী।।
ভারত উপমহাদেশের প্রখ্যাত সুফি সাধক হাজী ইমদাদদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী (রহ.) ভারতের মুজাফ্ফর নামক জেলার অন্তর্গত থানাভবন নামক গ্রামে ১২৩১ হিজরিতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি থানভবনের ফারুকি মাশায়েখদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। নানাতার শেখ সিদ্দিকী বংশে তাঁর বোনের বিবাহ হয়েছিলো। তাছাড়া হজরত মওলানা মুহাম্মাদ ইয়াকুব সাহেব (রহ.) ও হজরত মওলানা মুহাম্মাদ কাসেম নানতুবি (রহ.) ও তাঁর আত্মীয় ছিলেন।

হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী (রহ) শৈশবকাল থেকেই প্রখর স্মৃতিশক্তির অধিকারি ছিলেন। ফলে অতিঅল্প দিনের মধ্যেই তিনি পবিত্র কোরআন মজিদ সম্পুর্ণ হিফজ করেন। তারপর তিনি ফারসি ও আরবি শিক্ষার প্রতি গভীর মনযোগ দেন।

ছোটবেলা থেকেই তাঁর তাসাউফের প্রতি প্রবল ঝোঁক ছিলো। তিনি সর্বপ্রথম তরিকায়ে নকশবন্দিয়ার পীর হজরত শাহ নাসির উদ্দিন দেহলভী (রহ.) এর হাতে বা’য়াত হন। হজরত শাহ নাসিরুদিন (রহ.) এর মৃত্যুর পর তিনি হজরত মিয়াজী নুর মুহাম্মাদ ঝানঝানবী (রহ.) এর নিকট বায়া’ত গ্রহণ করেন এবং দীর্ঘদিন পর্যন্ত তাঁর সহবতে থাকেন। পরিশেষে তিনি মিয়াজী সাহেবের নিকট থেকে খেলাফত প্রাপ্ত হন।

হজরত মওলানা হাজী সাহেব (রহ.) ছিলেন জমিদার। কিন্তু প্রথমবার হজ করার পর তিনি তাঁর সমস্ত সম্পত্তি ছোট ভাইকে দান করে দেন এবং জাগতিক সকল চিন্তাÑভাবনা হতে সম্পুর্ণ মুক্ত হন। একটি ছোট্ট কামরায় মহান প্রভুর ইবাদতে গভীরভাবে নিমগ্ন হন। তিনি নিজের ভার ও সমস্ত মেহমানের ভার একমাত্র আল্লাহর উপর ছেড়ে দেন। অবশেষে যখন মেহমানদের আসা বেড়ে গেলো তখন তাঁর বড়ভাইয়ের স্ত্রী তাঁকে পীড়াপিড়ি করে এ অনুমতি প্রর্থণা করলেন যে, আপনার ও আপনার সকল মেহমানের খেদমত করার সুযোগ করে দিন। তিনি তার আবেদন মঞ্জুর করলেন। মোট কথা তিনি আল্লাহ তায়ালার উপর পূর্ণ ভরসা রাখতেন।

১৮৫৭ সালে ভারতের বিভিন্ন স্থানে বিপ্লব ছড়িয়ে পড়লে তখন উলামায়ে কেরামের মধ্যে উদ্দীপনা সৃষ্টি হয় এবং সেই সংগ্রামে অংশগ্রহণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এপ্রসঙ্গে হজরত সায়খুল মওলানা মাদানী (রহ.) নকশে হায়াত নামক গ্রন্থে লিখেন ‘‘পরিস্থিতি বিবেচনা করে আলেমগণ ভাবলেন যে, এ বিপ্লবে অংশগ্রহণ করা তাদের উপর ফরজ। ’’ এর অগ্রনায়ক ছিলেন হাফেজ যামেন (রহ.)। হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী (রহ.) ছিলেন উক্ত আন্দোলনে হাফেজ সাহেবের পরম সাথি। আন্দোলনের এক পর্যায়ে জিহাদের ঘোষণা দেওয়া হলো। উক্ত জিহাদে হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী (রহ.) কে ইমাম, হজরত মুহাম্মদ কাসেম নানতুবী (রহ.) কে সেনাপতি ও মওলনা রশিদ আহমাদ (রহ.) কে কাযী নির্ধারণ করা হয়েছিলো। এই জিহাদে তাঁরা ইংরেজদের হাতে পরাজিত হবার পর হজরত হাজী সাহেব (রহ.) পবিত্র মক্কা শরীফ হিজরত করার ইচ্ছা করেন। মওলানা কাসেম নানতুবী (রহ.) আত্মগোপন করলেন এবং মওলানা গাঙ্গুহী (রহ.) রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে গ্রেফতার হন।

যেহেতু হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী (রহ.) পুর্ব থেকেই হিজরতের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়েছিলেন, তাই নিজ গ্রাম থানাভবন ধ্বংশের পর তিনি হিজরতের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। তিনি আমবালা, তাগরী, পাঞ্জালাসা অবস্থান করতে করতে সিন্দুর পথে জাহাজ যোগে মক্কা শরীফে পৌঁছে যান। পাঞ্জালাসায় অবস্থান কালে রাও আব্দুল্লাহ নামক এক সরদারের এক পরিত্যাক্ত এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘোড়ার আস্তাবলে আশ্রয় নেন। একদিন ঘোড়াশালের অন্ধাকার কামরায় ওজু করে চাশতের নামাজ আদায়ের নিয়তে মুসাল্লা বিছিয়ে উপস্থিত প্রিয় ভক্তদেরকে বলেন ‘‘আপনারা আপনাদের স্ব স্ব স্থানে নফল নামাজ আদায় করে নিন।’’

এসময় গোপন খবরের ভিত্তিতে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে আসে। তখন রাও আব্দুল্লাহ ভিতরে গিয়ে দেখেন হুজুর তাহরিমা বাঁধা অবস্থায় রয়েছেন। তাই তাঁকে সতর্ক করার কোন সুযোগ না পেয়ে আল্লহকে ডাকতে থাকেন। পুলিশ অফিসার সরাসরি সেই কামরায় প্রবেশ করে দেখেন খাটের উপর নামাজের বিছানা বিছানো আছে। ওজুর লোটাও রাখা আছে এবং নিচে ওজুর পানি পড়ে আছে। চারদিকে পুলিশ বেষ্টিত কামরায় বেরুবার কোন উপায় নেই। কিন্তু হাজী সাহেবকে পাওয়া গেলনা। পুলিশ অফিসার হতাশ হয়ে ফিরে যান। পুলিশ চলে যাবার পর দেখা গেলো তিনি নামাজরত অবস্থায়ই রয়েছেন।

মক্কা শরীফে গিয়ে প্রথমে তিনি খুবই কষ্টে পড়েন। তিনি বলেন, ‘‘প্রথম প্রথম আমি যখন মক্কায় এলাম তখন আমার অভাব অনটনের অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিলো যে, নয়দিন পর্যন্ত শুধুমাত্র যমযমের পানি ব্যতিত কিছুই মেলেনি।তিন চারদিন ক্ষুধার্ত থাকার পর কোন কোন বন্ধুর কাছে কর্জ চাইলে তাদের সামর্থ থাকা সত্বেও কর্জ দিতে অস্বীকার করে। তখন আমি বুঝে নিলাম এবং সংকল্প করলাম যে, এখন থেকে কারো কাছে কিছুই চাইবনা।’’ তিনি বলেন,দুর্বলতা এমন চরমে পৌঁছালো যে আমার উঠা-বসা কষ্টকর হয়ে গেলো। অবশেষে নবম দিনে স্বপ্নযোগে হজরত খাজা আজমীর (রহ.) আগমণ করে আমাকে বলতে লাগলেন হে ইমদাদুল্লাহ তোমাকে এতদিন কষ্টের স্বীকার হতে হয়েছে, আজ তোমার হাতে লক্ষ টাকা ব্যয় করার ব্যবস্থা করতে চাই। এটা বড়ই শক্ত আমানত বিধায় আমি তাতে রাজি হলামনা। তিনি বল্লেন, ঠিক আছে তোমার ইচ্ছা, তবে এখন থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ তুমি পাবে।’’

তাঁর বিশিষ্ট খলিফা ছিলেন, হজরত মওলানা রশিদ আহমাদ (রহ.), হজরত মওলানা মুহাম্মআদ কাসেম নানতুবী (রহ.), হজরত মওলানা ইয়াকুব নানতুবী (রহ.), হজরত হাজী সায়্যেদমুহাম্মাদ আবিদ সাহেব দেওন্দী (রহ.), হজরত মওলানা মুহাম্মদ আশরাফ আলী থানভী (রহ.), হজরত মওলানা খলিল আহমাদ সাহেব সাহারানপুরী (রহ.), হজরত মওলানা হাসানস সাহেব দেওবন্দী (রহ.) এবং হজরত মওলানা আব্দুল ওয়াহিদ সাহেব বাঙ্গালী (রহ.)।

তিনি মীলাদ শরীফ সম্বন্ধে বলেন, ‘‘মীলাদ শরীফের মাহফিলকে বরকত লাভের উসিলা মনে করে আমি প্রতি বছর মীলাদ শরীফের মজলিস করি এবং মীলাদ মাহফিলে ক্বিয়াম শরীফ করার সময় আমি অশেষ আনন্দ ও স্বাদ উপভোগ করি। ’’ (ফয়সালায়ে হাফতে মাসায়লা পৃষ্ঠা-৫)।

হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী (রাহ.) উনার অন্য কিতাবে বলেন,‘‘ আমাদের আলেমগণ (দেওবন্দী) মিলাদ শরীফের বিষয়ে খুবই বিরোধ করছে। তবু আমি ক্বিয়াম শরীফ জায়েজ পন্থি আলেমগণের পক্ষেই গেলাম। যখন ক্বিয়াম শরীফ জায়েজ হওয়ার দলিল মওজুদ আছে, তখন কেন এত বাড়াবাড়ি করা হচ্ছে। আমাদের জন্য তো মক্কা শরীফ মদীনা শরীফের অনুকরনই যথেষ্ট। অবশ্য ক্বেয়ামের সময় জন্মের এতেকাদ না রাখা চাই। মীলাদ শরীফ মজলিসে হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম উপস্থিত হতে পারেন এমন বিশ^াস স্থাপনে কোন দোষ নেই। কারণ জড় জগত স্থান ও কাল থেকে মুক্ত নয়, তবে রূহানী জগত স্থান ও কাল হতে সম্পূর্ণ মুক্ত। সুতরাং হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলআইহে ওয়া সাল্লাম উনার মিলাদ মাহফিলে আগমণ করা উনার পবিত্র জাত মুবারকের জন্য অসম্ভব নয়।’’ (শামায়েল এমদাদীয়া-পৃষ্ঠা -৮)

ভারত উপমহাদেশের প্রখ্যাত সুফি সাধক হাজী ইমদাদদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী (রহ.) ৮৪ বছর ৩ মাস ২০ দিন বয়সে ১৩১৫ হিজরিসনের ১৩ জুমাদিউল উখারা সোমবার সুবেহ সাদেকের সময় তাঁর প্রকৃত বন্ধু আল্লাহ তায়ালার সান্নিধ্যে পৌঁছান। (লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)।

0
1
fb-share-icon1


শৈশব কৈশরের দুরন্ত-দুষ্টু ছেলেটিই আজকের এমপি প্রিন্স

শৈশব কৈশরের দুরন্ত-দুষ্টু ছেলেটিই আজকের এমপি প্রিন্স

শৈশব কৈশরের দুরন্ত-দুষ্টু ছেলেটিই আজকের প্রিন্স অফ পাবনা

Posted by News Pabna on Thursday, February 18, 2021

© All rights reserved 2021 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
x
error: Content is protected !!