শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২০, ১১:৫২ পূর্বাহ্ন

আতঙ্কিত হবেন না
করোনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত পাবনার বিবিসি বাজার

রনি ইমরান, পাবনা : বাঙালি জাতির সু-মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে গৌরবান্বিত গল্পে অংশীদার হয়ে আছে পাবনার বিবিসি বাজার।

বিৃটিশ ব্রডকাষ্টিং কর্পোরেশন বিবিসি বিশ্বের জনপ্রিয় একটি সংবাদ মাধ্যম। সেই নামেই আজকের বিবিসি বাজার।

সোনাঝরা স্বাধীনতা সংগ্রামের এক ঐতিহাসিক গল্পে নাম করণ হয়েছে বিবিসি বাজার। স্বাধীনতাকামী মানুষ মুক্তির বার্তা পেতে জড়ো হতো কাশেম মোল্লার চায়ের দোকানে।

১৯৭১ এর ২৫শে মার্চের পরে কাশেম মোল্লার নিজ গ্রাম পাকশীর রুপপুরে নিজের হাতে লাগান কড়ই গাছের পাশেই ছোট্ট একটি চায়ের দোকান দেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় সবাই যখন উৎবেগ আর উৎকন্ঠার মধ্যে দিন কাটাতো। দেশের খবর কেউ জানে না। এমন একটি সময় মুক্তিকামী যোদ্ধারা অধীর আগ্রহে চেয়ে থাকত একটি নির্দেশনার জন্য।তখন অনেক কষ্টে কেনা রেডিও নিয়ে হাজির হয় কাসেম মোল্লা।

হানাদার বাহিনীর পিস্তলের বাটের আঘাতে জখম হওয়া পা নিয়ে লাঠিতে ভর দিয়ে খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাটা কাশেম থ্রি ব্যান্ডের একটি রেডি কেনেন। সে সময় পাঁচ গ্রামে খুঁজেও একটি রেডিও পাওয়া যেত না।

Displaying received_2575367662570276.jpeg

তিনি চায়ের দোকানে মুক্তিকামী মানুষের ভীড় জমানোর জন্যে আর মুক্তিকামী মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য রেডিওটি দোকানে নিয়ে যেতেন।

দেশে যুদ্ধ লাগার পর দেশের সামগ্রিক অবস্থান নিয়ে বিবিসি বাংলায় খবর প্রচারিত হত। মুক্তিযোদ্ধারা জড়ো হয়ে খবরা-খবর শোনার জন্য তার চায়ের দোকানে অবস্থান নিত।

ধীরে ধীরে সকলের মাঝে মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের খবর শুনে দেশাত্ববোধে জাগ্রত হয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ত মুক্তিকামী জনতা। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকহানাদার বাহিনীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে কাসেম মোল্লা রেডিওতে মুক্তিযোদ্ধাদের খবর শোনাতেন।

রাতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র এবং বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা ও কলকাতা বেতারের খবর শোনার জন্য আশপাশের মানুষ দু’বেলা নিয়মিত ভিড় জমাতো তার চায়ের দোকানে।

চা খেতে আসা নানান লোকজনের নানা তথ্য থাকত কাশেম মোল্লার কাছে।

গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের দেশীয় দোসর, রাজাকার ও পাকিস্থানী হানাদার বাহিনীর সমন্ধে তথ্য দিতেন। ক্রমেই ভীড় বাড়তে থাকল তার দোকানে। মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে গড়ে উঠল সম্পর্ক।

Displaying kasam molla.jpg

অনেক সময় খবর পরিবেশন হয়ে যাওয়ার পর, যোদ্ধারা রণাঙ্গন থেকে ফিরে আসলে তিনি সেই তথ্য গুলো শুনে রেখে মুক্তিযোদ্ধাদের শোনাতেন।

হঠাৎ একদিন দেশ স্বাধীন হওয়ার কয়েকদিন আগে রাজাকারদের খবরের ভিত্তিতে পাকিস্থানী সেনারা হানা দেয় কাশেম মোল্লার চায়ের দোকানে।

কাশেম মোল্লার এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন,“পাকিস্থানী সেনারা আমারে হুংকার দিয়া অশ্রাব্য ভাষায় গালি দিয়া বলে, তোম এধার আও, তোমহারা দোকানমে রেডিও বাজতা হায়, শালে, তুমকো খতম কারদে গা, তুম রেডিও নিকালো।”

সেনাদের কথায় আমার তো জানে পানি নাই। ভেবেছিলাম, মাইরে ফেলবি। আমি কলেম, ও চিজ হামারা নেহি হে, আদমি লোক খবর লেকে আতা হে, শুনলোকে লেকে চলে যাতা হে।”

কাশেমের কথায় তারা আরো উত্তেজিত হয়ে ওঠে। হাতের রোলার আর রাইফেলের বাট দিয়ে তার পায়ে আঘাত করে। সেই থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কাশেম মোল্লার সেই পা অকেজো হয়ে ছিল।

সন্ধ্যে হলেই রুপপুর গ্রামে হাকডাক শুরু হতো। গ্রামের লোকেরা একে অন্যেকে বলত, চল ‘বিবিসি শুনতে যাই’।

Displaying bbc bazar photo 2.jpg

এভাবে কাশেম মোল্লার চায়ের দোকানে বিবিসি খবর শোনাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে আরো কয়েকশত দোকান, বিস্তার লাভ করতে থাকে পরিধি। যা দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ‘বিবিসি শোনার বাজার’ এবং পরবর্তীতে বিবিসি বাজার নামে নাম করণ হয়।

স্বাধীনতার ৪৯ বছর পার হয়ে গেলেও তার আর কেউ খবর রাখেনি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তাদানকারী হিসেবে স্বীকৃতি পাননি আবুল কাশেম মোল্লা। এ নিয়ে বিভিন্ন সময় তিনি দুঃখও করেছেন। না পাওয়ার এই ব্যাথা নিয়েই তিনি চলে যান না ফেরার দেশে।

সেই বিবিসি বাজার এখন সরকারি করা হয়েছে, তবে কাশেম মোল্লার মারা যাওয়ার পর কেউ আর খোঁজ নেয়নি তার পরিবারেরও। তার নিজ হাতে লাগানো কড়ই গাছ এখনও আছে।

দোকান আছে সারি সারি বিবিসি বাজারে।বিজয় দিবসে সেখানে স্বগৌরবে উড়ে লাল সবুজের পতাকা। চায়ের দোকানে সবাই যায় চা খায় গল্প করে শুধু সোনাঝরা সেই দিনগুলোর মত রেডিও বাজে না, বীর বাঙালী অস্ত্র ধরো বাংলাদেশ স্বাধীন করো।

নতুন প্রজন্মের অনেকে জানেনা বিবিসি বাজার গড়ে ওঠার পিছনে কাশেম মোল্লার অবদানের কথা।

মুক্তিযুদ্ধের সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা। মুক্তিযুদ্ধের দিন গুলোতে যখন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র কিংবা বিবিসি’র অনুষ্ঠান বার্তার কথা। কাশেম মোল্লা সেই সময় মহা উৎকন্ঠা, আশঙ্কার কথা জেনেও ভরা বাজারে বসে শত শত মুক্তিযোদ্ধাদের শুনেছেন মুক্তিরবানী।

কাশেম মোল্লার ছোট ভাই আবুল কালাম আজাদ বলেন, কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। তবে সামান্য সরকারি সহায়তা পেয়েছিলেন।

এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে চিকিৎসার জন্য ৩০ হাজার এবং মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে ৫০ হাজার টাকা পান। সেই রেডিও এখনো যত্ন করে রাখা আছে কাশেম মোল্লার আলমারিতে। সেটি নষ্ট হয়ে গেছে ২০ বছর আগে। কিন্তু সরকারিভাবে সেই রেডিও সংরক্ষণ করা হয়নি।

আজো আছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত সেই বিবিসি বাজার। শুধু কাশেম মোল্লা বেঁচে নেই। নতুন প্রজন্ম হয়তো জানেনা তার গল্প। তবু ইতিহাসের মনিকোঠায় চির অম্লান হয়ে আছেন তিনি।


টুইটারে আমরা

© All rights reserved 2020 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial