শুক্রবার, ২২ অক্টোবর ২০২১, ০৭:০৩ পূর্বাহ্ন

কুমিল্লায় পবিত্র কোরান অবমাননা সংক্রান্ত খবরটির প্রতি সরকারের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে সকলকে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য অনুরোধ করা যাচ্ছে।- ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়

মুক্তিযুদ্ধে পাকশি হার্ডিঞ্জ ব্রিজ

ভারতীয় মিত্র বাহিনীর বোমার আঘাতে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ১২ নাম্বার গার্ডারটি ভেঙে গিয়েছিল।

উপজেলা করেসপন্ডেন্ট : বিজয়ের ঠিক দুইদিন বাঁকি। সারাদেশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পন শুরু হয়েছে। পাবনার ঈশ্বরদীর পাকশি হার্ডিঞ্জ ব্রিজে যুদ্ধবিমান থেকে বোমা হামলা চালিয়ে ব্রিজের একটি স্প্যান ভেঙে ফেলা হয়।

পাক-বাহিনীর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্য ভারতীয় মিত্র বাহিনী ব্রিজে বোমা নিক্ষেপ করে। বিজয়ের শেষ লগ্নে (১৪ ডিসেম্বর) আহত হয় ‘হার্ডিঞ্জ’ ব্রিজ। বোমার আঘাতে ১২ নাম্বার মূল গার্ডারটি ভেঙে গিয়েছিল। এছাড়া ২, ৯ ও ১৫ নম্বর গার্ডারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ব্রিটিশ সরকার নিজ খরচে জাহাজ উদ্ধারকারী কোম্পানি সেলকো দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত স্প্যানের উদ্ধার কাজ শুরু করেন।

স্বাধীনতার পর ১২ নাম্বার গার্ডারের অনুরূপ আরেকটি স্প্যান পুন:স্থাপন করে ভারত। ব্রিজের ১২ নম্বর গার্ডে আজো লেখা আছে সে তথ্য। এভাবেই মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত এ সেতু। ‘হার্ডিঞ্জ’ যেন এক যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা।

মু্ক্তিযুদ্ধের ক্ষত আর শত বছরের গৌরব নিয়ে আজো দাঁড়িয়ে আছ মাথা উঁচু করে। বোমার অংশ যেন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বহন করে চলেছে।

পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশি রেলওয়ে সদর দফতর ‘পাকশীর বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপকের (ডিআরএম) কার্যালয়ের সামনে’ বোমাটি সংরক্ষণ করা আছে।

তৎকালিক পাবনার এডওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সহ সম্পাদক, বর্তমান ঈশ্বরদী উপজেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি বীর-মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ রশীদূল্লাহ জানান, ঠিক বিজয়ের দুই দিন আগেও ঈশ্বরদীজুড়ে ১০টি অপারেশন ক্যাম্প তখনো যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিল।

তখন যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে পালাতে শুরু করে পাকিস্তানি আর্মিরা। ওই দিন (১৪ ডিসেম্বর) তারা (পাকিস্তানি হানাদার) পালিয়ে পাকশী হার্ডিঞ্জ ব্রিজ হয়ে ঈশ্বরদীর দিকে আসছিল।

খবর পেয়ে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি সেনাদের মোকাবিলা করার জন্য চরসাহাপুরে প্রকৌশলী আব্দুল গফুরের বাড়ির সামনের রাস্তায় অবস্থান করে।
যশোর-কুষ্টিয়া তখন মুক্ত হয়ে গেছে।

দলে দলে পাকিস্তানি হানাদা​র বাহিনী হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পার হতে লাগল। ব্রিজে তারা ডিনামাইট (চার্জ) লাগিয়ে বিদ্যুৎ সংযোজন করে রেখেছিল। কারণ অবস্থা বেগতিক দেখলে ব্রিজটি উড়িয়ে দেওয়া হবে। তারা বেশ ক্ষুধার্ত ছিল বলে মনে হয়েছিল।

কারন পাকশী রেল টানেল ও বাঘইল রেল টানেলের মাঝামাঝি জায়গায় ৩০ জন পাকিস্তানি সেনাকে কাঁচা বেগুন খেতে দেখা যায়। পাকিস্তানি সেনাদের সংখ্যা বাড়তে থাকে।

এ সময় মুক্তিযোদ্ধারা ঈশ্বরদী-কুষ্টিয়া সড়কের ধারে অবস্থান নিয়ে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানালে পাকিস্তানি সেনারা কর্ণপাত না করে গুলি ছুড়তে থাকে। মুক্তিযোদ্ধারাও পাল্টা গুলি চালালে পাকিস্তানি সেনারা মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর আক্রমণ শুরু করে দেয়।

একপর্যায় মুক্তিযোদ্ধারা সংগঠিত হয়ে গ্রামের চারপাশ দিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের ঘিরে ফেলেন। বেপরোয়া হয়ে ওঠে পাকিস্তানি সেনারা। তারা হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ওপর দিয়ে ট্যাংক, কামান ও জিপ নিয়ে পার হতে থাকে।

‘এই পরিস্থিতিতে আমরা মিত্র বাহিনীর স্থানীয় কমান্ডারের কাছে ওয়্যারলেসের মাধ্যমে বিমানবাহিনীর সহযোগিতা চাই। ১৪ ডিসেম্বর দুপুর আনুমানিক ১২টার দিকে পাকশীর আকাশ দিয়ে ভারতীয় পাঁচটি যুদ্ধবিমান হার্ডিঞ্জ সেতুর ওপর চক্কর দিতে থাকে। শুরু হয় বিমান থেকে বোমাবর্ষণ।

চার-পাঁচটি বোমা হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ওপর নিক্ষেপ করা হয়। বোমার প্রচণ্ড আঘাতে এ সময় ব্রিজের ১২ নম্বর স্প্যানটির একদিকের অংশ ভেঙে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। আরেকটি স্প্যানের মারাত্মক ক্ষতি হয়। হঠাৎ বোমার আওয়াজে চমকে ওঠেন মুক্তিযোদ্ধারা। আর দলবদ্ধ ও অ্যাম্বুশ ভেঙে পাকিস্তানি সেনারা পাকশী থেকে পালিয়ে যেতে শুরু করে।’

পাকশি ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান, বীর-মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুল ইসলাম হবিবুল জানান, আমরা তখন বাঘইল গ্রামে পাকশী পেপার মিল ব্যাগাজ ইয়ার্ডের কাছে অবস্থান নিয়েছিলাম।

দুপুর ১২টার দিকে ভারতীয় মিত্র বাহিনীর বিমান অনেকক্ষণ আকাশে মহড়া দিচ্ছিল। প্রথমে পরপর তিনটি এবং কিছুক্ষণ পর আরেকটি বিমান থেকে বোমা বিস্ফোরণের প্রচণ্ড শব্দ পাওয়া যায়। শব্দে মাটি কেঁপে ওঠে।

শব্দের পর চরের প্রচণ্ড ধুলা ও ধোঁয়া এলাকায় ছড়িয়ে যায়। ১৬ ডিসেম্বর ঈশ্বরদী মুক্ত হলে বিধ্বস্ত হার্ডিঞ্জ ব্রিজের কাছে গিয়ে দেখা যায় ১২ নম্বর স্প্যানটি একদিকে কাত হয়ে পানিতে পড়ে ছিল ব্রিজের ওপর দিয়ে যাওয়া বিদ্যুৎ–সংযোগের তারগুলোর সঙ্গে পাকিস্তানি সেনার মৃতদেহ ঝুলে আছে।

পাকিস্তানি সেনাদের ফেলে যাওয়া একটি ট্যাংক সে সময় ব্রিজের ওপর পড়ে ছিল। ব্রিজ ভেঙে যাওয়ার কারণে পাকিস্তানি সেনারা সেটি পার করতে পারেনি।

পরে সেদিন আরেকটি বোমা ফেলা হয়েছিল পাকশী রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রায় ৫০ গজ দূরে ব্রিজের পশ্চিমে বালুচরের মধ্যে। আরেকটি বোমা পড়েছিল রেললাইনের ওপর। বিমান থেকে ফেলা একটি বোমা বালুর ওপর পড়ায় সেটি বিস্ফোরিত হয়নি। পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় বালুর ভেতরে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। সেই বোমার খোলসটি পাকশী রেলওয়ে বিভাগীয় ব্যবস্থাপকের কার্যালয়ের সামনে সংরক্ষণ করে রাখা হয়।’

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) শাহীদূল ইসলাম জানান, হার্ডিঞ্জ ব্রিজে যুদ্ধবিমান থেকে বোমা হামলা চালিয়ে ব্রিজের একটি স্প্যান ভেঙে ফেলা হয়।

সেই বোমার একটি অংশ এখনো মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বহন করে চলেছে।

পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ের ডিআরএম চত্বরের সামনে নিরাপত্তাবেষ্টনীর ভেতরে বোমার খোলসটি এখনো রাখা আছে। লোহার তৈরি খোলসটির ওজন প্রায় দুই মণ। বোমার খোলসটি রং করে সিমেন্টের বেদিতে গাঁথা রয়েছে। এর চারপাশ লোহা দিয়ে ঘেরা।

মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী বোমার খোলসটি দেখার জন্য অনেক দর্শনার্থী এখানে আসেন। পাকশী রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগের পক্ষ থেকে নিয়মিত বোমার খোলসটি পরিষ্কার, সংরক্ষণ ও রং করা হয়।

মহান স্বাধীনতার ৪৯ বছর পর বোমার খোলসটি এখন এই এলাকার মুক্তিযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের একটি স্মৃতি হয়ে আছে নতুন প্রজন্মের কাছে।

0
1
fb-share-icon1


© All rights reserved 2021 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
x
error: Content is protected !!