শুক্রবার, ২৯ মে ২০২০, ০২:৪৩ অপরাহ্ন

আতঙ্কিত হবেন না
করোনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

মুজিবনগরে উদিত সূর্য জগত করে আলোময়

।। ড. এম আবদুল আলীম।।

কালচক্রের ঘূর্ণিপাকে বিভিন্ন জাতির ভাগ্যাকাশে যেমন রাত্রির অন্ধকার নেমে আসে, তেমনি আবার উদিত হয় সোনালি সূর্য। বাঙালির জাতীয় জীবনেও এমনই ঘটনা ঘটে ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন এবং ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল। একবার পলাশীর আম্রকাননে অস্তমিত হয় বাংলার স্বাধীনতার সূর্য, আবার মুজিবনগরের আম্রকাননে তা উদিত হয়। দুই আম্রকাননের দূরত্ব অল্প হলেও, এর মাঝখানে ছিল প্রায় দু-শ বছরের শোষণ-বঞ্চনা আর পরাধীনতার শেকলে বন্দি অগণিত মানুষের আর্তনাদের ইতিহাস।

ড. এম আবদুল আলীম

স্বাধীনতার সোনালি সূর্য বাংলার আকাশে এমনিতেই উদিত হয়নি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ কালের সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ। তিতুমীরের বাঁশের কেল্লার লড়াই থেকে সিপাহীদের বন্দুক দাগানো এবং বাংলার নানা প্রান্তের বিদ্রোহী জনতার বজ্রমুষ্টি থেকে সূর্যসেন-প্রীতিলতার সশস্ত্র সংগ্রাম; সবই ছিল স্বাধীনতার জন্য। ১৯৪৭-এ ইংরেজ বিদায় হয়, বহু মানুষের রক্তসমুদ্র সাঁতরে আসে স্বাধীনতা। কিন্তু বাঙালির ভাগ্যাকাশের ঘোর অমানিশা তাতেও কাটে না, নতুনরূপে দুঃশাসন এ জাতির ভাগ্যে। পাকিস্তানিরা চালায় অত্যাচার আর শোষণের স্টিমরোলার। কিন্তু বাঙালি দমে না। নতুন শপথে জেগে ওঠে। শুরু হয় আবারও রক্তসমুদ্রে সাঁতরানো। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউর, আউয়াল, অহিউল্লাহ পথ দেখান। সে পথ ধরেই চুয়ান্ন, বাষট্টি, ছেষট্টি, উনসত্তর, সত্তর আর একাত্তরের ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ পথ ও রক্তগঙ্গা পাড়ি দিয়ে বাঙালি পৌঁছে যায় স্বাধীনতার মোহনায়। এ ক্ষেত্রে সোহরাওয়ার্দী-ভাসানীসহ অনেক নেতা অবদান রাখলেও, মূল নেতৃত্ব দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

এ পথ মোটেই সহজ ছিল না। চুয়ান্নতে যেমন, তেমনি সত্তরের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পরও বাঙালি বঞ্চিত থাকে। সামরিক শাসন এবং বুটের তলায় পিষ্ট হয় তাদের সকল অধিকার। শুধু তাই নয়, অপারেশন সার্চলাইটের নামে পাকিস্তানি শাসকেরা চালায় নির্মম গণহত্যা। একাত্তরের পঁচিশে মার্চ রাতে একদিকে চলে হত্যাযজ্ঞ, অন্যদিকে গভীর রাতে গ্রেপ্তার করার হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। গ্রেপ্তারের আগমুহূর্তে অর্থাৎ ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ৭ই মার্চের ভাষণে তিনি বাংলার ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলে যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলার আহ্বান জানান। তিনি বজ্রকণ্ঠে উচ্চারণ করেন ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশআল্লাহ।’ এবং আরও বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ পাকিস্তানি বাহিনী গণহত্যা শুরু করলে বাঙালি সর্বশক্তি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল কুষ্টিয়া জেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এমএনএ এবং এমপিএ-দের অধিবেশনে গঠন করা হয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সরকার। ১৭ই এপ্রিল মেহেরপুরের মুক্তাঞ্চল ভবেরপাড়া গ্রামের বৈদ্যনাথতলার ছায়ানিবিড় আম্রকাননে এ সরকার শপথ নেয়। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন আব্দুল মান্নান এম. এন. এ, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন অধ্যাপক ইউসুফ আলী এম. এন. এ.। এ সরকার ‘মুজিবনগর সরকার’ নামেই সমধিক পরিচিত। কেউ কেউ প্রবাসী সরকারও বলে থাকেন। মুজিবনগর সরকারের দায়িত্ব কতকগুলো মন্ত্রণালয় ও বিভাগে ভাগ করা হয়। এ সরকারের অধীনেই মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয় এবং বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। সেজন্য ‘মুজিবনগর সরকার’ ইতিহাসে গৌরবময় আসন লাভ করেছে। এ সরকারের রাষ্ট্রপতি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। উপ-রাষ্ট্রপতি (রাষ্ট্রপতির অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি) সৈয়দ নজরুল ইসলাম; প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ; মন্ত্রিপরিষদের সদস্য খোন্দকার মোশতাক আহমেদ, এম. মনসুর আলী এবং এ. এইচ. এম. কামারুজ্জামান। প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করা হয় এম. এ. জি. ওসমানীকে। এ সরকারের সদর দপ্তর ছিল কলকাতার ৮নং থিয়েটার রোডে, কার্যকাল ছিল ১৯৭২ সালের ১২ই জানুয়ারি পর্যন্ত।

১৭ই এপ্রিল সকাল নয়টা থেকেই নেতৃবৃন্দ ও অতিথিদের আগমনে বৈদ্যনাথতলার নিভৃত পল্লিতে যেন আনন্দের ফল্গুধারা প্রবাহিত হয়। একে একে উপস্থিত হন দেশি-বিদেশি অনেক সাংবাদিক। ঘড়ির কাঁটা নাচতে নাচতে যখন ১১টার উপর আসে, তখনই শুরু হয় শপথ অনুষ্ঠান। সত্যিই এক অভাবনীয় দৃশ্যের অবতারণা হয়। পার্শ্ববর্তী পলাশীর আম্রকানন থেকে যেন ভেসে আসে মোহনলাল আর সিরাজউদ্দৌলার অব্যক্ত হাসির লহরী, তাঁরা পরলোক থেকে করতালি দিয়ে যেন বলতে থাকেন দু-শ বছর আগে মীরজাফরদের কারণে আমরা ব্যর্থ হলেও, আমাদের উত্তরসূরিরা দেখিয়ে দিল স্বাধীনতার সূর্য চিরকাল অস্তমিত থাকে না। পবিত্র কোরআন তেলোয়াত ও বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি’ পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা ঘটে। সকল নিস্তব্ধতা ভেদ কয়ে জয়ধ্বনি ওঠে ‘জয় বাংলা’। এর পর বাংলাদেশকে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ রূপে ঘোষণা দেওয়া হয়, যা প্রচার করা হয়েছিল ১০ই এপ্রিল। এর কার্যকরিতা ঘোষণা করা হয় ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ থেকে। নতুন রাষ্ট্রের সশস্ত্রবাহিনীর প্রধান হিসেবে কর্নেল এম. এ. জি. ওসমানী ও সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ হিসেবে কর্নেল আবদুর রবের নাম ঘোষণা করেন। নতুন সরকার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে বৈদ্যনাথতলার নামকরণ করে ‘মুজিবনগর’। ১২ জন আনসার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে গার্ড অব অনার প্রদান করে। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধান সেনাপতি প্রত্যেকেই জলদগম্ভীর ভাষায় নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের আহ্বান জানান।

মুজিবনগর সরকারের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এ যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ দিয়ে। এমন ঘোষণা দিয়ে স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার নজীর পৃথিবীর খুব বেশি দেশের নেই। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমন জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জনের আইনানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৭১ সালে ২৬শে মার্চ ঢাকায় যথাযথভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং বাংলাদেশের অখ-তা ও মর্যাদা রক্ষার জন্য জনগণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান।’ এত আরও স্পষ্ট করে বলা হয় ‘বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা আমাদের পবিত্র কর্তব্য বিবেচনা করে আমরা বাংলাদেশকে সার্বভৌম গণপ্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি এবং এতদ্বারা পূর্বাহ্ণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণা অনুমোদন করছি।’ মুজিবনগর সরকার শপথের মাধ্যমে ১৭ই এপ্রিল জাতীয় জীবনে নতুন দিনের সূচনা ঘটে। বাস্তাবিকই ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল মুজিবনগর আম্রকাননে এক নতুন সূর্যোদয় ঘটে, যে সূর্য প্রায় দু-শ বছর পূর্বে অস্তমিত হয়েছিল পলাশীর আম্রকাননে। এই সূর্যের আভা ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বময়। ঐ দিনের শপথ নেওয়া সরকার দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালির ইস্পাতকঠিন ঐক্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে। তারা আভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক সকল ক্ষেত্রেই নীতিনির্ধারণী ভূমিকা পালন করে। শুধু তাই নয়, ১১টি সেক্টরের যুদ্ধ পরিচালনা এবং সে যুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন আদায় সবদিক থেকেই মুজিবনগর সরকার দক্ষতার পরিচয় দেয়। মুজিনগর সরকারের শপথ গ্রহণ, তথা ১৭ই এপ্রিল বাংলার আকাশে যে সূর্যোদয় ঘটেছিল, তার আভায় আমরা অর্জন করেছি লাল-সবুজের পতাকা ও স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। জাতিকে স্বাধীনতার কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছে দেয় বলে মুজিবনগর সরকারের অবদান কোনোদিন ভুলবার নয়।

ড. এম আবদুল আলীম
সাবেক ডিন, কলা অনুষদ, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

error20
fb-share-icon0
Tweet 10
fb-share-icon20


© All rights reserved 2020 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial
error: Content is protected !!