রবিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৪:০৩ অপরাহ্ন

রোজিনাকে ফাঁদে ফেলার নেপথ্যে কারা?

পলাশ মাহমুদ: মাত্র দুই সপ্তাহ হলো আমরা ‘বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস’ পালন করলাম। দিবসটির কয়েকদিন আগে মুক্ত সংবাদমাধ্যম সূচকে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ার চিত্র দেখা যায় রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ)-এর রিপোর্টে। তাদের সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫২তম। যা আগের দুই বছর থেকে ক্রমান্বয়ে পিছিয়েছে।

এমনকি প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান (১৪৫), ভারত (১৪২), মিয়ানমার (১৪০), শ্রীলঙ্কা (১২৭), আফগানিস্তান (১২২), নেপাল (১০৬), মালদ্বীপ (৭৯) ও ভুটানের(৬৫) চেয়েও বাংলাদেশের অবস্থান নিচে।

দেশে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা কিভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে তা দৈনিক প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রোজিনা ইসলামকে আটক, গ্রেফতার, রিমান্ড আবেদন ও জামিন না হওয়ার ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। এর আগে একাধিক সাংবাদিকের নিখোঁজ হয়ে আবার ফিরে আসা, রাস্তায় প্রকাশ্যে হামলা করা বা জামিনযোগ্য মামলায় দীর্ঘদিন কারাবরণের ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনায় দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়েছে। সরকারকেও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে।

তবে সাংবাদিক রোজিনার ঘটনা কিছুটা ব্যতিক্রম। তিনি পেশাগত দায়িত্বের কারণে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন। সোর্সের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করার পর সেই তথ্যসহ তাকে আটক করা হয়। তাকে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। ভয়াবহ বিষয় হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ নথি চুরির অভিযোগ এনে মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। সম্ভবত বাংলাদেশে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে এমন হয়রানির শিকার এটিই প্রথম।

তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এখানেই থেমে থাকেনি। তারা চূড়ান্ত পর্যায়ের বেআইনি কাজ করেছে। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে তারা রোজিনাকে দোষী ঘোষণা করেছে। বুধবার (১৯ মে) বিভিন্ন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে রোজিনার বিরুদ্ধে তিনটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রচার করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

১. রোজিনা কাগজপত্রের ছবি তুলেছেন। ২. তার মোবাইলে রাষ্ট্রীয় গোপনীয় অনেক দলিলের ছবি রয়েছে। ৩. তাকে তল্লাশি করে শরীরের বিভিন্ন স্থানে লুকিয়ে রাখা কাগজপত্র/ফাইল পাওয়া যায়।

রোজিনা ইসলামকে নিয়ে বুধবার পত্রিকায় যে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে সেটি সম্পূর্ণ বেআইনি। কারণ, বিষয়টি নিয়ে মামলা হয়েছে এবং বর্তমানে বিচারাধীন। বিচারাধীন বিষয়ে এভাবে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে কাউকে দোষী ঘোষণা করা যায় না। এটা পরিষ্কার যে, এই বিজ্ঞাপনের ফলে মামলার তদন্ত কাজ বাধাগ্রস্ত বা প্রভাবিত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

এছাড়া রোজিনাকে আটক, গ্রেফতার ও মামলার পুরোটাই বেআইনি কাজ করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। রোজিনাকে আটকের সময়কার সাত মিনিট ১৩ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিকমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওতে রোজিনার স্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে। উপস্থিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তিনি পরিষ্কার বলেছেন, তিনি কোনো কাগজ নেননি। তার সোর্স তাকে কাগজ দিয়েছে। তিনি কোনো কাগজের ছবিও তোলেননি। অর্থাৎ তিনি কারো টেবিল বা সংরক্ষিত স্থান থেকে কোনো কাগজ/নথি নেননি। রোজিনার এই বক্তব্যের সত্যতা রয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিজ্ঞপ্তিতে। যেখানে বলা হয়েছে, তাকে তল্লাশি করে নথি পাওয়া গেছে।

হ্যাঁ শুধু রোজিনা নয়, যে কোনো সাংবাদিককে তল্লাশি করলে বা তার মোবাইল ফোন বা অন্য কোনো ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসে খুঁজলে নানা কাগজ/নথি বা ছবি পাওয়া যেতে পারে। সাংবাদিকের কাজ হচ্ছে, তথ্য সংগ্রহ করা। সেগুলো অফিসে নিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদন করা। সাংবাদিক হিসেবে রোজিনা যথার্থই তথ্য সংগ্রহ করেছেন। কোনো সাংবাদিকের কাছে তল্লাশি করে তথ্য পেলে তিনি অপরাধী হবেন এমন কোনো কথা কোনো আইনে বলা নেই। বরং বলা হয়েছে, অবৈধ উপায়ে তথ্য সংগ্রহ করলে অপরাধ হবে। রোজিনা অবৈধ উপায়ে তথ্য সংগ্রহ করেননি। সাংবাদিক তার সোর্সের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করবে এটিই বৈধ উপায়। তাছাড়া তিনি এই নথি কোনো জায়গা থেকে চুরি করছেন এমন অবস্থায়ও তাকে ধরা হয়নি। সুতরাং একজন সাংবাদিকের কাছে থাকা কাগজ বের করে তাকে অপরাধী বলা বেআইনি।

সাংবাদিকের কাছে তথ্য থাকা কোনো অপরাধ নয়। বিশ্বের অনেক বড় বড় ঘটনায় দেখা গেছে সাংবাদিক একবার তথ্য সংগ্রহ করতে পারলে সেই তথ্যের মালিক তিনি। বিশ্বে নথি সংগ্রহ করে হৈচে ফেলে দেওয়া বড় ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্যতম ১৯৭১ সালের ‘পেন্টাগন পেপার্স’। ওই বছরের ২৫ মার্চ মার্কিনিদের ভিয়েতনাম যুদ্ধের টপ সিক্রেট দলিল ফাঁস হয় নিউ ইয়র্ক টাইমসে।

প্রতিরক্ষা বিভাগের একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে এই গুরুত্বপূর্ণ নথি তৈরি করেছিলেন ড্যানিয়েল এলসবার্গ। কিন্তু তিনি যখন দেখলেন মার্কিন প্রশাসন ভিয়েতনাম যুদ্ধে চরম কুকীর্তিতে জড়িত, তখন অন্যায়ের সঙ্গে আপস করাতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত তিনি নিজে নিউ ইয়র্ক পোস্টের সাংবাদিক নিল শিহানকে সব নথি দিয়ে দেন যেন সেগুলো প্রকাশ করে জনগণকে জানানো হয়।

এ ঘটনায় মার্কিন প্রশাসনও আইনি ব্যবস্থা নিয়েছিল। কিন্তু মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট নিক্সন প্রশাসনের বিপক্ষে গিয়ে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস ও ওয়াশিংটন পোস্টের পক্ষে ঐতিহাসিক রায় দেন। যা বিশ্বে সাংবাদিকতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ইতিহাসে একটি মাইলফলক। এছাড়াও মার্কিন প্রশাসন এতদিন ধরে কোনো গোপন তথ্য প্রকাশনার আগে নিষেধাজ্ঞা জারির যে সুবিধা পেয়ে এসেছিল, সেটিও রদ করা হয়।

রোজিনা ইসলামের ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, তিনি আইনশঙ্খলা বাহিনীকে বলছেন, তিনি এপিএসের রুমে অনুমতি নিয়েই ঢুকেছেন। এপিএস তার রুমে না থাকায় ওই কক্ষে তাকে বসতে বলা হয়েছিল। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, রোজিনা ওই কক্ষের টেবিলে থাকা গোপনীয় নথির ছবি তুলছিলেন। কিন্তু এর পক্ষে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এখনও বিশ্বাসযোগ্য কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি। রোজিনা ইতোপূর্বে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি নিয়ে একাধিক সংবাদ প্রকাশ করেছেন প্রথম আলোতে। এজন্য রোজিনার ওপর ক্ষুব্ধ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ফলে রোজিনাকে ফাঁকা কক্ষে বসতে দিয়ে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানো হয়েছে বলে ধারণা করা যায়। কারণ, যখন তাকে ঘিরে ধরা হয়েছে, তখনও তিনি বারবার বলছেন তিনি কোনো কাগজ নেননি এবং ছবি তোলেননি।

এই পর্যায়ে এসে রোজিনা ইসলাম সেখানে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। প্রয়োজনে মুচলেকা দিতে চেয়েছিলেন। অনেকে ভিডিওর এই অংশকে কাটপিস করে রোজিনাকে দোষী সাব্যস্তের চেষ্টা করছেন। কিন্তু নিজের সোর্সের সুরক্ষার জন্য একজন সাংবাদিক উদ্ভুত পরিস্থিতি শান্ত করতে নিজে দুঃখ প্রকাশ করে বা মুচলেকা দিয়ে সমাধান করার চেষ্টা করবেন এটাই স্বাভাবিক। সামান্য ছোটখাট ঘটনায়ও অন্যের কাছে ‘সরি’ বলে সমাধান করে ফেলা এক ধরনের ভদ্রতা। এ ভদ্রতাকে দুর্বলতা বা অপরাধ ভাবা বোকামি। রোজিনাকে দুঃখ প্রকাশ করতে দিয়ে ঘটনাটি এখানেই শেষ করে দেওয়া যেত। বিষয়টি অনুধাবন করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

রোজিনা ইসলামের ঘটনায় ভুল বোঝাবুঝি এড়ানো যেত মন্তব্য করে তিনি বলেছেন, ‘সচিবালয়ে সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে গ্রেপ্তারের দিন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীলদের ‘নীরবতার’ কারণে সংবাদকর্মীদের সঙ্গে ‘ভুল বোঝাবুঝির’ সৃষ্টি হয়েছে।’ কিন্তু দীর্ঘ সময় তাকে আটকে রেখে একটি ইস্যু তৈরি করা হয়েছে।

কতিপয় ব্যক্তির সৃষ্ট এই ইস্যু নিয়ে এখন গোটা দুনিয়ায় বাংলাদেশের সম্মান হানি হচ্ছে। সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়তে হচ্ছে। দেশি-বিদেশি সাংবাদিক সংগঠন, মানবাধিকার সংগঠন থেকে শুরু করে জাতিসংঘ পর্যন্ত এ ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে। বড় সব আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় বাংলাদেশের ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

রোজিনার সাম্প্রতিক প্রকাশিত রিপোর্টগুলোতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে। ফলে সেখানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা না বলা এবং কোনো তথ্য না দেওয়ার জন্যও অফিসিয়াল নোটিশ জারি করা হয়। অর্থাৎ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা তাদের দুর্নীতি তথ্য গোপন করতে সব ধরনের চেষ্টা করেছে। সেই চেষ্টার একটি অংশ হতে পারে সাংবাদিককে ফাঁসানো। যেখানে দুঃখ প্রকাশ বা মুচলেকা দিয়ে বিষয়টি সমাধান করা যেত সেখানে মামলার পর্যায়ে গিয়ে সরকারকে সাংবাদিকদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে।

যারা দুর্নীতি ঢাকতে গিয়ে রোজিনা ইস্যু বানিয়েছে এবং সেই ইস্যুতে সরকারকেই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে, দেশের সম্মান প্রশ্নের মুখে পড়েছে তাদের বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন। তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির যে সংবাদ রোজিনা প্রকাশ করেছে সেই তথ্যগুলো নিয়ে তদন্ত হওয়া দরকার। যদিও দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সেইরকম করে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না অজ্ঞাত কারণে। তবে রোজিনা নির্দোষ প্রমাণিত হোক আমরা সেই প্রত্যাশা করি। আদালত ‘পেন্টাগন পেপার্সের’ ঘটনাকে দৃষ্টান্ত হিসেবে নিয়ে বাংলাদেশে মুক্ত সাংবাদিকতার পথ প্রশস্ত করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত দেবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি।

লেখক: যুগ্ম বার্তা সম্পাদক, সময় টেলিভিশন।

0
1
fb-share-icon1


© All rights reserved 2021 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
x
error: Content is protected !!